📄 আল কারীম
আল কারীম শব্দের অর্থ দানশীল। যিনি কোন যাচনা এবং কোন আবেদন ছাড়াই দু'হাত ভরে মানুষকে দান করেন তাকেই আল কারীম বলে। আল্লাহ তা'আলাই মূলত কারীম। নিজ অনুগ্রহে তিনি সমস্ত মানুষকে দান করেন। মুমিন আর কাফেরের মাঝে তিনি কোন পার্থক্য করেন না। প্রত্যেকেই তাঁর নেয়ামত ভোগ করে। তিনি সকল সৃষ্টিকেই মানুষের কল্যাণে তাদের আজ্ঞাবহ করে দিয়েছেন। মানুষের উপকার ও সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
'যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও তাহলে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল, দয়ালু। (সূরা নাহল - ১৮)
আমাদের উপর আল্লাহর দয়ার অন্যতম প্রমাণ হল, তিনি মুমিনদেরকে তাদের পুণ্য দ্বিগুণ থেকে দশগুণ করে দিবেন। আর গুনাহগার যখন ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তিনি তার সব গুনাহ মুছে দেন এবং তদস্থলে পুণ্য লিখে দেন。
لا يرد سائلا তিনি কোন প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দেন না
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন দানবীর। কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করতেন। একদিন এক ব্যক্তি এসে কিছু চাইল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে এসময় দেয়ার মত এমন কিছুই ছিল না। তাই তিনি বললেন, 'আমার কাছে এখন কিছুই নেই। তোমার যা প্রয়োজন তা এখন ক্রয় করে নাও; আমি তা পরে পরিশোধ করে দেব।'
হযরত উমর রা. এ কথা শুনে সীমাহীন বিস্মিত হলেন। তিনি বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি তাকে ইতোপূর্বেও দিয়েছেন। তাহলে আপনি কেন সাধ্যের বাইরে নিজের উপর চাপ নিচ্ছেন?'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথাটা অপছন্দ করলেন। তখন এক সাহাবী বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি দান করে যান। আরশের মালিকের কাছে দারিদ্রের কোন আশংকা করবেন না।'
এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন। তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, 'আমাকে এমনই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে'।
📄 আর রাক্বীব
‘রকীব’ শব্দের অর্থ পর্যবেক্ষক। হেফাজতকারী। কোন কিছুই যার অগোচরে নয়। যিনি উদাসীন কখনই হন না। যিনি ঘুমান না। যাঁর দৃষ্টি সর্বত্র জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আসমান ও জমিনের কোন কিছুই যাঁর কাছে গোপন নয়। তিনি হলেন আল্লাহ。
কোন মুসলমান যখন এই কথা বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তা’আলা তার উপর নজর রাখছেন, তার আমলের প্রতি খেয়াল রাখছেন তখন সে কোন খারাপ বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারবে না। কোন গোনাহের কাজে লিপ্ত হবে না। কারো উপর জুলুম করবে না। কেননা সে ভালো করেই জানে যে, সে যেখানেই থাকুক আল্লাহ তাআলা সব সময় তার সঙ্গে আছেন。
عمر بن الخطاب و بائعة اللبن হযরত উমর রা. ও এক মহিলা দুধ বিক্রেতা
