📄 আল ওয়াকীল
'আল ওয়াকীল বলা হয় সেই সত্তাকে, যার ওপর সর্ববিষয়ে আস্থা রাখা হয়। যিনি বান্দার আস্থার প্রতিদান দিয়ে তাদের সকল কর্মকাণ্ড সম্পাদিত করেন। যিনি তাদের সার্বিক কল্যাণের দায়িত্ব বহন করেন। যিনি তাদের রিযিকের যিম্মাদারী পালন করেন। যিনি তাদের সকল প্রয়োজন নিখুঁতভাবে পূরণ করেন。
বান্দার সকল প্রয়োজন একমাত্র তিনিই পূরণ করেন। অন্য কেউ নয়。
আল্লাহ তা'আলাই আমাদের ওয়াকীল। তিনি আমাদেরকে আহ্বান করেছেন- আমরা যেনো তাঁর ওপরই আস্থা রাখি। আমরা যেন তাঁকে আশা-ভরসার একমাত্র কেন্দ্রস্থল বিশ্বাস করি। কেননা একমাত্র তিনিই চিরন্তন, চিরস্থায়ী সত্তা। একমাত্র তিনিই বান্দার ওপর সর্বোচ্চ দয়াশীল। কাজেই বান্দার সকল প্রয়োজন পূরণের সক্ষমতা একমাত্র তাঁরই রয়েছে。
একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, আমরা কেবল এক আল্লাহর ওপরই আস্থা রাখবো। আমাদের সকল কামনা ও প্রার্থনার শেষ বিন্দুতে একমাত্র তাঁকেই ধারণ করবো। কেননা আল্লাহর ওপর আস্থা এতোটাই সুখময় ও প্রীতিকর যে, এ কথা ভাবতেই বান্দার মন প্রশান্ত হয়ে যাবে। চোখ মুদে এই ভাবনার মাঝেই বুঁদ হয়ে থাকবে যে, তিনিই আমার সকল বেদনা ও হাহাকার বিদূরিত করবেন。
রক্তরাঙা ইতিহাস
সেসময় প্রবল শক্তিমত্তার অধিকারী 'হালাকু খান'-এর মোঙ্গলীয় বাহিনীর তাণ্ডবলীলা বয়ে যাচ্ছিল মুসলিম জাহানের ওপর। তৎকালীন রাজধানী 'বাগদাদ'-এর পতন হয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে দীর্ঘ যুগের শাসনদণ্ডের অধিকারী 'আব্বাসিয়া খেলাফত'। এটি হিজরী ৬৫৬ হিজরীর ঘটনা। বাগদাদের দেয়ালগুলোতে রক্তের ছোপ ছোপ চিহ্ন এঁকে এগিয়ে যাচ্ছে হালাকু খান。
একদিন সংবাদ এলো, তার হাতে সিরিয়ারও পতন ঘটেছে। এখন চোখের শূল হয়ে বাকি আছে, একমাত্র মিসর। অবশিষ্ট সবগুলো মুসলিম দেশের পতন ঘটেছে। কাজেই বিপদাপন্ন মিসরের পাশে দাঁড়ানোর মতো শক্তি আর কারো নেই। এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মিসরের তৎকালীন শাসক 'কুতুজ'-এর কাছে 'হালাকু খান' একটি চিঠি পাঠালো। সেই পত্রে হালাকু খান রুক্ষ ভাষায় বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলো। অন্যথা হলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ধমকিও জানিয়ে দিলো。
পত্র হাতে পেয়ে সম্রাট কুতুজ তার সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জরুরী বৈঠক আহ্বান করলেন। সেখানে সিংহভাগ সেনাপতি পরিস্থিতির প্রতিকূলতা বিবেচনা করে সংঘাতের পথ এড়ানোর পরামর্শ দিলো। তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সন্ধি করাটাই সবচেয়ে নিরাপদ。
পক্ষান্তরে কর্মকর্তাদের ক্ষুদ্র একটি অংশ এ অভিমত জানালো যে, আমাদেরকে অবশ্যই শত্রুপক্ষের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে স্বশস্ত্র লড়াইয়ে তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে হবে। কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ভয়ে এগিয়ে তাদের রুখে দেয়াটাই হবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। সম্রাট কুনুজ মনে মনে এ সিদ্ধান্তই নিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন, ইনশা আল্লাহ, আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করে ওদের দৃঢ়পদে মুকাবিলা করবো。
'কুতুজ' যুদ্ধের জন্যে তার গোটা সৈন্যবাহিনীকে সার্বিকভাবে প্রস্তুত করলেন। তার অধীনস্থ সৈন্যদের মনোবল উজ্জীবিত করতে সমর্থ হলেন। এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে বেরিয়ে পড়লেন। ৬৫৮ হিজরীর রমযান মাসের ২৫ তারিখে 'আইনে জালুত' প্রান্তরে মোঙ্গলীয় বাহিনীর সঙ্গে সাক্ষাত হলো。
