📄 আল বাসিত
‘আল বাসেত’ হলেন যিনি তাঁর বান্দার জন্য দানকে প্রসারিত করেন। নিজ দয়া ও অনুগ্রহে প্রচুর নেয়ামত দান করেন。
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছে তার দিকে রিযিকের হাত প্রসারিত করেন এবং তিনি তা করতে সক্ষম। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সূরা আন কাবুত - ৬২)
বাসেত ঐ সত্তা যিনি নিজ অনুগ্রহ ও হিকমতে তাঁর বান্দাকে রিযিক দান করেন। প্রশস্ততার সঙ্গে দান করেন। দান করেন করুণায় ও মহানুভবতায়। ব্যাপকভাবে দান করেন। তিনি প্রয়োজন মাফিক দান করেন。
মুমিন বান্দা যখন আল্লাহর এই নামটি মনে মনে স্মরণ করবে তখন সে বিনয়ের সৌন্দর্যে ভূষিত হবে। তার দৃষ্টি তখন দুনিয়া থেকে ওঠে যাবে। সেই চোখই দুনিয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করবে। ছোটদেরকে স্নেহ করবে। আর এর মাঝে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুভব করবে। ফলে সে তার সামনের বড় বড় এবং কঠিন কঠিন বিপদকেও তুচ্ছ মনে হবে। তার থেকে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ দুর্দশা দূর হয়ে যাবে। উচ্চাশা তার মন থেকে দূরীভূত হবে। ফলে সে অল্পতেই তুষ্ট হতে পারবে এবং অতিরিক্ত পাওয়ার লোভ থেকে নিজেকে নিবৃত করতে পারবে。
الإخوة الثلاثة তিন ভাইয়ের গল্প
এক দেশে বাস করত তিন ভাই। একদিন তাদের পিতা মারা গেল। মৃত্যুর সময় সে বড় ছেলেকে দিয়ে গেল সুন্দর একটি বাড়ি। মেঝ ছেলেকে গবাদি পশুগুলো দান করলেন। আর সবচেয়ে ছোট ভাইয়ের ভাগে পড়ল এক টুকরো জমি এবং কিছু গম。
একদিন বড় ভাই তার বাড়িটি বিক্রি করে দিল এবং আয়েশী জীবন যাপন করে সব অর্থ এক সময় খরচ করে ফেলল। এক পর্যায়ে সে নিঃস্ব হয়ে গেল。
মেঝ ভাইও তার গবাদি পশুগুলো ধীরে ধীরে বিক্রি করে দিল। এবং আমোদ প্রমোদে মত্ত হয়ে ওঠলো। তার সব অর্থও এক সময় দ্রুত ফুরিয়ে গেল。
অপরদিকে ছোট ভাই তার জমিতে গিয়ে গমের দানাগুলো ছড়িয়ে দিল। প্রতিদিন সে তার ফসলের পরিচর্যা করতে লাগলো। এভাবে এক সময় তার জমি নতুন ফসলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো। একদিন ফসল কাটার সময় হয়ে গেল। সে ফসলগুলো কেটে বিক্রি করে পুনরায় বিভিন্ন রকমের শষ্যদানা রোপন করল। এভাবেই চলতে লাগল তার দিনগুলো。
কয়েক বছর পর সে একটি সুন্দর বাড়ি ক্রয় করল। অনেক গরু-ছাগল ক্রয় করল। এক পর্যায়ে ছোট ভাইটি গ্রামের ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হয়ে উঠলো। আল্লাহ তা'আলা তার কাজে বরকত দান করেছেন। তার রিযিকে প্রশস্ততা দান করেছেন। কিন্তু সে তার বড় দুই ভাইকে কোনদিনই ভুলেনি। সে সবসময় তাদের দেখাশোনা করত এবং তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করত।
📄 আল খাফিদ
'আল খাফিদ' ঐ সত্তার নাম যিনি সত্য প্রকাশের দ্বারা বাতিলকে প্রতিহত করে দেন। নিষ্ঠাবান বিনয়ীকে সাহায্য করেন আর বিভ্রান্ত অহঙ্কারীকে করেন অবনমিত। মিথ্যাবাদীর মিথ্যাকে সমাজে প্রকাশ করে দমিয়ে দেন। কাফের আর অপরাধীদেরকে দুনিয়াতে তাদের মন্দ ও নিন্দনীয় কৃতকর্মের ফলস্বরূপ কিয়ামত দিবসে পরাজিত করবেন。
মুমিন বান্দার জন্য করণীয় হল নিজের নফসকে নিচু করে রাখা। আল্লাহ এবং অন্যান্য মুমিনদের সামনে বিনয় অবলম্বন করা। সে সকল বান্দাদের মাঝে নিজেকে সবচেয়ে ছোট ভাববে। কোন অহঙ্কার করবে না। কারো সঙ্গে প্রতারণা করবে না। পিতা-মাতার সঙ্গে বিনয় আচরণ করবে এবং তাদের সঙ্গে সদাচরণ করবে। সবসময় তাদের সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি থাকবে。
كنوز قارون কারুনের সম্পদ
