📄 আল হাদী
‘আল হাদী’-এর শাব্দিক অর্থ পথপ্রদর্শনকারী। আল্লাহ তা‘আলা মানবহৃদয়গুলোকে তাঁর মা‘রিফাতের দিকে পথ দেখান। এভাবে যে, তিনি জল-স্থলে তাঁকে চেনানোর মতো অসংখ্য আলামত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। সেই বিক্ষিপ্ত আলামতগুলো আল্লাহর একক সত্তার জানান দেয়; তাঁর বড়ত্ব ও বিশালতার প্রমাণ বহন করে।
এছাড়াও মানবজাতিকে পথ দেখানোর জন্যে আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন; শত শত কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এভাবে তিনি হিদায়াতের আয়োজনের ষোলকলা পূর্ণ করেছেন।
এর বাইরে তিনি প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন সুস্থ প্রকৃতি ও বিশ্লেষণক্ষমতা। যে কোনো মানুষ তার সেই স্বভাবজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তার মানসপটে আল্লাহর একক সত্তার স্বচ্ছ পরিচয় ফুটে ওঠবে। কাজেই তাওহীদ চেনা ও জানার উপকরণের কোনো কমতি আল্লাহ রাখেন নি।
এর বাইরে আল্লাহ তা'আলা গুনাহগার বান্দাদেরকে তাওবা ও অনুশোচনার দিকেও পথ প্রদর্শন করেন। তিনি প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃতিক বিভিন্ন উপকরণের সহায়তার তার চোখের সামনে পাপের কদর্য দিকগুলো তুলে ধরেন; মেলে ধরেন আল্লাহর ক্ষমার সুবিশাল আঁচল। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে- الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدُى
**আঙ্গুলের ছাপ**
পৃথিবীর বুকে কোটি কোটি মানুষ বসবাস করে থাকে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, একজন মানুষের আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে আরেকজনের আঙ্গুলের ছাপ কোনোদিনই মিলবে না। এমনকি একই সঙ্গে জন্মগ্রহণকরা দু'ভাইয়ের আঙ্গুলের ছাপও ভিন্ন। শুধু তাই নয়; একই হাতের এক আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে অন্য আঙ্গুলের ছাপও মিলবে না।
আধুনিক বিজ্ঞানে এ তথ্যও আবিস্কৃত হয়েছে যে, আঙ্গুলের সেই ছাপ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই অবস্থায় থাকে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার আকার বড়-ছোট হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পরিবর্তন হয় না।
📄 আল বাদী'
এই যে সবুজ শ্যামল পৃথিবী, অগণিত নক্ষত্র খচিত আকাশ, উর্মিমালায় বিক্ষুব্ধ সাগর, বাহারি ফুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে সুরভিত বাগান; সবটাই তো মহান আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি তার নিরূপম সৃষ্টিনৈপুণ্যের প্রকাশ ঘটিয়ে সেগুলোকে অস্তিত্ব দিয়েছেন।...
তিনি কারো সৃষ্টি নকল করে সেগুলোকে জন্ম দেননি। সেগুলোর প্রজনন ও গঠন কাজে কেউ তার সঙ্গে অংশীদারও ছিলো না। সৃষ্টি ও অস্তিত্ব দানের পুরোটাই একক আল্লাহর দান।...
তিনি কারো মতো নন। কেউ তাঁর মতো নয়। সত্তা ও গুণ; সর্বক্ষেত্রেই তিনি নিরূপম। কুরআনে কারীমে সে কথা ইরশাদ হয়েছে এভাবে-
بَدِيْعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُوْلُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ.
