📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 গণক ও জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ

📄 গণক ও জ্যোতিষীকে বিশ্বাস করা নিষিদ্ধ


আরবিতে 'কাহিন' শব্দের অর্থ হলো গণক, ভবিষ্যদ্বক্তা, গায়েব জানার দাবিদার। আর 'আররাফ' শব্দের অর্থও গোপন বিষয় জানার দাবিদার। ইবনুল আসির লিখেন, প্রাচীন আরবদের মাঝে এগুলোর ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন ছিল। জিন কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ভবিষ্যৎ জানার দাবিদারকে 'কাহিন' বলা হতো। চুরি কিংবা হারিয়ে যাওয়া বস্তু বিভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে উদ্ধার করে দেওয়ার দাবিদারকে বলা হতো 'আররাফ'। আর আকাশের তারকার সাহায্যে গায়েব জানার দাবিদারকে বলা হতো 'মুনাজ্জিম' তথা জ্যোতিষী। কিন্তু হাদিসে 'কাহিন' বলতে উপরের তিনটিকেই অন্তর্ভুক্ত করে।১ হরবি বলেন, 'কাহিন' হলো যে ব্যক্তি অনুমান-নির্ভর ভবিষ্যতের সংবাদ দেয়।২ বাংলাতে আমরা ভাগ্য গণনাকারী বা গণক বলতে পারি। জাকারিয়া আল-আনসারি 'কাহিন' এবং 'আররাফ'-এর মাঝে পার্থক্য করে বলেন, 'কাহিন' হলো যে তারকার মাধ্যমে ভবিষ্যতের কথা বলে, আর 'আররাফ' হলো বর্তমানে (তারকার সাহায্য ছাড়া অনুমানভিত্তিক) কোনো অদৃশ্য কিছুর সংবাদ দেয়, যেমন চুরি হয়ে যাওয়া বস্তু ইত্যাদি।৩ দেখা যাচ্ছে—কর্মপদ্ধতি ও উপকরণের ক্ষেত্রে 'কাহিন', 'আররাফ' ও 'মুনাজ্জিম' প্রভৃতির মাঝে পার্থক্য থাকলেও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে অভিন্ন। তাদের প্রত্যেকেই বর্তমানের অজ্ঞাত বিষয় ও ভবিষ্যৎ জানার দাবিদার। ৪

ইসলামে ভাগ্যগণনা, হস্তরেখাবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, রাশিচক্র—সবগুলো নিষিদ্ধ। কারণ, এগুলোর ভিত্তি মিথ্যার উপর। সবগুলোই দ্বীন ও দুনিয়া, সমাজ ও মানুষের জন্য সমান ক্ষতিকর। বিপরীতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া, আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে গর্ভের সন্তানের অবস্থা ও লিঙ্গ জানা-সহ এ-জাতীয় সকল বিষয়, যা বৈজ্ঞানিক ও প্রায়োগিক বিদ্যার উপর নির্ভরশীল, সেগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না।

ইসলামে গণক ও জ্যোতিষীদের কাছে যেতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে তার উম্মতকে তাদের কাছে যেতে নিষেধ করেছেন। যারা যাবে, তাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আবু হুরাইরা রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে এলো এবং তার কথাকে সত্যায়ন করল, সে যেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ (দ্বীনকে) অস্বীকার করল।' ৫ সাফিয়্যাহ রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো গণক (আররাফ)-এর কাছে আসবে এবং তার কথা সত্যায়ন করবে, চল্লিশ দিন তার নামাজ কবুল করা হবে না।' ৬ আনাস ইবনে মালেক থেকে আরেকটি ব্যাখ্যা-সহ এমন হাদিস এসেছে, 'যদি কোনো ব্যক্তি গণকের কাছে আসে এবং তার কথা সত্যায়ন করে, তবে সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর অবতীর্ণ দ্বীন থেকে মুক্ত। আর যে ব্যক্তি তার কাছে আসে, কিন্তু তাকে সত্যায়ন করে না, তবে চল্লিশ দিন তার নামাজ কবুল করা হবে না।' ৭

