📄 আন নূর
জগতের বুকে যতো আলো আছে তার স্রষ্টা আল্লাহ। এ পৃথিবীকে আলোকিত করার আয়োজনের অংশ হিসেবে তিনি সৃষ্টি করেছেন আলোময় সূর্য ও দীপ্ত চাঁদ। অন্ধকার থেকে তিনিই সেগুলোকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আনেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
اللَّهُ نُورُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ.
আল্লাহ তা'আলাই তাঁর হিদায়াতের আলো দিয়ে মানবহৃদয়গুলোকে সত্যের দিকে পরিচালিত করেন। তিনিই তো তাদের অন্তকরণে তাওহীদের বহ্নিশিখা জ্বেলেছেন। ইরশাদ করেছেন-
هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ آيْت بَيِّنَتٍ لِّيُخْرِجَكُمْ مِّنَ الظُّلُمتِ إلى النُّوْرِ.
একজন বান্দা যখন আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে এগিয়ে আসবে তখন তার অন্তর, কর্ণশক্তি ও শ্রবণশক্তির মাঝে আল্লাহর নূরের প্রকাশ ঘটবে। তখন দেখা যাবে- তার হাত একমাত্র হালাল পাত্রের ওপরই পড়ছে। তা পা শুধু ন্যায়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত সুবিবেচনা ও ভারসাম্যের দৃষ্টিতে গৃহীত হবে।
📄 আল হাদী
‘আল হাদী’-এর শাব্দিক অর্থ পথপ্রদর্শনকারী। আল্লাহ তা‘আলা মানবহৃদয়গুলোকে তাঁর মা‘রিফাতের দিকে পথ দেখান। এভাবে যে, তিনি জল-স্থলে তাঁকে চেনানোর মতো অসংখ্য আলামত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন। সেই বিক্ষিপ্ত আলামতগুলো আল্লাহর একক সত্তার জানান দেয়; তাঁর বড়ত্ব ও বিশালতার প্রমাণ বহন করে।
এছাড়াও মানবজাতিকে পথ দেখানোর জন্যে আল্লাহ তা‘আলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন; শত শত কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এভাবে তিনি হিদায়াতের আয়োজনের ষোলকলা পূর্ণ করেছেন।
এর বাইরে তিনি প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন সুস্থ প্রকৃতি ও বিশ্লেষণক্ষমতা। যে কোনো মানুষ তার সেই স্বভাবজাত ক্ষমতা প্রয়োগ করলে তার মানসপটে আল্লাহর একক সত্তার স্বচ্ছ পরিচয় ফুটে ওঠবে। কাজেই তাওহীদ চেনা ও জানার উপকরণের কোনো কমতি আল্লাহ রাখেন নি।
এর বাইরে আল্লাহ তা'আলা গুনাহগার বান্দাদেরকে তাওবা ও অনুশোচনার দিকেও পথ প্রদর্শন করেন। তিনি প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃতিক বিভিন্ন উপকরণের সহায়তার তার চোখের সামনে পাপের কদর্য দিকগুলো তুলে ধরেন; মেলে ধরেন আল্লাহর ক্ষমার সুবিশাল আঁচল। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে- الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدُى
**আঙ্গুলের ছাপ**
পৃথিবীর বুকে কোটি কোটি মানুষ বসবাস করে থাকে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, একজন মানুষের আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে আরেকজনের আঙ্গুলের ছাপ কোনোদিনই মিলবে না। এমনকি একই সঙ্গে জন্মগ্রহণকরা দু'ভাইয়ের আঙ্গুলের ছাপও ভিন্ন। শুধু তাই নয়; একই হাতের এক আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে অন্য আঙ্গুলের ছাপও মিলবে না।
আধুনিক বিজ্ঞানে এ তথ্যও আবিস্কৃত হয়েছে যে, আঙ্গুলের সেই ছাপ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই অবস্থায় থাকে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার আকার বড়-ছোট হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পরিবর্তন হয় না।
📄 আল বাদী'
এই যে সবুজ শ্যামল পৃথিবী, অগণিত নক্ষত্র খচিত আকাশ, উর্মিমালায় বিক্ষুব্ধ সাগর, বাহারি ফুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে সুরভিত বাগান; সবটাই তো মহান আল্লাহর সৃষ্টি। তিনি তার নিরূপম সৃষ্টিনৈপুণ্যের প্রকাশ ঘটিয়ে সেগুলোকে অস্তিত্ব দিয়েছেন।...
তিনি কারো সৃষ্টি নকল করে সেগুলোকে জন্ম দেননি। সেগুলোর প্রজনন ও গঠন কাজে কেউ তার সঙ্গে অংশীদারও ছিলো না। সৃষ্টি ও অস্তিত্ব দানের পুরোটাই একক আল্লাহর দান।...
