📄 আর রা'ফী
আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন। কাউকে উচ্চ মাকাম দান করেন আর কাউকে দান করেন অঢেল সম্পদ। কিংবা কাউকে দেন ইলম ও আল্লাহর মা'রেফাত। আর তিনি নেক বান্দাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে দান করবেন সর্বোচ্চ স্থান। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
‘আর তিনি তোমাদেরকে বানিয়েছেন দুনিয়ার প্রতিনিধি। আর তোমাদের পরস্পরকে পরস্পরের উপর মর্যাদা দিয়েছেন যেন তিনি পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন সে ব্যাপারে।’ (সূরা আনআম - ১৬৫)
আল্লাহই রাজাদেরকে উচ্চকিত করেছেন জনগণের ওপর। শাসকবর্গকে প্রজাদের ওপর। ধনীদেরকে গরিবদের ওপর। পৃথিবীর শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই তিনি এসব করেছেন। তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন স্তরে রেখেছেন মূলত পরীক্ষা করার জন্যে। আমরা যদি আল্লাহর এঁকে দেয়া সেই সীমারেখা মেনে চলি, তার ওপর বিশ্বাস ধারণ করি তাহলে পরকালে আমাদের মুক্তি পেতে কোনো বাঁধা থাকবে না。
মানুষ যদি আল্লাহর এ নাম স্মরণ রাখে তাহলে সে কারো সঙ্গে প্রতারণা করবে না। কোনো প্রজা তার কর্তার সঙ্গেও প্রতারণা করবে না। কোনো ব্যক্তি তার সম্পদের সঙ্গেও প্রতারণা করবে না। বরং সে মানুষের সঙ্গে বিনম্র আচরণ করবে। তাদের সেবা ও প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকবে。
يوسف واخواته
ইউসুফ আ. ও তার ভাইদের ঘটনা
ইউসুফ আ. এর ভায়েরা তার প্রতি খুব হিংসে করত। যেহেতু তাঁর বাবা হযরত ইয়াকুব আ. তাকে বেশী ভালবাসতেন। তারা মনে করত তাদের পিতা ইউসুফ আ.-কে তাদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছেন। তখন শয়তান তাদের অন্তরে ধোঁকা দিল যেনো ইউসুফ আ.কে দূরে মরুভূমিতে ফেলে রেখে আসে。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ আ. এর সুরক্ষার দায়িত্ব নিলেন। তিনি ইউসুফ আ. এর কাছে এক ব্যবসায়ী কাফেলাকে পাঠিয়ে দিলেন। তারা মিসরের দিকে যাচ্ছিল। তারা ইউসুফ আ. কে মরুভূমির এক গভীর কূপ থেকে তুলে নিলো এবং মিসরের বাদশাহর কাছে বিক্রি করে দিল। ফলে ইউসুফ আ. বাদশাহর প্রাসাদে দীর্ঘদিন কাটালেন। এমনকি একদিন বাদশাহর স্ত্রীর ক্রোধ তার উপর এসে পড়ল। তখন বাদশাহ ইউসুফ আ. কে অন্যায়ভাবে জেলে আটকে রাখলেন。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা হযরত ইউসুফ আ.কে মর্যাদা দান করলেন ওই সকল লোকের ওপর; যারা একদিন তার উপর জুলুম করেছিল। তিনি জেল থেকে মুক্তি লাভ করলেন। এক পর্যায়ে মিসরের বাদশার প্রভাবশালী মন্ত্রী হলেন। যখন তার ভাইয়েরা মিসরে এলো তিনি তাদেরকে দেখেই চিনে ফেললেন। তাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দিলেন। তারাও ইউসুফ আ. এর কাছে নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিল। ফলে তারা ইউসুফ আ. এর অনুগ্রহে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করল。
📄 আল মুইজ্জ