এরপরের ঘটনা হয়ে আছে আমাদের ইতিহাসের অন্যতম সোনালী অধ্যায়। আল্লাহর সাহায্যে কুতুজের সৈন্যদল ইতিহাসের এই বর্বরতম সৈন্যদলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে সমর্থ হয়। জয়লাভ করে আল্লাহর ওপর আস্থাভাজন کুতুজবাহিনী。
মিসরসম্রাট কুতুজের এই ঐতিহাসিক বিজয় মুসলিম জাহানে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। যার ফলে বেঁচে যায় লাখো মানুষের অসহায় জীবন ও সম্মান।
📄 আল ক্বওয়ী
'আল ক্বওয়ী' বলা হয় ওই সত্তাকে, যিনি প্রবল শক্তির অধিকারী। একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই এমন পরাক্রম শক্তিশালী যে, তাঁকে পরাভূত করার সামর্থ কারো নেই। কখনই কোনো দুর্বলতা বা সাময়িক অক্ষমতাও তাঁকে গ্রাস করতে পারে না। তিনি কারো সহায়তার সামান্যতম মুখাপেক্ষী নন। সকল শক্তির ওপর তাঁর শক্তিই প্রবল। তাঁর শক্তি নিরংকুশ। তাঁর ক্ষমতা অজেয়。
আল্লাহর প্রবল শক্তিমত্তার অসংখ্য নজির বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে রয়েছে। রাতের আকাশের উজ্জ্বল চন্দ্র, নক্ষত্র; দিনের আকাশের সমুজ্জ্বল রৌদ্রময় সূর্য; সুউচ্চ পর্বতরাশির গগনচুম্বী চূড়া; সমুদ্রের অতল বিস্তৃতি; এসবই হলো তাঁর প্রবল ক্ষমতার উজ্জ্বল প্রকাশ।
একজন আল্লাহবিশ্বাসী হিসেবে আমাদেরকেও শক্তিশালী হতে হবে। শক্তিশালী হতে হবে আমাদের দ্বীনদারিত্বে। প্রবল হতে হবে সদাচরণে। ক্ষুরধার হতে হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে। এ দিকে ইঙ্গিত করেই হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
الْمُؤْمِنُ القَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيف، وَفِي كُلِّ خَيْرٌ.
'একজন শক্তিশালী মুমিন বান্দা অবশ্যই কল্যাণকামী। তিনি আল্লাহর কাছে একজন দুর্বল মুমিন বান্দা অপেক্ষা অতিপ্রিয়। যদিও সবার মাঝেই কল্যাণ রয়েছে।'
হযরত মুসা আলাইহিস সালাম যখন তুর পর্বতে
মহান আল্লাহর ইবাদত-অর্চনা ও তাঁর দীদার লাভের প্রত্যাশায় মহান নবী হযরত মূসা আলাইহিস সালাম যাচ্ছেন 'সায়না'-এর তূর পর্বতে। এই পর্বতে তিনি একাধারে চল্লিশ রজনী অবস্থান করবেন。
সেখানে এক রাতে মহান আল্লাহর সঙ্গে হযরত মুসা আলাইহিস সালামের দীর্ঘ আলাপ হলো। মনোমুগ্ধকর সেই আলাপচারিতার এক পর্যায়ে হযরত মূসা বললেন, হে আমার রব, আপনি আমাকে আমার সঙ্গে কথা বলার মহাসৌভাগ্য দিয়েছেন। আমি তার শুকরিয়া আদায় করছি। এখন আমার মনে আপনাকে চাক্ষুস দেখার বাসনা জেগেছে। দয়া করে আপনি আমাকে এই পরম সৌভাগ্যের অধিকারী করুন。
হযরত মুসার এই আবেদনের উত্তরে আল্লাহ বললেন, আমাকে দেখার শক্তি তোমার নেই। তবে এক কাজ করো। কাছের ওই পাহাড়টির দিকে তুমি তাকিয়ে থাকো। তার ওপর আমি যখন আমার নজর ফেলবো তখন যদি ওই পাহাড়টি তার স্থানে অবিচল থাকতে পারো তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পারবে。
আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম পাহাড়টির দিকে একনিবিষ্ট মনে তাকিয়ে রইলেন। যখন আল্লাহ তা'আলা সেই পাহাড়টির ওপর তাঁর কুদরতি নজর ফেললেন সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়টি ভস্মিভূত হয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেলো। তার বিখণ্ডিত অংশগুলো চারদিকে ইতস্তত ছড়িয়ে পড়লো。
