📄 আস সামী'উ
'আস সামি' সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টিজীব থেকে উৎসারিত সব রকমের আওয়াজ ও সব রকমের শব্দ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তিনি তাদের স্বশব্দ ও নিঃশব্দ; সর্বপ্রকার ধ্বনিই শুনতে পান। তিনি ঠোঁটের মৃদু ঘর্ষণের শব্দও অবলীলায় শোনেন। এই জিহ্বার প্রতিটি নড়াচড়াও তিনি শোনেন। এমনকি হৃদয়ে ও মনকুহরে উদ্ভুত প্রতিটি কথাও তিনি বুঝতে পারেন。
আল্লাহ তাআলার শ্রবণের কোন সীমারেখা নেই। কোন স্থান বা কোন সময়ের সঙ্গে আল্লাহর শ্রবণ সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শ্রবণ কোন মানুষের মত নয়। অপরাপর সৃষ্টিজীবের মত নয়। আল্লাহ তা'আলা পুরো সৃষ্টিজীবের কথা শুনেন। সবসময়। সবখানে。
এই যে আমাদের চারপাশে বাতাস প্রবাহিত হয়। তার থাকে একটি ক্ষীণ আওয়াজ। থাকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার তরঙ্গায়িত ঢেউ। মোবাইল, টেলিফোন ইত্যাদির তরঙ্গও কেন্দ্রস্থলে পৌঁছানোর পথে শব্দহীন প্রবাহিত হয়। আমরা এই সমস্ত আওয়াজ আমাদের স্বল্পশ্রবণশক্তি দিয়ে শুনতে পাই না; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা যথাযথভাবে শুনতে সক্ষম。
هل تعلم !!! তুমি জানো কি!!!
* মানুষের শ্রবণশক্তি কান তিনটি ছোট হাড় দিয়ে তৈরী। প্রতিটি হাড়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। মিতরাকা, সানদান ও রিকাব। এই তিনটিকে শ্রবণশক্তির হাড় বলে। এগুলো হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে ছোট হাড়。
* আমাদের চারপাশে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য আওয়াজ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। আমরা কিন্তু সব আওয়াজই শুনতে পাই না। কারণ আমাদের শ্রবণশক্তির ক্ষমতা সীমিত। আমরা শুধু প্রতি সেকেন্ডে ১৫ থেকে ১৫০০ তরঙ্গায়িত শব্দতরঙ্গই শুনতে পাই। এর বাইরের শব্দ তরঙ্গ আমাদের শ্রবণশক্তি শুনতে পায় না。
আমরা যেমন ধরুন, বাদুরের শব্দ শুনতে পাই না। আমরা বেতারের প্রবাহিত শব্দতরঙ্গও শুনতে পাই না। কেননা এগুলো আমাদের শ্রবণশক্তির বাইরে。
📄 আল বাছীর
‘আল বাসির’ যিনি সবকিছু দেখেন। গোপন হোক বা প্রকাশ্য, ছোট কিংবা বড়; সৃষ্টির সবকিছুই তিনি দেখেন। আসমান ও জমিনে কোন কিছুই তাঁর অগোচরে নয়। তা যত ছোটই হোক কিংবা যত বড়। কাছে থাকুক বা দূরে। আল্লাহ তাআলা মায়ের উদরের সন্তানকেও দেখেন। জমিনের অভ্যন্তরে ছোট থেকে ছোট শস্যদানাগুলোও দেখেন। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম, সৃষ্টির ছোট থেকে ছোট সবকিছুই তিনি জানেন。
সুতরাং বান্দা যখন জানবে- আল্লাহ তা’আলা সর্বশ্রোতা, তখন সে গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁর কথা স্মরণ রাখবে। গুনাহ করার সময় লজ্জাবোধ করবে এ ভেবে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন। ফলে সে কল্যাণের দিকে ধাবিত হবে। তার বাহ্যিক গঠনও সুন্দর হয়ে যাবে। ভেতরও হবে নির্মল পবিত্র। শেষ পর্যন্ত সে একজন নেক বান্দায় পরিণত হবে。
الشيخ العجوز و الرجل الظالم এক অত্যাচারী ও একজন বৃদ্ধ
কোন এক শহরে বাস করত একজন নিকৃষ্ট অত্যাচারী লোক। সে মানুষের উপর অনেক জুলুম করত। তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করত। যে তার বিরোধিতা করত বা তার বিপক্ষে দাঁড়াত সে তাকে হত্যা করে ফেলত। কোন ব্যক্তি যখনই তাকে এই ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করতে, এই অত্যাচার ও বিশৃঙ্খলা ত্যাগ করতে বলত সাথে সাথে সে তার উপর আক্রমণ করত。
একদিন সেই গ্রামে জনৈক বৃদ্ধ এলেন। তিনি ছিলেন একজন সজ্জন মানুষ। গ্রামের মানুষ তার কাছে সেই জালেম লোকটি এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। সবার কথা শুনে নেককার বৃদ্ধ লোকটি ওই অত্যাচারীর কাছে গেলেন। তিনি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তাকে আল্লাহর কুদরত ও তার উপর আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন。
জালেম লোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল - আমি চাইনা তুমি আমার সঙ্গে তওবা ও হিদায়েত নিয়ে কথা বল। তুমি শুধু বল যে, আমি যা চাই তাই করব কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমাকে পাকড়াও করবেন না; তা কিভাবে সম্ভব?
কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি হেসে বললেন - তুমি যদি আল্লাহর নাফরমানী করতে চাও তাহলে এমন জায়গায় গিয়ে কর যেখানে তিনি তোমাকে দেখবেন না。
অত্যাচারী লোকটি তখন চুপ হয়ে গেলো। তার মুখে কোনো কথার খৈ ফুটলো না। সে তন্ময় হয়ে কিছু ক্ষণ ভাবলো। এরপর শান্ত পদক্ষেপে সেখান থেকে উঠে বাড়ি ফিরে গেলো। কিন্তু এরপর বদলে গেলো তার জীবনের ছক। এখন সে কাউকে ধরে প্রহার করে না। কারো ওপর অত্যাচার করে না। সেই গ্রামটিতে নেমে এলো শান্তির সুবিমল বাতাস。
📄 আল হাকাম
‘আল হাকামু’-এর অর্থ এমন বিচারক যার হুকুম বাস্তবায়ন হয়। তার ওপর কোন বিচারক নেই। তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কেউ নেই। তিনিই হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করে দেন。
তিনি মানুষের মধ্যকার বিবাদ-মিমাংসা করেন। বিশৃঙ্খলা থেকে সতর্ক করেন। তাই তিনি মানুষের কাছে যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যেন তারা আল্লাহর হুকুম ও বিধানের দিকে মানুষকে নিয়ে আসতে পারেন। যেই দীনের মধ্যে রয়েছে মানুষের জন্য কল্যাণ ও সৌভাগ্য। যেই দীন মানবজাতিকে পাপাচার, ভ্রষ্টতা এবং পদস্খলন থেকে রক্ষা করে。
যিনি হাকাম তিনি সবকিছুর সিদ্ধান্তের মালিক। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে সবচেয়ে সুন্দর অবয়বে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হল নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। তাই কেউ খারাপ আচরণ করলে তার উপর রাগ করবে না। সকল কাজে আল্লাহর কিতাব এবং তার রাসূলের সুন্নতের অনুসরণ করবে। কেননা এতেই সব কল্যাণ নিহিত。
جرة الذهب স্বর্ণের কলস বাড়ি বানানোর জন্য একলোক একখণ্ড জমি ক্রয় করল। একদিন সে তার সেই জমি খনন করতে লাগল। হঠাৎ তার কুড়াল জমিনে পুতে রাখা একটি কলসির ওপর আঘাত লাগল। সে তখন মাটি খুঁড়ে কলসিটি বের করল। কলসির মুখ খুলতেই সে বিস্মিত হলো। আরে, এতো দেখি স্বর্ণালংকারে ভর্তি এক কলস。
লোকটি তা নিয়ে দ্রুত ছুটে গেল ওই জমিটির বিক্রেতার কাছে। কারণ সে ভেবেছিলো, আমি এই কলসিটির মালিক নই। মালিক হলেন তিনি, যিনি আমার কাছে এ জমিন বিক্রি করেছেন。
জমিনের মালিক তার কাছ থেকে ওই কলসিটি গ্রহণ করতে কিছুতেই রাজি হলো না। এ নিয়ে এক পর্যায়ে তাদের দু'জনের মাঝে বিবাদ লেগে গেলো। তাদের আশপাশে তখন অনেক লোক জড়ো হলো। তারা পরামর্শ দিলো, তোমরা বিচারকের কাছে যাও। তিনি তোমাদের বিবাদের ফয়সালা করবেন। তখন তারা বিচারকে কাছে উপস্থিত হলো。
বিচারক প্রথমে তাদের দু'জনের বক্তব্য শুনলেন, অতপর ভূমি বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি কোন সন্তান আছে?