প্রশ্ন হতে পারে, গণকের কাছে যাওয়া এবং তাদের সত্যায়ন করা কি বাস্তবেই কুফর? অন্য কথায়, কেউ যদি গণকদের সত্যায়ন করে, তবে কি সে কাফের হয়ে যাবে? প্রথম কথা হলো, হাদিসের বাহ্যিক ভাষ্য যদিও তা-ই বলে, কিন্তু বাস্তবে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব নয়; বরং হাদিসে মূলত ভয়াবহতা এবং গুনাহের প্রচণ্ডতা বোঝাতে এটা বলা হয়েছে। কারণ, যেসব হাদিসে গণকের কাছে আসা ব্যক্তির কুফরের কথা বলা হয়েছে, সেসব হাদিসে আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেগুলোও কুফরের আওতায় পড়ে, অথচ আলিমদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী সেগুলো কুফর নয়। যেমন: আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, 'যদি কেউ গণকের কাছে যায় এবং তাকে সত্যায়ন করে, অথবা তার স্ত্রীর হায়েজ অবস্থায় তার সঙ্গে সহবাস করে, অথবা স্ত্রীর পিছনের দিক থেকে সহবাস করে, তবে সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা-কিছু অবতীর্ণ হয়েছে, তা থেকে মুক্ত।' এখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই বাহ্যত কাফের বলা হয়েছে; অথচ স্ত্রীর সঙ্গে উক্ত পন্থায় যারা সহবাস করবে, তারা অপরাধী হলেও আহলে সুন্নাতের আলিমদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হবে না। সুতরাং গণকের কাছে গেলে এবং তাকে সত্যায়ন করলেই কাফের হয়ে যাবে—এমন নয়। তবে কাজটি অত্যন্ত জঘন্য এবং বড় ধরনের কবিরা গুনাহ। ৮

তবে কিছু কিছু অবস্থায় বাস্তবিক অর্থেই কাফের হয়ে যাবে। কারণ, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গায়েব জানে না। আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে বলেন, قُلْ لَّا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُوْنَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ. অর্থ: 'আপনি বলুন, আকাশ ও জমিনে যারা আছে, তাদের কেউ গায়েব জানে না। গায়েব জানেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।' [নামল: ৬৫] ফলে গণকও গায়েব জানে না। যদি গণকের কথা এই বিশ্বাস রেখে সত্যায়ন করে যে, সে হয়তো জিন, শয়তান কিংবা অন্য কোনো উপায়ে এগুলো জেনেছে, অথবা অনুমান করে বলছে, তাতে সে কাফের হবে না। উপরের বক্তব্য এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু যদি কেউ এটা মনে করে যে, গণক গায়েব জানে, জগতের সকল রহস্য তার সামনে উদ্ভাসিত, অতীত ও বর্তমানের সবকিছু তার নখদর্পণে, তবে এমন ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। কারণ, সে দ্বীনের মৌলিক একটা বিষয় অস্বীকার করেছে; আল্লাহর বিশেষ একটি গুণে সৃষ্টিকে শরিক করেছে। ফলে এটা বড় ধরনের শিরকের পর্যায়ে পড়বে এবং সে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বেরিয়ে মুশরিক হয়ে যাবে।

টিকাঃ
১. আন-নিহায়া, ইবনুল আসির (৩/২১৮, ৬/৭৫২)।
২. গরিবুল হাদিস, হরবি (২/৫৯৪)।
৩. শরহু রাওজিত তালিব, জাকারিয়া আল-আনাসারি (৪/৮২)।
৪. শরহে মুসলিম, নববি (৫/২২); রদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন (১/৪৫); আকহাসারি (২৬০); ফাওজান (১৯৪)।
৫. আবু দাঊদ (৩৯০৪); তিরমিজি (১৩৫); ইবনে মাজা (৬৩৯); হাকেম (১৫); দারেমি (১১৭৬)।
৬. মুসলিম (২২৩০); মুসনাদে আহমদ (১৬৯০৬)।
৭. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৬৬৭০)।
৮. আল-ইবানাহ-আল কুবরা, ইবনে বাত্তাহ (২/৭২৮); আল-ফুরু, ইবনে মুফলিহ (১০/২১১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইসলামের মানবিকতা

📄 ইসলামের মানবিকতা


এটা মূলত ইসলাম যে কতটা মানবিক, বাস্তববাদী ও কল্যাণকর জীবনবিধান তার প্রমাণ। কারণ গণক-জ্যোতিষী মানব সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এরা প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের সম্পদ লুটে নেয়, মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে মানুষকে ঠকায়। পাশাপাশি হতাশাগ্রস্ত মানুষকে হতাশার প্রকৃত চিকিৎসা না দিয়ে হতাশা থেকে উত্তরণের পথ না বলে উলটো হতাশা ও নিরাশার অথই সাগরে ভাসিয়ে দেয়। কেউ তাদের উপর ভরসা করে আকাশ-কুসুম ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর থাকে।