আল মুয়িয্যু হলেন সেই সত্তা যিনি তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে মর্যাদা দান করেন। যদিও তারা দরিদ্র হয়। আল্লাহভীরুদেরকে মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন যদিও তারা দুর্বল হয়। হক ও সত্য কথাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করেন। কিয়ামত দিবসে গুনাহগার ও অপরাধীদের থেকে মুমিনদেরকে তিনি স্বাতন্ত্র দিয়ে মর্যাদায় ভূষিত করবেন। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশে সম্মানিত করবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
হে নবী! আপনি বলুন- হে আল্লাহ! আপনিই রাজত্বের মালিক। যাকে ইচ্ছা আপনি রাজত্ব দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। আপনার হাতেই সব। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। • (সূরা আলে ইমরান - ২৬)
আল্লাহর আনুগত্য, অল্পেতুষ্টি ও তার সন্তষ্টি অর্জনের মধ্যেই সকল সম্মান নিহিত। গুনাহ এড়িয়ে চলাই আল্লাহর আনুগত্য। সুতরাং যে ব্যক্তি নাফরমানীর মাঝে সম্মান তালাশ করে আল্লাহ তাআলা তাকে অপমানিত করেন। আর যে ব্যক্তি লোভ পরিত্যাগ করে এবং হালাল উপার্জন ও নেক আমলের মধ্যে নিজেকে লিপ্ত রাখে, আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানে ভূষিত করেন。
الأمير عمار আম্মার রা. যখন শাসনকর্তা
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.। তিনি ছিলেন প্রথমসারির মুসলমান। ইসলাম ত্যাগ করার জন্য তাঁকে, তাঁর পিতা ইয়াসির, তাঁর মা হযরত সুমাইয়া রা. মক্কার মুশরিকরা পাশবিক নির্যাতন করেছিলো। তবুও তারা ছিলেন ধৈর্য্যশীল। ইসলামের উপরই অটল থাকলেন। ফলে তাদের উপর মুশরিকদের নির্যাতন ও ক্ষোভ বেড়েই চলল। বিশেষকরে আবু জাহল। সে হযরত সুমাইয়া রা.-কে তাঁর সন্তানের চোখের সামনেই বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। তারা হযরত আম্মার রা. ও তার পিতা ইয়াসির রা.-এর উপর নির্যাতন করতেই থাকল। একদিন তার পিতাও শহীদ হয়ে গেলেন。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আম্মার রা.-কে সম্মানিত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মার রা.-এর ব্যাপারে বললেন, 'যে ব্যক্তি আম্মারের সঙ্গে শত্রুতা করবে আল্লাহ তা'আলাও তার সঙ্গে বৈরী আচরণ করবেন। আর যে আম্মারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ তা'আলাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করবেন।'
হযরত উমর রা.-এর খেলাফতের সময় হযরত আম্মার রা. কুফার গভর্নর নিযুক্ত হলেন। কিন্তু এতে তাঁর বিনয় আরো বেড়ে গেল। তিনি নিজের প্রয়োজন নিজ হাতেই মেটাতেন। ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তিনি বাজার থেকে ক্রয় করে নিজের পিঠের ওপর বহন করে নিয়ে আসতেন。
📄 আল মুযিল্ল
আল মুযিল্লু আল্লাহ তাআলার একটি গুণবাচক নাম। এর অর্থ হল- অপদস্তকারী। অর্থাৎ তিনি কাফেরদেরকে লাঞ্ছিত করেন। জালেমদেরকে অপমানিত করেন। গুনাহগার ও অহংকারীদেরকে ধূলিস্যাৎ করেন। দুনিয়াতে তাদের জন্য অপমান ও অবমাননা নির্ধারিত রয়েছে। কেননা তারা মানুষকে অপমান করে। অহংকার দেখায়। হটকারিতা করে। তাই কিয়ামত দিবসেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। সমস্ত মানুষের সামনে তাদেরকে শাস্তি দেবেন। তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। সেখানেই তারা শাস্তি পেতে থাকবে। তারা কতইনা নিকৃষ্ট আবাসস্থলে নিক্ষিপ্ত হবে!
