📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মুসলমানদের ঐক্য অপরিহার্য

📄 মুসলমানদের ঐক্য অপরিহার্য


যেসব বৈশিষ্ট্য ইসলামকে জগতের অন্য সকল ধর্ম থেকে আলাদা করেছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এর অনুসারীদের ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সুদৃঢ় বন্ধনের উপর গুরুত্ব। ইসলাম তার অনুসারীদের ঐক্যের উপর যতটা জোর দিয়েছে, জগতের অন্য কোনো ধর্ম এতটা জোর দেয়নি। তবুও দুঃখজনকভাবে আজ মুসলিমরাই সম্ভবত সকল ধর্মের অনুসারীদের চেয়ে সবচেয়ে বেশি বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং সবচেয়ে বেশি অনৈক্যের শিকার; অন্ততপক্ষে বেশি ক্ষতির শিকার। অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা নিজেদের মাঝে অসংখ্য মৌলিক বিষয়ে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও অভিন্ন প্রতিপক্ষের ব্যাপারে সবাই এক। বিপরীতে সকল মুসলমান মৌলিক বিষয়ে একমত হলেও শাখাগত বিষয়ের মতবিরোধকে তারা মৌলিক দ্বন্দ্বের বিষয়বস্তুতে পরিণত করে আজ শতধাবিচ্ছিন্ন। বরং মুসলিমদের আজ মুসলিমদের তুলনায় অমুসলিমদের সঙ্গে সখ্য বেশি। ফলাফলও সামনে। মুসলিম উম্মাহর মতো দুর্বল, নিরীহ, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অক্ষম ও নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী সম্ভবত বর্তমান পৃথিবীতে আর নেই। অথচ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কোনো নফল বিষয় নয় যে, মন চাইলে এক হলাম, মন না চাইলে হলাম না। বরং এটা মুসলমানদের ওয়াজিব আমল, মুসলমানদের আকিদার অংশ। আর এ কারণেই ইমাম তহাবি রাহি. তার আকীদাহ গ্রন্থের শেষ পর্যায়ে এসে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

কুরআন-সুন্নাহর অসংখ্য স্থানে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে, তাদের এক থাকতে বলা হয়েছে; মতভেদ করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন: আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا.
অর্থ: 'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেছ।' [আলে ইমরান: ১০৩] অনৈক্যের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّনَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا.
অর্থ: 'যে ব্যক্তি সরল পথ স্পষ্ট হওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের অনুসৃত পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে, আমি তাকে ওই দিকেই ফেরাব, যে দিকে সে গিয়েছে (অর্থাৎ বক্র করে দেবো)। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব; সেটা কতই না নিকৃষ্টতর গন্তব্য!' [নিসা: ১১৫]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদিসে একদিকে উম্মাহর মতানৈক্য হবে সেই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, অপরদিকে তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ইহুদিরা একাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়েছে; খ্রিষ্টানরা বাহাত্তর ফিরকায় বিভক্ত হয়েছে; আমার উম্মত তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত হবে। সবগুলো ফিরকা জাহান্নামে যাবে, কেবল একটি জান্নাতে যাবে।' জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তারা কারা, হে আল্লাহর রাসুল?' তিনি বললেন, 'যারা আমি ও আমার সাহাবাদের পথে থাকবে।' ১ অন্য হাদিসে বলেন, 'তোমাদের ভিতর যারা বেঁচে থাকবে, তারা অতি শীঘ্রই অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমাদের কর্তব্য হলো আমার সুন্নাহ এবং সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা। এগুলোকে তোমরা মজবুতভাবে ধরে রেখো, এগুলোর সঙ্গে দাঁত কামড়ে পড়ে থেকো। আর তোমরা নব-উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান থাকো। কারণ, প্রত্যেক নব-উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত; আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি; আর প্রত্যেক গোমরাহির পরিণতি জাহান্নাম।' ২

আরেকটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় পছন্দ করেন আর তিনটি বিষয় অপছন্দ করেন। পছন্দের তিনটি বিষয় হলো, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে তার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করবে না। তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে এক হয়ে ধারণ করবে, বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত হবে না। আল্লাহ তোমাদের উপর যাদের নিযুক্ত করেছেন (শাসক) তাদের কল্যাণ কামনা করবে। আর তিনি অপছন্দ করেন অর্থহীন কথাবার্তা, অতিরিক্ত প্রশ্ন এবং সম্পদ বিনষ্ট করা।' ৩

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেন, সেখানেও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। সংবিধানের শুরুতেই উল্লেখ করা হয়, 'কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মুসলিম এবং যারা তাদের সঙ্গে এসে নতুন যোগ দেবে, তাদের সঙ্গে জিহাদ করবে তারা এক জাতি। তাদের মাঝে অন্যরা অন্তর্ভুক্ত হবে না।' ৪

টিকাঃ
১. তিরমিজি (২৬৪১); ইবনে মাজা (৩৯৯২); আবু দাঊদ (৪৫৯৬)।
২. আবু দাঊদ (৪৬০৭); তিরমিজি (২৬৭৬); ইবন মাজা (৪৩); ইবনে হিব্বান (৫)।
৩. মুসলিম (১৭১৫); ইবনে হিব্বান (৩৩৮৮); মুসনাদে আহমদ (৮৯২১)।
৪. আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ইবনে কাসির (২/৩২১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 অনৈক্যের কারণ

📄 অনৈক্যের কারণ


ঐক্য মুসলিমদের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ, অনৈক্য ধ্বংসের কারণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَরَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَতֵধহَبَ رِيحُكُمْ অর্থ: 'আর তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য করো। পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না; তাতে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে।' [আনফাল: ৪৬] ১ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাজি. বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে কুরআন শিখিয়েছেন তার চেয়ে ভিন্নভাবে কুরআন পড়তে দেখে তাঁর কাছে নিয়ে এলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের পড়া শুনে বললেন, 'দুজনেরটাই ঠিক আছে। তোমরা মতভেদ করো না; কারণ তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো মতভেদ করেছে, ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।' ২

তিন দিনের বেশি কোনো মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন রাখাও জায়েজ নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না; তোমরা পরস্পর হিংসা করো না; একে অন্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো না। বরং সকলে আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তার (মুসলিম) ভাইয়ের সঙ্গে তিন রাতের অধিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হালাল নয়।' ৩ ৪

কুরআনে সকল মুমিনকে ভাই ভাই বলা হয়েছে। [হুজুরাত: ১০] অনৈক্যকে কাফেরদের নিদর্শন আখ্যা দিয়ে রাসুলুল্লাহকে সেটা থেকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوْا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ * অর্থ: 'নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে পরিণত হয়েছে, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।' [আনআম: ১৫৯] অন্য আয়াতে কাফেরদের মতো বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করে বলেন, وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ تَفَرَّقُوا وَ اخْتَلَفُوْا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَتُ وَ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ . অর্থ: 'আর তাদের মতো হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তাদের কাছে নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।' [আলে ইমরান: ১০৫]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, অনুগ্রহ ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে মুমিনদের উদাহরণ হচ্ছে এক দেহের মতো, যার কোনো অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা শরীর ব্যথায় ভোগে, বিনিদ্র রাত কাটায়।' ৫ ৬ ৭ ৮

মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবিরোধী যেকোনো সাম্প্রদায়িক আহ্বানকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহেলিয়্যাত বলেছেন; সেটাকে দূষিত ও দুর্গন্ধময় বস্তু হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ৯ ১০ বরং অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলাকে তিনি কুফর এবং কাফেরদের স্বভাব আখ্যা দিয়ে জীবনের শেষ লগ্নে বিদায় হজে বলেন, 'তোমরা আমার পরে কাফেরদের মতো একে অন্যের ঘাড়ে তরবারি ধরো না।' ১১ বরং মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ থাকার পরে কেউ যদি তাদের সেই ঐক্য নষ্ট করতে চায় এবং বিদ্রোহ করে (বাগি হয়), তবে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। ১২

