📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আল বাকী

📄 আল বাকী


‘আল বাক্বী’ মানে, যিনি চিরঞ্জীব। যার মৃত্যু নেই। চিরস্থায়ী। যখন সমস্ত সৃষ্টিজগত ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তখনও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিরাজমান থাকবেন। তিনি প্রথম; তাঁর পূর্বে যেমন কেউ নেই; তদ্রুপ তিনি সর্বশেষ; তাঁর পরও কেউ নেই।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ والإكرام.
যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান : ২৬-২৭]
একজন বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার বিশালতা ও বড়ত্বের বিষয়টি হৃদয়ে ধারণ করবে তখন তার মন প্রতিনিয়ত তাঁর আনুগত্যের দিকেই ধাবিত হবে। সে সর্বোপরি যে কোনো প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চাকচিক্য ছেড়ে চিরস্থায়ী আখেরাতের শাশ্বত কল্যাণের অভিমুখী হবে। সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-বঞ্চনা; সবসময় সে এক আল্লাহর আশ্রয়েই নিজেকে সমর্পণ করবে। তার মনে এক আল্লাহর ভয়-ই জাগ্রত হয়ে থাকবে; অন্য কারো নয়। কারণ সে বিশ্বাস করে; আল্লাহ-ই সেই রাজাধিরাজ, যাঁর রাজত্বের বিনাশ নেই।

**তুমি কি জানো?**
কিয়ামতের আগ-মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল আলাইহিস সালামকে শিঙ্গায় ফুৎকারের নির্দেশ দেবেন। তিনি নির্দেশ পালন করবেন। তখন সেখান থেকে এতোটাই বিকট শব্দ বেরিয়ে আসবে যে, আসমান ও জমিনে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীর প্রাণবায়ু বেরিয়ে আসবে। আল্লাহর ইচ্ছেয় তখন মাত্র চারজন ফেরেশতা ছাড়া অন্য সবাই মৃত্যুর অমোঘ কোলে ঢলে পড়বে। বেঁচে থাকবেন চারজন মহান ফেরেশতা। হযরত জিবরীল, মীকাইল, ইসরাফীল ও জান কবজকারী আযরাঈল আলাইহিমুস সালাম। আল্লাহ তখন তাঁদের রুহও কবজ করবেন।
ওই সময় গোটা বিশ্বচরাচর হবে প্রাণহীন নিস্তব্ধ ময়দান। কোথাও কোনো, জীবনের স্পন্দন থাকবে না। ফেরেশতা নেই, মানুষ নেই, জ্বিন নেই। নেই, পাখি নেই। কোথাও কেউ নেই। আছেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।...
আল্লাহ তা'আলা তখন হেঁকে বলবেন-
لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ রাজত্ব আজ কার?
প্রাণহীন নিস্তব্ধ বিশ্বচরাচর থেকে কোনো উত্তর আসবে না। তিনি নিজেই উত্তর জানিয়ে বলবেন-
لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِه পরাক্রমশালী একক আল্লাহর।
কুরআন কারীমে সেই দৃশ্য এভাবে চিত্রিত হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান: ২৬-২৭]

📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আল ওয়ারিস

📄 আল ওয়ারিস


যখন সমগ্র সৃষ্টজীব ধ্বংস হয়ে যাবে; আসমান ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাবে; ভূপৃষ্ঠ ও তার উপরিস্থ সব কিছু ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে; তখন যেই একটি মাত্র সত্ত্বা অমর অক্ষুন্ন থাকবেন তিনি হলেন আল্লাহ।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে- وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত। [সূরা আলে ইমরান: ১৮০]
এ পৃথিবীর বুকে জীবিত প্রতিটি মানুষ তার জীবনের এক প্রান্তে এসে মরে যায়। তার মৃত্যুর পর পরবর্তীরা তার উত্তরাধিকারী হয়। সেই উত্তরাধিকারীরাও একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সবকিছুই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সৃষ্টিজীব মাত্রই মৃত্যুর মেহমান। একটি মাত্র সত্তার মৃত্যু নেই। তিনি হলেন, আল্লাহ। তিনি চিরঞ্জীব; তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অমর, তিনি শাশ্বত; তিনি চিরন্তন। আক্ষরিক অর্থে, তিনিই সর্বশেষ উত্তরাধিকারী।
একজন বান্দা হিসেবে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আমার মালিকানাধীন ধন-সম্পদ সম্পদ ছেড়ে একদিন আমাকে পরপারের উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে। তখন সেগুলোর মালিকানা অন্যের হাতে চলে যাবে। এভাব হাত-বেহাত হয়ে সেগুলো শেষ পরিণতিতে আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে। কাজেই যতো দিন সেগুলো আমার হাতে থাকবে আমি সেগুলোর সদ্ব্যবহার করবো।
আসুন আমরা আত্মজিজ্ঞাসা করি যে, হে আমার নফস! এই সম্পদগুলো তুমি কীভাবে উপার্জন করেছো এবং কোথায় কোথায় ব্যয় করেছো? চূড়ান্ত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার আগে আসুন উত্তরগুলো তৈরি করে ফেলি।