বিস্ময়কর এ দৃশ্য দেখে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি সম্বিত ফিরে পেয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ। এ কী দৃশ্য দেখলাম। হে আল্লাহ, আমি আমার আবেদন ফিরিয়ে নিচ্ছি। দ্বিতীয়বার আমি আপনার কাছে এমন আকাঙ্ক্ষা পেশ করবো না。
📄 আল মাতীন
‘আল মাতীন বলা হয় এমন সত্তাকে, যার অভিধানে ভয়, দুঃসাধ্য বলে কিছু নেই। আল্লাহ-ই একক সেই সত্তা, যার কাছে পৃথিবীর কোনো কাজ দুঃসাধ্য নয়। যাকে কখনই ক্লান্তি, তন্দ্রা, ঘুম স্পর্শ করতে পারে না। যিনি কোনো কাজে বিরক্তি ও সংকোচ অনুভব করেন না। যিনি শক্তি অর্জনের জন্যে কোনো খাবার-পানীয়ের মুখাপেক্ষী নন। তার শক্তিমত্তার এমন কোনো যতিচিহ্ন নেই, যেখানে এসে তার প্রভাব ফুরিয়ে যায়। তাঁকে কখনই ক্লান্তি, অবসাদ ও দুর্বলতা গ্রাস করে না。
আমরা আমাদের চারপাশে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যেই অনুপম প্রকাশ দেখছি, সেগুলো ‘আল্লাহ পরাক্রান্ত শক্তিধর হওয়ার’ স্ববাক সাক্ষ্য দেয়। সেদিকে ইশারা করেই কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ اللهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
নিশ্চয়ই আল্লাহ-ই জীবিকাদাতা, শক্তির আধার ও পরাক্রান্ত। [সূরা যারিয়াত: ৫৮]
একজন মুসলমানের মাঝে এই অনুভূতি ও বিশ্বাস প্রবল হয়ে ওঠতে হবে যে, সে এখন ঈমানের বলে বলিয়ান। এখন তার দ্বীনদারিত্ব পরাক্রান্ত। এই অনুভূতি যখন তার অন্তরের অন্তস্থলে গেঁথে যাবে তখন সে আর প্রবৃত্তির শিকার হবে না। কোনো মিথ্যার কাছে অবনত হবে না。
ধ্বংস হলো হযরত নূহ আ.-এর সম্প্রদায়
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম। মহান আল্লাহর একজন মহান নবী। তাঁর স্বজাতি ছিলো মূর্তিপূজারী। তিনি তাদেরকে দীর্ঘ সাড়ে ন'শো বছর আল্লাহর 'দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। এসময় তিনি তাদের পিঠে হাতে বুলিয়ে মূর্তির অক্ষমতার বিষয়টি বুঝিয়েছেন। তিনি তাদের ভেতরের বিবেককে সজাগ করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, তাঁর সম্প্রদায়ের গুটিকয়েক মুষ্ঠিমেয় লোক ব্যতীত অন্য কেউই তাঁর কথায় কর্ণপাত করেনি। মূর্তির অক্ষমতার বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বে পিতৃপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ তাদেরকে বিবেকের বিভায় আলোকিত হতে দেয়নি। এভাবে তারা তাদের কুফুরির অন্ধকারে ডুবে থাকে。
এক পর্যায়ে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম তাঁর স্বজাতির ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়লেন। নিরুপায় হয়ে তিনি আল্লাহর কাছে তাদের শেষ পরিণতি কামনা করলেন। আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীর দু'আ কবুল করলেন। নির্দেশ দিলেন, হে নূহ, তুমি জরুরী ভিত্তিতে একটি নৌজাহাজ তৈরি করো。
এরপর যখন তাঁদের ধ্বংসের নির্দিষ্ট সময় ঘনিয়ে এলো, তখন আল্লাহ হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে নির্দেশ করলেন, আপনি আপনার জাহাজে একজোড়া করে প্রতিটি প্রাণী উঠিয়ে নিন। আর আপনার স্বজাতির মধ্য হতে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকেও জাহাজে আশ্রয় দিন。
হযরত নূহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। এর কয়েক মুহূর্ত পর ভূপৃষ্ঠ চৌচির হয়ে পানি বেরোতে শুরু করলো। আকাশ থেকে প্রবল বেগে বৃষ্টি বর্ষণ হতে লাগলো। চারপাশে অথৈ জলের প্রাবল্য দেখে বিস্ময়ে মুশরিকদের চোখ ফুলে চড়ক গাছ হয়ে গেলো। পানির প্রবল প্রবাহের মুখে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের বাড়ি-ঘর, জমি-জমা- সবকিছুই তলিয়ে গেলো। তখন তারা জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পাহাড়ের ওপর আশ্রয় নিতে শুরু করলো। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিলো, বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ তাদেরকে পাহাড়ের চূড়ার দিকে ধাওয়া করছে।