টিকাঃ
১. আত-তাফসিরুল কাবির, রাজি (১৫/৪৮৯)।
২. বুখারি (২৪১০); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৮০৪০)।
৩. বুখারি (৬০৭৬); মুসলিম (২৫৬০)।
৪. মুসলিম (২৫৬৫); আবু দাঊদ (৪৯১৬)।
৫. বুখারি (৬০১১); মুসলিম (২৫৮৬)।
৬. ইবনে হিব্বান (২৩২)।
৭. বুখারি (২৪৪৬); মুসলিম (২৫৮৫)।
৮. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৪২৭, ১০৪৪৮)।
৯. বুখারি (৪৯০৫); মুসলিম (২৫৮৪)।
১০. সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৮৮০৫); মুসনাদে আহমদ (১৮০১৩)।
১১. বুখারি (১৭৩৯); মুসলিম (৬৫)।
১২. মুসলিম (১৮৫২); ইবনে হিব্বান (৪৪৪৬); হাকেম (২৬৮০)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কালিমা ঐক্যের চাবিকাঠি

📄 কালিমা ঐক্যের চাবিকাঠি


আল্লাহর অনুগ্রহ যে, এই শতধাবিভক্ত উম্মতের জন্য আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে গিয়েও চাইলে মুহূর্তেই আবার এক কাতারে দাঁড়ানোর একটি পথ খোলা রেখেছেন। সেই মূলমন্ত্র হলো 'কালিমা' লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। সালাফের মানহাজে এই কালিমার অর্থ বোঝা ও মানার ক্ষেত্রে উম্মাহ একমত হতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত ঐক্যের স্বপ্ন পূর্ণ হবে। অন্য কথায়, ঈমানের ভিত্তিতে মুসলমানরা একমত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেই শতধাবিভক্ত মুসলিম উম্মাহর পক্ষে আল্লাহর রজ্জুকে এক হয়ে আঁকড়ে ধরা সম্ভব। এর বাইরে কোনো কিছুই মুসলিম উম্মাহকে এক করতে পারবে না।

মুসলিম উম্মাহর ভাষা, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় মাজহাব, তাজকিয়ার তরিকা, আকিদার মানহাজ, চিন্তাধারা, জীবন ও জগতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি সবকিছু ভিন্ন ভিন্ন। এসব ভিন্নতা কখনোই সম্পূর্ণরূপে মিটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; আবার এসব ভিন্নতাকে ঐক্যের মানদণ্ড বানালে ঐক্য বাস্তবায়ন করাও সম্ভব নয়। ফলে এমন একটা মঞ্চ লাগবে, যে ক্ষেত্রে সকল মুসলিম তাদের ভিন্নতা সহকারেই দাঁড়াতে পারবে; এমন একটা গজল লাগবে, মুসলিম উম্মাহর সবাই তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা সহকারেই দরাজ গলায় যা গাইতে পারবে। আর সেটা হচ্ছে 'কালিমা', কুরআনে যেটিকে 'আল্লাহর রজ্জু' বলা হয়েছে। [আলে ইমরান: ১০৩]

ফলে ফিকহে চার মাজহাব의 অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ একে অন্যের ভাই ভাই হবে। কারণ, চার মাজহাব কালিমার উপরই প্রতিষ্ঠিত। তাদের মাঝে যেসব বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা রয়েছে, সেগুলো ইসলামের সৌন্দর্য ও বহুমাত্রিক প্রকাশ মাত্র। তাই এই ভিন্নতাকে বিভেদের হাতিয়ার বানানো যাবে না। একইভাবে কালিমার সুবাদে মুসলিম উম্মাহ অসংখ্য রাজনীতিক মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত হওয়ার পরও এক অভিন্ন প্ল্যাটফরমে দাঁড়াতে পারবে; কারণ সেসব দৃষ্টিভঙ্গি কালিমার ভিত্তিতেই তৈরি। এই মূলমন্ত্র মেনে নিলে আকিদার তফসিলি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একাধিক মানহাজে বিভক্ত থাকলেও মূল ঈমানের ক্ষেত্রে সকল মুসলমান পরস্পরকে ভাই মনে করতে পারবে। অর্থাৎ ফিকহ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের মতানৈক্য থাকলেও ঈমান ও তাওহিদের মৌলিক উসুলের ক্ষেত্রে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এই ঐক্যের জন্য সকল মাজহাব-মাশরাব মিটিয়ে দিতে হবে না।