মদীনা মুনাওয়ার ওপর নেমে এসেছে অন্ধকার রাত। বাইরে সুনসান নীরবতা। খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর রাদি. বাইরে বেরিয়েছেন। মদীনার অলি-গলিতে একাকী হাঁটছেন। হঠাৎ তিনি এক ঘরের ভেতর থেকে কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেলেন。
কৌতূহল নিয়ে তিনি ঘরটির নিকটবর্তী হলেন। তখন শুনলেন যে এক মহিলা তার মেয়েকে বলছে, দুধের সঙ্গে পানি মেশাও。
মেয়েটি তখন বলল, না মা! আমিরুল মুমিনীন উমর রা. এই আদেশ জারি করেছেন যে দুধের সঙ্গে যেন কেউ পানি না মেশায়。
মা বলল, আমিরুল মুমিনীনতো এখন আমাদেরকে দেখছেন না। মেয়ে বলল, কিন্তু উমরের রব তো দেখছেন。
হযরত উমর রা. এই নেককার তরুণীর কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। চমৎকৃত হলেন। অভিভূত হলেন তার সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা থেকে。
বাড়ি ফিরে তিনি সেই তরুণীকে নিজ ছেলে আসেমের বৌ করে নিয়ে এলেন। এই মেয়ের গর্ভে জন্ম নিল আরেকটি মেয়ে। যাকে বিয়ে করেন খলীফা আব্দুল আযীয বিন মারওয়ান। তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক শিশু। এক মহান শিশু। পৃথিবীর ইতিহাস যেই শিশুটি আজ ন্যায়পরায়ণ খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহ. নামে সমধিক পরিচিত。
📄 আল মুজীব
আল মুজীব হলেন তিনি, যিনি বান্দার ডাকে সাড়া দান করেন। তিনি হলেন, মহান আল্লাহ। তিনি যাচনাকারীর আহ্বানে সাড়া দেন। তাকে দান করেন যা সে চায়। কখনো চাওয়া থেকেও বেশী ও উত্তম জিনিসও দান করেন। তিনি ঐ বান্দাকে বেশী ভালবাসেন যে সবসময় তাকে ডাকে। দুআর মধ্যে কাকুতি মিনতি করে。
তাই মুসলমানের করণীয় হলো, সে আল্লাহ ও তার রাসূলের আদেশ ও নিষেধগুলো মেনে চলবে। সমাজের হতদরিদ্র, অসহায় ও মুখাপেক্ষী লোকদেরকে নিজ সাধ্যানুযায়ী সহায়তা করবে। যদি কোনো অনিবার্য কারণে সে তাদের সহযোগিতা করতে না পারে তাহলে নিদেনপক্ষে নরম ভাষায় কথা বলা।
دعاء في بطن الحوت মাছের উদরে দুআ
হযরত ইউনুছ আ. তার কওমের উপর রাগ করে নিজ শহর নিনো থেকে বের হয়ে এলেন। কারণ তিনি তাদেরকে দীর্ঘদিন আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়েছেন। নিজেকে দাওয়াতী কাজে উজাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু তারা ঈমান আনেনি। তিনি তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করলেন। বললেন, অচিরেই তাদের উপর আল্লাহ পাকের আযাব নিপতিত হবে。
কিন্তু তাঁর কওম তাঁর সঙ্গে ঠাট্টা বিদ্রুপ করেলো। এদিকে হযরত ইউনুছ আ. এর শহর ত্যাগ করার পর আল্লাহ তাআলা কওমের মনে ঈমান ঢেলে দিয়েছেন। তারা সকলে ঈমান গ্রহণ করে নিল এবং নিজেদের কুফুরীর কারণে ভীষণ অনুতপ্ত হল。
আর ঐদিকে ইউনুছ আ. একটি জাহাজে আরোহন করলেন। যখন জাহাজটি সমুদ্রের মাঝখানে এল তখন প্রচণ্ড ঝড়ের কবলে পড়ে গেল। ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল জাহাজটি। যাত্রীরা কোন কুল কিনারা পাচ্ছিল না। মাত্র একটি পথ বাকি ছিল। যে কোন একজনকে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দিতে হবে যাতে জাহাজটি হালকা হয়। ফলে তারা লটারী করল, যার নাম উঠবে তাকে ফেলে দেয়া হবে। তখন হযরত ইউনুছ আ. এর নাম উঠল এবং তাকে সমুদ্রের বুকে ফেলে দেয়া হল。
