📄 আর রউফ
'আর রউফ' বলা হয় ওই সত্তাকে যিনি তাঁর বান্দাদের ওপর খুবই দয়াপ্রবণ। যিনি যেমন সর্বক্ষণ তাঁর নেককার আউলিয়ায়ে কেরামের প্রতি দয়াশীল হয়ে থাকেন; তাদেরকে পাপের গহ্বরে পড়তে দেন না। তদ্রুপ তিনি পাপী বান্দাদের প্রতিও দয়াদ্র হয়ে থাকেন; এভাবে যে, তাদেরকে সবসময় ইসতিগফার ও তাওবার দিকে হাকিয়ে বেড়ান। এ আশায় যে, তারা যেন শাস্তির কবল থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَؤُوفٌ رَّحِيمٌ
নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু। [সূরা বাক্বারা : ১৪৩]
দুনিয়াবাসীদের জন্যে আল্লাহর যেই রহমত নির্দিষ্ট সেটিকে তিনি ১০০ টি ভাগে ভাগ করেছেন। ৯৯ ভাগ নিজের কাছে রেখে বাকি ১ ভাগ গোটা দুনিয়ার সকল মানুষের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। সেই এক ভাগ রহমতের কল্যাণে-ই আজ পৃথিবীর সকল সৃষ্টিজীবের মাঝে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বাহুডোর দেখা যায়। ...
আল্লাহর পরকালীন রহমত শুধু মুমিনদের জন্যেই বরাদ্দ থাকবে。
একজন মুসলমান বান্দা যখন আল্লাহ তা'আলার এই 'রউফ' গুণবাচক নামটির অর্থ উপলব্ধি করবে তখন সেও নিজেকে দয়াপ্রবণ হিসেবে গড়ে তুলবে। সে তখন সবার সঙ্গে প্রীতিময় আচরণ করবে। তার সঙ্গে কেউ দূরাচার করলে সে ক্ষমা করে দেবে। সে যথাসম্ভব অন্যদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলবে。
তুমি কি জানো?
একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধবন্দিদের খোঁজ-খবর নিতে হাজির হলেন।...
সেই বন্দিদের মাঝে একজন মহিলাও ছিলেন। হঠাৎ মহিলাটি লক্ষ্য করলেন, দূরে একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু কান্না করছে। শিশুকণ্ঠের কান্না শুনে তার মাতৃহৃদয়ও কেঁদে ওঠলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি শিশুটির দিকে ছুটে গেলেন। পরম ভালোবাসায় তাকে কোলে তুলে নিলেন। এমনকি তাকে দুধ পান করাতে শুরু করলেন। অথচ সেই দুগ্ধপোষ্যটি তার সন্তান নয়। ইতোপূর্বে হয়তো কোনোদিন তিনি শিশুটিকে দেখেননি。
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাতৃত্বের এই নিষ্পাপ প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়ে সাহাবায়ে কেরামকে প্রশ্ন করলেন-
'তোমাদের কি মনে হয়, এ মহিলাটির পক্ষে শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করা সম্ভব?'
সাহাবায়ে কেরام দু'দিকে মাথা নেড়ে বললেন- 'আদৌ সম্ভব নয়।'
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন,
'একজন মা তার নাড়িছেড়া সন্তানকে যতোটুকু ভালোবাসেন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে তারচেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভালোবাসেন।'
📄 মালিকুল মুলক
‘মালিকুল মুলক’ বলা হয় ওই সত্তাকে যিনি সমগ্র বিশ্বচরাচরের একচ্ছত্র অধিপতি। মালিক। যিনি প্রতিটি বস্তুর ওপর তাঁর নিজের যে কোনো ইচ্ছে প্রয়োগ করতে পারেন অবলীলায়।...তিনি যা চান তাই ঘটে। যা চান না তা আর ঘটে না। ...
এই আকাশ, জমিন, নক্ষত্র, গ্রহপুঞ্জ, সৌরজগৎ, জিন, ইনসান, উদ্ভিৎ ও প্রাণীজগৎ ইত্যাদি মিলে গড়ে উঠেছে একটাই রাজত্ব; যার একমাত্র ক্ষমতাধর শাসক আল্লাহ। তাঁর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অধীনে বিশ্বজাহান পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয় ঘটছে না।...