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়, গুনাহ ও খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, নফসকে উচ্চাভিলাষ ও প্রবৃত্তির কুধারণা থেকে রক্ষা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করেন。
السارق و الحكيم জনৈক চোর ও একজন জ্ঞানী
রাস্তার একপাশে অনেক মানুষের জটলা। তারা কৌতুহল ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাতকড়া বাঁধা চোরের দিকে। চোরটির পাঁয়েও লোহার বেড়ি বাঁধা রয়েছে। প্রচণ্ড লাঞ্ছনা ও অপমানের সঙ্গে পুলিশ তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিচারকের কাছে。
চোরটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছে আর আশপাশের লোকদের কাছে এক টুকরো রুটি চাচ্ছে। সে বলছে, আমি প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। আমাকে এক টুকরো রুটি দাও। আমি তা খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করবো。
তখন ভিড়ের ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ ব্যক্তি চোরের কাছে এগিয়ে এলেন। রুক্ষ গলায় তিনি চোরটিকে বললেন -
লোভের বশবর্তী হয়ে তুমি খুবই ঘৃণ্য কাজ করেছো। তোমার সেই কাজ আজ তোমাকে চরম লাঞ্ছিত করছে। যদি তুমি লোভাতুর না হতে, যদি তুমি আগেই এক টুকরো রুটির ওপর সন্তুষ্ট হতে তাহলে চুরি করতে যেতে না। তুমি যদি অল্পেতুষ্ট হতে তাহলে আজ তোমার হাত-পায়ে লৌহশলাকা বাঁধা হতো না。
📄 আস সামী'উ
'আস সামি' সেই সত্তা, যিনি সৃষ্টিজীব থেকে উৎসারিত সব রকমের আওয়াজ ও সব রকমের শব্দ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তিনি তাদের স্বশব্দ ও নিঃশব্দ; সর্বপ্রকার ধ্বনিই শুনতে পান। তিনি ঠোঁটের মৃদু ঘর্ষণের শব্দও অবলীলায় শোনেন। এই জিহ্বার প্রতিটি নড়াচড়াও তিনি শোনেন। এমনকি হৃদয়ে ও মনকুহরে উদ্ভুত প্রতিটি কথাও তিনি বুঝতে পারেন。
আল্লাহ তাআলার শ্রবণের কোন সীমারেখা নেই। কোন স্থান বা কোন সময়ের সঙ্গে আল্লাহর শ্রবণ সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শ্রবণ কোন মানুষের মত নয়। অপরাপর সৃষ্টিজীবের মত নয়। আল্লাহ তা'আলা পুরো সৃষ্টিজীবের কথা শুনেন। সবসময়। সবখানে。
এই যে আমাদের চারপাশে বাতাস প্রবাহিত হয়। তার থাকে একটি ক্ষীণ আওয়াজ। থাকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার তরঙ্গায়িত ঢেউ। মোবাইল, টেলিফোন ইত্যাদির তরঙ্গও কেন্দ্রস্থলে পৌঁছানোর পথে শব্দহীন প্রবাহিত হয়। আমরা এই সমস্ত আওয়াজ আমাদের স্বল্পশ্রবণশক্তি দিয়ে শুনতে পাই না; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা যথাযথভাবে শুনতে সক্ষম。
هل تعلم !!! তুমি জানো কি!!!
* মানুষের শ্রবণশক্তি কান তিনটি ছোট হাড় দিয়ে তৈরী। প্রতিটি হাড়ের ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। মিতরাকা, সানদান ও রিকাব। এই তিনটিকে শ্রবণশক্তির হাড় বলে। এগুলো হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে ছোট হাড়。
* আমাদের চারপাশে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য আওয়াজ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। আমরা কিন্তু সব আওয়াজই শুনতে পাই না। কারণ আমাদের শ্রবণশক্তির ক্ষমতা সীমিত। আমরা শুধু প্রতি সেকেন্ডে ১৫ থেকে ১৫০০ তরঙ্গায়িত শব্দতরঙ্গই শুনতে পাই। এর বাইরের শব্দ তরঙ্গ আমাদের শ্রবণশক্তি শুনতে পায় না。
আমরা যেমন ধরুন, বাদুরের শব্দ শুনতে পাই না। আমরা বেতারের প্রবাহিত শব্দতরঙ্গও শুনতে পাই না। কেননা এগুলো আমাদের শ্রবণশক্তির বাইরে。