📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আল ওয়াহেদ

📄 আল ওয়াহেদ


‘আল ওয়াহেদ’ শব্দের অর্থ একক। আক্ষরিক ও বাস্তবিক উভয় অর্থে একমাত্র আল্লাহই একক। তাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই। পৃথিবীর কেউ-ই তাঁর সমকক্ষ নয়। তিনি তাঁর সত্তার ক্ষেত্রে যেমন একক; তদ্রুপ তিনি তাঁর গুণাবলির ক্ষেত্রেও একক। পৃথিবীর কোনো কিছু যেমন তাঁর মত নয়; তদ্রুপ তিনিও কারো মত নন। পৃথিবীর অনুপম সৃষ্টিজগৎ সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি তাঁর একক ক্ষমতা ও কুদরত দিয়ে সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মহান ও পরাক্রমশালী। তিনি তাঁর একক শাসন ও ব্যবস্থাপনায় বিশ্বজগৎ পরিচালনা করছেন。
কাজেই একজন মুসলিম হিসেবে আমি বিশ্বাস করি যে, একমাত্র আল্লাহই সকল উপাসনার উপযুক্ত। তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। একমাত্র তিনি-ই সকলের আশ্রয়স্থল।...
আরো বিশ্বাস করি যে, তাঁর হাতেই সকল শক্তি ও ক্ষমতার উৎস।...
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও নমরুদ
আল্লাহর মহান পয়গম্বর হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সঙ্গে তৎকালীন 'বাবেল' নগরীর রাজা নমরুদের যেই আলাপ হয়েছিলো, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ কুরআনে কারীমে উঠে এসেছে। নমরুদ ছিলো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী অত্যাচারী শাসক।...
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম একত্মবাদের বার্তা নিয়ে রাজা নমরুদের রাজদরবারে আগমন করলেন। তিনি তাকে এক আল্লাহর কথা শোনালেন। আল্লাহর একত্মবাদের ওপর প্রমাণ দিয়ে বোঝালেন। তার কাছে প্রত্যয়ের সঙ্গে তুলে ধরলেন যে, এক আল্লাহ-ই সকল প্রাণীর জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা করেন。
উত্তরে নমরুদ দু'পাশে মাথা ঝাকিয়ে বললো- উঁহু! আমার হাতেই মানুষের জীবন-মৃত্যুর ফয়সালা。
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কপালে কুঞ্চন তুলে জিজ্ঞেস করলেন- কীভাবে?...
উত্তরে নমরুদ বললো- দেখতে চাও, আমি কী করি?...
এ কথা বলে সে দু'জন লোককে তার সামনে হাজির করার নির্দেশ দিলো। তন্মধ্য হতে একজনকে হত্যা করার নির্দেশ দিলো আর অপরজনকে ছেড়ে দিলো। এরপর বললো- দেখলে তো কীভাবে আমি একজনকে জীবন দিলাম আর আরেকজনকে মৃত্যু দিলাম?...
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তখন বললেন- তুমি যদি মানুষের জীবন-মৃত্যু দানের ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার দাবী করো, তাহলে এক কাজ করে দেখাও। আল্লাহ তা'আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি যদি প্রভু হওয়ার দাবী করো তাহলে ওই সূর্যটিকে পশ্চিমদিক থেকে উদিত করে দেখাও তো。
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের এই বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের কাছে অত্যাচারী রাজা নমরুদ মার খেয়ে গেলো। তার মুখে আর কোনো কথা ফুটলো না। তাঁর চ্যালেঞ্জের জবাবে নমরুদের নির্বাক চোখে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না।....

📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আল ক্বদির

📄 আল ক্বদির


'আল ক্বদির' বলা হয় ওই সত্ত্বাকে যিনি নিরঙ্কুশ শক্তির অধিকারী। একমাত্র মহান আল্লাহই সকল ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় তাঁর অন্যতম একটি গুণবাচক নাম হলো, 'আল ক্বদির'। কেননা পৃথিবীর কোনো কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে সক্ষম নয়। কেউ তার কোনো সিদ্ধান্ত প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে না। তিনি প্রত্যেকের ওপর সমান শক্তিবান। আকাশ, যমিন সহ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু রয়েছে; আপনি গভীর চোখে দেখলে বুঝবেন- সেগুলো মহান আল্লাহর সীমাহীন কুদরতের সাক্ষ্য দেয়。
একজন মুসলমান যখন তাঁর মা'বুদ আল্লাহকে 'আল ক্বদির' জ্ঞান করবে তখন সে ভাববে- আমি যদি জীবনের কোনো ক্ষেত্রে সেই মহাক্ষমতাবান আল্লাহর অবাধ্য হই তাহলে আমাকে তাঁর কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। যার ফলে সে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বপ্রকার গুনাহ ও পদস্খলন থেকে নিজেকে সংবরণ করবে।...
তদ্রুপ সে কারো কাছ থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হলে নিজ থেকে প্রতিশোধ নেবে না। কেননা সে তখন বলবে- আমি এর প্রতিকার আল্লাহর কুদরতের মাধ্যমে নেবো।... শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহ-ই সর্বশক্তিমান।
তুমি কি জানো?
তুমি কি জানো, সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা'আলা তাঁর বিস্ময়সৃষ্টি উটকে কত ধরনের সক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন?
– একটি উট পানি ছাড়াও কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে。
– উটের চামড়া খুবই মোটা হয়ে থাকে। যার কারণে রুক্ষ মরুভূমির বিপদজনক মাত্রার উষ্ণ তাপদাহও তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। প্রচণ্ড গরমের মাঝেও উট নির্বিকার স্বাভাবিক থাকতে পারে。
- উটের পায়ের ক্ষুরগুলোকে আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে কোমল তুলতুলে করে সৃষ্টি করেছেন। যার কারণে উট রুক্ষ বালুকাবেলা বা কণ্টকাকীর্ণ পথ অনায়াসেই অতিক্রম করতে পারে。
– উটের দুধের মূল্যমান গাভী-বকরির দুধের চেয়ে অনেক বেশি। রক্তশূন্যতা, পাকস্থলীর বিভিন্ন জটিলতা ইত্যকার রোগের চিকিৎসায় উটের দুধ কার্যকর ভূমিকা পালন করে。
– আল্লাহ তা'আলা উটের বহিরাঙ্গ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তীব্র উষ্ণতাও তাকে কোনোভাবে কাবু করতে পারে না। তাইতো উটকে বলা হয়, 'মরুভূমির জাহাজ'।

📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আল মুক্তাদির

📄 আল মুক্তাদির


‘আল মুক্বতাদির’ বলা হয় ওই বিশাল শক্তির অধিকারী সত্তাকে; যার শক্তিমত্তার কোনো পরিসীমা নেই। যার ক্ষমতার পরিধির সীমারেখা নেই। যাকে কেউ অক্ষম করতে পারে না। যার সিদ্ধান্তকে কেউ প্রতিহত করতে পারে না।...
যতো উচ্চাঙ্গের শক্তিমত্তা হতে পারে; যতো ব্যাপক ক্ষমতা হতে পারে; তার সমুদয় একমাত্র মহান আল্লাহর। তিনি তো সেই সত্তা যিনি একক ক্ষমতায় সুবিশাল আকাশ, দিগন্ত বিস্তৃত যমিন সৃষ্টি করেছেন।...
তিনি ইচ্ছে করলে, চোখের পলকে এরকম আরো অনেকগুলো আসমান, অনেকগুলো যমিন সৃষ্টি করে দিতে পারবেন।...
তিনি তো সেই সত্তা; যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এভাবে তিনি আমাদেরকে মৃত্যুর পর আরেকবার সৃষ্টি করতে সক্ষম। তিনি শুধু ‘কুন’ [হয়ে যাও] বললেই মুহূর্তে তা হয়ে যাবে।...
একজন মুসলমান যখন মহান আল্লাহর এই গুণবাচক নামটির কথা স্মরণ করবে তখন সে অনুভব করবে যে, আল্লাহর বিশাল শক্তিমত্তার সামনে তার শক্তি খুবই দুর্বল। ফলশ্রুতিতে সে ব্যক্তিজীবনে যতো বড় পালোয়ান বা বিজ্ঞানী হোক না কেন- কখনই অহঙ্কার বা ঔদ্ধত্য দেখাবে না。

📘 আল আসমাউল হুসনা মহান আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গল্প > 📄 আল মুকাদ্দিম