**একটি অসিয়ত ও তার পরের ঘটনা**
বিশাল বড় একটি বাগান। যতো দূর দৃষ্টি যায়, রকমারি ফুল ও ফলে সুশোভিত হয়ে আছে। সেই বাগানের উৎপাদিত ফল বিক্রি করে প্রতি বছর প্রচুর মুনাফা হতো।
পুরো বাগানটির মালিক ছিলেন একজন গৃহকর্তা। তার সঙ্গে তার দুই ছেলে ও এক ভাতিজাও সেই বাগানে কাজ করতো। ভাতিজাটি ছিলো অনাথ। ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তিনিই তার এ ভাতিজার দেখা-শুনা করতেন।
লোকটি মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে গেলেন যে, আমার মৃত্যুর পর আমার পিতৃহীন ভাতিজাও বাগানটির কিয়দাংশের মালিক হবে। ...
লোকটির দু'ছেলে পিতার ওই অসিয়তের কথা শুনতে পেয়ে ভীষণ রুষ্ট হলো। বড় ছেলে উত্তেজিত কণ্ঠে বললো- এ বাগান আমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ। তিনি আমাদের জন্যে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। কাজেই আমরাই তার মালিক হবো। অন্য কাউকে সেখান থেকে কোনো অংশ দেবো না।
এ কথা বলে তার সদ্যপ্রয়াত পিতার অসিয়তের কাগজটি টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললো। অসিয়তের ব্যাপারে অবগত সাক্ষীদের ডেকে বললো- তোমরা যদি অসিয়তের কথা কাউকে বলো তাহলে জানে মেরে ফেলবো।
এভাবে কিছু দিন তারা বাগানের ভোগ-দখল নিজেদের হাতে রাখলো। কিন্তু আল্লাহর কী কুদরত! কিছু দিন পর তারা দু'ভাই-ই এক অজ্ঞাত রোগের শিকার হলো। রোগের প্রকোপে তারা এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়লো যে, হাঁটা-চলার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো। বিছানা থেকে উঠে মুখে খাবার তুলে নেয়ার শক্তিটুকুও পর্যন্ত তাদের ছিলো না।
তাদের এই দূরবস্থা থেকে সেই ইয়াতীম চাচাতো ভাই এগিয়ে এলেন। সাধ্যমতো তিনি তাদের সেবা-শুশ্রুষা করতে লাগলেন। এভাবে কয়েক বছর তিনি তাদের যত্ন-আত্তি করলেন। অবশেষে এক সময় তারা দু'ভাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
আল্লাহর কী কুদরত! সেই দু' ভাইয়ের কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিলো না। উত্তরাধিকারী না থাকায় অবশেষে সেই বাগানটির সম্পূর্ণ মালিকানা ওই চাচাতো ভাইয়ের হাতেই চলে এলো। এভাবে আল্লাহর ইচ্ছেতে তিনি হয়ে গেলেন সেই বাগানের একমাত্র মালিক।

📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আর রশীদ

📄 আর রশীদ


‘আর রশীদ’-এর শাব্দিক অর্থ হলো, সঠিক পথের নির্দেশদাতা। এটিও আল্লাহ তা’আলার একটি গুণবাচক নাম। কেননা তিনিই তাঁর বান্দাদেরকে কল্যাণ ও মঙ্গলের দিকে পথ প্রদর্শন করেন। তিনি তাদেরকে তাড়িত করেন সেই কল্যাণের দিকে; যা উভয় জগতে তাদের জন্যে প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনবে।
সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্যে মহান আল্লাহকে কারো সঙ্গে পরামর্শ করতে হয় না। তিনি তাঁর কোনো কর্মেই পরনির্ভরশীল নন। তিনি অবলীলায় তাঁর বান্দাদের হৃদয়গুলোকে আনুগত্য ও সততার দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম। এভাবেই তিনি তাদেরকে জান্নাতের দিকে ধাবিত করেন।
আল্লাহর অনুসারী বান্দা হিসেবে আমাদেরকেও ব্যক্তিজীবনে সৎ পরামর্শদাতা হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। চেষ্টা করতে হবে, আমাদের কাজগুলো যেনো সততানির্ভর হয়; আমাদের পরামর্শগুলো যেনো হিতাকাঙ্ক্ষামূলক হয়; আমাদের আচরণগুলো যেনো হৃদ্যতাপূর্ণ হয়।
আসুন, আমরা আমাদের ভাইদেরকে প্রজ্ঞার সঙ্গে সত্যের দিকে আহ্বান করি। আসুন, আমরা প্রত্যেকেই একজন আদর্শবান দাঈ হিসেবে গড়ে ওঠি।