কিন্তু আজ মুসলিমরা কালিমার পরিবর্তে নিজেদের বানানো বিভিন্ন তুচ্ছ বিষয়কে ঐক্যের মানদণ্ড স্থির করেছে। ভাষা, বর্ণ, সংস্কৃতি, ক্ষুদ্র ভৌগোলিক সীমানা, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, মানবরচিত রাজনীতিক ও সামাজিক মতাদর্শ ইত্যাদি মুসলমানদের ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পার্থিব স্বার্থপূরণই তাদের ঐক্যের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মুসলিমদের ঐক্যে আজ কোনো বরকত নেই, কল্যাণ নেই, পরকালীন মুক্তি ও সাফল্যের কথা নেই। সমাজে হানাহানি ও খুন-খারাবি বাড়ছে, মানুষের সংখ্যা কমছে।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইসলাম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন

📄 ইসলাম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন


আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সবার জন্য একটি জীবনব্যবস্থা মনোনীত করেছেন। তার নাম ইসলাম। আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত সকল নবি-রাসুল, জিন-মানুষ, সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর নির্বাচিত ও তার কাছে গ্রহণযোগ্য জীবনবিধান কেবল ইসলাম। সকল নবি-রাসুলের দ্বীন ও দাওয়াত ছিল ইসলাম। তারা তাদের উম্মতকে ইসলামের দিকে ডেকেছেন। ফলে নুহ আলাইহিস সালামের অনুসারী, মুসা আলাইহিস সালামের অনুসারী এবং ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারী এ অর্থে সবাই মুসলিম ছিলেন। হ্যাঁ, তাদের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল, কিন্তু দ্বীন একটিই—ইসলাম। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের মাধ্যমে অতীতের সকল শরিয়ত রহিত হয়ে গিয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ অর্থ: 'নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।' [আলে ইমরান: ১৯] অন্য আয়াতে বলেন, وَমَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ. অর্থ: 'আর যে ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু সন্ধান করবে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গৃহীত হবে না। সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' [আলে ইমরান: ৮৫]

আরেক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সবাইকে মৃত্যুর আগে মুসলমান হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقْتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ. অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।' [আলে ইমরান: ১০২] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।' [মায়িদা: ৩] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যেকোনো ইহুদি কিংবা খ্রিষ্টান যদি আমার কথা শুনতে পায়, তদুপরি আমার উপর ঈমান না আনে, তবে সে জাহান্নামে যাবে।' ১

কেন কুরআনকে সংরক্ষিত করা হয়েছে আর অন্যগুলোকে বিকৃতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে, অথচ সবগুলোই আল্লাহর অবতীর্ণ বাণী? এর উত্তর হলো, কুরআনকে কিয়ামত পর্যন্ত গোটা বিশ্বজগতের হিদায়াত ও জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ফলে তা সবসময় সুসংরক্ষিত থাকা আবশ্যক। বিপরীতে আগের আসমানি গ্রন্থগুলো নির্ধারিত ভূখণ্ডের নির্ধারিত সম্প্রদায়ের কাছে নির্ধারিত সময়ের জন্য জীবনবিধান হিসেবে অবতীর্ণ করা হয়েছিল। ফলে তা সুরক্ষিত থাকা আবশ্যক নয়।

টিকাঃ
১. মুসলিম (১৫৩); সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর (১০৮৪); বাজ্জার (৩০৫০); তয়ালিসি (৫১১)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px