📄 আল মুকাদ্দিম


কোন বস্তুটি আগে যাবে আর কোন বস্তুটি পরে আসবে; এ সিদ্ধান্ত মহান আল্লাহই গ্রহণ করেন। তিনি-ই প্রতিটি বস্তুকে যথাযথ স্থানে স্থাপন করেন। কাজেই আল্লাহই অগ্রগামীযোগ্য বান্দাকে সামনে এগিয়ে দেন আর পশ্চাদযোগ্য বান্দাকে পেছনে রাখেন。
আল্লাহ তা'আলাই যেমন সকল নবী-রাসূলকে মানবজাতির সকল সদস্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তদ্রুপ তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন অপরাপর সকল নবী-রাসূলের ওপর।...
আল্লাহ তা'আলাই অজ্ঞদের ওপর জ্ঞানীদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কাফেরদের ওপর তিনিই মুমিনদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তা'আলা তাঁর অবারিত রহমতের কারণেই জালেমদের ওপর শাস্তির বিষয়ে দেরি করেন- এ আশায় যে, তারা তাওবা করে সুপথে ফিরে আসবে。
আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হিসেবে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, সে তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে কল্যাণ ও মঙ্গলকে প্রাধান্য দেবে। আর ক্ষতিকর বিষয়গুলোকে পিছিয়ে দেবে।... তদ্রুপ তার করণীয় হলো, সে সর্বক্ষেত্রে মুমিন ও নেককার লোকদেরকে এগিয়ে রাখবে এবং তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করবে। পক্ষান্তরে ফাসেক-পাপাচারীদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে ও তাদেরকে পিছিয়ে রাখবে।... আর সবসময় সে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী কর্মকাণ্ডের ওপর আখেরাতের চিরস্থায়ী কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য দেবে。
সৈনিক থেকে রাজা
হযরত মুসা আলাইহিস সালামের ইনতিকালের পর ইসরাঈল সম্প্রদায় ঈমানের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে শান্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সে মুতাবেক তিনি 'আমালিকা' নামের একটি বর্বর অভব্য সম্প্রদায়কে তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। কুখ্যাত সেই বর্বর সম্প্রদায়ের রাজার নাম ছিলো, 'জালুত'।
জালূতের নেতৃত্বে আমালিকা গোষ্ঠী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের ওপর হামলে পড়ে। তারা তখন তাদেরকে গণহারে হত্যা করে। বাড়ি-ঘর লুণ্ঠন করে। এমনকি বনী ইসরাঈলীরা যেই পবিত্র সিন্দুকের ভেতর আসমানী গ্রন্থ 'তাওরাত' সংরক্ষণ করতো; সেটিও তারা উঠিয়ে নিয়ে যায়。
বনী ইসরাঈলীদেরকে তাদের কৃতকর্মের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার পর আল্লাহ তা'আলা অবশেষে তাদের মাঝে একজন নবী প্রেরণ করলেন। তিনি তাদেরকে নতুন করে ঈমানের পথ দেখাচ্ছিলেন। তাদের মনের জঞ্জাল পরিস্কার করে তাদেরকে আগামীর জন্যে পরিশুদ্ধ করে তুলছিলেন。
একদিনের ঘটনা। ইসরাঈলী সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য লোকজন সেই নবীর নিকট হাজির হয়ে নিবেদন করলেন যে, আপনি আমাদের জন্যে একজন শাসক নির্বাচন করুন। আমরা সেই শাসকের অধীনে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো।...
তখন সেই নবী তাদেরকে অবহিত করলেন যে, মহান আল্লাহ 'তালুত'-কে তাদের শাসক হিসেবে মনোনীত করেছেন。
আল্লাহর এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে সেই গণ্যমান্য লোকেরা বেঁকে বসলো। তারা বললো, 'তালুত' তো একজন হতদরিদ্র সৈনিক। সে কীভাবে আমাদের শাসক হয়? আমাদের মধ্যে তার চেয়ে অধিক যোগ্য লোক তো আরো অনেকেই আছেন!
তাদের আপত্তির উত্তরে আল্লাহর নবী বললেন, তোমাদের কার কী যোগ্যতা সে সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের চেয়ে ভালো জানেন। এ কারণেই তিনি তালুতকে তোমাদের শাসক মনোনীত করেছেন। কেননা তোমাদের সকলের চেয়ে তালুতের যেমন জ্ঞান বেশি, তদ্রুপ শক্তিও অনেক বেশি。
ওদিকে আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের নির্দেশ করলেন, তোমরা সেই পবিত্র সিন্দুকটিকে ইসরাঈলীদের কাছে ফিরিয়ে দাও। তাহলে ওরা বুঝবে যে, এটি হচ্ছে তালুতের শাসক হিসেবে সর্বাধিক যোগ্য হওয়ার আলামত।
ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। এই কুদরত দেখে ইসরাঈলীগণ আল্লাহর নির্দেশের কার্যকরিতা অনুভব করতে সক্ষম হলো। সঙ্গে সঙ্গে তারা তালুতের বশ্যতা স্বীকার করে নিলো। ...
অবশেষে তালুতের নেতৃত্বে ইসরাঈলীরা 'আমালিকা' সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বেরিয়ে পড়লো। দু' দলের মাঝে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হলো। সেই যুদ্ধে আল্লাহ তা'আলা ইসরাঈলীদের বিজয় দান করলেন。
ওই ইসরাঈলী বাহিনীর সঙ্গে একজন রাখালও যোগদান করেছিলেন। তার দায়িত্ব ছিলো, সেনাদলের বকরির পাল দেখা-শুনা করে। নাম, দাউদ। যুদ্ধের ময়দানে দেখা গেলো, দাউদ নামের সেই রাখাল বালক-ই সবচেয়ে বেশী বীরত্ব দেখিয়েছেন। এমনকি তার হাতেই আমালিকা সম্প্রদায়ের দুর্বিনীত রাজা 'জালুত'-এর মৃত্যু ঘটে।...
পরবর্তীতে মহান আল্লাহ তা'আলা তাকে ইসরাঈলী সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র শাসনের পাশাপাশি নবুওয়াত দান করেন। তিনি হলেন ইতিহাসের সেই মহান নবী হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম।...

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00