📄 আল জামে'
'আল জামে'-এর শাব্দিক অর্থ একত্রকারী। এটি আল্লাহ তা'আলার অন্যতম গুণবাচক নাম। কারণ 'আল জামে' বলা হয় ওই সত্তাকে;
- যার মাঝে সকল পূর্ণতা, প্রতাপ, বদান্যতা, সৌমার্য্য ইত্যকার গুণাবলির এমন সমাহার ঘটেছে; যা আর অন্য কারো মাঝে নেই。
- যিনি তার সৃষ্টিজীবের দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো — যেগুলো পঁচে-গলে ধ্বংস হয়ে বিভিন্ন স্থানের মাটির সঙ্গে মিশে গেছে— সেগুলোকে আবার একত্র করবেন। শূন্যে মিলিয়ে যাওয়া, সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া আর মাটির সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়া সৃষ্টিজীবকে পুনরুজ্জীবিত করে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করবেন。
- যিনি হিসাব-নিকাশ গ্রহণের দিন পৃথিবীর প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি মানুষকে কেয়ামতের ময়দানে একত্র করবেন。
কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন。
رَبَّنَا إِنَّكَ جَامِعُ النَّاسِ لِيَوْمٍ لَا رَيْبَ فِيهِ
হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি মানুষকে সমবেত করবেন এমন একদিন, যাতে কোন সন্দেহ নেই। [সূরা আলে ইমরান: ৯]
- যিনি মানবঅন্তরে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও হৃদ্যতা গড়ে তোলেন। আল্লাহর দেয়া সেই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের পরিণতিতে আজ আমরা একজন অপরজনের প্রতি হৃদয়ের টান অনুভব করি。
একজন মুসলমান যখন আল্লাহ তা'আলার এই ব্যাপক অর্থবোধক গুণবাচক নামটির সংজ্ঞা ও পরিচিতি হৃদয়ে ধারণ করবে তখন তার মনে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও নির্ভরতা গেঁথে যাবে। সে বিশ্বাস করবে- নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দার তিল পরিমাণ আমলও নষ্ট করবেন না। প্রত্যেককে তার নির্ধারিত প্রাপ্য যথাসময় বুঝিয়ে দেবেন。
আল্লাহর এক সৎ বান্দার ঘটনা
একবার আল্লাহর কোনো এক সম্মানিত বান্দা নিজের গাধার ওপর চড়ে একটি বিধ্বস্ত জনপদের ধ্বংসস্তুপের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে কোনো বাড়ি-ঘর বা লোক-জন ছিলো না। তবে মুছে যাওয়া বিভিন্ন চিহ্ন সাক্ষ্য দিচ্ছিলো একসময়ের কোলাহলমুখর জনবসতির স্মৃতিকথা。
বুযুর্গ তখন এ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে ভাবতে লাগলেন যে, এই ধ্বংসস্তুপ এই বিধ্বস্ত বিরান জনপদ আবার কিভাবে আবাদ হবে? এই মৃত জনপদ আবার কিভাবে প্রাণ ফিরে পাবে? এখানে তো বাহ্যিকভাবে কোনো উপকরণ বা মাধ্যম দেখতে পাচ্ছি না。
সেই বুযুর্গ ওই ভাবনার মাঝে নিমজ্জিত থাকা অবস্থাতেই মহান আল্লাহ ওই স্থানেই তার রুহ কবজ করে ফেললেন এবং তাকে এক শো বছর ওই অবস্থাতেই রেখে দিলেন। এই দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাকে দ্বিতীয়বার জীবন দান করলেন। এরপর তাকে বললেন, বলো, কতোক্ষণ তুমি এ অবস্থায় ছিলে?
