📄 আল মুমীত
‘আল মুমীত’-এর অর্থ, মৃত্যু দানকারী। একমাত্র আল্লাহর হাতেই সবার মৃত্যুর ফয়সালা। তিনি যখন যার ওপর ইচ্ছে মৃত্যু চাপিয়ে দেন। তিনি প্রত্যেককেই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আয়ু দিয়েছেন। প্রতিটি প্রাণীর আয়ুষ্কাল শেষ হলে আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেন। তখন তার রুহ তার দেহ ছেড়ে ফিরে যায় সেই আল্লাহর কাছে যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন。
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
‘প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ [সূরা আনকাবূত : ৫৭]
একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের করণীয় হলো- আমরা আল্লাহর বেশি বেশি আনুগত্যের মাধ্যমে প্রবৃত্তির চাহিদাগুলো মেরে ফেলবো। আমরা যখন শুধু আল্লাহর ওয়াস্তেই আমাদের সিদ্ধান্তগুলো স্থির করবো তখন আমাদের অন্তর ঈমানের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠবে। একটি আলোকিত অন্তরই প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বক্ষণ আল্লাহর সঙ্গে বেঁচে-বর্তে থাকে。
মৃত্যুর পর নতুন জীবন
ইতিহাসে পাওয়া যায়- ইসরাঈল সম্প্রদায়ের একটি গোত্র একবার জিহাদ করতে অস্বীকার করেছিলো। তারা তাদের দ্বীনরক্ষার তাগিদে; দেশরক্ষার প্রয়োজনে শত্রুর মুকাবেলায় মাঠে নেমে আসতে অসম্মতি প্রকাশ করে বসে। তারা মৃত্যুর ভয়ে সেদিন এতোটাই কাপুরুষ হয়ে গিয়েছিলো যে, সংখ্যায় প্রচুর হওয়া সত্ত্বেও অস্ত্র ছুড়ে ফেলে নিজেদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে চলে যায়。
ওই সময় তাঁদের নবী ছিলেন হযরত হিযকীল আলাইহিস সালাম। তিনি সেদিন তাদেরকে হাত ধরে বুঝিয়েছিলেন। তিনি তাদের হৃত বীরত্ব ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো কথায় তারা কর্ণপাত করেনি। তারা মনে করেছিলো- যুদ্ধ মানেই প্রাণবিসর্জন আর পলায়ন মানেই জীবনরক্ষা。
আল্লাহ তা'আলা তখন সিদ্ধান্ত নিলেন- তাদের সবার প্রাণ তুলে নিয়ে তাদেরকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেবেন। যেন তাদের এ শিক্ষা হয় যে, প্রতিটি প্রাণী একটি নির্দিষ্ট জীবন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। কাজেই কোনো কৌশলই ব্যক্তিকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না。
আল্লাহর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো। তারা সবাই একসঙ্গে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়লো। কিছু দিন পর আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রত্যেকের জীবন ফিরিয়ে দিলেন। এরপর নির্দেশ দিলেন- যাও। এবার শত্রুর মুকাবিলায় ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ো。
এ ঘটনার মাধ্যমে তারা তখন বুঝতে পেরেছিলো যে, হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। অন্য কেউ এর মালিক নয়। কাজেই পলায়নের মাধ্যমে কেউ মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা পাবে না। কেননা প্রতিটি মানুষ একটি নির্দিষ্ট হায়াত নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। হায়াত ফুরাতেই প্রত্যেককে ওই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হবে。
📄 আল হাইয়ূ
‘আল হাই’-এর অর্থ চিরঞ্জীব সত্তা। যিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন। যার অস্তিত্ব কখনই ধ্বংস হবে না। যাকে কখনই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে না। ধ্বংস, বিনাশ, ক্ষয়, মৃত্যু, পতন ইত্যাদির সম্মুখীন হতে হবে না। একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই চিরঞ্জীব। তিনি ছাড়া অন্য সবকিছুকে একসময় অবশ্যই ধ্বংস হতে হবে。
এ কথা প্রতিটি মুসলমান মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে। কারণ সে জানে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই চিরঞ্জীব, শাশ্বত। পক্ষান্তরে সে নিজে হলো অস্থায়ী। খুবই ছোট্ট একটি জীবন নিয়ে সে পৃথিবীতে এসেছে। এ জীবন শেষ হতেই তাকে মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়াতে হবে। কাজেই এই ক্ষুদ্র জীবনে তাকে কিছু পাথেয় জোগাড় করতে হবে। কিছু উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে。
সে এ কথাও জানে যে, বেশি বেশি নেক আমল করার মাধ্যমে সেই পাথেয় স্ফিত হয়ে থাকে। যার কারণে সে প্রচুর নেক আমল সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করবে。
জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে...
