📄 আল মালিক
‘আল মালিক’-এর অর্থ, যিনি সবকিছুর অধিপতি। যিনি সার্বভৌম একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, অথচ সবাই তাঁর-ই মুখাপেক্ষী। যিনি গোটা রাজত্বের অধিকারী। কাজেই জীবন, মরণ, পুনর্জীবন; সবকিছু একমাত্র তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর-ই নির্ভরশীল。
কাজেই যিনি এ কথা বুঝতে সমর্থ হবে যে, সবকিছুর একমাত্র আল্লাহই মালিক, তার কর্তব্য হবে, সর্বক্ষণ শুধু তাঁর কথাই স্মরণ করা। শয়নে-জাগরণে তাঁরই ধ্যান করা। কেননা প্রদান ও প্রত্যাহারের একমাত্র মালিক আল্লাহ。
মালিকের গোলাম
প্রখ্যাত সাধক শাকীক বালখী রহ.। তাঁর নাম তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছো। প্রথম জীবনে তিনি ততোটা আল্লাহমুখী ছিলেন না। সবসময় দুনিয়ার কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর সময়ে একবার দেশে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দু' মুঠো অন্ন জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। অভাব-অনটনের কারণে মানুষের মুখ থেকে হাসি মুছে গিয়েছিলো। আগত দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা নিয়ে লোকদের দুশ্চিন্তার অন্ত ছিলো না。
তখন শাকীক রহ. এক যুবককে দেখলেন সে সুখে স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করছে। অথচ মানুষের দুর্দশা তখন চরমে উঠে গেছে。
তিনি তখন যুবককে বললেন, তোমার এই প্রফুল্লতা কেন? তুমি কি মানুষের দুঃখ ও বিপদ দেখতে পাচ্ছ না?
যুবকটি উত্তরে বলল, কেন আমি চিন্তা বোধ করব অথচ আমার মালিকের রয়েছে বড় একটি গ্রামের মালিকানা?
যুবকের কথা শাকীক রহ. এর হৃদয়ে ভীষণ ভাবে আলোড়ন করল। তার চিন্তার মাঝে প্রভাব বিস্তার করল এবং তার ঘুমকে কেড়ে নিল। অত:পর গাফলত থেকে তিনি জেগে উঠলেন। তাঁর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ল বাস্তবতা, যার থেকে এতদিন ছিলেন উদাসীন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে তাওবা করলেন। এবং বললেন, এই যুবকতো এক মাখলুকের গোলাম। অথচ সে কত সুখী! কোন চিন্তায়ই তার মনে রেখাপাত করছে না। কেননা তার মালিকের রয়েছে একটি গ্রাম। তাহলে আমি কেন চিন্তিত হব অথচ আল্লাহ আমার রব। যিনি এই মহা বিশ্বের মালিক!
📄 আল কুদ্দূস
'আল কুদ্দুস' এর অর্থ- যিনি পবিত্রতার গুণে গুণান্বিত। দোষ-ত্রুটি এবং দুর্বলতা থেকে মুক্ত। যিনি মানবীয় গুণাবলীর থেকে অনেক ঊর্ধ্বে。
যে ব্যক্তি এই নামটির মর্মার্থ বুঝতে সক্ষম হবে তার জন্য করণীয় হল সে নিজেকে সব রকমের দোষ-ত্রুটি ও গুনাহ থেকে মুক্ত রাখবে। হারাম থেকে দূরে থাকবে। ছোট ছোট গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে চেষ্টা করবে。
سر الفيروس المدمر ধ্বংসাত্মক গোপন ভাইরাসের রহস্য
ঘড়ির কাটা ভোর চারটার ঘরটিও অতিক্রম করেছে। নিরব নিস্তব্ধ প্রকৃতি। রাতের নির্জনতা ক্রমশ গাঢ় হয়ে একটু একটু করে ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। মাহির তার বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে মাত্র। তার চেহারায় আনন্দ আর বিজয়ের রেখাগুলো চিকচিক করছে। সে তার কয়েকজন বন্ধুর কম্পিউটার থেকে মেসেঞ্জার হ্যাক' করে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং তাদের কম্পিউটারগুলোতে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। সে এই কাজ প্রায় করে থাকে。
কাজটি করে সে খুবই আনন্দ পায়। যদিও তার এই আনন্দের কারণে তাদের অনেক ক্ষতি হয়। তাদের কম্পিউটারে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। তাদের জরুরী ফাইলগুলো নষ্ট হয়ে যায়。