বনী ঈসরাইলে ক্বারূন নামে এক লোক ছিল। লোকটি ছিল প্রচুর অর্থ- বৈভবের অধিকারী সবচেয়ে বড় সম্পদশালী। আল্লাহ তা'আলা তাকে অঢেল সম্পদের মালিক বানিয়েছিলেন। যা তার অন্যান্য গুণকেও ছাপিয়ে উঠেছিল। শক্তিশালী পুরুষের একটি দল মিলেও তার মহা মূল্যবান ধনভাণ্ডারের চাবিগুলো বহন করতে সক্ষম হত না。
কিন্তু সে তার এই নেয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের পরিবর্তে অহঙ্কার করত। যখনই আল্লাহ তা'আলা তাকে সম্পদ বৃদ্ধি করতেন সে জুলুম করত। দিনে দিনে তার এই অহঙ্কার বেড়েই চলল。
ক্বারূন দরিদ্র ও অসহায় লোকদের সঙ্গে ভাল আচরণ করত না। একদিনও সে আল্লাহ তাআলার এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে নি। এমনকি কারো কোন উপদেশই সে গ্রাহ্য করত না। যখন কেউ তাকে আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্বরণ করিয়ে দিত এবং তার উপর আল্লাহর দয়ার কথা মনে করিয়ে দিত, সে তাকে তিরষ্কার করত। অহঙ্কারীর মত তার দিকে তাকাত আর বলত,
'আমার উপর কারো কোন অনুগ্রহ নেই। এই সব সম্পদ আমি আমার বুদ্ধি ও পরিশ্রম দিয়ে অর্জন করেছি।'
ফলে আল্লাহ তা'আলা তাকে এই অস্বীকার ও আত্মম্ভরিতার কারণে ধ্বংস করে দিলেন। সে এবং তার বিশাল প্রাসাদ জমিনে দেবে গেল। তার সমস্ত ধন সম্পদ মাটির গহ্বরে হারিয়ে গেল। যুগে যুগে তার এই ঘটনা মানুষের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকল।
📄 আর রা'ফী
আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন। কাউকে উচ্চ মাকাম দান করেন আর কাউকে দান করেন অঢেল সম্পদ। কিংবা কাউকে দেন ইলম ও আল্লাহর মা'রেফাত। আর তিনি নেক বান্দাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে দান করবেন সর্বোচ্চ স্থান। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
‘আর তিনি তোমাদেরকে বানিয়েছেন দুনিয়ার প্রতিনিধি। আর তোমাদের পরস্পরকে পরস্পরের উপর মর্যাদা দিয়েছেন যেন তিনি পরীক্ষা করতে পারেন তোমাদেরকে তিনি যা দিয়েছেন সে ব্যাপারে।’ (সূরা আনআম - ১৬৫)
আল্লাহই রাজাদেরকে উচ্চকিত করেছেন জনগণের ওপর। শাসকবর্গকে প্রজাদের ওপর। ধনীদেরকে গরিবদের ওপর। পৃথিবীর শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই তিনি এসব করেছেন। তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন স্তরে রেখেছেন মূলত পরীক্ষা করার জন্যে। আমরা যদি আল্লাহর এঁকে দেয়া সেই সীমারেখা মেনে চলি, তার ওপর বিশ্বাস ধারণ করি তাহলে পরকালে আমাদের মুক্তি পেতে কোনো বাঁধা থাকবে না。
মানুষ যদি আল্লাহর এ নাম স্মরণ রাখে তাহলে সে কারো সঙ্গে প্রতারণা করবে না। কোনো প্রজা তার কর্তার সঙ্গেও প্রতারণা করবে না। কোনো ব্যক্তি তার সম্পদের সঙ্গেও প্রতারণা করবে না। বরং সে মানুষের সঙ্গে বিনম্র আচরণ করবে। তাদের সেবা ও প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকবে。
يوسف واخواته
ইউসুফ আ. ও তার ভাইদের ঘটনা
ইউসুফ আ. এর ভায়েরা তার প্রতি খুব হিংসে করত। যেহেতু তাঁর বাবা হযরত ইয়াকুব আ. তাকে বেশী ভালবাসতেন। তারা মনে করত তাদের পিতা ইউসুফ আ.-কে তাদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছেন। তখন শয়তান তাদের অন্তরে ধোঁকা দিল যেনো ইউসুফ আ.কে দূরে মরুভূমিতে ফেলে রেখে আসে。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ইউসুফ আ. এর সুরক্ষার দায়িত্ব নিলেন। তিনি ইউসুফ আ. এর কাছে এক ব্যবসায়ী কাফেলাকে পাঠিয়ে দিলেন। তারা মিসরের দিকে যাচ্ছিল। তারা ইউসুফ আ. কে মরুভূমির এক গভীর কূপ থেকে তুলে নিলো এবং মিসরের বাদশাহর কাছে বিক্রি করে দিল। ফলে ইউসুফ আ. বাদশাহর প্রাসাদে দীর্ঘদিন কাটালেন। এমনকি একদিন বাদশাহর স্ত্রীর ক্রোধ তার উপর এসে পড়ল। তখন বাদশাহ ইউসুফ আ. কে অন্যায়ভাবে জেলে আটকে রাখলেন。