📄 আল গাফূর
আল গফুর এর অর্থ হল, অধিক ক্ষমা ও মার্জনাকারী। আল্লাহ তা'আলা তার বান্দাকে অধিক পরিমাণে ক্ষমা করতে চান। তিনি বান্দার পাপকে গোপন রাখেন। বান্দা যখনই পাপ করার পর ক্ষমা প্রার্থনা করে আর একান্ত মনে তাওবা করে আল্লাহ ওই বান্দাকে ক্ষমা করে দেন。
যে ব্যক্তি নিজেকে সর্বত গোনাহের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে আল্লাহ তা'আলা তাকেও ক্ষমা ও অনুগ্রহের সুসংবাদ দান করেন। শর্ত হলো, তাকে তাওবা করে ফিরে আসতে হবে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, 'আপনি বলে দিন, ও আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল দয়ালু'। (সূরা যুমার - ৫৩)
সত্যিকারের মুসলমানের পরিচয় হল যে হবে উদার, ক্ষমাশীল, মন্দকাজের প্রতি অনাগ্রহী, অপরাধীকে মার্জনাকারী এবং ক্ষমা করার অজুহাতসন্ধানী。
أ أفضحه وقد غفرت له আমি কীভাবে তাকে ক্ষমা করার পর অপমান করি?
মুসা আলাইহিস সালামের যুগে বনী ইসরাঈলের মাঝে এক বছর প্রচণ্ড মহামারী ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সেই দিনগুলোতে মানুষের উপর প্রচণ্ড রকমের বিপদ আপতিত হয়। বাধ্য হয়ে মুসা আ. বনী ইসরাঈলকে নিয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য দুআ করতে বের হলেন。
মুসা আ. দুআর জন্য আল্লাহর দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করলেন। সবাই তখন তার চারপাশে অপেক্ষমাণ। কিন্তু বৃষ্টি নামছে না। আল্লাহ তা'আলা ওহী নাযিল করলেন। মুসা আ. বললেন, তোমাদের মধ্যে এক ব্যক্তি আছে যে আল্লাহর নাফরমানী করে। সে যতক্ষণ এই মজলিসে থাকবে আল্লাহ তা'আলা কোন দুআই কবুল করবেন না। তাই মুসা আ. আল্লাহর বার্তা জনগণকে জানিয়ে দিলেন। তিনি ওই অনির্দিষ্ট লোকটিকে মানুষের ভিড় থেকে বের হয়ে আসতে বললেন। যাতে আল্লাহ দুআ কবুল করেন এবং বৃষ্টি নামে。
এদিকে সেই পাপী বান্দা প্রচণ্ড লজ্জাবোধ করল। মানুষের সামনে বের হয়ে আসতে অপমান বোধ করল। ফলে সে তার মাথা কাপড়ে ঢেকে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে দু'আ করতে লাগল। স্বীয় অপকর্মের জন্য তওবা করল।
লোকটি যখন রোনাজারী ও ক্ষমা প্রার্থনায় মশগুল, এর মধ্যেই আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে মুসা আ. সহ বনী ইসরাঈলের সবাই অবাক হয়ে গেল। হযরত মুসা আ. বললেন, হে আল্লাহ! আপনি বৃষ্টি দিয়ে দিলেন, অথচ সেই লোক তো আমাদের সামনে এখনো বের হয়ে আসেনি。
তখন আল্লাহ তা'আলা বললেন, এখন ঐ ব্যক্তির জন্যই বৃষ্টি হয়েছে যার কারণে এতোদিন বৃষ্টি হচ্ছিল না। মুসা আ. তখন বললেন, হে আল্লাহ, আমাদেরকে দেখিয়ে দেন- কে সেই লোক?
আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমি তাকে তোমাদের নিকট গোপন রেখেছিলাম যখন সে গুনাহ করত। আর এখন তার নাম কিভাবে প্রকাশ করি যখন সে তওবা করেছে....? আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
📄 আশ শকূর
আশ শাকুর হলেন সেই সত্তা যিনি বান্দাকে তার সৎ কাজ ও নেক আমলের উত্তম বদলা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তিনি বান্দাদের প্রতি দয়ালু। তিনি নেক আমলের প্রতিদান স্বরূপ বান্দার সওয়াবকে দ্বিগুণ করে দেন। তিনি পুণ্যকে বাড়িয়ে দেন নিজ অনুগ্রহ আর দয়ায়। আর তিনি তাঁর অনুগত মুমিন বান্দাদেরকে আখেরাতে দান করবেন উচ্চ মাকাম। তাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি তাদেরকে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণ করে দিবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো বাড়িয়ে দিবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও অধিক কৃতজ্ঞতাপ্রাপ্ত’
(সূরা ফাতির - ৩০)
أيهما أنفع ؟ কোন দুটি বেশী উপকারী?
একটি ছোট্ট হরিণ পানি খাওয়ার জন্য নদীর কিনারে এল। যখন সে তার ছবিটি পানির মধ্যে দেখল, তখন হরিণটি নিজের লম্বা ও সুন্দর শিং দেখে বিস্মিত হয়ে গেল। আত্মমুগ্ধতার কারণে সে তা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল。
কিন্তু যখন সে তার ক্ষীণকায় পাদুটো দেখতে পেলো তখন খুবই দুঃখিত হয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল হায় যদি আমার বড় বড় শক্তিশালী দুটি পা থাকত!