লোকটি প্রথম যখন বিস্মিত অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলো, তখন ছিলো বেলা শুরুর মুহূর্ত। আর যখন সে দ্বিতীয়বার জীবন ফিরে পায়, তখন পশ্চিমাকাশের সূর্য ডুবু ডুবু করছিলো। যার কারণে তিনি উত্তর দিলেন, একদিন বা তারও কম সময়。
আল্লাহ বললেন, এমন নয়। বরং তুমি এ অবস্থায় এক শো বছর কাটিয়ে দিয়েছো। এতে যদি তুমি বিস্মিত বোধ করো, তাহলে তার প্রমাণ দেখো। তোমার একদিকে তোমার ফেলে রাখা খাদ্যসামগ্রী রয়েছে। সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য করো, সেখানে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। তোমার অন্যদিকে তোমার গাধার প্রতি লক্ষ্য করো, তার দেহ পঁচে-গলে কেবলমাত্র কিছু হাড়-গোড়ের কাঠামো বাকি আছে। এর থেকে তুমি আমার কুদরতের আন্দায করে নিতে পারো। যে জিনিসটি আমি সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছি, এক শো বছরের দীর্ঘ সময়ে কোনো মৌসুমি পরিবর্তন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। অবিকল ও অক্ষুন্ন থাকতে পেরেছে। আর যে জিনিসের ক্ষেত্রে আমি ইচ্ছে করেছি, তা পঁচে গলে যাক, তা-ই হয়েছে। আর তোমার চোখের সামনে তোমাকে দ্বিতীয়বার জীবন দান করেছি。
এতো কিছু করার কারণ হলো, আমি তোমাকে ও তোমার এ ঘটনাকে লোকদের জন্যে ‘নিদর্শন’ বানাতে চাই। যাতে করে তুমি বিশ্বাসের সাথে প্রত্যক্ষ করো যে, আল্লাহ তা'আলা এভাবেই মৃতকে জীবন দান করেন এবং ধ্বংস হওয়া বস্তুকে দ্বিতীয়বার আবাদ করেন。
আল্লাহর মহান সেই বান্দা ওই কুদরতি নিশান দেখার পর যখন সামনের নগরীর দিকে লক্ষ্য করেন, তখন সেটিকে পূর্বাপেক্ষা অধিক জনবহুল দেখতে পান। সাথে সাথে তিনি আল্লাহর কাছে নিজের দাসত্ব প্রকাশ করে স্বীকার করেন যে, নিঃসন্দেহের তোমার কুদরতে কামেলার পক্ষে এগুলো অত্যন্ত সহজ কাজ。
কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةٌ عَلَى عُرُوشِهَا ۚ قَالَ أَنَّى يُحْيِ هُذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَأَمَاتَهُ اللَّهُ مِائَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَانْظُرُ إِلَى طَعَامِكَ وَشَرَابِكَ لَمْ يَتَسَنَّهُ وَانْظُرُ إِلَى حِمَارِكَ وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ وَانْظُرُ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرُه
অথবা তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখোনি, যে এমন এক নগরে উপনীত হয়েছিলো যা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিলো। সে বললো, মৃত্যুর পর কীরূপে আল্লাহ একে জীবিত করবেন? তৎপর আল্লাহ তাকে এক শো বছর মৃত রাখলেন। পরে তাকে পুনর্জীবিত করলেন। আল্লাহ বললেন, তুমি কত কাল অবস্থান করলে? সে বললো, এক দিন অথবা এক দিনেরও কিছু কম অবস্থান করেছি। তিনি বললেন, না, বরং তুমি এক শো বছর অবস্থান করেছো। তোমার খাদ্যসামগ্রী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করো, তা অবিকৃত রয়েছে। আর তোমার গর্দভটির প্রতি লক্ষ্য করো, কারণ তোমাকে মানবজাতির জন্যে নিদর্শন স্বরূপ করবো। আর অস্থিগুলির প্রতি লক্ষ্য করো, কিভাবে সেগুলোকে সংযোজিত করি এবং গোশত দ্বারা ঢেকে দিই। যখন তা তার নিকট স্পষ্ট হলো তখন সে বলে ওঠলো, আমি জানি যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। [সূরা বাক্বারা : ২৫৯]