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা হযরত ইউসুফ আ.কে মর্যাদা দান করলেন ওই সকল লোকের ওপর; যারা একদিন তার উপর জুলুম করেছিল। তিনি জেল থেকে মুক্তি লাভ করলেন। এক পর্যায়ে মিসরের বাদশার প্রভাবশালী মন্ত্রী হলেন। যখন তার ভাইয়েরা মিসরে এলো তিনি তাদেরকে দেখেই চিনে ফেললেন। তাদেরকে তিনি ক্ষমা করে দিলেন। তারাও ইউসুফ আ. এর কাছে নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিল। ফলে তারা ইউসুফ আ. এর অনুগ্রহে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করল。
📄 আল মুইজ্জ
আল মুয়িয্যু হলেন সেই সত্তা যিনি তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে মর্যাদা দান করেন। যদিও তারা দরিদ্র হয়। আল্লাহভীরুদেরকে মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন যদিও তারা দুর্বল হয়। হক ও সত্য কথাকে দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত করেন। কিয়ামত দিবসে গুনাহগার ও অপরাধীদের থেকে মুমিনদেরকে তিনি স্বাতন্ত্র দিয়ে মর্যাদায় ভূষিত করবেন। তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশে সম্মানিত করবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
হে নবী! আপনি বলুন- হে আল্লাহ! আপনিই রাজত্বের মালিক। যাকে ইচ্ছা আপনি রাজত্ব দান করেন আর যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। আপনার হাতেই সব। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। • (সূরা আলে ইমরান - ২৬)
আল্লাহর আনুগত্য, অল্পেতুষ্টি ও তার সন্তষ্টি অর্জনের মধ্যেই সকল সম্মান নিহিত। গুনাহ এড়িয়ে চলাই আল্লাহর আনুগত্য। সুতরাং যে ব্যক্তি নাফরমানীর মাঝে সম্মান তালাশ করে আল্লাহ তাআলা তাকে অপমানিত করেন। আর যে ব্যক্তি লোভ পরিত্যাগ করে এবং হালাল উপার্জন ও নেক আমলের মধ্যে নিজেকে লিপ্ত রাখে, আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানে ভূষিত করেন。
الأمير عمار আম্মার রা. যখন শাসনকর্তা
হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.। তিনি ছিলেন প্রথমসারির মুসলমান। ইসলাম ত্যাগ করার জন্য তাঁকে, তাঁর পিতা ইয়াসির, তাঁর মা হযরত সুমাইয়া রা. মক্কার মুশরিকরা পাশবিক নির্যাতন করেছিলো। তবুও তারা ছিলেন ধৈর্য্যশীল। ইসলামের উপরই অটল থাকলেন। ফলে তাদের উপর মুশরিকদের নির্যাতন ও ক্ষোভ বেড়েই চলল। বিশেষকরে আবু জাহল। সে হযরত সুমাইয়া রা.-কে তাঁর সন্তানের চোখের সামনেই বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। তারা হযরত আম্মার রা. ও তার পিতা ইয়াসির রা.-এর উপর নির্যাতন করতেই থাকল। একদিন তার পিতাও শহীদ হয়ে গেলেন。
কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আম্মার রা.-কে সম্মানিত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মার রা.-এর ব্যাপারে বললেন, 'যে ব্যক্তি আম্মারের সঙ্গে শত্রুতা করবে আল্লাহ তা'আলাও তার সঙ্গে বৈরী আচরণ করবেন। আর যে আম্মারের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ তা'আলাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করবেন।'
হযরত উমর রা.-এর খেলাফতের সময় হযরত আম্মার রা. কুফার গভর্নর নিযুক্ত হলেন। কিন্তু এতে তাঁর বিনয় আরো বেড়ে গেল। তিনি নিজের প্রয়োজন নিজ হাতেই মেটাতেন। ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তিনি বাজার থেকে ক্রয় করে নিজের পিঠের ওপর বহন করে নিয়ে আসতেন。