আল্লাহ তা'আলা এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং এর আয়ুস্কালও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যা শেষ হলে তিনি মৃত্যু দেবেন। কাজেই জীবনের পর মৃত্যু; এ চক্রেই আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি।... প্রতিটি মানুষ ভালো করে জানে যে, তার জন্যে একটি নির্দিষ্ট জীবন রয়েছে। যার অবসান হতেই তাকে ঢলে পড়তে হবে মৃত্যুর অমোঘ কোলে।... আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীর কাউকেই চিরস্থায়ী করে সৃষ্টি করেননি। একমাত্র তিনি নিজেই চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী。
একজন মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার মরদেহ নিষ্প্রাণ পড়ে থাকে। মানুষের সেই মরদেহ পচনশীল। কেননা তা সৃষ্টি হয়েছে দ্রবিভূত উপাদান দিয়ে। যদি মানুষের মরদেহ দ্রবিভূত হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে না যেতো, তাহলে গোটা পৃথিবী এতোদিনে লাশে লাশে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। জমিনের ওপর হাঁটা-চলা দুষ্কর হয়ে ওঠতো। থেমে যেতো জীবনের সব চাঞ্চল্য। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ আমাদের জন্যে তা হতে দেননি। সততই তিনি চিরঞ্জীব ও মহাপ্রজ্ঞাবান。
কাজেই প্রাণীমাত্রই মরণশীল। যদি কোনো ব্যক্তি হযরত নূহ আলাইহিস সালামের মতো সবচেয়ে দীর্ঘ হায়াতের অধিকারীও হয়; তাঁর মতো এক হাজার বছরেরও অধিক জীবন নিয়ে পৃথিবীতে আসে তারপরও তাকে জীবনের ঘানি টেনে একসময় মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হবে। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই।
📄 আল ওয়াজিদ
‘আল ওয়াজিদ’ যিনি স্বনির্ভর। যা ইচ্ছে পেয়ে যান। কোনো কিছুই তাঁর নাগালের ঊর্ধ্বে নয়। মহান আল্লাহর অন্যতম একটি নাম হলো, ‘আল ওয়াজিদ’। কারণ তিনি তাঁর যে কোনো ইচ্ছে প্রয়োগ করতে সক্ষম। তিনি সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। তাঁর জন্যে কোনো কিছুই দুষ্কর নয়। তিনি পূর্ণ ও সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর দান-বদান্যতা সর্বত্র বিস্তৃত。
একজন মুসলমান যখন তাঁর মা’বুদ আল্লাহ সম্পর্কে উক্ত বিশ্বাস বুকে ধারণ করবে তখন সে তার সকল প্রয়োজন পূরণের জন্যে এক আল্লাহকেই যথেষ্ট মনে করবে। আমার দ্বিতীয় কারো প্রয়োজন নেই। সে তখন আল্লাহর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। কারণ সে বিশ্বাস করে- সকল দানের উৎস একমাত্র আল্লাহ তা’আলা。
هل تعلم أن ؟! আপনি কি জানেন...
