📄 অনৈক্যের কারণ
ঐক্য মুসলিমদের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ, অনৈক্য ধ্বংসের কারণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَরَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَতֵধহَبَ رِيحُكُمْ অর্থ: 'আর তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য করো। পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; তাতে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে।' [আনফাল: ৪৬] ১ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে কুরআন শিখিয়েছেন তার চেয়ে ভিন্নভাবে কুরআন পড়তে দেখে তাঁর কাছে নিয়ে এলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের পড়া শুনে বললেন, 'দুজনেরটাই ঠিক আছে। তোমরা মতভেদ করো না; কারণ তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো মতভেদ করেছে, ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।' ২
তিন দিনের বেশি কোনো মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন রাখাও জায়েজ নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না; তোমরা পরস্পর হিংসা করো না; একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো না। বরং সকলে আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তার (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে তিন রাতের অধিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হালাল নয়।' ৩ ৪
কুরআনে সকল মুমিনকে ভাই ভাই বলা হয়েছে। [হুজুরাত: ১০] অনৈক্যকে কাফেরদের নিদর্শন আখ্যা দিয়ে রাসুলুল্লাহকে সেটা থেকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوْا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ * অর্থ: 'নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে পরিণত হয়েছে, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।' [আনআম: ১৫৯] অন্য আয়াতে কাফেরদের মতো বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করে বলেন, وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوا وَ اخْتَلَفُوْا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ . অর্থ: 'আর তাদের মতো হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তাদের কাছে নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।' [আলে ইমরান: ১০৫]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ হচ্ছে এক দেহের মতো, যার কোনো অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা শরীর ব্যথায় ভোগে, বিনিদ্র রাত কাটায়।' ৫ ৬ ৭ ৮
মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবিরোধী যেকোনো সাম্প্রদায়িক আহ্বানকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলিয়্যাত বলেছেন; সেটাকে দূষিত ও দুর্গন্ধময় বস্তু হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ৯ ১০ বরং অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলাকে তিনি কুফর এবং কাফেরদের স্বভাব আখ্যা দিয়ে জীবনের শেষ লগ্নে বিদায় হজে বলেন, 'তোমরা আমার পরে কাফেরদের মতো একে অন্যের ঘাড়ে তরবারি ধরো না।' ১১ বরং মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ থাকার পরে কেউ যদি তাদের সেই ঐক্য নষ্ট করতে চায় এবং বিদ্রোহ করে (বাগি হয়), তবে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। ১২
টিকাঃ
১. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (১৫/৪৮৯)।
২. বুখারি (২৪১০); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৮০৪০)।
৩. বুখারি (৬০৭৬); মুসলিম (২৫৬০)।
৪. মুসলিম (২৫৬৫); আবু দাঊদ (৪৯১৬)।
৫. বুখারি (৬০১১); মুসলিম (২৫৮৬)।
৬. ইবনে হিব্বান (২৩২)।
৭. বুখারি (২৪৪৬); মুসলিম (২৫৮৫)।
৮. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৪২৭, ১০৪৪৮)।
৯. বুখারি (৪৯০৫); মুসলিম (২৫৮৪)।
১০. সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৮৮০৫); মুসনাদে আহমদ (১৮০১৩)।
১১. বুখারি (১৭৩৯); মুসলিম (৬৫)।
১২. মুসলিম (১৮৫২); ইবনে হিব্বান (৪৪৪৬); হাকেম (২৬৮০)।
📄 কালিমা ঐক্যের চাবিকাঠি
আল্লাহর অনুগ্রহ যে, এই শতধাবিভক্ত উম্মতের জন্য আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে গিয়েও চাইলে মুহূর্তেই আবার এক কাতারে দাঁড়ানোর একটি পথ খোলা রেখেছেন। সেই মূলমন্ত্র হলো 'কালিমা' লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। সালাফের মানহাজে এই কালিমার অর্থ বোঝা ও মানার ক্ষেত্রে উম্মাহ একমত হতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত ঐক্যের স্বপ্ন পূর্ণ হবে। অন্য কথায়, ঈমানের ভিত্তিতে মুসলমানরা একমত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেই শতধাবিভক্ত মুসলিম উম্মাহর পক্ষে আল্লাহর রজ্জুকে এক হয়ে আঁকড়ে ধরা সম্ভব। এর বাইরে কোনো কিছুই মুসলিম উম্মাহকে এক করতে পারবে না।
