📄 আল মুইজ্জ
আল মুয়িয্যু হলেন সেই সত্তা যিনি তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে মর্যাদা দান করেন। যদিও তারা দরিদ্র হয়। আল্লাহভীরুদেরকে মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন যদিও তারা দুর্বল হয়। হক ও সত্য কথাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করেন। কিয়ামত দিবসে গুনাহগার ও অপরাধীদের থেকে মুমিনদেরকে তিনি স্বাতন্ত্র দিয়ে মর্যাদায় ভূষিত করবেন। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশে সম্মানিত করবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
হে নবী! আপনি বলুন- হে আল্লাহ! আপনিই রাজত্বের মালিক। যাকে ইচ্ছা আপনি রাজত্ব দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। আপনার হাতেই সব। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। • (সূরা আলে ইমরান - ২৬)
আল্লাহর আনুগত্য, অল্পেতুষ্টি ও তার সন্তষ্টি অর্জনের মধ্যেই সকল সম্মান নিহিত। গুনাহ এড়িয়ে চলাই আল্লাহর আনুগত্য। সুতরাং যে ব্যক্তি নাফরমানীর মাঝে সম্মান তালাশ করে আল্লাহ তাআলা তাকে অপমানিত করেন। আর যে ব্যক্তি লোভ পরিত্যাগ করে এবং হালাল উপার্জন ও নেক আমলের মধ্যে নিজেকে লিপ্ত রাখে, আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানে ভূষিত করেন。
الأمير عمار আম্মার রা. যখন শাসনকর্তা
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.। তিনি ছিলেন প্রথমসারির মুসলমান। ইসলাম ত্যাগ করার জন্য তাঁকে, তাঁর পিতা ইয়াসির, তাঁর মা হযরত সুমাইয়া রা. মক্কার মুশরিকরা পাশবিক নির্যাতন করেছিলো। তবুও তারা ছিলেন ধৈর্য্যশীল। ইসলামের উপরই অটল থাকলেন। ফলে তাদের উপর মুশরিকদের নির্যাতন ও ক্ষোভ বেড়েই চলল। বিশেষকরে আবু জাহল। সে হযরত সুমাইয়া রা.-কে তাঁর সন্তানের চোখের সামনেই বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। তারা হযরত আম্মার রা. ও তার পিতা ইয়াসির রা.-এর উপর নির্যাতন করতেই থাকল। একদিন তার পিতাও শহীদ হয়ে গেলেন。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আম্মার রা.-কে সম্মানিত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মার রা.-এর ব্যাপারে বললেন, 'যে ব্যক্তি আম্মারের সঙ্গে শত্রুতা করবে আল্লাহ তা'আলাও তার সঙ্গে বৈরী আচরণ করবেন। আর যে আম্মারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ তা'আলাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করবেন।'
হযরত উমর রা.-এর খেলাফতের সময় হযরত আম্মার রা. কুফার গভর্নর নিযুক্ত হলেন। কিন্তু এতে তাঁর বিনয় আরো বেড়ে গেল। তিনি নিজের প্রয়োজন নিজ হাতেই মেটাতেন। ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তিনি বাজার থেকে ক্রয় করে নিজের পিঠের ওপর বহন করে নিয়ে আসতেন。
📄 আল মুযিল্ল
আল মুযিল্লু আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম। এর অর্থ হল- অপদস্তকারী। অর্থাৎ তিনি কাফেরদেরকে লাঞ্ছিত করেন। জালেমদেরকে অপমানিত করেন। গুনাহগার ও অহংকারীদেরকে ধূলিস্যাৎ করেন। দুনিয়াতে তাদের জন্য অপমান ও অবমাননা নির্ধারিত রয়েছে। কেননা তারা মানুষকে অপমান করে। অহংকার দেখায়। হটকারিতা করে। তাই কিয়ামত দিবসেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। সমস্ত মানুষের সামনে তাদেরকে শাস্তি দেবেন। তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সেখানেই তারা শাস্তি পেতে থাকবে। তারা কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থলে নিক্ষিপ্ত হবে!