কিছু মাছ আছে উভচর। অর্থাৎ জলে ও স্থলে; দু' জায়গাতেই সমানভাবে বিচরণ করে। সেই মাছগুলো পানি ছাড়াও দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকতে পারে। শুকনো মৌসুমে যখন বিল, হাওড় ও জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যায়, তখন সেগুলো হাওড় ও জলাশয়ের তলদেশে চলে যায়। সেখানে সে নিজ পুচ্ছ মাথার ওপর তুলে এনে গোলাকার আকৃতি ধারণ করে পড়ে থাকে। এ সময় সে তার কানসা -অর্থাৎ যে দু'টি ছিদ্র দিয়ে নিঃশ্বাস নেয়- সেটি ভেজা রাখার জন্যে তার শ্লেষা ব্যবহার করে থাকে। এ দিনগুলোতে সেই মাছ বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে জীবন টিকিয়ে রাখে。
এরপর যখন বর্ষাকাল চলে আসে আর জলাশয়ের বুকে পানি জমতে শুরু করে তখন সেই মাছ তার গুটিশুটি অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। আগের মতো তরতর করে পানিতে সাঁতার কাটতে শুরু করে।
📄 আল মাজিদ
‘আল মাজিদ’ বলা হয়, সম্মান, মর্যাদা, আভিজাত্য ও পূর্ণতার সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত সত্তাকে। মহান আল্লাহর একটি নাম হলো, ‘আল মাজিদ’। কারণ তিনিই সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী। তিনিই সবচেয়ে সুন্দর গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনিই সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন। তাঁর দান-বদান্যতা, দয়া-মায়া অন্য যেকোনো সত্তা অপেক্ষা সর্বাধিক ব্যাপক ও বিস্তৃত。
একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, আমরা উক্ত গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের মাঝে ধারণ করার চেষ্টা করবো। কারণ, যার মাঝে দয়া-মায়া রয়েছে সে অবশ্যই অন্যের সঙ্গে কোমল আচরণ করে। অপরের জন্যে সে তখন কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হয় না। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে সে তখন মনে করে- আমার ভাই, আমার পরিবারের সদস্য। কাজেই বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সে সবার সঙ্গে কোমল প্রীতিময় আচরণ করবে。
جئتكم من عند خير الناس আজ শ্রেষ্ঠ মানুষটির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে
একদিনের ঘটনা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো এক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন। সঙ্গে ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম। পথিমধ্যে একটি উদ্যানে যাত্রা বিরতি হলো।...
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম থেকে খানিকটা দূরের একটি গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়লেন।....
হঠাৎ এক কাফের তরবারি হাতে নবীজির দিকে তেড়ে এলো। লোকটির উন্মত্ত হুঙ্কারে নবীজির ঘুম ভেঙে গেলো。
মাথার ওপর ঔদ্ধত তরবারী হাতে লোকটি তখন হুঙ্কার ছুড়ে বললো- 'তুমি কি আমাকে ভয় করো?'
প্রশান্তিমাখা কণ্ঠে নবীজি বললেন- 'না। এতোটুকুও ভয় পাই না।'
লোকটি তখন তীব্র ক্রোধের সঙ্গে বললো- 'কে তোমাকে আজ আমার হাত থেকে বাঁচাবে?'...
সুস্থির ও শান্ত-সৌম্য কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন- 'আল্লাহ।'...
সঙ্গে সঙ্গে লোকটির হাত থেকে তরবারী পড়ে গেলো。
নবীজি তখন তরবারীটি উঠিয়ে এনে লোকটির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন- 'এখন তোমাকে আমার থেকে কে বাঁচাবে?'...
লোকটি ভয়ার্ত কণ্ঠে উত্তর করেছিলো- আপনার মহানুভবতা।...
নবীজি তখন লোকটির পথ ছেড়ে দিয়ে বলেছিলেন- 'যাও, তোমাকে ছেড়ে দেয়া হলো।...
মুক্তির আনন্দে লোকটি তখন গলা হেকে বললো- 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আর আপনি তাঁর রাসূল।'...
লোকটি তখন তার বাড়ির লোকদের কাছে ফিরে এসে বললো- 'আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়েছে।'