📄 ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা
যেসব শোভা-সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলাম জগতের অন্য সকল ধর্ম থেকে আলাদা, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দিক। ইসলাম ব্যতীত জগতের সকল ধর্ম, সব ধরনের তন্ত্রমন্ত্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা ও প্রান্তিকতার শিকার। কোনো ধর্ম পরকালকে বড় করতে গিয়ে ইহকালকে একেবারে অর্থহীন করে দিয়েছে, আবার কোনো মতবাদ ইহকালকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পরকাল বরবাদ করে দিয়েছে। ইসলাম জগতের সকল ধর্ম ও মতবাদ থেকে ব্যতিক্রম—পরম ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থি একটি দ্বীন। কুরআনে এই ভারসাম্যকে জগতের সকল ধর্মের অনুসারীদের মাঝে মুসলমানদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
وَكَذلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُوْلُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
অর্থ: 'আর এভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থি উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলের জন্য এবং যাতে রাসুল সাক্ষী হন তোমাদের জন্য।' [বাকারা: ১৪৩] ফলে সকল ডানবাম ও বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ির মাঝে ইসলামের অবস্থান।
এটা ইনসাফ, কল্যাণ, আলো, মঙ্গল, বিনির্মাণ, ইতিবাচক ও বিকাশের ধর্ম। সকল অন্যায়, অনাচার, নিপীড়ন, ঠগবাজি, প্রতারণা, অনিষ্ট ও মন্দ দূরীভূতকারী ধর্ম। এখানে সবাইকে সবার অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামের অধিকার ও ভারসাম্যের এই মূলনীতি দুনিয়া ও আখিরাত সকল ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। পুঁজিবাদ-সাম্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র-গণতন্ত্র, ভোগবাদ-বৈরাগ্যবাদ, বস্তুবাদ-অধিবাদ, বুর্জোয়া-সর্বহারা—সকল প্রান্তিকতার মাঝে ইসলামের অবস্থান জীবন ও জগতের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ভিত্তির উপর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হে লোকসকল, তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি (গুলু) করো না। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়েছে।' ১ অন্য প্রসিদ্ধ হাদিসে বলেন, 'তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, ঘৃণা ছড়িয়ো না।' ২ আরেক হাদিসে বলেছেন, (দ্বীনের ক্ষেত্রে) 'তোমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করো। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। তোমাদের আমল কিন্তু তোমাদের জান্নাতে নেবে না।' ৩ হুজাইফা রাজি. বলেন, 'হে কারিগণ, তোমরা অবিচল থাকো; তাতে তোমরা সকলের আগে চলে যাবে। তবে ডানেবামে যেয়ো না; তাতে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির শিকার হবে।' ৪ ৫
টিকাঃ
১. ইবনে মাজা (৩০২৯); মুসনাদে আহমদ (৩৩১০); ইবনে আবি শাইবা (১৪০৯৭); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৭৪২)।
২. বুখারি (৬৯); মুসলিম (১৭৩৪)।
৩. বুখারি (৬৪৬৩); মুসলিম (২৮১৮); তিরমিজি (২১৪১)।
৪. বুখারি (৭২৮২); বাজ্জার (২৯৫৬); আল মুজামুল কাবির, তাবারানি (৮৬৩৩)।
৫. তিরমিজি (৩২৫৩); ইবনে মাজা (৪৮); মুসনাদে আহমদ (২২৫৯৪)।
📄 উদারতার প্রকৃত অর্থ কী?
উদারতা মানে আলো-অন্ধকার সবকিছুকে সমানভাবে গ্রহণ করা নয়। ভারসাম্যের অর্থ সবকিছু গ্রহণ করা, সবকিছুর সঙ্গে গলে যাওয়া নয়। সহিষ্ণুতা মানে জগতের সকল বাদ-মতবাদকে সত্য বলে মেনে নেওয়া নয়। মন্দকে ভালো বলা এবং মিথ্যাকে সত্য বলা কি ইনসাফ? বরং তা ভালো ও সত্যের প্রতি জুলুম। ইসলাম ও অন্য ধর্মকে এক জায়গায় রাখার নাম ন্যায় নয়, বরং ইসলামকে হক এবং অন্যান্য ধর্মকে বাতিল বলাই ন্যায়। সুন্নাহ ও বিদআতের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকা ভারসাম্য নয়, বরং সুন্নাহকে গ্রহণ করে বিদআত বর্জন করাই ইনসাফ। মুমিন ও মুরতাদের ক্ষেত্রে নীরব থাকা ইনসাফ নয়, বরং মুরতাদদের বিরুদ্ধে সজাগ হওয়া এবং ব্যবস্থা নেওয়াই ভারসাম্য। উদারতা মানে ভুলকে ভুল বলা, শুদ্ধকে শুদ্ধ বলা; হককে গ্রহণ করা, বাতিলকে বর্জন করা।
ইমাম তহাবি রাহি. তাওহিদ ও আকিদার ক্ষেত্রে ইসলামের উদারতার উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, 'এই দ্বীন সব ধরনের বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি, 'তাশবিহ'-'তাতিল', 'জবর'-'কদর' এবং অতি আশা-হতাশার মাঝামাঝি মধ্যমপন্থি দ্বীন।' 'তাশবিহ' ও 'তাতিল' মূলত তাওহিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই প্রান্তিকতা। 'তাশবিহ' হচ্ছে আল্লাহকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করা। আর 'তাতিল' হচ্ছে আল্লাহর সিফাতকে (গুণ) নাকচ করে দেওয়া। আহলে সুন্নাত এই দুই প্রান্তিকতার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ আকিদা রাখে। 'জবর'-'কদর' মূলত তাকদিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুই প্রান্তিকতা। 'জবর' হচ্ছে তাকদির স্বীকারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে মানুষকে সম্পূর্ণ পরাধীন মনে করা, আর 'কদর' হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা ও সামর্থ্যের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে মানুষকেই সর্বক্ষমতার অধিকারী ভেবে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদির অস্বীকার করা। আহলে সুন্নাতের অবস্থান হলো এই দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি।
'আশা' ও 'হতাশা'-কেন্দ্রিক আল্লাহর সিফাত, শরিয়ত, ঈমান, দ্বীন ও দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে তিনটি প্রান্তিকতা জন্ম নিয়েছে। খারেজি ও মুতাজিলারা হতাশা বেছে নিয়েছে। তারা কবিরা গুনাহকারীকে জাহান্নামি আখ্যা দিয়েছে। মুরজিয়ারা আশার ক্ষেত্রে প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে। আহলে সুন্নাতের মতে, ঈমান আশা-নিরাশা-ভয়-ভালোবাসা সবকিছু নিয়ে। আল্লাহকে ভালোবাসলেই তার ভয় কিংবা প্রতিদানপ্রাপ্তির কথাকে বর্জন করতে হবে এমন নয়; বরং ভালোবাসা-ভয়-আশা সবগুলো একত্রে নিয়ে পথ চলাই উত্তম। এটাই প্রকৃত ভারসাম্য। উদারতা মানে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মিথ্যাকে বর্জন করা। পরের আলোচনায় এটা আরও স্পষ্ট হবে।