📄 কিয়ামতের ছোট আলামত
কিয়ামতের ছোট আলামত: এসব আলামতের সংখ্যা অনেক এবং এগুলো কয়েক ভাগে বিভক্ত। তন্মধ্যে কিছু রয়েছে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, আবার কিছু বাকি আছে এবং প্রকাশিত হবে। এসব আলামতের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো:
এক. আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে বলেছেন, তিনি কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে প্রেরিত হয়েছেন।¹ যদিও আজ প্রায় চৌদ্দশো বছরের বেশি হয়ে গেছে, তবুও কিয়ামত আসেনি; তথাপি পৃথিবীর বয়সের তুলনায় এক-দুই হাজার বছর নিতান্তই ক্ষুদ্র। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন শেষ নবি। তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবেন না। তাঁর উম্মতই সর্বশেষ উম্মত। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় পৃথিবী পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে। আর কোনো নতুন পয়গাম, নতুন উম্মত আসবে না। আর কিছুর অপেক্ষা নেই।
দুই. চন্দ্র বিদীর্ণ হয়ে যাওয়া। সকল মুহাক্কিক আলিমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের ইশারায় আকাশের চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল রাসুলুল্লাহর অন্যতম শক্তিশালী একটি মুজিজা, পাশাপাশি কিয়ামত সন্নিকটে আসার নিদর্শন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,
اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ
অর্থ: 'কিয়ামত আসন্ন। চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।' [কামার: ১]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আনাস ইবনে মালেক, ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, আলি, হুজাইফা-সহ অন্যান্য সাহাবা চন্দ্ৰ বিদীর্ণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তারা এই ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। ফলে এটাকে অস্বীকার করা দুঃসাহসিকতা ও সত্য অস্বীকার। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'রাসুলুল্লাহর যুগে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল। তখন আমরা তাঁর সঙ্গে মিনাতে ছিলাম। তিনি বললেন, তোমরা দেখো। আমরা দেখলাম চাঁদের একটি টুকরো (হেরা) পাহাড়ের একদিকে, অন্য টুকরো আরেক দিকে।'²
তিন. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন—কিয়ামতের আগে হিজাজ থেকে একটি আগুন বের হবে, যার আলোতে (শামের) বুসরা শহরের লোকেরা তাদের উটের ঘাড় দেখতে পাবে।³ এটা সপ্তম শতাব্দে (৬৫৪ হিজরিতে) ঘটেছে। ইতিহাসবিদগণ নিজেদের চোখে দেখে সেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
চার. বাইতুল মাকদিস বিজয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের আগে বাইতুল মাকদিস বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন।৪ উমর রাজি.-এর যুগে ১৬ হিজরিতে মুসলমানগণ বাইতুল মাকদিস বিজয় করেন।
পাঁচ. ফিতনা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা ও রক্তপাত বৃদ্ধি পাবে।⁵
ছয়. মিথ্যা নবুওতের দাবিদারদের প্রকাশ ঘটবে।⁶ বিভিন্ন সময়ে একাধিক মিথ্যা নবি দাবিদারের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের সর্বশেষ ছিল ভারতের গোলাম আহমদ কাদিয়ানি।
সাত. দাসীর গর্ভে মনিব জন্ম নেবে।
আট. ভুখা-নাঙ্গা ছাগলের রাখালরা অভ্রভেদী অট্টালিকা গড়ে গর্ব করবে।⁷
নয়. ইলম উঠে যাবে এবং মূর্খতার প্রসার ঘটবে।⁸
দশ. মদ্যপান ও ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে।⁹
এগারো. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে খারাপ আচরণ বাড়বে। অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়বে।
বারো. অধিক হারে ভূমিকম্প ও ভূমিধ্বস হবে। মানুষের আকার বিকৃত হবে।¹⁰
টিকাঃ
১. বুখারি (৫৩০১); মুসলিম (৮৬৭)।
২. বুখারি (৩৬৩৬, ৩৮৬৯, ৪৮৬৪); মুসলিম (২৮০১); তিরমিজি (৩২৮৭)।
৩. বুখারি (৭১১৮); মুসলিম (২৯০২)।
৪. বুখারি (৩১৭৬); ইবনে মাজা (৪০৪২)।
৫. বুখারি (৭০৬২)।
৬. বুখারি (৩৬০৯); মুসলিম (১৫৭)।
৭. মুসলিম (৮); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।
৮. বুখারি (৭০৬২)।
৯. মুসলিম (২৬৭১)।
১০. তিরমিজি (২১৮৫); ইবনে মাজা (৪০৬০)।