এক পর্যায়ে তারা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেলো। কিন্তু নিচ থেকে পানির প্রবল প্রবাহ কিছুতেই থামছে না। কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের চূড়া ছাপিয়ে গেলো পানির উচ্চসীমা। এক পর্যায়ে সম্প্রদায়টির সকল কাফের-মুশরিকের সলিল সমাধি ঘটলো。
জমিনের ওপর বিদ্যমান সকল কাফেরের ধ্বংস নিশ্চিত করার পর ধীরে ধীরে পানি কমে আসতে শুরু করলো। ওদিকে আকাশের বৃষ্টি বর্ষণেও ছেদ পড়লো। যার ফলে এক পর্যায়ে ভূপৃষ্ঠের ফাক গলে জলরাশি হারিয়ে গেলো তার সীমাহীন গর্ভদেশে। একটি যুৎসই স্থানে এসে দাঁড়িয়ে গেলো হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কিশতি। ভেতর থেকে তিনি মুমিনদেরকে সঙ্গে নিয়ে জমিনে নেমে এলেন। আর এর মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয়বারের মতো সূচিত হলো মানবজীবনের প্রাণচাঞ্চল্য।
📄 আল ওয়ালী
‘আল ওলিয়্যু’ শব্দের আভিধানিক অর্থ, সহায়তাকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা সহায়তাকারী। তবে তার সহায়তা সেই লোকদের জন্যেই নির্দিষ্ট; যারা একমাত্র তাঁর ওপর ঈমান রাখে। আল্লাহর রহমত তাঁদের ওপরই বর্ষিত হয়। আর তাইতো তিনি তাদেরকে সীরাতে মুস্তাক্বীমের পথে পরিচালিত করেন। ইরশাদ হয়েছে-
اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوْا يُخْرِجُهُم مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ওই সকল লোকদের বন্ধু- যারা ঈমান এনেছে। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। [সূরা বাক্বারা : ২৫৭]
اللهُ لَا يُضَيِّعنا আল্লাহ অবশ্যই আমাদের ধ্বংস করবেন না
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের নাম আমরা সবাই জানি। তিনি ছিলেন আল্লাহর অনেক বড় নবী। একদিন তিনি প্রিয়তম স্ত্রী হযরত হাজারা ও আদরের সন্তান 'ইসমাঈল'-সে সঙ্গে নিয়ে মক্কার পথে এওয়ানা হলেন। দীর্ঘ সফর শেষে তারা উপনীত হলেন মরুময় মক্কায়。
ইতিহাসের সেই দিনগুলোতে মক্কা ছিলো একটি অনাবাদ প্রান্তর। যখানে জীবনের কোনো স্পন্দন-ই নেই। কোথাও কোনো সবুজ শ্যামলিমার নাম-নিশানা নেই。
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মক্কা নগরীর ছোট্ট একটি পর্বতের পাদদেশে এসে থেমে গেলেন। আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে সেখানে এসে তিনি স্ত্রী হাজারা ও তার প্রিয় সন্তানকে নামিয়ে দিলেন। এ সময় খাবার হিসেবে কয়েকটি খেজুর দিলেন। সামান্য কিছু পানিও দিয়ে গেলেন। এরপর এক পা-দু' পা করে ফেরার পথে হাঁটতে শুরু করলেন。
জীবনের স্পন্দনহীন এই বালুকাময় প্রান্তরে একাকী বাস করতে হবে শুনে হযরত হাজারা আলাইহিস সালাম কিছুটা কেঁপে ওঠলেন। বুকের গভীরে এক চিলতে ভীতিও অনুভব করলেন। তখন তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ওপর স্বামীকে রাজি করাতে সাধ্যমতো চেষ্টাও করলেন। কিন্তু তাঁর কোনো চেষ্টাই আলোর মুখ দেখলো না。
প্রিয় স্বামীর গমনপথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। এরপর পেছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহ তা'আলা কি আপনাকে এ কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন?'
হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম পেছন দিকে না তাকিয়ে ভাবলেশহীন কণ্ঠে উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।'
তখন প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে সাহসী সুরে হযরত হাজারা আ. বললেন, 'তাহলে ঠিক আছে। মহান আল্লাহ অবশ্যই আমাদের ধ্বংস করবেন না।'
হযরত হাজারা আ. সেখানেই নিবাস পাতলেন। পানপাত্র থেকে তিনি অল্প অল্প করে পানি পান করতেন। ক্ষুধা অনুভব করলে যৎসামান্য খেজুর মুখে তুলে নিতেন। আর প্রিয় সন্তান ইসমাঈলকে কোলে তুলে বুকের দুধ খাওয়াতেন। এভাবে কিছু দিন কেটে গেলো。
এক পর্যায়ে খাবার-জল ফুরিয়ে এলো। বালুকাময় তেপান্তরের প্রখর রৌদ্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো তৃষ্ণার জ্বালা। শিশু ইসমাঈলও প্রচণ্ড তৃষ্ণায় হাঁপিয়ে ওঠেছে। বাধ্য হয়ে হযরত হাজারা আ. পানির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। তৃষ্ণা নিবারণের মতো কয়েক ঢোক পানির খোঁজে তিনি একবার সফা পাহাড়ে উঠছেন। আবার সেখান থেকে নেমে মারওয়া পাহাড়ে উঠছেন। এভাবে তিনি পানির সন্ধানে হন্য হয়ে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে সাতবার দৌড়ে উঠলেন আর নামলেন。
এভাবে তৃষ্ণার্ত বুকে পাহাড়দু'টিতে উঠানামা করতে করতে তিনি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। এক পর্যায়ে পানির আশা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লেন। যদিও ক্লান্ত চোখে তখনও তিনি সন্ধান করছিলেন পানির অস্তিত্ব。
অবসন্ন দৃষ্টিতে তিনি যখন জীবন বাঁচানোর মতো এক ঢোক পানি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তখন অকস্মাৎ আদরের সন্তান ইসমাঈলের খুব কাছে পানির একটি ফোয়ারা বেরিয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেদিকে ছুটে গেলেন। উচ্ছসিত ফোয়ারা থেকে প্রথমে তিনি খানিকটা পানি পান করে নিজের জীবন রক্ষা করলেন। এরপর সেখান থেকে অঞ্জলী ভরে পানি তুলে স্নেহের বাছাধনকেও পান করালেন。
তোমরা কি জানো, পানির সেই ফোয়ারাটির নাম কী? হ্যাঁ, এটি হলো সেই বিশ্ববিখ্যাত কুপ 'যমযম'। যেই কুপটিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে এখানে মানববসতি গড়ে ওঠতে শুরু করে। গোড়াপত্তন হয় ঐতিহাসিক নগরী মক্কার। এরপর সেই তিলোত্তমা নগরীতেই প্রতিষ্ঠিত হয় হৃদয়তীর্থ কা‘বা। নির্মিত হয় বিশ্বমুসলিমের প্রাণবিন্দু বাইতুল্লাহিল হারাম।