**সত্য আনে মুক্তি**
হযরত আবুল ইয়াযীদ বোস্তামী রহ.। বিখ্যাত জ্ঞানতাপস। তাঁর শৈশবের একটি শিক্ষণীয় ঘটনা তুলে ধরছি। তিনি তাঁর জন্মভূমি থেকে বাগদাদগামী একটি কাফেলার সহযাত্রী হয়ে রওয়ানা হলেন।
বাড়ি থেকে বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর জন্মদাত্রী সোহাগিণী মা উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন- বাবা! সবসময় সত্য কথা বলবে। কখনই মিথ্যার আশ্রয় নেবে না।
এ কথা বলার পর তিনি তাঁর হাতে চল্লিশ দিনার গুঁজে দিয়ে বললেন- বাবা! প্রয়োজন পড়লে এখান থেকে নিয়ে খরচ করবে।
পথিমধ্যে সেই কাফেলার ওপর একদল ডাকাত আক্রমণ করলো। তারা কাফেলার প্রত্যেক যাত্রীকে তন্নতন্ন করে তল্লাশি করলো। মারধরও করলো। তাদের সঙ্গের সোনা-দানা, টাকা-কড়ি ছিনিয়ে নিলো।...
এক পর্যায়ে সেই ডাকাতদলের এক সদস্য শিশু আবুল ইয়াযীদ বোস্তামীর কাছে এগিয়ে এলো। ভীষণ রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলো- - তোমার কাছে কি কোনো গোপন সম্পদ আছে?
শিশুটি বললো- জ্বি হ্যাঁ, আমার কাছে সর্বসাকুল্যে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে।
শিশুর কণ্ঠে অকপট স্বীকারোক্তি দেখে ডাকাতদলের সর্দার প্রচণ্ড বিস্মিত হলো। এগিয়ে এসে বললো- তুমি জানো আমরা ডাকাত। অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করাই আমাদের কাজ। তারপরও কীভাবে তুমি আমাদের কাছে সত্য কথা প্রকাশ করে দিলে?
তিনি বললেন- 'আমার মা আমার কাছ থেকে সবসময় সত্য কথা বলার অঙ্গীকার নিয়েছেন। আমি তার সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারি না।'
কথাগুলো যেনো ডাকাতদলের সর্দারের কানে আগুনের হলকা ছুড়ে দিলো। আত্মগ্লানির তীব্র দহনে তার হৃদয় পুড়তে শুরু করলো। অনুতাপ মাখা কণ্ঠে বলে ওঠলো- হায়! ছোট্ট এ শিশু তার মায়ের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ হওয়ার ভয় করছে। আর আমরা আল্লাহর শাস্তির ভয় করছি না। আল্লাহর কসম! তার কথাগুলো আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আজকের পর থেকে আর কোনোদিন আমি এই অপকর্ম করবো না।
তখন তার সঙ্গের অন্য ডাকাতগুলোও বলে ওঠলো- সর্দার! গুনাহের ওই কাজগুলোতে আপনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আজ আল্লাহ আপনাকে সত্য ও কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। হিদায়াতের সেই পথেও আমরা আপনাকে সর্দার হিসেবে মেনে নিচ্ছি। সর্দার! গুনাহের পথ ছেড়ে আল্লাহর পথে চলার এই সফরেও আপনি আমাদের নেতৃত্ব দিন।

📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আস সবূর

📄 আস সবূর


‘আস সবুর’ বলা হয় ওই সত্তাকে যিনি অপরাধীদের শান্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার তাড়াহুড়া করেন না। তিনি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কারণ হতে পারে, তারা পাপের পথ ছেড়ে অনুশোচনাদগ্ধ হৃদয়ে ফিরে আসবে। বিগত কর্মকাণ্ডের ওপর ক্ষমাপ্রার্থনা করে আল্লাহমুখী হবে।...
কেননা, আল্লাহর রহমত বিশালতা ও ব্যাপকতার বিচারে তার ক্রোধ ও প্রতাপকেও ছাড়িয়ে গেছে। একজন বান্দা যখন তাওবা ও ইসতিগফারের পথ ধরবে তখন সে অনুভব করবে যে, আল্লাহর রহমত তার দিকে তীব্রগতিতে ছুটে আসছে। কেননা তিনি তার কোনো সৃষ্টিকে দণ্ডিত করার নিয়তে সৃষ্টি করেননি।
আসুন, আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমরা নিজেদেরকে ধৈর্য ও সংযমের উপাদানে গড়ে তুলি। আসুন, আল্লাহর পথে আহ্বানকালে কোনো ধরনের তীর্যক মন্তব্য বা আঘাতের সম্মুখীন হলে হাসিমুখে bরণ করে নিই। আসুন, দাঁত চেপে সত্যের অনুসরণ ও মিথ্যা বর্জনের ওপর বলিষ্ঠ থাকি। আসুন, আমরা কোনো অপরাধীকে শাস্তি প্রদানে উদগ্রীব না হই; বরং তাকে ফিরে আসার অবকাশ করে দিই। তবেও আমরা হবো 'আস সবুর' আল্লাহর ধৈর্যশীল বান্দা।

**তাওবার অনুপম গল্প**
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক যুদ্ধ থেকে ফেরামাত্রই মুসলিম বাহিনীকে 'বনু কুরাইযা'-এর ইয়াহুদিদের ওপর আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। কারণ তারা চুক্তি ভঙ্গ করে মুশরিকদের সঙ্গে আঁতাত করে ছিলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মজবুত কেল্লার চারপাশে অবরোধ করলেন।
তখন ইয়াহুদিরা দূত মারফত প্রস্তাব পেশ করলো যে, আপনি আমাদের কাছে 'আবু লুবাবা ইবন্ আবদিল মুনযির-কে প্রেরণ করুন। আমরা এ বিষয়ে তার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করতে ইচ্ছুক। হযরত আবু লুবাবা ছিলেন, একজন মুসলিম রণযোদ্ধা। তবে তার সঙ্গে ইয়াহুদিদের মিত্রতা চুক্তি ছিলো।
নবীজি তাদের প্রস্তাব মেনে নিয়ে হযরত আবু লুবাবা রাদি.-কে প্রেরণ করলেন। ইয়াহুদিরা তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হলো। সেখানে তারা জিজ্ঞেস করলো- হে আবু লুবাবা! আপনি কি আমাদেরকে মুহাম্মাদ- এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বলেন?
তিনি বললেন- হ্যাঁ। সেটাই করো। এ কথা বলে তিনি মুসলিম বাহিনীর দিকে হাতের ইশারা করলেন। অর্থাৎ ইঙ্গিতে তিনি বুঝালেন, বাগে পেলে তারা তোমাদের হত্যা করবে।
তৎক্ষণাৎ আবু লুবাবা বুঝতে পারলেন, তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে খিয়ানত করে ফেলেছেন। এখন যে কোনো মুহূর্তে তাঁর ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘোষণা করে দিলেন- যতোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমার তাওবা কবুল না করবেন, আমি আমার এ মুখ নিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির হবো না।
এ কথা বলে তিনি নিজেকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেললেন। বললেন- তাওবা কবুল না হওয়া পর্যন্ত আমি এ স্থান ছেড়ে কোথাও যাবো না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু লুবাবার এ কাণ্ড সম্পর্কে অবহিত হয়ে বললেন- যদি সে আমার কাছে আসতো তাহলে আমি তার জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। তবে সে যেহেতু কাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেলেছে কাজেই আল্লাহর সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমি তার বাঁধন খুলে দেবো না।
এভাবে আবু লুবাবা একাধারে ছয় রাত স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন। নামাযের সময় হলে বাঁধন খুলে কাতারে এসে হাজির হতেন। বাকিটা সময় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বন্দি থাকতেন।
অবশেষে সপ্তম রাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর তাওবা কবুলের ঘোষণা এলো। লোকেরা তখন তাকে তাওবা কবুলের সুসংবাদ শুনিয়ে বললো- এবার তুমি নিজেকে মুক্ত করো।
তখন আবু লুবাবা বললেন- একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার এ বাঁধন খুলবেন।
ফজরের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে তাঁর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিলেন। তখন হযরত আবু লুবাবা রাদি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার পাপের আরো কিছু প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমার মালিকানায় যতো সম্পদ আছে তার সমুদয় আমি আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার সংকল্প করেছি। আপনি অনুমতি দিলে এখুনি তা এনে আপনার পদতলে হাজির করবো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু লুবাবা! তুমি যদি তোমার পূর্ণ সম্পদের এক তৃতীয়াংশ সদকা করো তাহলে সেটাই তোমার জন্যে যথেষ্ট হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00