📄 কিয়ামতের বড় আলামত
কিয়ামতের বড় আলামত: ছোট আলামতের মতো কিয়ামতের বড় বড় কিছু আলামত রয়েছে। ইমাম তহাবি তন্মধ্যে মাত্র চারটি উল্লেখ করেছেন। আমরা উপযুক্ত চারটির সঙ্গে আরও কিছু আলামত যোগ করে সংক্ষেপে সেগুলো উল্লেখ করছি। এসব আলামত যখন একটার পর একটা প্রকাশ পাওয়া শুরু করবে, তখন কিয়ামতের জন্য চূড়ান্ত ক্ষণ গণনা শুরু করতে হবে।
১. মাহদির আগমন।
২. দাজ্জালের আবির্ভাব।
৩. ঈসা আলাইহিস সালামের আকাশ থেকে অবতরণ।
৪. ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাদুর্ভাব।
৫. পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া।
৬. দাব্বাতুল আরদ বা জমিন থেকে একটি বিশেষ প্রাণীর বের হওয়া।
৭. প্রকাণ্ড ধোঁয়া নির্গত হওয়া।
৮. তিনটি বিশাল ভূমিধস হওয়া।
📄 পৃথিবীর শেষ দিনগুলো
পৃথিবীর শেষ দিনগুলো: সহিহ মুসলিমের একটি লম্বা হাদিসে কিয়ামতের বিভিন্ন আলামত-সহ পৃথিবীর শেষ দিনগুলোর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঈসা আলাইহিস সালাম দাজ্জালকে হত্যা করবেন। অতঃপর ঈসা আলাইহিস সালামের নিকট একটি ওহি নাজিল করবেন যে, আমি আমার এমন কিছু বিশেষ সৃষ্টি প্রকাশ করছি যাদের সাথে কারও যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদের তুর পর্বতে নিয়ে যাও। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়কে প্রেরণ করবেন। তারা প্রতি উঁচু ভূমি থেকে ঢলের মতো নামবে। আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আজাব প্রেরণ করবেন। তাদের ঘাড়ে একপ্রকার পোকা হবে। এতে তারা সমূলে ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ মুষলধারে প্রচণ্ড বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। এতে মাটি বিধৌত হয়ে পরিচ্ছন্ন পিচ্ছিল মৃত্তিকায় পরিণত হবে। তখন মাটিকে এ মর্মে নির্দেশ দেওয়া হবে যে, হে মাটি, তুমি শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বরকত ফিরিয়ে দাও। এ সময় আল্লাহ পবিত্র বাতাস প্রেরণ করবেন। এ বাতাস সকল মুমিনের বগল ছুঁয়ে যাবে, আর এতে প্রত্যেক মুমিন-মুসলিমের মৃত্যু হবে; একমাত্র মন্দ লোকেরাই পৃথিবীতে বাকি থাকবে। তারা গাধার মতো পরস্পর যৌনকর্মে লিপ্ত হবে। তাদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।¹
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৯৩৭); ইবনে মাজা (৪০৭৫); হাকেম (৮৬০৩); মুসনাদে আহমদ (১৭৯০৪)।
📄 কিয়ামতের আলামত-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দুটো মূলনীতি
কিয়ামতের আলামত-সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দুটো মূলনীতি: কিয়ামতের আলামতগুলো বোঝার দুটো গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি রয়েছে।
প্রথম মূলনীতি: কুরআন-সুন্নাহে এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবে বিশ্বাস করতে হবে—আপত্তি করা যাবে না, যুক্তির লাঙল ঠ্যালা যাবে না। কারণ, এগুলো সব অদৃশ্যের বিষয়; যুক্তিতে ধরা আবশ্যক নয়। যুক্তি ও বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে এগুলো অস্বীকার করা কিংবা অপব্যাখ্যা করা অবৈধ, গোমরাহি ও ভ্রষ্টতার পথ।
দ্বিতীয় মূলনীতি: কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া এসব আলামতকে বর্তমানের উপর প্রয়োগ না করা। পিছনে আমরা কিয়ামতের যেসব আলামত উল্লেখ করেছি, সেগুলো প্রসিদ্ধ এবং সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এগুলোর বাইরেও কুরআন-সুন্নাহে কিয়ামতের অসংখ্য আলামত এসেছে। যেমন: বিভিন্ন বাহিনীর আত্মপ্রকাশের ঘটনা-১ শাম-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিশাল বিশাল যুদ্ধ (মালহামা) সংঘটিত হওয়া ইত্যাদি।² কিছু সমকালীন ইসলামি গবেষককে দেখা যায় এসব হাদিস নির্ধারিত ব্যক্তি, ভূখণ্ড কিংবা সম্প্রদায়ের উপর প্রয়োগ করছেন; অথচ এমন কাজ সালাফের মানহাজ নয় এবং নিরাপদও নয়। মানুষকে কিয়ামতের আলামতগুলো জানানো, দরস, ইলমি মজলিস ও মাহফিলগুলোতে এসব বিষয়ের আলোচনা দূষণীয় তো নয়ই, বরং প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমকালীন বিভিন্ন ঘটনার উপর এগুলোকে প্রয়োগ করা সঠিক নয়।
টিকাঃ
১. উদাহরণস্বরূপ দেখুন: কানজুল উম্মাল (৩৫১৫৫)।
২. আবু দাউদ (৪২৯৪); মুসনাদে আহমদ (২২৪৪৬)।