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন 'হও' ফলে তা হয়ে যায়। [সূরা বাকারা: ১১৭]
অনুপম স্রষ্টা 'আল বদী'' আল্লাহ তা'আলার বান্দা হিসেবে আসুন, আমরা তাঁর সৃষ্টিনৈপুণ্যের ভাস্বর এই বিশ্বপ্রকৃতি গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করি। সৃষ্টির মাঝে অনুসন্ধান করি স্রষ্টার রূপ-বৈচিত্র।
রাতের পরিস্কার আকাশের দিকে তাকালে দেখানে যাবে, সেখানে অসংখ্য তারা মিটিমিটি জ্বলছে। বিশাল আকাশের বুকে তারাগুলোকে খুবই ছোট দেখায়। কারণ সেগুলো আমাদের থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থিত।
সূর্যের পর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটিও আমাদের পৃথিবী থেকে ৪.২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। একটি আলো বছরে ৯.৪৬ মিলিয়ন মিটারের পথ অতিক্রম করতে পারে। এজন্যে এ পরিমাণ দূরত্বকে এক আলোকবর্ষ বলা হয়। সেই হিসেবে সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটি আমাদের কমপক্ষে ৪০ মিলিয়ন দূরত্বে অবস্থিত।
বিস্ময়ের বিষয় হলো, কিছু কিছু নক্ষত্র আমাদের থেকে হাজার হাজার মাইল আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমরা রাতের পৃথিবীতে এতো কোটি মাইল দূর থেকে ছুটে আসা আলো প্রত্যক্ষ করে থাকি।
📄 আল বাকী
‘আল বাক্বী’ মানে, যিনি চিরঞ্জীব। যার মৃত্যু নেই। চিরস্থায়ী। যখন সমস্ত সৃষ্টিজগত ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তখনও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিরাজমান থাকবেন। তিনি প্রথম; তাঁর পূর্বে যেমন কেউ নেই; তদ্রুপ তিনি সর্বশেষ; তাঁর পরও কেউ নেই।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ والإكرام.
যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান : ২৬-২৭]
একজন বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার বিশালতা ও বড়ত্বের বিষয়টি হৃদয়ে ধারণ করবে তখন তার মন প্রতিনিয়ত তাঁর আনুগত্যের দিকেই ধাবিত হবে। সে সর্বোপরি যে কোনো প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চাকচিক্য ছেড়ে চিরস্থায়ী আখেরাতের শাশ্বত কল্যাণের অভিমুখী হবে। সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-বঞ্চনা; সবসময় সে এক আল্লাহর আশ্রয়েই নিজেকে সমর্পণ করবে। তার মনে এক আল্লাহর ভয়-ই জাগ্রত হয়ে থাকবে; অন্য কারো নয়। কারণ সে বিশ্বাস করে; আল্লাহ-ই সেই রাজাধিরাজ, যাঁর রাজত্বের বিনাশ নেই।
**তুমি কি জানো?**
কিয়ামতের আগ-মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল আলাইহিস সালামকে শিঙ্গায় ফুৎকারের নির্দেশ দেবেন। তিনি নির্দেশ পালন করবেন। তখন সেখান থেকে এতোটাই বিকট শব্দ বেরিয়ে আসবে যে, আসমান ও জমিনে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীর প্রাণবায়ু বেরিয়ে আসবে। আল্লাহর ইচ্ছেয় তখন মাত্র চারজন ফেরেশতা ছাড়া অন্য সবাই মৃত্যুর অমোঘ কোলে ঢলে পড়বে। বেঁচে থাকবেন চারজন মহান ফেরেশতা। হযরত জিবরীল, মীকাইল, ইসরাফীল ও জান কবজকারী আযরাঈল আলাইহিমুস সালাম। আল্লাহ তখন তাঁদের রুহও কবজ করবেন।
ওই সময় গোটা বিশ্বচরাচর হবে প্রাণহীন নিস্তব্ধ ময়দান। কোথাও কোনো, জীবনের স্পন্দন থাকবে না। ফেরেশতা নেই, মানুষ নেই, জ্বিন নেই। নেই, পাখি নেই। কোথাও কেউ নেই। আছেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।...
আল্লাহ তা'আলা তখন হেঁকে বলবেন-
لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ রাজত্ব আজ কার?