তিনি যেভাবে একক শক্তিতে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড গড়ে তুলেছেন, তদ্রুপ তিনি তাঁর একক ইচ্ছেয় মুহূর্তেই এই বিশাল পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম। ...
একজন বান্দা যখন জানবে যে, সে নিজেই তার চোখ, কান ও কণ্ঠের মালিক নয়। এমনকি সে যেই কাজগুলো করছে; যেই হায়াত অতিবাহিত করছে সেগুলোরও একক মালিক আল্লাহ। তখন সে পূর্ণ বিনয় ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে রাজাধিরাজ আল্লাহর অভিমুখী হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে সে প্রথম দৃষ্টি রাখবে আল্লাহর নির্দেশের ওপর। ফলশ্রুতিতে যাপিত জীবনে সে হবে আল্লাহমুখী বান্দা。
তুমি কি জানো?
ভূপৃষ্ঠের ওপর বসবাসকারী জীবজগতের মাঝে অসংখ্য প্রজাতি রয়েছে। যার সঠিক সংখ্যা ও পরিসংখ্যান আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিরুপণ করতে পারে নি। তারা এখন পর্যন্ত দেড় মিলিয়নেরও অধিক প্রজাতির অস্তিত্ব খুঁজে বের করেছেন। এর মধ্য হতে এক মিলিয়ন-ই হচ্ছে কীট-পতঙ্গ। বিজ্ঞানীগণ প্রতি বছর ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করছেন। এছাড়াও রয়েছে ২১০০০ প্রজাতির জলজ প্রাণী, ৯৭০০ প্রজাতির পাখি, ৬৪০০ সরীসৃপ, ৪০০০ উভচর ও ৪৫০০ স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি。
বিজ্ঞানীদের ধারণা হলো, এখন পর্যন্ত আড়াই মিলিয়নেরও অধিক প্রজাতির প্রাণী অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে。
সুবহানাল্লাহ! কতো বড় মহিয়ান সেই সত্তা! পৃথিবীর বিশাল জীববৈচিত্র যাঁর কুদরতের অনন্য প্রকাশ。
📄 যুল জালালি ওয়াল ইকরাম
‘যুল জালালি ওয়াল ইকরাম’ বলা হয় ওই সত্তাকে যিনি অতি উচ্চ বড়ত্ব, সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব ও মহামর্যাদার অধিকারী। যাঁর নে'আমতের ছায়াতলে সমগ্র সৃষ্টিজগতের বসবাস। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ ، وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ والإكرام
যমীনের উপর যা কিছু রয়েছে, সবই ধ্বংসশীল। আর থেকে যাবে শুধু মহামহিম ও মহানুভব তোমার রবের চেহারা। [সূরা আর রহমান : ২৬-২৭]
এ বৈশিষ্ট্যটি আল্লাহ তা'আলা নিজের জন্যে এমনভাবে নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন যে, অন্য কোনো সৃষ্টিজীবের সেখানে বিন্দু পরিমাণও অংশগ্রহণ নেই。
কাজেই সকল প্রতাপ একমাত্র আল্লাহর। সকল পূর্ণতা একমাত্র আল্লাহ। সকল সম্মান ও আভিজাত্য শুধু আল্লাহর। বান্দার জীবনে যতো নে'আমতের উপস্থিতি তার সমুদয় আল্লাহর দান。
কাজেই একজন বান্দা হিসেবে আমার করণীয় হলো, আমি আল্লাহর প্রতীকগুলোর প্রতিও সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবো। আল্লাহর দেয়া আসমানী কিতাবগুলোকে; তাঁর ঘর মসজিদ; তাঁর বন্ধু আউলিয়া কেরামকে সম্মান করবো। আমার কোনো কথা বা কাজের মাধ্যমে যেন সেগুলোর সম্মানহানী না হয় তার প্রতি সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখবো。
📄 আল মুকসিত
'আল মুক্বসিত' বলা হয় ওই ব্যক্তিকে যিনি তার বিধানের ক্ষেত্রে সবসময় ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখেন। যিনি মজলুমের হৃত অধিকার জালিমের কাছ থেকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেন। অতঃপর যখন সেই জালিম ব্যক্তি তার কৃতকর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করে তখন আল্লাহ তা'আলাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় দান করেন। এটাই তো ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতার অনুপম দৃষ্টান্ত。
আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকেও জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি কুরআনে কারীমে সাম্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইরশাদ করেছেন-
وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন। [সূরা হুজুরাত : ৯]
সত্যিকার মুসলমান কখনই অবিচার ও অন্যায্য করতে পারে না। প্রতিটি অধিকারকে তার যোগ্য পাত্রের হাতে অর্পণ করা ইসলামের অন্যতম প্রতীক। কেননা ইসলামের শিক্ষা হলো, শত্রু ও বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গেও ইনসাফ বজায় রাখতে হবে। এমনকি যদি কারো সঙ্গে দ্বীন ও আক্বিদার ক্ষেত্রে মতভিন্নতা থাকে তার সঙ্গেও অন্যায় করা যাবে না। কেননা এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে অন্যায় করার অর্থ হলো, তাদেরকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। পক্ষান্তরে তাদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা হলে সেটি তাদেরকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে আসবে。
গভর্নরের ছেলে
তখন খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ইবনুল খত্তাব রাদি.-এর শাসন চলছে। একদিন এক মিসরী ব্যক্তি রাজধানী মদীনায় এসে সোজা আমিরুল মুমিনীনের দরবারে হাজির হয়ে গেলো। লোকটি এসেছিলো একটি অভিযোগ নিয়ে। কী অভিযোগ?
'হে আমিরুল মুমিনীন! আমি মিসরের একজন সাধারণ নাগরিক। একবার সেখানকার গভর্নর আমর ইবনুল আস রাদি.-এর ছেলের সঙ্গে একটি ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। যেখানে সে আমার কাছে হেরে যায়। আমার কাছে এভাবে পরাজিত হওয়াটা সে মেনে নিতে পারেনি। উত্তেজিত হয়ে সে দোররা হাতে নিয়ে আমাকে মারতে শুরু করে। সে তখন আমাকে গালাগাল করে বলে-
এতো বড় দুঃসাহস! আমাকে অপমান করার সাহস কোথেকে হলো? আমি হলাম সম্মানিত অভিজাত ঘরের ছেলে। কীভাবে এক পুচকে ছেলে আমাকে হারিয়ে দেয়?
অভিযোগ শুনে হযরত উমর রাদি. খুবই ক্ষুদ্ধ হলেন। জরুরী ভিত্তিতে তিনি হযরত আমর রাদি. ও তাঁর ছেলেকে মদীনায় তলব করলেন। খলীফার ফরমান পেয়ে তারা দ্রুত হাজির হয়ে গেলেন। তখন হযরত উমর রাদি. মিসরীয় লোকটিকে ডেকে তার হাতে একটি দোররা তুলে দিয়ে বললেন-
'তোমাকে যে লোক মেরেছিলো আজ তুমি নিজ হাতে তাকে প্রহার করো।'
মিসরী লোকটি দোররা হাতে নিয়ে সবার সামনেই গভর্নরের ছেলেকে প্রহার করলো। তার দোররার প্রতিটি আঘাতের সময় আমিরুল মুমিনীন বলতেন-
'মারো! ভালো করে মারো। মেরে অভিজাত ঘরের ছেলেটির পিঠের ছাল তুলে ফেলো।'
মিসরীয় লোকটি যখন ক্ষ্যান্ত হলো তখন আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর রাদি. তার হাত থেকে দোররা তুলে নিয়ে বললেন, 'এখন আমি গভর্নরকে মারবো।'
লোকটি তখন বললো- হে আমিরুল মুমিনীন! গভর্নরের তো কোনো দোষ নেই। আমাকে তার ছেলে মেরেছিলো। আমি তো আজ তার বিচার পেয়ে গেছি!
হযরত উমর রাদি. তার কথার উত্তর না দিয়ে সরাসরি হযরত আমর ইবনুল আস রাদি.-কে বললেন-
তোমরা আর কত দিন ওই মানুষদের দাস বানিয়ে রাখবে যারা তাদের মায়ের গর্ভ থেকে স্বাধীন হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছে?
হযরত আমর ইবনুল আস রাদি. তখন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বললেন- 'হে আমিরুল মুমিনীন! যা ঘটেছে তার সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। ওই লোকটি আমার কাছে তার অভিযোগের কথা বলেনি। যদি সে আমার কাছে আসতো তাহলে অবশ্যই আমি তার প্রতিকার করতাম।'