তিনি কারো মতো নন। কেউ তাঁর মতো নয়। সত্তা ও গুণ; সর্বক্ষেত্রেই তিনি নিরূপম। কুরআনে কারীমে সে কথা ইরশাদ হয়েছে এভাবে-
بَدِيْعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَإِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُوْلُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ.
তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা। আর যখন তিনি কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন 'হও' ফলে তা হয়ে যায়। [সূরা বাকারা: ১১৭]
অনুপম স্রষ্টা 'আল বদী'' আল্লাহ তা'আলার বান্দা হিসেবে আসুন, আমরা তাঁর সৃষ্টিনৈপুণ্যের ভাস্বর এই বিশ্বপ্রকৃতি গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করি। সৃষ্টির মাঝে অনুসন্ধান করি স্রষ্টার রূপ-বৈচিত্র।
রাতের পরিস্কার আকাশের দিকে তাকালে দেখানে যাবে, সেখানে অসংখ্য তারা মিটিমিটি জ্বলছে। বিশাল আকাশের বুকে তারাগুলোকে খুবই ছোট দেখায়। কারণ সেগুলো আমাদের থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থিত।
সূর্যের পর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটিও আমাদের পৃথিবী থেকে ৪.২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। একটি আলো বছরে ৯.৪৬ মিলিয়ন মিটারের পথ অতিক্রম করতে পারে। এজন্যে এ পরিমাণ দূরত্বকে এক আলোকবর্ষ বলা হয়। সেই হিসেবে সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটি আমাদের কমপক্ষে ৪০ মিলিয়ন দূরত্বে অবস্থিত।
বিস্ময়ের বিষয় হলো, কিছু কিছু নক্ষত্র আমাদের থেকে হাজার হাজার মাইল আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আমরা রাতের পৃথিবীতে এতো কোটি মাইল দূর থেকে ছুটে আসা আলো প্রত্যক্ষ করে থাকি।
📄 আল বাকী
‘আল বাক্বী’ মানে, যিনি চিরঞ্জীব। যার মৃত্যু নেই। চিরস্থায়ী। যখন সমস্ত সৃষ্টিজগত ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তখনও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিরাজমান থাকবেন। তিনি প্রথম; তাঁর পূর্বে যেমন কেউ নেই; তদ্রুপ তিনি সর্বশেষ; তাঁর পরও কেউ নেই।
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ والإكرام.
যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান : ২৬-২৭]
একজন বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার বিশালতা ও বড়ত্বের বিষয়টি হৃদয়ে ধারণ করবে তখন তার মন প্রতিনিয়ত তাঁর আনুগত্যের দিকেই ধাবিত হবে। সে সর্বোপরি যে কোনো প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করবে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চাকচিক্য ছেড়ে চিরস্থায়ী আখেরাতের শাশ্বত কল্যাণের অভিমুখী হবে। সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-বঞ্চনা; সবসময় সে এক আল্লাহর আশ্রয়েই নিজেকে সমর্পণ করবে। তার মনে এক আল্লাহর ভয়-ই জাগ্রত হয়ে থাকবে; অন্য কারো নয়। কারণ সে বিশ্বাস করে; আল্লাহ-ই সেই রাজাধিরাজ, যাঁর রাজত্বের বিনাশ নেই।
**তুমি কি জানো?**
কিয়ামতের আগ-মুহূর্তে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইসরাফীল আলাইহিস সালামকে শিঙ্গায় ফুৎকারের নির্দেশ দেবেন। তিনি নির্দেশ পালন করবেন। তখন সেখান থেকে এতোটাই বিকট শব্দ বেরিয়ে আসবে যে, আসমান ও জমিনে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীর প্রাণবায়ু বেরিয়ে আসবে। আল্লাহর ইচ্ছেয় তখন মাত্র চারজন ফেরেশতা ছাড়া অন্য সবাই মৃত্যুর অমোঘ কোলে ঢলে পড়বে। বেঁচে থাকবেন চারজন মহান ফেরেশতা। হযরত জিবরীল, মীকাইল, ইসরাফীল ও জান কবজকারী আযরাঈল আলাইহিমুস সালাম। আল্লাহ তখন তাঁদের রুহও কবজ করবেন।
ওই সময় গোটা বিশ্বচরাচর হবে প্রাণহীন নিস্তব্ধ ময়দান। কোথাও কোনো, জীবনের স্পন্দন থাকবে না। ফেরেশতা নেই, মানুষ নেই, জ্বিন নেই। নেই, পাখি নেই। কোথাও কেউ নেই। আছেন একমাত্র আল্লাহ তা'আলা।...
আল্লাহ তা'আলা তখন হেঁকে বলবেন-
لِمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ রাজত্ব আজ কার?
প্রাণহীন নিস্তব্ধ বিশ্বচরাচর থেকে কোনো উত্তর আসবে না। তিনি নিজেই উত্তর জানিয়ে বলবেন-
لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِه পরাক্রমশালী একক আল্লাহর।
কুরআন কারীমে সেই দৃশ্য এভাবে চিত্রিত হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান: ২৬-২৭]