মুসলিম উম্মাহর ভাষা, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় মাজহাব, তাজকিয়ার তরিকা, আকিদার মানহাজ, চিন্তাধারা, জীবন ও জগতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি সবকিছু ভিন্ন ভিন্ন। এসব ভিন্নতা কখনোই সম্পূর্ণরূপে মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; আবার এসব ভিন্নতাকে ঐক্যের মানদণ্ড বানালে ঐক্য বাস্তবায়ন করাও সম্ভব নয়। ফলে এমন একটা মঞ্চ লাগবে, যে ক্ষেত্রে সকল মুসলিম তাদের ভিন্নতা সহকারেই দাঁড়াতে পারবে; এমন একটা গজল লাগবে, মুসলিম উম্মাহর সবাই তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা সহকারেই দরাজ গলায় যা গাইতে পারবে। আর সেটা হচ্ছে 'কালিমা', কুরআনে যেটিকে 'আল্লাহর রজ্জু' বলা হয়েছে। [আলে ইমরান: ১০৩]
ফলে ফিকহে চার মাজহাব의 অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ একে অন্যের ভাই ভাই হবে। কারণ, চার মাজহাব কালিমার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তাদের মাঝে যেসব বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা রয়েছে, সেগুলো ইসলামের সৌন্দর্য ও বহুমাত্রিক প্রকাশ মাত্র। তাই এই ভিন্নতাকে বিভেদের হাতিয়ার বানানো যাবে না। একইভাবে কালিমার সুবাদে মুসলিম উম্মাহ অসংখ্য রাজনীতিক মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত হওয়ার পরও এক অভিন্ন প্ল্যাটফরমে দাঁড়াতে পারবে; কারণ সেসব দৃষ্টিভঙ্গি কালিমার ভিত্তিতেই তৈরি। এই মূলমন্ত্র মেনে নিলে আকিদার তফসিলি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একাধিক মানহাজে বিভক্ত থাকলেও মূল ঈমানের ক্ষেত্রে সকল মুসলমান পরস্পরকে ভাই মনে করতে পারবে। অর্থাৎ ফিকহ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের মতানৈক্য থাকলেও ঈমান ও তাওহিদের মৌলিক উসুলের ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এই ঐক্যের জন্য সকল মাজহাব-মাশরাব মিটিয়ে দিতে হবে না।
কিন্তু আজ মুসলিমরা কালিমার পরিবর্তে নিজেদের বানানো বিভিন্ন তুচ্ছ বিষয়কে ঐক্যের মানদণ্ড স্থির করেছে। ভাষা, বর্ণ, সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র ভৌগোলিক সীমানা, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, মানবরচিত রাজনীতিক ও সামাজিক মতাদর্শ ইত্যাদি মুসলমানদের ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পার্থিব স্বার্থপূরণই তাদের ঐক্যের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মুসলিমদের ঐক্যে আজ কোনো বরকত নেই, কল্যাণ নেই, পরকালীন মুক্তি ও সাফল্যের কথা নেই। সমাজে হানাহানি ও খুন-খারাবি বাড়ছে, মানুষের সংখ্যা কমছে।
📄 ইসলাম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সবার জন্য একটি জীবনব্যবস্থা মনোনীত করেছেন। তার নাম ইসলাম। আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত সকল নবি-রাসুল, জিন-মানুষ, সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর নির্বাচিত ও তার কাছে গ্রহণযোগ্য জীবনবিধান কেবল ইসলাম। সকল নবি-রাসুলের দ্বীন ও দাওয়াত ছিল ইসলাম। তারা তাদের উম্মতকে ইসলামের দিকে ডেকেছেন। ফলে নুহ আলাইহিস সালামের অনুসারী, মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারী এবং ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারী এ অর্থে সবাই মুসলিম ছিলেন। হ্যাঁ, তাদের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল, কিন্তু দ্বীন একটিই—ইসলাম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের মাধ্যমে অতীতের সকল শরিয়ত রহিত হয়ে গিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ অর্থ: 'নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।' [আলে ইমরান: ১৯] অন্য আয়াতে বলেন, وَমَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ. অর্থ: 'আর যে ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু সন্ধান করবে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গৃহীত হবে না। সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' [আলে ইমরান: ৮৫]
আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সবাইকে মৃত্যুর আগে মুসলমান হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقْتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ. অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।' [আলে ইমরান: ১০২] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।' [মায়িদা: ৩] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যেকোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি আমার কথা শুনতে পায়, তদুপরি আমার উপর ঈমান না আনে, তবে সে জাহান্নামে যাবে।' ১
কেন কুরআনকে সংরক্ষিত করা হয়েছে আর অন্যগুলোকে বিকৃতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে, অথচ সবগুলোই আল্লাহর অবতীর্ণ বাণী? এর উত্তর হলো, কুরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত গোটা বিশ্বজগতের হিদায়াত ও জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ফলে তা সবসময় সুসংরক্ষিত থাকা আবশ্যক। বিপরীতে আগের আসমানি গ্রন্থগুলো নির্ধারিত ভূখণ্ডের নির্ধারিত সম্প্রদায়ের কাছে নির্ধারিত সময়ের জন্য জীবনবিধান হিসেবে অবতীর্ণ করা হয়েছিল। ফলে তা সুরক্ষিত থাকা আবশ্যক নয়।
টিকাঃ
১. মুসলিম (১৫৩); সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর (১০৮৪); বাজ্জার (৩০৫০); তয়ালিসি (৫১১)।
📄 ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা
যেসব শোভা-সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলাম জগতের অন্য সকল ধর্ম থেকে আলাদা, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ দিক। ইসলাম ব্যতীত জগতের সকল ধর্ম, সব ধরনের তন্ত্রমন্ত্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতা ও প্রান্তিকতার শিকার। কোনো ধর্ম পরকালকে বড় করতে গিয়ে ইহকালকে একেবারে অর্থহীন করে দিয়েছে, আবার কোনো মতবাদ ইহকালকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পরকাল বরবাদ করে দিয়েছে। ইসলাম জগতের সকল ধর্ম ও মতবাদ থেকে ব্যতিক্রম—পরম ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যপন্থি একটি দ্বীন। কুরআনে এই ভারসাম্যকে জগতের সকল ধর্মের অনুসারীদের মাঝে মুসলমানদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
وَكَذلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُوْلُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
অর্থ: 'আর এভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থি উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলের জন্য এবং যাতে রাসুল সাক্ষী হন তোমাদের জন্য।' [বাকারা: ১৪৩] ফলে সকল ডানবাম ও বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ির মাঝে ইসলামের অবস্থান।
এটা ইনসাফ, কল্যাণ, আলো, মঙ্গল, বিনির্মাণ, ইতিবাচক ও বিকাশের ধর্ম। সকল অন্যায়, অনাচার, নিপীড়ন, ঠগবাজি, প্রতারণা, অনিষ্ট ও মন্দ দূরীভূতকারী ধর্ম। এখানে সবাইকে সবার অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামের অধিকার ও ভারসাম্যের এই মূলনীতি দুনিয়া ও আখিরাত সকল ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। পুঁজিবাদ-সাম্যবাদ, স্বৈরতন্ত্র-গণতন্ত্র, ভোগবাদ-বৈরাগ্যবাদ, বস্তুবাদ-অধিবাদ, বুর্জোয়া-সর্বহারা—সকল প্রান্তিকতার মাঝে ইসলামের অবস্থান জীবন ও জগতের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ভিত্তির উপর। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হে লোকসকল, তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি (গুলু) করো না। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়েছে।' ১ অন্য প্রসিদ্ধ হাদিসে বলেন, 'তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, ঘৃণা ছড়িয়ো না।' ২ আরেক হাদিসে বলেছেন, (দ্বীনের ক্ষেত্রে) 'তোমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করো। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। তোমাদের আমল কিন্তু তোমাদের জান্নাতে নেবে না।' ৩ হুজাইফা রাজি. বলেন, 'হে কারিগণ, তোমরা অবিচল থাকো; তাতে তোমরা সকলের আগে চলে যাবে। তবে ডানেবামে যেয়ো না; তাতে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির শিকার হবে।' ৪ ৫
টিকাঃ
১. ইবনে মাজা (৩০২৯); মুসনাদে আহমদ (৩৩১০); ইবনে আবি শাইবা (১৪০৯৭); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৭৪২)।
২. বুখারি (৬৯); মুসলিম (১৭৩৪)।
৩. বুখারি (৬৪৬৩); মুসলিম (২৮১৮); তিরমিজি (২১৪১)।
৪. বুখারি (৭২৮২); বাজ্জার (২৯৫৬); আল মুজামুল কাবির, তাবারানি (৮৬৩৩)।
৫. তিরমিজি (৩২৫৩); ইবনে মাজা (৪৮); মুসনাদে আহমদ (২২৫৯৪)।