প্রাণহীন নিস্তব্ধ বিশ্বচরাচর থেকে কোনো উত্তর আসবে না। তিনি নিজেই উত্তর জানিয়ে বলবেন-
لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِه পরাক্রমশালী একক আল্লাহর।
কুরআন কারীমে সেই দৃশ্য এভাবে চিত্রিত হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান: ২৬-২৭]
📄 আল ওয়ারিস
যখন সমগ্র সৃষ্টজীব ধ্বংস হয়ে যাবে; আসমান ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাবে; ভূপৃষ্ঠ ও তার উপরিস্থ সব কিছু ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে; তখন যেই একটি মাত্র সত্ত্বা অমর অক্ষুন্ন থাকবেন তিনি হলেন আল্লাহ।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে- وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত। [সূরা আলে ইমরান: ১৮০]
এ পৃথিবীর বুকে জীবিত প্রতিটি মানুষ তার জীবনের এক প্রান্তে এসে মরে যায়। তার মৃত্যুর পর পরবর্তীরা তার উত্তরাধিকারী হয়। সেই উত্তরাধিকারীরাও একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সবকিছুই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। সৃষ্টিজীব মাত্রই মৃত্যুর মেহমান। একটি মাত্র সত্তার মৃত্যু নেই। তিনি হলেন, আল্লাহ। তিনি চিরঞ্জীব; তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। তিনি অমর, তিনি শাশ্বত; তিনি চিরন্তন। আক্ষরিক অর্থে, তিনিই সর্বশেষ উত্তরাধিকারী।
একজন বান্দা হিসেবে আমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আমার মালিকানাধীন ধন-সম্পদ সম্পদ ছেড়ে একদিন আমাকে পরপারের উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে। তখন সেগুলোর মালিকানা অন্যের হাতে চলে যাবে। এভাব হাত-বেহাত হয়ে সেগুলো শেষ পরিণতিতে আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে। কাজেই যতো দিন সেগুলো আমার হাতে থাকবে আমি সেগুলোর সদ্ব্যবহার করবো।
আসুন আমরা আত্মজিজ্ঞাসা করি যে, হে আমার নফস! এই সম্পদগুলো তুমি কীভাবে উপার্জন করেছো এবং কোথায় কোথায় ব্যয় করেছো? চূড়ান্ত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার আগে আসুন উত্তরগুলো তৈরি করে ফেলি।
**একটি অসিয়ত ও তার পরের ঘটনা**
বিশাল বড় একটি বাগান। যতো দূর দৃষ্টি যায়, রকমারি ফুল ও ফলে সুশোভিত হয়ে আছে। সেই বাগানের উৎপাদিত ফল বিক্রি করে প্রতি বছর প্রচুর মুনাফা হতো।
পুরো বাগানটির মালিক ছিলেন একজন গৃহকর্তা। তার সঙ্গে তার দুই ছেলে ও এক ভাতিজাও সেই বাগানে কাজ করতো। ভাতিজাটি ছিলো অনাথ। ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তিনিই তার এ ভাতিজার দেখা-শুনা করতেন।
লোকটি মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে গেলেন যে, আমার মৃত্যুর পর আমার পিতৃহীন ভাতিজাও বাগানটির কিয়দাংশের মালিক হবে। ...
লোকটির দু'ছেলে পিতার ওই অসিয়তের কথা শুনতে পেয়ে ভীষণ রুষ্ট হলো। বড় ছেলে উত্তেজিত কণ্ঠে বললো- এ বাগান আমার বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ। তিনি আমাদের জন্যে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। কাজেই আমরাই তার মালিক হবো। অন্য কাউকে সেখান থেকে কোনো অংশ দেবো না।
এ কথা বলে তার সদ্যপ্রয়াত পিতার অসিয়তের কাগজটি টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললো। অসিয়তের ব্যাপারে অবগত সাক্ষীদের ডেকে বললো- তোমরা যদি অসিয়তের কথা কাউকে বলো তাহলে জানে মেরে ফেলবো।
এভাবে কিছু দিন তারা বাগানের ভোগ-দখল নিজেদের হাতে রাখলো। কিন্তু আল্লাহর কী কুদরত! কিছু দিন পর তারা দু'ভাই-ই এক অজ্ঞাত রোগের শিকার হলো। রোগের প্রকোপে তারা এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়লো যে, হাঁটা-চলার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো। বিছানা থেকে উঠে মুখে খাবার তুলে নেয়ার শক্তিটুকুও পর্যন্ত তাদের ছিলো না।
তাদের এই দূরবস্থা থেকে সেই ইয়াতীম চাচাতো ভাই এগিয়ে এলেন। সাধ্যমতো তিনি তাদের সেবা-শুশ্রুষা করতে লাগলেন। এভাবে কয়েক বছর তিনি তাদের যত্ন-আত্তি করলেন। অবশেষে এক সময় তারা দু'ভাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
আল্লাহর কী কুদরত! সেই দু' ভাইয়ের কোনো স্ত্রী-সন্তান ছিলো না। উত্তরাধিকারী না থাকায় অবশেষে সেই বাগানটির সম্পূর্ণ মালিকানা ওই চাচাতো ভাইয়ের হাতেই চলে এলো। এভাবে আল্লাহর ইচ্ছেতে তিনি হয়ে গেলেন সেই বাগানের একমাত্র মালিক।