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়, গুনাহ ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, নফসকে উচ্চাভিলাষ ও প্রবৃত্তির কুধারণা থেকে রক্ষা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করেন。
السارق و الحكيم জনৈক চোর ও একজন জ্ঞানী
রাস্তার একপাশে অনেক মানুষের জটলা। তারা কৌতুহল ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাতকড়া বাঁধা চোরের দিকে। চোরটির পাঁয়েও লোহার বেড়ি বাঁধা রয়েছে। প্রচণ্ড লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে পুলিশ তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিচারকের কাছে。
চোরটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর আশপাশের লোকদের কাছে এক টুকরো রুটি চাচ্ছে। সে বলছে, আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। আমাকে এক টুকরো রুটি দাও। আমি তা খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করবো。
তখন ভিড়ের ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি চোরের কাছে এগিয়ে এলেন। রুক্ষ গলায় তিনি চোরটিকে বললেন -
লোভের বশবর্তী হয়ে তুমি খুবই ঘৃণ্য কাজ করেছো। তোমার সেই কাজ আজ তোমাকে চরম লাঞ্ছিত করছে। যদি তুমি লোভাতুর না হতে, যদি তুমি আগেই এক টুকরো রুটির ওপর সন্তুষ্ট হতে তাহলে চুরি করতে যেতে না। তুমি যদি অল্পেতুষ্ট হতে তাহলে আজ তোমার হাত-পায়ে লৌহশলাকা বাঁধা হতো না。
📄 আস সামী'উ
'আস সামি' সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টিজীব থেকে উৎসারিত সব রকমের আওয়াজ ও সব রকমের শব্দ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তিনি তাদের স্বশব্দ ও নিঃশব্দ; সর্বপ্রকার ধ্বনিই শুনতে পান। তিনি ঠোঁটের মৃদু ঘর্ষণের শব্দও অবলীলায় শোনেন। এই জিহ্বার প্রতিটি নড়াচড়াও তিনি শোনেন। এমনকি হৃদয়ে ও মনকুহরে উদ্ভুত প্রতিটি কথাও তিনি বুঝতে পারেন。
আল্লাহ তাআলার শ্রবণের কোন সীমারেখা নেই। কোন স্থান বা কোন সময়ের সঙ্গে আল্লাহর শ্রবণ সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শ্রবণ কোন মানুষের মত নয়। অপরাপর সৃষ্টিজীবের মত নয়। আল্লাহ তা'আলা পুরো সৃষ্টিজীবের কথা শুনেন। সবসময়। সবখানে。
এই যে আমাদের চারপাশে বাতাস প্রবাহিত হয়। তার থাকে একটি ক্ষীণ আওয়াজ। থাকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার তরঙ্গায়িত ঢেউ। মোবাইল, টেলিফোন ইত্যাদির তরঙ্গও কেন্দ্রস্থলে পৌঁছানোর পথে শব্দহীন প্রবাহিত হয়। আমরা এই সমস্ত আওয়াজ আমাদের স্বল্পশ্রবণশক্তি দিয়ে শুনতে পাই না; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা যথাযথভাবে শুনতে সক্ষম。
هل تعلم !!! তুমি জানো কি!!!