📄 আল গানিয়্যু
'আল গনিয়্যু'-এর শাব্দিক অর্থ, ঐশ্বর্যবান, স্বতন্ত্র। এটিও আল্লাহ তা'আলার একটি গুণবাচক নাম। কারণ, আল্লাহ তা'আলা এতোটাই ঐশ্বর্যবান যে, তিনি তাঁর কোনো সৃষ্টিজীবের মুখাপেক্ষী নন। অথচ ধনী, গরিব, শক্তিশালী, দুর্বল নির্বিশেষে সকলই আল্লাহ তা'আলার মুখাপেক্ষী। কাজেই একমাত্র তিনিই আক্ষরিক অর্থে সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র। তিনি সত্তাগত ও গুণবাচক; কোনোভাবেই কারো ওপর নির্ভরশীল নন। তাঁর স্ত্রী-সন্তান নেই। তাঁকে খেতে বা পান করতে হয় না। এমনকি তন্দ্রা বা ঘুমুতেও হয় না。
কুরআনে কারীমে তিনি ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاء إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُه
হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত। [সূরা ফাতের : ১৫]
যেহেতু আল্লাহ তা'আলা কারো ওপর নির্ভরশীল নন; কাজেই কোনো বান্দার উপাসনার কারণে যেভাবে তাঁর রাজত্ব ও ক্ষমতার মাঝে কোনো কিছু সংযোজন করে না; তদ্রুপ কোনো মানুষের কুফরির কারণে তার কোথাও কোনো বিয়োজন হয় না। সে কথাই কুরআনে এভাবে বিমূর্ত হয়েছে-
إِن تَكْفُرُوا أَنتُمْ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ حميده
'যদি তোমরা ও যমীনের সকলে কুফরী কর, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত'। [সূরা ইবরাহীম: ৮]
একজন মানুষ যখন আল্লাহর এই গুণটির কথা তার হৃদয়ে ধারণ করবে তখন সে নিজেকে পৃথিবীর সকল মানুষ থেকে গুটিয়ে নেবে। সে তখন একমাত্র আল্লাহর দিকেই নিবিষ্টমুখী হবে। তার সর্বক্ষণিক ভালোবাসায় একমাত্র আল্লাহই বিরাজ করবেন।...
কেমন রাজা তুমি?
তোমরা সবাই নিশ্চয়ই ভুবনবিখ্যাত আব্বাসি বাদশাহ 'হারুনু রশীদ'-এর নাম শুনেছো। তিনি ছিলেন তার সমকালের সর্ববৃহৎ সম্রাজ্যের অধিপতি। পরিধি ও ক্ষমতার বিচারে তার সমমানের আর কোনো রাজা সেসময় ছিলো না।
একদিনের ঘটনা। বাদশাহ হারুনুর রশীদ তার দরবারে বসে রাজকার্য পরিচালনা করছেন। সেদিন তার সঙ্গে ছিলেন সেসময়কার শ্রেষ্ঠজ্ঞানী 'ইবনুস সাম্মাক'। ইত্যবসরে বাদশার পানির তেষ্টা পেয়ে বসলো। তিনি তখন কাছের এক রাজভৃত্যকে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসতে বললেন। ভৃত্যটি অতিদ্রুততার সঙ্গে পানি নিয়ে হাজির হলো। বাদশাহ তার হাত থেকে পানির গ্লাসটি তুলে নিলেন। সবেমাত্র গ্লাসটি ঠোঁটে ছোঁয়াবেন, তার পূর্বেই ইবনুস সাম্মাক বাদশাহকে সম্বোধন করে বললেন- হে আমিরুল মুমিনীন! প্রয়োজনের মুহূর্তে আপনি এই এক গ্লাস পানি কতো টাকা দিয়ে ক্রয় করতে রাজি হবেন?
বাদশাহ বললেন, আমি তখন আমার অর্ধরাজত্বের বিনিময়ে এক গ্লাস পানি ক্রয় করতে রাজি হয়ে যাবো。
তখন ইবনুস সাম্মাক বললেন, জ্বি, আমিরুল মুমিনীন! স্বাচ্ছন্দ্যে পান করুন。
বাদশাহ পানি পান করার পর ইবনুস সাম্মাক দ্বিতীয়বারের মতো প্রশ্নের ডালি নিয়ে হাজির হলেন। বললেন- ওই এক গ্লাস পানি যদি আপনার শরীর থেকে না বেরোয়, তাহলে তার চিকিৎসার জন্যে আপনি কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত?
বাদশাহ বললেন, তখন তো আমি আমার গোটা রাজত্ব দিয়ে দিতে রাজি হয়ে যাবো。
ইবনুস সাম্মাক তখন মুচকি হাসির সঙ্গে বললেন, যেই রাজত্ব এক গ্লাস পানিরও সমান নয়, তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করে কী লাভ!!!