আজকেও মাহির তার পরিচিত কয়েকজনকে বিশেষ ভাইরাসটি পাঠিয়েছে ই-মেইলের মাধ্যমে। ভাইরাসটি তৈরী করে তাদের আইডিতে পাঠাতে পাঠাতে অনেক রাত হয়ে গেল। কাল যখন তার বন্ধুরা তাদের কম্পিউটারের ইমেইল ওপেন করবে সাথে সাথে তাদের কম্পিউটারের ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়বে। সেটা চিন্তা করে মুচকি হাসতে হাসতে মাহির অনেক রাতে বিছানায় গেলো। কিন্তু আজ তার ঘুম আসছে না। সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে এপাশ ওপাশ করছে। সম্ভবত এখন তার বিবেক অপরাধবোধে তাড়িত হচ্ছে। বন্ধু-বান্ধবদের উপর একটি নীরব দুঃখ অনুভব করছে। অনুশোচনা তাকে ঘিরে ফেলেছে। সে ঘুমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল。
ফজরের সময় হয়ে এল। হঠাৎ সে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল। তার ঘরের দিকেই আসছে সেই আওয়াজ। সে দরজার কপাট খোলার আওয়াজ পেল। মাহির এগিয়ে গেল। দরোজার ফাক গলে সে দেখতে পেলো তার বড় ভাই মাহমুদকে। জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য তাকে ডাকতে এসেছে। দু' ভাইয়ের দৃষ্টি বিনিময় হল। সেই দৃষ্টিতে সৌহার্দ্য ছিল। ছিল খানিকটা নীরব তীরষ্কার। মাহমূদ একটিও শব্দও বলল না। শুধু ছোট ভাইয়ের কাঁধে স্নেহের হাতটি রেখেই দ্রুত সিড়ি দিয়ে নেমে গেল। মাহির বিস্ফারিত নেত্রে কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইল। প্রচণ্ড লজ্জা ও অনুশোচনা তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। বেশী সময় নিল না সে। সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটি বন্ধ করে মসজিদের দিকে রওয়ানা হল। জামাত ধরতে হবে。
নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে এল মাহির। এসেই প্রথম যে কাজটি সে করল, সেটা হল সে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। তাদেরকে সতর্ক করে দিল যেন তারা তাদের ইনবক্সে পাঠানো ফাইলগুলো না খোলে। কেননা সেগুলো খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যাবে তাদের কম্পিউটার। অতপর সে দ্রুত সেগুলো দূর করে দিল, যেন বন্ধুদের জরুরী ফাইলগুলো নিরাপদ থাকে。
টিকাঃ
১. (গোপনে আরেকজনের ফাইলে ঢুকে তার সমস্ত তথ্য নিয়ে নেওয়া এবং অন্যের একাউন্ট নিজের দখলে নিয়ে নেয়াকে হ্যাকিং বলে)। -অনুবাদক
📄 আস সালাম
'আস সালাম' শব্দের অর্থ হল- যিনি তাঁর বান্দাদের সমস্ত পেরেশানি থেকে শান্তি দান করেন। যিনি তাদেরকে নিরাপদ রাখেন। যিনি তাদেরকে পরিত্রাণ ও নিষ্কৃতি দিয়ে থাকেন। পরিপূর্ণ গুণাবলী সম্পন্ন হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা নিজেই সালাম। সৃষ্টিজীবের মাঝে যে সমস্ত দোষ ও দুর্বলতা রয়েছে তিনি সেগুলো থেকে মুক্ত。
বান্দার ক্ষেত্রে আস-সালাম শব্দের অর্থ হলো- গোপন ও প্রকাশ্য সর্বপ্রকার গুনাহ ও অপরাধ থেকে দূরে থাকা। শিরক, নেফাক, সন্দেহ ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে দূরে থেকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা। কাউকে কষ্ট না দেওয়া। কেননা মুসলমান তো ঐ ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে。
صلح الحديبية হুদায়বিয়ার সন্ধি
ষষ্ট হিজরীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ শরীফ তাওয়াফ করার ইচ্ছে করলেন। তিনি ১৫০০ সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। কুরাইশরা সেই আগমন সংবাদ জানতে পেরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আলোচনা করার আবেদন করল। আলোচনা শেষে একটি নিরাপত্তা চুক্তি করতে চাইল। চুক্তির শর্তগুলো হলো
১। সন্ধিটি কুরাইশ এবং মুসলমানদের মাঝেই হবে。
২। মুসলমানরা এ বছর মদীনায় ফিরে যাবে। সামনের বছর মক্কায় আসতে পারবে。
৩। কেউ মুসলমান হয়ে মদীনায় চলে গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মক্কায় ফিরিয়ে দিবেন; কিন্তু মদীনা থেকে কেউ মক্কায় চলে এলে কুরাইশরা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়।
এছাড়াও আরো কিছু শর্ত ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকাঙ্ক্ষা ছিল ব্যাপকভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। তাই তিনি কুরাইশদের শর্তগুলো মেনে নিলেন। যদিও এর মধ্যে বাহ্যত মুসলমানদের জন্য অপমান জনক ছিল। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ছিল যে, প্রত্যেকের মিত্রগোত্রগুলোও এ চুক্তির মধ্যে শামিল থাকবে। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক মুসলমানকে মক্কায় ফিরিয়ে দিলেন যারা মুশরিকদের অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন。
মদীনা থেকে মক্কায় ফেরত পাঠানো সেই সাহাবীরা অবশেষে নিরূপায় হয়ে মক্কা থেকে দ্বিতীয়বার পলায়ন করতেন। তারা বিভিন্ন বন-জঙ্গলে আত্মগোপন করে কুরাইশদের বাণিজ্যবহরের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা করতেন। তাদের সেই বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমণের কারণে কুরাইশরা ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন হতে লাগলো। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেরাই চুক্তির ধারাগুলো প্রত্যাহার করে নিলো। তারা বললো, এখন থেকে যারা মক্কা থেকে মদীনায় চলে আসবে, তাদের আর মক্কায় ফেরত পাঠানোর প্রয়োজন নেই। এভাবে ওই চুক্তিটি চূড়ান্ত পরিণতিতে মুসলমানদের জন্য বিজয় বয়ে নিয়ে এলো। উক্ত চুক্তির মাত্র দু' বছর পর মুসলমানরা বিনা রক্তপাতে, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে মক্কা বিজয় করেন。
📄 আল মু'মিন
‘আল মু’মিন’ এর অর্থ হল- যিনি তাঁর বান্দাদেরকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দান করবেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে নিরাপত্তা দেন। তিনি তাকে শয়তান থেকে, গুনাহ থেকে, পাপ কাজে ডুবে যাওয়া থেকে নিরাপত্তা দান করেন। এগুলো হচ্ছে, দুনিয়াতে আল্লাহর নিরাপত্তা দান। আর কিয়ামত দিবসে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন জাহান্নামের আগুন থেকে。
আল্লাহ তা’আলা নিজের নাম আল-মু’মিন রেখেছেন। যে বান্দা ইখলাছের সঙ্গে তাঁর ইবাদত করে তার নামও রেখেছেন মু’মিন。
عرفت فالزم জানতে যখন পেরেছ, এখন লেগে থাক
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হারেছ ইবনে মালেক আনসারী রা.কে জিজ্ঞেস করলেন- আজকে তোমার সকাল কেমন হয়েছে?
তিনি বললেন- সত্যিকারের মুমিন অবস্থায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- কী বলছ ভেবে দেখ। সবকিছুরই বাস্তবতা থাকে। তোমার ঈমানের বাস্তবতা কী?
তিনি বললেন- আমার অন্তর দুনিয়াবিমুখ হয়ে গেছে। তাই আমি রাত্রি জাগরণ করি। আর দিবসে রোজা রাখি। যেন আমি আমার রবের আরশ সামনেই দেখতে পাচ্ছি। যেন আমি জান্নাতবাসীদেরকে দেখছি তারা সেখানে ঘুরাফেরা করছে। জাহান্নামীদেরকেও দেখছি, তারা সেখানে যন্ত্রনাদায়ক আর্তচিৎকার করছে。
তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হে হারেছ! জানতে পেরেছ এখন লেগে থাকো। (তাবরানী)