📄 আল মুহাইমিন
‘আল মুহাইমিন’ হলেন, এই আসমান ও জমিনের কোন কিছুর জ্ঞানই যার অজ্ঞাত নয়। তিনি তার বান্দাদের দেখাশোনা করেন। তাদের কাছে রিযিক পৌঁছান। নিজ অনুগ্রহ ও দয়ার মাধ্যমে তাদের কোলে তুলে নেন। তিনি সবসময় তাঁর বান্দাদের কাছেই থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাদের আমলের প্রতি নজর রাখেন। একসময় তিনি তাদের কাছ থেকে সেগুলোর হিসেব নেবেন। তাই তিনি বান্দাকে শরীয়ত দিয়েছেন। যাতে তাদের জীবন সুশৃঙ্খল হয়। শরীয়ত দিয়ে তিনি যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী ও রাসূল。
মানুষ যখন এই নামের কথা তার অন্তরে ও তার মনোজগতে লালন করবে, সে যখন জানবে যে, আল্লাহ তা’আলা তার প্রতিটি আমল দেখছেন তখন সেও আল্লাহকে দেখতে পারবে এবং তার আনুগত্যে মশগুল থাকবে। এভাবে সে গোপন ও প্রকাশ্য; সর্বত্রই আল্লাহকে ভয় করবে。
الله يراني আল্লাহ আমাকে দেখছেন
সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ তুসতারী নামে এক ছোট্ট বালক ছিল। সে তার মামাকে প্রচুর ইবাদত করতে দেখত। তাই সে তার মামাকে পর্যবেক্ষণ করত এবং তার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। মামা ভাবলেন তাকে কিছু শেখানো দরকার এবং (দীনের ব্যপারে) কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া দরকার। তাই তিনি একদিন সাহলকে বললেন -
তুমি সবসময় অন্তরে এ কথা লালন করবে যে, আল্লাহ আমার সামনেই আছেন। তিনি আমাকে দেখছেন। তিনি আমার সঙ্গেই আছেন。
সাহল তার মামার এই কথাগুলো গভীর মনোযোগ সহকারে শুনলো। দীর্ঘদিন সেই কথাগুলো মেনে চলল। একদিন তার মামা তার কাছে এসে বললেন -
সাহল! আল্লাহ তা'আলা যাকে দেখছেন, যার সঙ্গে আছেন সেকি কোন গুনাহ করতে পারে?
সাহল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল – নাহ....
মামা তখন অত্যন্ত স্নেহ ও মমতামাখা স্বরে বললেন – এই কথাটি তুমি বাকি জীবন স্মরণ করে চলবে। কখনই নিজের হৃদয়কে আল্লাহ থেকে উদাসীন করে রেখো না।
📄 আল আযীয
‘আল আযীয’- যার কোনো দৃষ্টান্ত নেই। যিনি বিজয়ী। যার উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা কারো নেই। সৃষ্টিজীব তার মুখাপেক্ষী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন。
মানুষের উচিৎ সেই আল্লাহর কাছে নিজেকে সোপর্দ করা। আল্লাহ ছাড়া সে অন্য কারো বশ্যতা স্বীকার করবে না। তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করবে না। মানুষ নিজের সম্মান খুঁজে পাবে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও তাঁর নৈকট্য হাসিলের মাঝে। তাই বান্দা আল্লাহর জন্যই বিনয় অবলম্বন করবে। তাঁকে যেন অহঙ্কার ও সৃষ্টিজীবের কারো উপর প্রবঞ্চনা গ্রাস না করে।
انا ذاك الرجل আমিই সেই লোক
এক ব্যক্তি হজ্বে গেল। সে তওয়াফ করা অবস্থায় দেখল, এক ব্যক্তিকে ঘিরে রয়েছে প্রচুর সংখ্যক লোক। সেখানে জড়ো হয়েছে অনেক গোলাম ও খাদেম। তারা তার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। তার এই অহঙ্কার দেখে সে বড়ই আশ্চর্য হল। কাবাঘরের সামনে সে নিজের বড়ত্ব দেখাচ্ছে! অথচ হজ্বও পালন করছে!