অনেকে তাদের কথার ভিত্তিতে পরিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করে; বরং গণক ও জ্যোতিষী অনেক সময় সমাজে বিভিন্ন হানাহানি ও খুনোখুনির পিছনে থাকে। অনেক ফৌজদারি মামলার নথিপত্রে এমন বিবরণ দেখা গেছে। এগুলো পার্থিব ক্ষতি। পরকালীন ক্ষতি আরও বেশি। তাদের কাছে যারা নিয়মিত আসা-যাওয়া করে, ধীরে ধীরে তাদের ঈমানহারা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ, তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাবিজ-কবচ কিংবা গণক-জ্যোতিষীদের মিথ্যা আশ্বাসের উপর ভরসা করা শুরু করে, বিপদে-আপদে বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা সর্বক্ষমতার অধিকারী আল্লাহর কাছে মনোযোগী হওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর তুচ্ছ সৃষ্টি পাথর কিংবা আংটির প্রতি মনোযোগী হয়, তাকদিরের পরিবর্তে এগুলোকে সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের উপকরণ মনে করে। এভাবে যারা তাদের কাছে যায়, একসময় দ্বীন ও দুনিয়া দুটোকেই হারিয়ে ফেলে।

বর্তমান সময়ে শিক্ষিত শ্রেণির মাঝেও পাথর, আংটি ও ধাতুর অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাসী, জ্যোতিষী ও রাশিচক্রের প্রতি বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অথচ মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে নক্ষত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। রাশির সঙ্গে মানুষের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের বিন্দুমাত্র যোগসূত্র নেই। জন্ম ও মৃত্যুতারিখের সঙ্গে সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যের কোনো সংযোগ নেই। কল্যাণ-অকল্যাণের সঙ্গে পাথরের সম্পর্ক নেই। এগুলো সব তাওহিদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পৌত্তলিক বিশ্বাস। তা হলে শিক্ষিত, স্মার্ট ও সেলিব্রিটিরা এদিকে ঝুঁকছে কেন? মূলত মুসলমানদের উপর হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাবের অন্যতম ক্ষতিকর দিক এটি। হিন্দুদের কুণ্ডলী কুসংস্কার থেকে এদেশের মুসলমানদের মাঝে এগুলো ছড়িয়েছে। মিডিয়া ও প্রচারমাধ্যমে অত্যধিক এবং প্রতারণাপূর্ণ প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে মানুষকে এদিকে টানা হচ্ছে। এটি একদিক থেকে বেশ উদ্বেগজনক ও দুঃখজনক বিষয় হলেও বিস্ময়কর নয়; বরং দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও কুরআন-সুন্নাহকে অবহেলার স্বাভাবিক পরিণতি। যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহর আলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, অন্ধকার ছাড়া তার গতি কী? যারা আল্লাহকে ভুলে যায়, আল্লাহ তাদের ধাপ্পাবাজদের দরজায় দাঁড় করিয়ে লাঞ্ছিত করেন। এ জন্য ইমাম তহাবি তার কথা কেবল গণক ও জ্যোতিষীদের উপর সীমাবদ্ধ করেননি, বরং যে-কেউ কুরআন-সুন্নাহর বাইরে কিছু করার দাবি করবে, তাদের প্রত্যাখ্যান করতে বলেছেন: 'আমরা কুরআন, সুন্নাহ এবং উম্মাহর সর্বসম্মত মতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো দাবি-দাওয়া সত্য বলে স্বীকার করি না।'

প্রশ্ন আসতে পারে, অনেক সময় জ্যোতিষীদের কথা সত্য হয়ে যায়। তা হলে কি এটা প্রমাণ করে না যে, তাদের জ্ঞান ভিত্তিহীন নয়? হ্যাঁ, অনেক সময় তাদের কথা সত্য হয়। কিন্তু সেটা দুই প্রকারের:

এক. কাকতালীয়। অর্থাৎ একান্তই আকস্মিকভাবে কথায় কথা মিলে যায়। বাস্তবে তার নিজেরও জানা থাকে না যে, এটা ঘটতে পারে। দুই. জিন ও জাদুবিদ্যার সহায়তা। [আনআম: ১১২-১১৩] ১ আয়েশা রাজি. থেকে বর্ণিত, একদল লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গণক (কাহিন) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তারা কিছুই না' (ভুয়া)। তখন তাকে বলা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ, অনেক সময় তো তাদের কথা সত্য হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'সেটা জিন (আকাশ থেকে শুনে) তাদের শোনায়। তারা সেটার সঙ্গে আরও একশো মিথ্যা মিশ্রিত করে।' ২ উক্ত হাদিসের প্রথম অংশ প্রথম প্রকার; অর্থাৎ তারা কিছুই জানে না; যা বলার আন্দাজে বলে। আর দ্বিতীয় অংশ দ্বিতীয় প্রকার। ফলে অনেক সময় জিন ও নক্ষত্র ইত্যাদির সঙ্গে জাদুবিদ্যার সমন্বয় করে জ্যোতিষীরা জাদুর আশ্রয় নেয়।