এমন সময় সে কাছাকাছি এক সিংহকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত পালাতে শুরু করল। তার হালকা পাতলা পাদুটো তাকে দ্রুত দৌড়াতে সাহায্য করছে। সে যখন বনের ভিতরে ঢুকে গেল তখন গাছ-গাছালির লতা-পাতা তার শিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে লাগল। ফলে সে আর দৌড়াতে পারল না। অবশেষে সিংহটি তার কাছে চলে এল। অথচ সে তখনো তার শিং থেকে লতাগুল্ম ছাড়ানোর কাজে ভীষণ ব্যস্ত।
📄 আল আলীই
এ শব্দটির অর্থ- এমন সুউচ্চ মহান সত্ত্বা, সব ধরনের মাখলুকের উপর রয়েছে যার মর্যাদা। একমাত্র আল্লাহই এতোটা সুমহান ও সুউচ্চ। সম্মানে, মর্যাদায় ও মহত্বে কোন কিছুই তাঁর সমকক্ষ নয়। তিনি পবিত্র সত্তা। তিনি পূর্ণতার মালিক। সব ধরনের জ্ঞানের অধিকারী। সৃষ্টিজীবের উপর পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান。
যে ব্যক্তি জানবে যে, আল্লাহ তা'আলা সুউচ্চ মহান এবং হৃদয়ে তা মথিত করবে ও বিশ্বাস রাখবে, তাকে কোন অহমিকা ও কোন বিশ্বাসঘাতকতা স্পর্শ করবে না। সে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হবে। সে তার হৃদয়ের মাঝে সবসময়ের জন্যে আল্লাহর বড়ত্ব ধারণ করবে। যার ফলে সে নেক আমলের প্রতি ঝুঁকে পড়বে। ছোট ছোট গুনাহ থেকেও বেঁচে চলবে। যেন আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে。
الخليفة و صاحب الحمار বাদশাহ ও এক গাধার মালিক
খলীফা মুতাসিম একদিন একা একা রাস্তায় বের হলেন। উদ্দেশ্য হল সাধারণ মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। তিনি ঘোড়ায় চড়ে বসলেন এবং বাগদাদের উপকণ্ঠে এসে থামলেন। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তা-ঘাট কাঁদায় ভরে গেল। রাস্তায় পথচলা একদম অসম্ভব হয়ে ওঠল。
এমন পরিস্থিতিতে তিনি প্রাসাদে ফিরে যেতে উদ্যত হলেন। ঠিক এ সময় তিনি দেখতে পেলেন এক বৃদ্ধ লোকের একটি গাধা হোঁচট খেয়ে রাস্তার পাশে বিশাল গর্তের ভিতর পড়ে গেছে। বৃদ্ধ লোকটি আপ্রাণ চেষ্টা করছে গর্ত থেকে তুলে আনতে। কিন্তু পারছে না। এই দৃশ্য দেখে বাদশাহ মুতাসিম ঘোড়া থেকে নেমে দ্রুত বৃদ্ধের সঙ্গে গাধাটি উঠানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। বাদশাহর কাপড়-চোপড় কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল। হাতে মুখে ময়লা লেপ্টে গেল। শেষ পর্যন্ত গাধাটিকে উদ্ধার করা গেল। বৃদ্ধ লোকটি ভীষণ খুশি হয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল আর বাদশাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল। কিন্তু সে বাদশাহকে চিনতে পারল না。
ঐ সময় বাদশাহর প্রাসাদের এক লোক ঐ দিক দিয়ে যাচ্ছিল। সেই লোকটি বাদশাকে দেখে সালাম নিবেদন করল। বৃদ্ধ যখন চিনতে পারল বাদশাহকে তখন সে ভীষণ ভয়ে পেয়ে গেল। কিন্তু বাদশাহ মুতাসিম আনন্দিতই হলেন। তিনি নিজের বিনয় আর বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার দিয়ে বৃদ্ধের ওই ভয় দূর করে দিলেন。
📄 আল কাবীর
'আল কাবীর' হলেন তিনি যার সামনে সমস্ত কিছু তুচ্ছ। সব বড় বড় জিনিস যার মহত্বের সামনে গৌণ। যার বড়ত্বের কাছে মূল্যহীন। তাই সবকিছুই তাঁর সামনে নগণ্য。
আমরা যখন নামাজ পড়ি তখন আল্লাহর মহত্বের কথা মনে করে বলি, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সবচেয়ে বড়)। হৃদয়ে তাঁর মাহাত্মের কথা স্মরণ করি। তাঁর ভয়ে থাকি তটস্থ。
আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে বড়। মাখলুকের সঙ্গে তাঁর কোন তুলনা নেই। তিনি অনেক বড়। মানুষের, জ্ঞানের ঊর্ধ্বে। তাঁর মত কেউ নয়。
الخائف من الله আল্লাহর ভয়ে ভীত
অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক লোক ছিল। সে গোনাহে লিপ্ত ছিল। কোন কাজেই সে আল্লাহর কথা স্মরণ করত না। যেভাবে ইচ্ছা জীবন-যাপন করেছে。
ফলে যখন সে নিজের জীবনের শেষ সময়ে এসে পৌঁছল, মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেল, তখন সে তার ছেলেদের ডেকে বলল, যখন আমি মারা যাব তখন তোমরা আমাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে। আর আমার ছাইগুলো বাতাসে উড়িয়ে দেবে। কেননা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আমার ভয় লাগছে। আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই আমার উপর ক্ষমতাবান। তিনি আমাকে এমন শাস্তি দিবেন যা কাউকে দিবেন না。
যখন লোকটি মারা গেল তখন ছেলেরা তার বাবার ওসিয়ত পূর্ণ করল। আল্লাহ তা'আলা তখন যমিনকে নির্দেশ দিলেন, তুমি ওই লোকটির দেহের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো নতুন করে একত্র করো। সে যখন আল্লাহর সামনে এসে দাঁড়াল তখন আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে তুমি এমনটি করলে?
সে জবাবে বলল, হে রব! তোমার ভয়ে।
তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন。