📄 ‘ওয়ালা-বারা’র পরিচয় ও প্রকারভেদ
'ওয়ালা' শব্দের অর্থ হলো: বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, দেখাশোনা করা, পাশে থাকা, মৈত্রীবদ্ধ হওয়া, সহায়তা করা, দায়িত্ব নেওয়া, অনুসরণ করা, তত্ত্বাবধান করা, সুখে-দুঃখে পাশে থাকা। এখান থেকে 'ওলি' শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে, যার অর্থ—বন্ধু, অভিভাবক ইত্যাদি। প্রথম অর্থে কুরআনে মুমিনদের আল্লাহর 'ওলি' বলা হয়েছে। [ইউনুস: ৬২] আবার দ্বিতীয় অর্থে আল্লাহকে মুমিনদের 'ওলি' বলা হয়েছে। [বাকারা: ২৫৭] মাওলা শব্দটিও উক্ত শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ—বন্ধু, প্রতিপালক, অভিভাবক, মিত্র ইত্যাদি। বিপরীতে 'বারা' শব্দের অর্থ হলো: দূরত্ব, দায়মুক্তি, সম্পর্ক ছিন্ন করা, শত্রুতা রাখা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মতিক্রমে একজন মুমিনের বন্ধুত্ব ও দূরত্ব, ভালোবাসা ও শত্রুতা, মৈত্রী ও সম্পর্কচ্ছেদ—মোট কথা, পৃথিবীর সকলের সঙ্গে তার সম্পর্কের মানদণ্ড হবে শরিয়ত। সে কাউকে ভালোবাসলে আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে, কাউকে ঘৃণা করলে আল্লাহর জন্য করবে, কাউকে সাহায্য করলে আল্লাহর জন্য করবে, আবার কারও সঙ্গে শত্রুতা রাখলে আল্লাহর জন্য রাখবে, কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহর জন্য করবে। অর্থাৎ তার ভালোবাসা ও শত্রুতা কেবল আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দ্বীনের জন্য হবে, নিজের পার্থিব ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য নয়।
ওয়ালা-বারার ক্ষেত্রে মুসলমানরা সকল মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করবে:
এক. শুধু ওয়ালা, তাদের সঙ্গে বারা নেই। তারা হচ্ছে হকের উপর অবিচল মুসলমান তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত। তাদের সর্বোতভাবে এবং নিঃশর্তে ভালোবাসবে; তাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখবে না। [মায়িদা: ৫৬-৫৬, তাওবা: ৭১]
দুই. ওয়ালা এবং বারার সমন্বয় করবে। তারা গুনাহগার মুসলমান ও আহলে বিদআত। তাদের ইসলাম, ঈমান ও পুণ্যের কারণে তাদের ভালোবাসবে। যেসব ক্ষেত্রে তারা হকের উপর, সেসব ক্ষেত্রে তাদের মহব্বত করবে, সহায়তা করবে, তাদের পাশে দাঁড়াবে; আর যেসব ক্ষেত্রে তারা ভুলভ্রান্তির শিকার, সেসব ক্ষেত্রে তাদের সতর্ক করবে, দাওয়াত দেবে, প্রয়োজনে সে ক্ষেত্রে বারার পথে হাঁটবে; তবে সামগ্রিক বারা নয়। [সাদ: ২৮, হুজুরাত: ৯]
তিন. স্রেফ বারা, কোনো ওয়ালা নেই। কাফের, মুশরিক, মুরতাদ, নাস্তিক এবং ইসলামের সকল বিরোধী শক্তি। তাদের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে বারা বাস্তবায়ন করবে, সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করবে, শত্রুতা পোষণ করবে; তাদের সঙ্গে কোনো বন্ধুত্ব রাখবে না। [তাওবা: ২৩-২৪, কাহাফ: ৫০, মুজাদালা: ২২] তবে বারার স্তরভেদ রয়েছে— কিছু রয়েছে বিশ্বাস ও হৃদয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আর কিছু হচ্ছে বাস্তবিক ও প্রায়োগিক।
টিকাঃ
১. বুখারি (৬৭৮০); বিস্তারিত দেখুন: মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া (২৬/২২৮-২৩০); ইরশাদুদ তালিব, ইবনে সাহমান (৮-২০)।
📄 কাফেরদের সঙ্গে বারা
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নিজেকে মুমিনদের বন্ধু বলেছেন, বিপরীতে কাফেরদের বন্ধু বলেছেন তাগুত শয়তানকে। আল্লাহ বলেন, 'যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের বন্ধু ও অভিভাবক। তাদের তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে; আর যারা কুফরি করে তাদের বন্ধু ও অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদের আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।' [বাকারা: ২৫৭] ফলে আল্লাহ আর শয়তানের মাঝে যেমন বন্ধুত্ব হতে পারে না, তেমনই মুমিন ও কাফেরের মাঝে বন্ধুত্ব হতে পারে না।
কুরআনের অনেকগুলো আয়াতে মুসলমানদের পরস্পর ভাই-বন্ধু হয়ে থাকতে এবং কাফেরদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করতে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, 'তারা চায় তোমরাও তাদের মতো কুফরি করো, যাতে তোমরা এবং তারা সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে চলে আসে।' [নিসা: ৮৯] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না।’ [নিসা: ১৪৪]
কাফেরকে মুমিনদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা নিষেধ; কারণ সকল কাফের-মুশরিক পরস্পরের বন্ধু। মুমিনদের বিরুদ্ধে তারা একজোট। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদের পথ প্রদর্শন করেন না।’ [মায়িদা: ৫১]
তাই কেবল কাফেরদের বন্ধুত্ব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা নয়, বরং তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা ও তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করাই ইসলামের নীতি। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরেই আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি সদয় হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কারকে ভয় পাবে না।’ [মায়িদা: ৫৪]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসংখ্য হাদিসে ওয়ালা ও বারার কথা বলা হয়েছে। ঈমানের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য ঘৃণা করা।¹ জারির রাজি. যখন রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত নিতে আসেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর বাইয়াত করান: ‘আল্লাহর ইবাদত করবে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে। জাকাত প্রদান করবে। মুসলমানদের জন্য কল্যাণ কামনা করবে। মুশরিকদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে।’²
সালাফ মুমিনদের প্রতি সবচেয়ে সদয় আর কাফেরদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর ছিলেন। আল্লাহ বলেন, 'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের পরস্পরের প্রতি সদয়।' [ফাতহ: ২৯] ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে, আল্লাহর জন্য ঘৃণা করবে, আল্লাহর জন্য সুসম্পর্ক রাখবে, আল্লাহর জন্য শত্রুতা পোষণ করবে, সে আল্লাহর বেলায়াত লাভ করবে। এটা না করা পর্যন্ত কেউ যতই নামাজ-রোজা করুক, ঈমানের স্বাদ পাবে না।'³
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ হচ্ছে এক দেহের মতো, যার কোনো অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা শরীর ব্যথায় ভোগে, বিনিদ্র রাত কাটায়।'⁵ মুমিনগণ ঘরের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে এভাবে ধরে রাখে।⁷ অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলাকে তিনি কুফর এবং কাফেরদের স্বভাব আখ্যা দিয়ে বিদায় হজে বলেন, 'তোমরা আমার পরে কাফেরদের মতো একে অন্যের ঘাড়ে তরবারি ধরো না।'¹¹ বরং মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ থাকার পরে কেউ যদি তাদের সেই ঐক্য নষ্ট করতে চায় এবং বিদ্রোহ করে, তবে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।¹²
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (১৮৮২১); তয়ালিসি (৭৮৩); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩১০৬০)।
২. নাসায়ী (৪১৮৮)।
৩. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, ইবনে রজব (১/১২৫)।
৫. বুখারি (৬০১১); মুসলিম (২৫৮৬)।
৭. বুখারি (২৪৪৬); মুসলিম (২৫৮৫)।
১১. বুখারি (১৭৩৯); মুসলিম (৬৫)।
১২. মুসলিম (১৮৫২); ইবনে হিব্বান (৪৪৪৬); হাকেম (২৬৮০)।
📄 ‘ওয়ালা’ এবং ‘ইহসান’-এর মাঝে পার্থক্য আবশ্যক
প্রশ্ন হতে পারে, কারও প্রতিবেশী, শিক্ষক, সহপাঠী এমনকি যদি আত্মীয়-স্বজন অমুসলিম হয়, তা হলে কি তাদেরও ঘৃণা করবে? সংক্ষেপে উত্তর হলো, না। অমুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা রাখা হবে তাদের কুফরের কারণে; আর সে বিদ্বেষ হবে সমষ্টিগত ও সামগ্রিকভাবে। কিন্তু কারও আত্মীয়-স্বজন যদি অমুসলিম হয়, তবে সে তাদের সঙ্গে তাদের অধিকার প্রদান ও সদাচরণ অব্যাহত রাখবে। [লুকমান: ১৫]¹ ক্লাসের সহপাঠী বা অফিসের সহকর্মী যদি অমুসলিম হয়, তবে সে তাদের সঙ্গে মানবিক সৌজন্যবোধ প্রদর্শন করবে। [মুমতাহিনা: ৮] এটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং দাওয়াহর নিয়তে। তাদের কুফরি বিশ্বাসকে ভালোবেসে নয়।
ইসলামে কাফের-মুশরিকরা অসুস্থ হলে তাদের দেখতে যাওয়া যাবে,² তাদের সঙ্গে উপহার বিনিময় করা যাবে, অমুসলিম প্রতিবেশী/আত্মীয়দের পার্থিব সুখ-দুঃখে অংশগ্রহণ করা যাবে। ক্ষুধার্ত অমুসলিমকে খাবার দেবে, ঋণগ্রস্তের ঋণ আদায় করবে। তাদের সঙ্গে সুন্দর ও উত্তমরূপে কথা বলবে। অর্থাৎ (হরবি নয় এমন) সাধারণ অমুসলিমদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার ও সদাচরণ করবে।³
আল্লাহ বলেন, 'দ্বীনের ক্ষেত্রে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিয়েছে এবং বের করার কাজে সহায়তা করেছে।' [মুমতাহিনাহ: ৮-৯]¹
কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষ 'বারা' এবং 'মুআমালা বিল হুসনা' দুটোকে গুলিয়ে ফেলে। মানবিক ও দাওয়াতি সীমানা পার করে তাদের শিরকি অনুষ্ঠানে যোগদান করে, যা নিজের বিশ্বাসের দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' নামক স্লোগানটি ইসলামবিরোধী। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মানে নিজেদের ঈমান ও স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া নয়। এমন দেউলিয়াপনা ও ভুয়া সহিষ্ণুতার স্থান নেই ইসলামে।
টিকাঃ
১. বুখারি (২৬২০); মুসলিম (১০০৩)।
২. বুখারি (১৩৫৬); হাকেম (১৩৪৬)।
৩. আল-ফুরুক, কারাফি (৩/১৫); আহকামু আহলিজ জিম্মাহ, ইবনুল কাইয়িম (১/৬০২); ইমদাদুল ফাতাওয়া, থানভি (৪/২৭০-২৭১)।
১. মুমতাহিনাহ: ৮-৯।
📄 ভ্রান্ত মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে ওয়ালা-বারা
উপরে আমরা ওয়ালা-বারার ক্ষেত্রে সকল মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করেছি। ইসলামের অন্তর্ভুক্ত সকল সম্প্রদায় সমান স্তরে নয়—তাদের কেউ সামান্য বিদআতের শিকার, কেউ আকিদার ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিচ্যুতির শিকার। ফলে সকল মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে ওয়ালা-বারার সমান নীতি প্রয়োগ করা যাবে না।
এক. যারা দ্বিতীয় ক্যাটাগরি তথা আমলি বিদআতের শিকার, কিংবা এমন আকিদাগত বিদআতের শিকার যার মাধ্যমে তারা গোমরাহ গণ্য হয় কিন্তু কাফের হয় না। তাদের সঙ্গে ওয়ালা এবং বারা দুই নীতিতেই কাজ করতে হবে। যেমন: 'খারেজি', 'মুতাজিলা', 'কাদারিয়্যাহ', 'জাবরিয়্যাহ', 'মুশাববিহাহ', 'জাহমিয়্যাহ', শিয়া-সহ বিভিন্ন ভ্রান্ত সম্প্রদায়। তাদের ঈমান ও দ্বীনের জন্য মেহনতের কারণে তাদের ভালোবাসবে ও সাহায্য করবে। আর যেসব ক্ষেত্রে তারা ভ্রান্তির শিকার, সেসব ক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতা করবে। ভ্রান্তির ক্ষেত্রে তাদের কোনো সহযোগিতা করবে না। এ কারণেই ইমাম তহাবি রাহি. উপরের দলগুলোকে 'পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত' বলেছেন, কাফের বলেননি।
তবে বিদআত ও আহলে বিদআতের মাঝে পার্থক্য করতে হবে। অনেক সময় ভুল ইজতিহাদ বা অজ্ঞতার কারণে মানুষ বিদআতে লিপ্ত থাকে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা ও তাদের দরদের সঙ্গে বোঝানো কর্তব্য। কিন্তু যখন গোটা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য প্রয়োজন—যেমন কুফর, শিরক, নাস্তিক্যবাদ ও কাদিয়ানি ফিতনার বিরুদ্ধে লড়াই—সে ক্ষেত্রে সকল আহলে কিবলা একযোগে কাজ করবে। সে সময় তাদের বিদআতগুলোকে পেছনে রেখে দ্বীনের সুরক্ষায় এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।
দুই. ইসলামের দাবিদার যেসব ভ্রান্ত ফিরকা সুস্পষ্ট কুফর ও শিরকের মাঝে নিমজ্জিত এবং ইসলাম থেকে খারিজ, যেমন কাদিয়ানি ও বাতেনি (ইসমাইলি, নুসাইরি) সম্প্রদায়, তাদের সঙ্গে কেবলই বারা। কারণ তারা নামে মুসলিম হলেও মূলত ইসলাম থেকে খারিজ। তারা কাফের-মুশরিকদের চেয়েও জঘন্য, যাদের মুনাফিক বলা হয়। ইবনে আবিদিন লিখেছেন, 'তাদের সঙ্গে বিয়েশাদি বৈধ হবে না। তাদের জবাই করা প্রাণী খাওয়া যাবে না।'¹ ফলে তাদের সঙ্গে কোনো ওয়ালা নেই।
কিন্তু তাদের 'আফরাদ' তথা ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে সৌজন্য ও সদাচরণ নিষিদ্ধ নয়। কারণ তাদের মাঝে এমন অনেক সাধারণ মানুষ রয়েছে, যারা আকিদা সম্পর্কে কিছুই জানে না। হুজ্জত কায়েমের আগপর্যন্ত তারা কাফের নয়, বরং মাজুর হিসেবে গণ্য হবে। সে ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বারা নয়, বরং ওয়ালা। এ কারণে তাদের ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে সদাচরণ বৈধ। এবং দাওয়াতের নিয়তে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উত্তম।²
আকিদা সম্পর্কে কিছু অজ্ঞ লোক মনে করে ইসলামই যথেষ্ট; সকল মুসলিম ভাই ভাই; ইসলামের নামে ভেদাভেদ বৈধ নয়। তাদের কথা সঠিক নয়। কেউ যদি ইসলামের উপরই না থাকে, তবে সে মুসলমানদের ভাই হয় না। এসব সম্প্রদায় কাফের-মুশরিকদের চেয়েও ইসলামের জন্য ক্ষতিকর। তাই কেবল নিজে মুসলিম হলেই হবে না, বরং ভ্রান্ত মাজহাবগুলো থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করতে হবে। এ কারণেই ইমাম তহাবি বলেন, 'তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।'
টিকাঃ
১. রদ্দুল মুহতার (৪/১৯৯, ৪/২৪৪)।
২. মাজমুউল ফাতাওয়া (৩/৩৫৩-ষা৩৫৪); দেখুন: আল-ইনসাফ, মারদাভি (১২/৪৮); কিফায়াতুল মুফতি (৯/৩১৪)।