ইতোমধ্যে বিশালকায় এক মাছ আল্লাহর হুকুমে হযরত ইউনুছ আ.-কে গিলে ফেলল। তিনি মাছের পেটে ঢুকে দুআ করতে লাগলেন এবং তসবীহ পড়তে লাগলেন, 'লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যালিমীন।' (সূরা আম্বিয়া-৮৭)
ফলে আল্লাহ তা'আলা দুআ কবুল করলেন এবং ইউনুছ আ.কে মাছের পেট থেকে বের করে আনলেন। তিনি মাছকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইউনুছ আ.কে সমুদ্রের তীরে নিক্ষেপ করতে। মাছ তাই করল। ফলে ইউনুছ আ. আবার তার কওমের নিকট ফিরে এলেন। এসে দেখলেন সবাই ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছে。
📄 আল ওয়াসি'
তিনি ঐ সত্তা যার রিযিক তার সমস্ত সৃষ্টিজীবের জন্য ব্যাপক। তাঁর রহমত সব কিছুকে বেষ্টন করে রয়েছে। কোন কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে না। কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নয়। তাঁর ক্ষমতার কোন শেষ নেই। তাঁর প্রাচুর্যতার কোন সীমা না নেই। তাঁর দান শেষ হবার নয়। সমস্ত মাখলুক সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত। তিনি প্রাচুর্যময়। ইলম, দয়া, ধনাঢ্যতা, রাজত্ব, ক্ষমতা ও সহনশীলতা; সর্বক্ষেত্রে তাঁর দয়া ও করুণা সমুজ্জ্বল ও চিরন্তন。
মানুষের উচিৎ উত্তম গুণাবলীতে সজ্জিত হওয়া।
উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে মেশা এবং তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা। বদান্যতা ও দয়া দিয়ে মানুষকে বরণ করে নেওয়া। যতটুকু সম্ভব ততটুকুই মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা। সহনশীল আচরণ করা। ভুল-ত্রুটি থেকে চুপ থাকা এবং ক্ষমা করে দেওয়া。
حلم إلى ما لا نهاية সীমাহীন সহনশীলতা
হযরত আহনাফ ইবনে কায়েস রহ. তার বাঁদীকে খাবার দিতে বললেন। ব্যাক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সহনশীলতা ও ক্ষমার উজ্জ্বল প্রতীক। প্রশিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।
নির্দেশ মোতাবেক বাঁদীটি খাবার নিয়ে এল। তিনি ঝোলের বাটিটি চাইলেন। বাটিটি ছিল খুব গরম। বাঁদীটি তা বাড়িয়ে দিতে এগিয়ে এল。
দস্তরখানের কাছে আসতেই অসতর্কতাবশত হঠাৎ বাঁদীর জামার সঙ্গে তার পা পেচিয়ে গেল। বাঁদীটি তখন দস্তরখানের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে গেল আর গরম ঝোলের বাটিটি পড়ল আহনাফ রহ. এর উপর। যন্ত্রণায় তার মাথা বিগড়ে গেল। তিনি বাঁদীটিকে প্রহারের জন্য ক্রোধে দাঁড়িয়ে পড়লেন。
এমন সময় বাঁদিটি বলল, আল্লাহ তা'আলা কি বলেন নি (মুমিন হল যারা) ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করে? তিনি বললেন, আমি আমার রাগকে নিয়ন্ত্রণ করলাম। তিনি কিছুটা শান্ত হলেন。
এবার বাঁদীটি বলল, আল্লাহ তা'আলা কি বলেন নি (মুমিন হল যারা) মানুষকে ক্ষমা করে দেয়? তিনি বললেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তার রাগ এবার সম্পূর্ণরূপে উবে গেল。
পূনরায় বাঁদীটি বলল, আল্লাহ তা'আলা কি বলেন নি যে, আল্লাহ তাআলা দয়াকারীদেরকে ভালবাসেন? (সূরা আলে ইমরান – ১৩৪) তিনি বললেন, আমি তোমার উপর দয়া করলাম। তুমি আল্লাহর জন্য আজ থেকে মুক্ত।