📄 আল মুগনী
‘আল মুগনী’-এর শাব্দিক অর্থ সমৃদ্ধকারী, উদ্ধারকারী। এটিও আল্লাহ তা’আলার একটি গুণবাচক নাম। কারণ, একমাত্র তিনিই তাঁর সৃষ্টির মধ্য হতে যখন যাকে ইচ্ছে অর্থ-সম্পদ দান করতে সক্ষম।...
তিনি কাউকে সম্পদের ধনাঢ্যতা দান করেন। কাউকে জ্ঞান, সুস্থতার প্রাচুর্য দান করেন। কাউকে সন্তান-সন্ততির বৈভব দান করেন। কাউকে তিনি সব ক’টাই দান করেন。
তবে আল্লাহর সবচেয়ে বড় দান সেই পেয়েছে যে তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে পেরেছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর মা’রিফাত তথা সত্যিকারের পরিচয় লাভ করতে পেরেছে সেই তো প্রকৃত ধনী。
একজন বান্দা যখন এ কথা বিশ্বাস করবে যে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই সমৃদ্ধকারী; অন্য কেউ নন।
তখন সে নিজেকে গায়রুল্লাহ থেকে গুটিয়ে নেবে। কেননা সে জানে, বান্দার সম্পদ একান্তই সীমিত। পক্ষান্তরে আল্লাহর প্রাচুর্য্যের কোনো সীমারেখা নেই।...
আল্লাহর একজন বান্দা হিসেবে আসুন, আমরাও আমাদের সীমিত সামর্থ দিয়ে আমাদের চারপাশের লোকজনের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখি。
কুষ্ঠ, টেকো ও অন্ধের গল্প
বনি ইসরাঈল গোত্রে তিনজন লোক ছিলো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তন্মধ্যে একজন ছিলো কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত। দ্বিতীয়জন মাথায় টাক পড়া। আর তৃতীয়জন অন্ধ। আল্লাহ তা'আলা এ তিনজনকে পরীক্ষা করার ইচ্ছে করলেন। তিনি একজন ফেরেশতা পাঠালেন。
ফেরেশতা প্রথমে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত লোকটির নিকট হাজির হয়ে বললেন- তুমি কী চাও? লোকটি উত্তর করলো- আমি আল্লাহর কাছে চাই- আমার এই কুৎসিত রোগটির নিরাময় হোক। আমার শরীরের চামড়া নতুন রূপ ধারণ করে সুন্দর হোক。
ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দু'আ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে তার রোগ নিরাময় হলো। সর্বশরীরে নতুন রূপ ধারণ করলো。
ফেরেশতা তখন জিজ্ঞেস করলো- তুমি কী পেতে চাও? লোকটি বললো- আমি একটি উট পেলে সন্তুষ্ট হবো। ফেরেশতা তাকে একটি একটি গর্ভবতী উট এনে দিলেন এবং তার জন্যে আল্লাহর দরবারে বরকতের দুআ করলেন。
এরপর ফেরেশতা টাকপড়া লোকটির নিকট হাজির হয়ে বললো- তুমি কোন জিনিস পসন্দ করো? লোকটি বললো- আমার মাথার ব্যাধি নিরাময় হোক। এই টাকের কারণে লোকেরা আমাকে ঘৃণা করে। আল্লাহর ফেরেশতা তখন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় নতুন চুল গজিয়ে ওঠলো。
ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলো- তুমি কোন ধরনের সম্পদ চাও? সে বললো- আমি একটি গাভী পেয়ে খুশি হবো। ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী গাভী এনে দিলেন এবং বরকতের দু'আ করে দিলেন。
এবার ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট গমন করলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কী চাও? লোকটি বললো- আমি যেন দুনিয়া দেখতে পারি; এজন্যে আল্লাহ আমার দু'চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিন। আল্লাহর ফেরেশতা তখন তার চোখের ওপর হাত বুলিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ ভালো হয়ে গেলো। পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলো। অতপর ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা বলো তো, কোন জিনিস পেলে তুমি খুশি হবে?