বিচারকের প্রশ্ন শুনে ভূমি বিক্রেতা হতবাক হয়ে গেল। তবু উত্তর দিল, আমার একটি যুবতী মেয়ে আছে。
এবার বিচারক ক্রেতাকে একই প্রশ্ন করল। সে বলল, আমার একটি যুবক ছেলে আছে。
তখন বিচারক হেসে দিয়ে বলল, তোমরা দুজনই সৎ। আমার রায় হল মেয়েটিকে ছেলেটির কাছে বিয়ে দাও। আর এই সম্পদ তাদের বিয়েতে খরচ কর। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের জন্য বরকতের ফায়সালা করুন。
📄 আল আদল
আল আদলু হলেন ঐ সত্তা যিনি তাঁর হুকুমের ক্ষেত্রে কোন এক পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়েন না। আল্লাহ তাআলাই ন্যায়পরায়ণ। হুকুমের ক্ষেত্রে তিনি ইনসাফ বজায় রাখেন। পুরো জাহান সৃষ্টি করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। শৃঙ্খলার সঙ্গে। হিকমতের সঙ্গে। যদি আল্লাহ তাআলার ইনসাফ না থাকত তাহলে এই বিশ্বজগতের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত。
আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে রিযিকের ফয়সালা করেছেন। তিনি তাদেরকে দান করেছেন প্রচুর নেয়ামত। কাউকে দিয়েছেন সম্পদের নেয়ামত। কাউকে দিয়েছেন ইলমের নেয়ামত। কাউকে সুস্থতা। আবার কাউকে অল্পেতুষ্টি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। সর্বাবস্থাতেই বান্দার উচিৎ আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা。
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মুমিন বান্দার বিষয়টি খুবই বিস্ময়কর। তার সবকিছুই কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রেই এমনটা হয় না। আনন্দের কোন কিছু যদি তার কাছে আসে, তাহলে সে শুকরিয়া আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি বিপদাপন্ন হয় তাহলে ধৈর্য্যধারণ করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর। (মুসলিম শরীফ)
القاضي العادل ন্যায়পরায়ণ বিচারক
বাদশাহ প্রথম সলিম জানতে পারলেন যে, আর্মেনিয়া, পারস্য এবং ইহুদীদের কিছু অমুসলিম সংখ্যালঘু দেশে অসন্তোষ ছড়াচ্ছে এবং কোন একটি বিষয় নিয়ে এমন ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে; যা দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ফলে বাদশাহ নির্দেশ দিলেন যেন এই সংখ্যালঘুরা ইসলাম গ্রহণ করে। যারা অস্বীকার করবে তাদেরকে হত্যা করা হবে。
তখন তাদের মধ্য হতে একটি প্রতিনিধি দল مسلمانوں প্রধান নেতা যানবিলী আলী মালী আফিনদী এর কাছে গেল। তিনি ছিলেন সেই যুগের বড় আলেম। প্রতিনিধি দল ইমামকে বাদশাহর নির্দেশনা জানাল। শুনে তিনি প্রচন্ড রেগে গেলেন। ইসলাম গ্রহণে অনাগ্রহী অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণে চাপ প্রয়োগ করা ইসলামী শিক্ষার বহির্ভূত। ইসলামের রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ করা কারো জন্যই বৈধ নয়। এমনকি সুলতানের জন্যও নয়。
ইমাম দ্রুত সুলতানের কাছে ছুটে এলেন। তিনি সুলতানকে বললেন, নিশ্চয়ই এটি ইসলাম বহির্ভূত কাজ। তিনি বাদশাহকে হুমকি দিলেন, যদি আপনি এই নির্দেশ বাস্তবায়নে অগ্রসর হোন, তাহলে আমি আপনার ক্ষমতাচ্যুতির ফতোয়া দিতে বাধ্য হব। শুধুমাত্র শরীয়তের বিরোধিতার কারণে।
তখন বাদশাহ ইমামের রায় মেনে নিলেন। তিনি পূর্বে নিদের্শ প্রত্যাহারের ঘোষণা করে দিলেন। ফলে অমুসলিম সংখ্যালঘুরা দেশে নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে লাগল। এরপর থেকে কেউ তাদেরকে কোন কটুকথা বা তাদের সঙ্গে কোন খারাপ ব্যবহার করে না।