লোকটি হজ্ব সেরে বাড়িতে ফিরে আসল। এভাবেই কেটে গেল অনেক বছর। একদিন সে রাস্তায় তালিযুক্ত কাপড় পরিহিত এক ফকিরকে দেখতে পেলো। সে রাস্তায় চলাচলকারী লোকদের কাছে গিয়ে গিয়ে ভিক্ষার হাত পাতছে। যখন সে ফকিরের নিকটে গেল তখন প্রচণ্ড বিস্মিত হলো। খুবই হতবাক হলো। নির্বাক তাকিয়ে থাকল ফকিরের দিকে। তখন ফকির তার দিকে না তাকিয়েই বলল-
তুমি মনে হয় আমাকে সেই লোক মনে করছ যাকে অনেক বছর আগে তাওয়াফের সময় দেখেছিলে। হ্যাঁ, আমিই সেই ব্যক্তি। আমি এমন জায়গায় অহঙ্কার করেছিলাম যেখানে মানুষ বিনয়ী হয়। তাই আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন স্থানে নামিয়ে দিলেন, যেখানে মানুষ চূড়ান্ত অপমান-অপদস্থ হয়।
📄 আল জাব্বার
'আল জাব্বার'- তিনি তাঁর বান্দাদের অবস্থা সংশোধন করেন। নিজ কুদরতে তাদের চাহিদা পূরণ করেন। তাদের দুআ কবুল করেন ও প্রয়োজন পূরণ করেন。
জাব্বারের আরেকটি অর্থ হল - যার রাজত্ব থেকে কেউ বের হতে পারে না। যার ইচ্ছাই তার সৃষ্টির মাঝে বাস্তবায়ন হয়。
সুতরাং যে ব্যক্তি জানবে যে, একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জাব্বার। তিনিই দুর্বলকে সবল করেন। তিনিই প্রত্যেক জালেমের উপর কর্তৃত্বকারী, সেই ব্যক্তির অন্তর থেকে সব রকমের দুশ্চিন্তা দূরীভূত হয়ে যাবে। তার দুঃখ লাঘব হয়ে যাবে। সে লাভ করবে অনাবিল প্রশান্তি। কোন কাজেই সে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কথা চিন্তা করবে না। বিপদ-আপদে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছেই কোন আশা করবে না。
صاحب المزرعة শষ্যক্ষেতের মালিক
এক ধনী বৃদ্ধ লোক ছিল। অনেক দরিদ্র কৃষক তার অধীনে কাজ করত। কিন্তু লোকটি ছিল খুব অত্যাচারী। তার স্বভাব ছিলো খুবই রুক্ষ। সে শষ্যক্ষেতে কৃষকদের উপর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কষ্টকর কাজ চাপিয়ে দিত。
তার এক ছেলে ছিল। ছেলেটি ছিলো তার বাবার সম্পূর্ণ বিপরীত। ছেলেটি ওই কৃষকদেরকে মন থেকে ভালোবাসত। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। বিপদে-আপদে তাদেরকে দান করত, তবে খুবই গোপনে, যাতে করে তার বাবা জানতে না পারে。
একদিন ছেলেটি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। এমনকি মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। তার কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন কিডনি স্থাপন করা আবশ্যক। বাবার একটিই চিন্তা, ছেলেকে সুস্থ করে তুলতে হবে। বাবা দ্রুত ছুটল পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে। কোন দুর্ঘটন ঘটার আগেই কে দিবে তার ছেলেকে একটি কিডনী? তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতেই হবে。
কিন্তু কেউ এগিয়ে এল না। এদিকে ছেলেটি দিন দিন শুকিয়ে যেতে লাগল। তার সুস্থতার আশা ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসল。
একটি চমক অপেক্ষা করছিল বাবার জন্য। একদিন সে ছেলেকে দেখতে আসল। তখন সে দেখতে পেলো যে, ওই কৃষকদের একজন একটি কিডনী তাকে দিয়ে দিয়েছে। এমনকি কৃষকরা সেচ্ছায় তাকে কিডনী দেয়ার জন্য পরষ্পরে প্রতিযোগিতা করছে। এমনকি তারা এর জন্য কোন প্রতিদান নিতেও রাজি নয। তখন, তিনি বুঝতে পারলেন যে, তারা ওকে খুবই ভালোবাসে। কারণ সেও তাদেরকে ভালবেসেছিল।
এটা শুনে ছেলেটির বাবা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাল। তাদের কাছে ক্ষমা চাইল। লজ্জা ও অনুশোচনায় তার দু' গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। এরপর থেকে সবাই শষ্যক্ষেতে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে লাগল। একে অপরকে ভীষণ সাহায্য-সহযোগিতা করে। যেন তারা প্রত্যেকেই এই শষ্যক্ষেতের মালিক।
📄 আল মুতাকাব্বির
আল মুতাকাব্বির
মুতাকাব্বির শব্দের অর্থ হল-
আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির যাবতীয় গুণাবলী থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি সবধরনের দোষ-ত্রুটি থেকেও মুক্ত। সৃষ্টিজীবের দুর্বলতা থেকে অনেক উচ্চে। আল্লাহ তা'আলা একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি একক সত্তা। তার কোন দৃষ্টান্ত নেই। নেই কোন সমকক্ষ。
আর মানুষের ক্ষেত্রে তাকাব্বরের অর্থ হল -
আত্মপরিচয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যার কারণে নিজেকে অন্যের থেকে বড় মনে হয়। নিজেই নিজের কাজের উপর গর্ববোধ করে। অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। পরিশেষে মানুষের উপর অন্যায় ও জুলুম করতে থাকে。
مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ الله যে ব্যাক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (আল হাদীস)
বিনয়ের এক অসাধারণ গল্প শোন...
ইসলামের পঞ্চম খলীফা হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহ.। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ বিনয়ী বাদশাহ। একদিন তার কাছে তার এক বন্ধু আসল। লোকটি ছিলো বাদশাহর অন্যতম উপদেষ্টা। তিনি তার পরামর্শগুলো গভীর মনোযোগের সঙ্গে গ্রহণ করতেন। লোকটি বলল-
আপনার ছেলে একটি আংটি ক্রয় করেছে, যার মধ্যে অতি মূল্যবান একটি পাথর রয়েছে। আংটিটির মূল্য প্রায় এক হাজার দিনার হবে。
এ কথা শুনে খলীফার চেহারায় চিন্তার ছাপ দেখা দিল। ক্রমশ সেখানে ক্রোধের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি তৎক্ষণাৎ ছেলেকে ডেকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বললেন-
শুনলাম তুমি এক হাজার দিনার দিয়ে একটি আংটি ক্রয় করেছ? সেটা এখুনি বিক্রি করে দাও। সেই টাকা দিয়ে এক হাজার ক্ষুধার্তকে খাওয়াও। আর একটি লোহার আংটি ক্রয় করে নাও। সেই আংটিটির উপর লিখবে- 'আল্লাহ তা'আলা ঐ ব্যক্তির উপর দয়া করেন যে নিজের মূল্য বুঝে'।