অন্ধ বললো- আল্লাহ যদি আমাকে একটি বকরি দান করেন, আমি খুব খুশি হবো। ফেরেশতা তৎক্ষণাৎ তাকে একটি গর্ভবতী বকরী এনে দিলেন এবং বরকতের দু'আ করে চলে গেলেন。
অল্প ক'দিনের মধ্যেই এই তিন জনের বাড়ি ও তৎসংলগ্ন মাঠ উট, গরু ও বকরিতে ভরে গেলো। তারা প্রত্যেকে এক একজন বিরাট ধনী。
কিছু দিন পর সেই ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণ করে উটের খামারের মালিক [পূর্বের কুষ্ঠ রোগী]-এর বাড়িতে হাজির হলো। করজোরে নিবেদন করে বললো- আমি একজন মুসাফির। বিদেশে এসে অভাবে পড়েছি। আমার বাহক জন্তুটিও মরে গেছে। আমার হাতে কোনো অর্থ-কড়ি নেই। আপনি আমাকে একটি উট দান করুন。
লোকটি তখন ধমকের সুরে বললো- হতভাগা কোথাকার! এখান থেকে দূর হও। তোমাকে দেবার মতো কিছু নেই। আমার নিজেরই অনেক প্রয়োজন বাকি রয়ে গেছে。
ফেরেশতা তখন বললেন- আমি তোমাকে চিনি বলে মনে হচ্ছি। তুমি তো পূর্বে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত দরিদ্র ছিলে। আল্লাহ তোমাকে এখন সুস্থ করে ধন-সম্পদ দান করেছেন。
লোকটি বললো- এসব কথা কোত্থেকে বানিয়ে বলছো? আমরা তো বংশীয়ভাবেই বড় লোক। এই সম্পত্তি বংশানুক্রমে আমরা ভোগ-দখল করে আসছি。
ফেরেশতা বললেন- যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তাহলে আল্লাহ তোমাকে পূর্বের মতো বানিয়ে দিন। এ ঘটনার কিছু দিনের মধ্যেই লোকটি নিঃস্ব হয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেলো。
এরপর ফেরেশতা পূর্বের টাকপড়া, এখনকার সুশ্রী সুঠাম লোকটির কাছে হাজির হলো। তার কাছেও পূর্বের কথাগুলো বলে একটি গাভী প্রার্থনা করলো। সেও প্রথমজনের মতো দান করতে অস্বীকার করে বসলো এবং নিজেকে বংশীয়ভাবে অভিজাত দাবী করলো। ফেরেশতা তাকেও বদ দু'আ দিয়ে বললেন, যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তাহলে আল্লাহ তোমাকে পূর্বের মতো বানিয়ে দিন। এ ঘটনার কিছু দিনের মধ্যেই লোকটি সর্বস্বান্ত হয়ে পূর্বের মতো টাকপড়া দরিদ্রাবস্থায় ফিরে গেলো。
এরপর ফেরেশতা তৃতীয় ব্যক্তির কাছে হাজির হলো এবং নিজের দূরাবস্থার বিবরণ জানিয়ে একটি বকরী প্রার্থনা করলো। লোকটি বললো- নিশ্চয়ই। আমি পূর্বে অন্ধ ও দরিদ্র ছিলাম। আল্লাহ আমার দু'চোখে দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন এবং অনুগ্রহ করে আমাকে এই বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক করেছেন। আপনার এই বকরির পাল থেকে যে কয়টি প্রয়োজন; ইচ্ছেমতো নিয়ে যান。
ফেরেশতা বললেন- এসব তোমার থাকুক। আমার কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। আমি আসলে তোমাদের তিনজনের পরীক্ষা নিতে এসেছিলাম। তারা দু'জন সেই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। তাদের ওপর আল্লাহ তা'আলা অসন্তুষ্ট হয়েছে। তুমি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তোমার ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন。
📄 আল মানে'
'আল মানে' বলা হয় ওই সত্তাকে যিনি তার বান্দার ওপর থেকে কষ্টদায়ক জিনিসগুলোকে দূর করেন। যে বিষয়গুলো বান্দার দ্বীনদারিত্বের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হবে; কিংবা তার শারীরিক বা মানসিক পীড়ার কারণ হবে সেগুলোকে তিনি প্রতিহত করেন। আল্লাহ তা'আলা সবসময় মুমিনদের পাশে থাকেন। সব সংকটে তিনি সহায়তা করেন। তিনি তাদেরকে শত্রুদের অনাচার থেকে রক্ষা করেন। তিনি বৈরীশক্তিকে মুমিনদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে দেন না। এ কারনেই আমরা আল্লাহ তা'আলাকে 'আল মানে' হিসেবে বিশ্বাস করি।
আল্লাহ তা'আলা কখনো কখনো তার কোনো বান্দার ওপর থেকে দান উঠিয়ে নেন। এই উঠিয়ে নেয়াটা অনেকগুলো কারণে হতে পারে। যেমন, পরীক্ষার উদ্দেশ্যে উঠিয়ে নেন। অথবা হতে পারে ওই দানের কারণে সে কোনো অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে; এজন্যে তিনি দানের দুয়ার সংকুচিত করে ফেলেন। এমন অনেকগুলো হিকমত রয়েছে -যার রহস্য তিনিই জানেন。
একজন মুমিন হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি- দান করা- না করার সর্বময় ক্ষমতা আল্লাহ। কাজেই আমরা আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে একমাত্র আল্লাহর দুয়ারের সঙ্গেই জড়িয়ে রাখবো। অন্য কারো কাছে আমরা আমাদের প্রার্থনার হাত বাড়াবো না。
মাটিতে গেঁথে গেলো অশ্ব
আল্লাহ তা'আলার অসীম কৃপায় কুরাইশদের কবল থেকে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর একমাত্র সঙ্গী হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাদি. বেঁচে গেলেন। সমবেত আক্রমণোদ্যত যুবক বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে তাঁরা বাড়ি থেকে বের হয়ে একটি গুহায় আত্মগোপন করলেন।...
এ সংবাদ কুরাইশ শিবিরে অপমানের চাবুকের মতো আঘাত করলো। তারা তখন মরিয়া হয়ে ওঠলো। ঘোষণা করলো- ওই দু'জনকে জীবিত বা মৃত এনে দিতে পারলে এক শো উট পুরস্কার দেয়া হবে।...
বিশাল পুরস্কারের লোভে হতোদ্যম কুরাইশী যুবকগুলো নতুন করে চাঙা হয়ে ওঠলো। শুরু হলো তল্লাশি অভিযান। লোভাতুর চোখগুলো মক্কার আশপাশের পাহাড়গুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো। তাদেরই একজন ছিলেন সুরাকা বিন মালিক। তিনিও পুরস্কারের লোভে বেরিয়ে পড়লেন。
পায়ের চিহ্ন ধরে এগোতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তিনি পেয়েও গেলেন। তার তাজাদম ঘোড়ার গতি মুহূর্তেই বেড়ে গেলো। আশাতুর চোখে ভেসে ওঠলো এক শো উট পুরস্কারের চকচকে দৃশ্য।... কিন্তু বিধিবাম...। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ছোঁয়ার আগমুহূর্তে হঠাৎ তার ঘোড়ার সামনের দু' পা মাটিতে দেবে গেলো। আকস্মিক হোঁচটের তাল সইতে না পেরে সুরাকাও ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেলেন。
তাতে কী! ধুলোয় ধুসরিত শরীর নিয়েই তিনি পুনরায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। কিছু দূর সামনে অগ্রসর হতেই আবার সেই বিনা মেঘে বজ্রপাত। সমতল মরুতটে অকারণে আবার তার ঘোড়ার পা মাটিতে দেবে গেলো। তবে এবার সুরাকা কোনো মতে নিজেকে সামলে নির্ঘাত পতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে সমর্থ হলেন। কিন্তু ততোক্ষণে তার মনোজগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গেছে。
বুদ্ধিমান সুরাকা বুঝতে পারলেন, স্বয়ং আল্লাহ তাঁর নবী ও তাঁর একমাত্র সহচর রক্ষার জন্যে তাঁকে কেন্দ্র করে এভাবে কুদরতি নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছেন। অন্যথায় এমনটি হওয়ার বাহ্যত কোনো কারণ নেই। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দু'হাত উপরের দিকে তুলে ধরলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি আত্মসমর্পণ করে আপনার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করুন। নিরাপত্তা দিন।...
দয়ার মূর্তপ্রতীক বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অপরাধ মার্জনা করে দিলেন। প্রাণের নিরাপত্তার কথাও জানিয়ে দিলেন। নিরাপত্তা পেয়ে আশ্বস্ত হলো সুরাকার অস্থির মন। ততোক্ষণে দু'চোখ থেকে লালসার উগ্র চাহিদা ঝরে পড়েছে। আস্তে আস্তে তিনি অবনত মস্তকে মক্কার পথ ধরলেন。