* মানুষের শ্রবণশক্তি কান তিনটি ছোট হাড় দিয়ে তৈরী। প্রতিটি হাড়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। মিতরাকা, সানদান ও রিকাব। এই তিনটিকে শ্রবণশক্তির হাড় বলে। এগুলো হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে ছোট হাড়。
* আমাদের চারপাশে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য আওয়াজ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। আমরা কিন্তু সব আওয়াজই শুনতে পাই না। কারণ আমাদের শ্রবণশক্তির ক্ষমতা সীমিত। আমরা শুধু প্রতি সেকেন্ডে ১৫ থেকে ১৫০০ তরঙ্গায়িত শব্দতরঙ্গই শুনতে পাই। এর বাইরের শব্দ তরঙ্গ আমাদের শ্রবণশক্তি শুনতে পায় না。
আমরা যেমন ধরুন, বাদুরের শব্দ শুনতে পাই না। আমরা বেতারের প্রবাহিত শব্দতরঙ্গও শুনতে পাই না। কেননা এগুলো আমাদের শ্রবণশক্তির বাইরে。
📄 আল বাছীর
‘আল বাসির’ যিনি সবকিছু দেখেন। গোপন হোক বা প্রকাশ্য, ছোট কিংবা বড়; সৃষ্টির সবকিছুই তিনি দেখেন। আসমান ও জমিনে কোন কিছুই তাঁর অগোচরে নয়। তা যত ছোটই হোক কিংবা যত বড়। কাছে থাকুক বা দূরে। আল্লাহ তাআলা মায়ের উদরের সন্তানকেও দেখেন। জমিনের অভ্যন্তরে ছোট থেকে ছোট শস্যদানাগুলোও দেখেন। সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম, সৃষ্টির ছোট থেকে ছোট সবকিছুই তিনি জানেন。
সুতরাং বান্দা যখন জানবে- আল্লাহ তা’আলা সর্বশ্রোতা, তখন সে গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁর কথা স্মরণ রাখবে। গুনাহ করার সময় লজ্জাবোধ করবে এ ভেবে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন। ফলে সে কল্যাণের দিকে ধাবিত হবে। তার বাহ্যিক গঠনও সুন্দর হয়ে যাবে। ভেতরও হবে নির্মল পবিত্র। শেষ পর্যন্ত সে একজন নেক বান্দায় পরিণত হবে。
الشيخ العجوز و الرجل الظالم এক অত্যাচারী ও একজন বৃদ্ধ
কোন এক শহরে বাস করত একজন নিকৃষ্ট অত্যাচারী লোক। সে মানুষের উপর অনেক জুলুম করত। তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করত। যে তার বিরোধিতা করত বা তার বিপক্ষে দাঁড়াত সে তাকে হত্যা করে ফেলত। কোন ব্যক্তি যখনই তাকে এই ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করতে, এই অত্যাচার ও বিশৃঙ্খলা ত্যাগ করতে বলত সাথে সাথে সে তার উপর আক্রমণ করত。
একদিন সেই গ্রামে জনৈক বৃদ্ধ এলেন। তিনি ছিলেন একজন সজ্জন মানুষ। গ্রামের মানুষ তার কাছে সেই জালেম লোকটি এবং তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল। সবার কথা শুনে নেককার বৃদ্ধ লোকটি ওই অত্যাচারীর কাছে গেলেন। তিনি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তাকে আল্লাহর কুদরত ও তার উপর আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন。
জালেম লোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল - আমি চাইনা তুমি আমার সঙ্গে তওবা ও হিদায়েত নিয়ে কথা বল। তুমি শুধু বল যে, আমি যা চাই তাই করব কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমাকে পাকড়াও করবেন না; তা কিভাবে সম্ভব?
কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি হেসে বললেন - তুমি যদি আল্লাহর নাফরমানী করতে চাও তাহলে এমন জায়গায় গিয়ে কর যেখানে তিনি তোমাকে দেখবেন না。
অত্যাচারী লোকটি তখন চুপ হয়ে গেলো। তার মুখে কোনো কথার খৈ ফুটলো না। সে তন্ময় হয়ে কিছু ক্ষণ ভাবলো। এরপর শান্ত পদক্ষেপে সেখান থেকে উঠে বাড়ি ফিরে গেলো। কিন্তু এরপর বদলে গেলো তার জীবনের ছক। এখন সে কাউকে ধরে প্রহার করে না। কারো ওপর অত্যাচার করে না। সেই গ্রামটিতে নেমে এলো শান্তির সুবিমল বাতাস。