আর জাদুবিদ্যা বাস্তবেই বিদ্যমান। দুষ্ট জিন ও বিভিন্ন পন্থায় এর মাধ্যমে মানুষকে অসুস্থ করা যায়, হত্যা করা যায়, মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া যায়, পাগল বানানো যায়, স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। অর্থাৎ জগতের অনেক ক্ষতিকর কর্ম এই জাদুর মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সেগুলো আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া হয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া জাদু কোনো ক্ষতি করতে পারে না। [বাকারা: ১০২] কিন্তু আল্লাহ পৃথিবীতে যেসব শৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন, জাদুবিদ্যার মাধ্যমে প্রভাব তৈরি হওয়া সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত। তবে জাদুবিদ্যা যেহেতু একটি অনিষ্ট ও ক্ষতিকর বিদ্যা, এ জন্য ইসলামে এটা সামগ্রিকভাবে সম্পূর্ণ হারাম এবং ক্ষেত্রবিশেষে (কুফরির উপাদান থাকলে) কুফর। বিস্তারিত আলোচনায় মতপার্থক্য ও বিধানের ভিন্নতা থাকলেও জাদুকরকে হত্যার বৈধতার ব্যাপারে সকল আলিম একমত। ৪

মোট কথা, অনেক সময় জ্যোতিষীরা জাদুবিদ্যার আশ্রয় নিয়ে কাজগুলো করে। ফলে যদি কখনও তারা আপনাকে কোনো সাহায্য করতেও পারে, সেটা সম্পূর্ণ হারাম ও অবৈধ পন্থায় করা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নক্ষত্র থেকে জ্ঞান আহরণ করল, সে জাদুবিদ্যা গ্রহণ করল। ৫ তাই এসব হারাম পথে কোনো বরকত বা সুখ-সৌভাগ্য আসতে পারে না। হ্যাঁ, যদি কেউ কারও দ্বারা ক্ষতির শিকার হয়, কাউকে জাদু-টোনা করা হয়, সে ক্ষেত্রে শরয়ি রুকইয়া, জাদু নষ্টের জন্য বিভিন্ন আমল করা যেতে পারে। ৬ কারও কিছু চুরি হয়ে গেলে সে ক্ষেত্রে শরিয়ত-অনুমোদিত পন্থা অবলম্বন করা যেতে পারে; ৭ কিন্তু জিনদের সহায়তা নেওয়া, জাদুকর ও জ্যোতিষী-গণকদের কাছে যাওয়া বৈধ নয়। সে ক্ষেত্রে অনেক দ্বীনদার পরিবারকেও শিথিলতা করতে দেখা যায়। তাই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

একজন মুসলিম হিসেবে আপনার মনে রাখা উচিত, বিশ্বজগতের কোনো কিছু আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া হয় না। আল্লাহ ছাড়া কেউ আপনার লাভ-ক্ষতি, উপকার-অপকারের ক্ষমতা রাখে না। অমুসলিমদের কাছে আল্লাহ নেই, ফলে তারা মানুষের দরবার, মাজার ও আস্তানায় পড়ে থাকে। আপনি কেন তাদের মতো মানুষের কাছে যাবেন? আপনার চাকরি প্রয়োজন? বিপদে আছেন? স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা হয় না? সন্তান হয় না? ঋণগ্রস্ত? কেউ আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে? চোরাই মাল ফেরত পেতে চান? রাস্তায় এমন চটকদার সস্তা বিজ্ঞাপন দেখে কোনো মানুষের দরজায় কড়া নাড়ানোর প্রয়োজন নেই। তারা আপনাকে ঠকানো ছাড়া আর কিছু করতে পারবে না। ওজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। আল্লাহর কাছে মিনতি করুন। তিনি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করবেন, ইনশাআল্লাহ। দোয়ার আদব, দোয়া কবুলের শর্ত ও সময় ইত্যাদি নিয়ে পিছনে আলোচনা করা হয়েছে, সেগুলো দেখুন।

টিকাঃ
১. তাফসিরে ইবনে কাসির (৬/১৫৬)।
২. বুখারি (৬২১৩); মুসলিম (২২২৮)।
৩. আল-ফুরুক, কারাফি (৪/১৪৯); ফাতহুল কাদির, ইবনুল হুমাম (৬/৯৯)।
৪. রদ্দুল মুহতার (১/৪৪-৪৫); ফাতহুল কাদির, ইবনুল হুমাম (৬/৯৯); ইলাউস সুনান (১২/৬৩৮)।
৫. আবু দাঊদ (৩৯০৫); ইবনে মাজা (৩৭২৬)।
৬. আস-সুনান ওয়াল মুবতাদাআত, শুকাইরি (১২৮)।
৭. রদ্দুল মুহতার (২/২৮)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px