📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মহাবিশ্ব কবে ধ্বংস হবে?

📄 মহাবিশ্ব কবে ধ্বংস হবে?


মহাবিশ্ব কবে ধ্বংস হবে? মহাপ্রলয় কবে আসবে? এটা সেসব নিগূঢ় অদৃশ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যেসব আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না; এমনকি ফেরেশতারাও জানেন না; কোনো নবি-রাসুল-ওলি কেউ জানেন না। আল্লাহ বলেন,

يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسُهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّ لَا يُجَلِّيْهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ثَقُلَتْ فِي السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ لَا تَأْتِيْكُمْ إِلَّا بَغْتَةً يَسْأَلُونَكَ كَأَنَّكَ حَفِيٌّ عَنْهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ اللهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْনَ.

অর্থ: 'তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে কিয়ামত কবে আসবে? বলে দিন, এর জ্ঞান কেবল আমার পালনকর্তার কাছে। তিনিই তা উন্মোচিত করবেন নির্ধারিত সময়ে। আসমান ও জমিনের জন্য তা অতি কঠিন বিষয়। তা তোমাদের উপর আসবে হঠাৎ করেই। তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে যেন আপনি তার অনুসন্ধানে লেগে আছেন। বলে দিন, এর জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর নিকটই রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ লোকই সেটা বোঝে না।' [আরাফ: ১৮৭] প্রসিদ্ধ হাদিসে জিবরিলে ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি বলেন, 'জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে অধিক অবগত নয়।' অর্থাৎ এ ব্যাপারে জিবরাইল যেমন জানেন না, তেমন রাসুলুল্লাহও জানেন না।¹

তবে কিয়ামত আসবে হঠাৎ। পৃথিবীর মানুষ যে যার কাজে ব্যস্ত থাকবে। এমন সময় আচমকা কিয়ামত এসে তাদের পাকড়াও করবে। কারণ, পৃথিবীতে মানুষকে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ফলে কিয়ামত কবে হবে সেটা দিনক্ষণ বলে দিলে আর পরীক্ষা থাকে না। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্য বর্ণনায় এটাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

قَدْ خَسِرَ الَّذِيْنَ كَدَّبُوا بِلِقَاءِ اللَّهِ حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً قَالُوا يُحَسْرَتَنَا عَلَى مَا فَرَّطْنَا فِيهَا .

অর্থ: 'নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে; এমনকি যখন হঠাৎ তাদের কাছে কিয়ামত এসে যাবে, তারা বলবে, হায় আফসোস! এক্ষেত্রে আমরা ত্রুটি করেছি।' [আনআম: ৩১] অন্য আয়াতে বলেন,

وَلَا يَزَالُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي مِرْيَةٍ مِنْهُ حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً أَوْ يَأْتِيَهُمْ عَذَابُ يَوْমٍ عَقِيمٍ

অর্থ: 'কাফেররা (কিয়ামতের ব্যাপারে) সন্দেহ পোষণ অব্যাহত রাখবে যতক্ষণ না সেটা তাদের কাছে আকস্মিকভাবে এসে পড়ে; অথবা এসে পড়ে এমন দিবসের শাস্তি যা থেকে রক্ষার উপায় নেই।' [হজ: ৫৫] মহাপ্রলয় এমনভাবে এসে পড়বে যে, মানুষ টেরই পাবে না। আল্লাহ বলেন,

هَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَنْ تَأْتِيَهُمْ بَগْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

অর্থ: 'তারা কেবল কেয়ামতেরই অপেক্ষা করছে; আচমকা সেটা তাদের কাছে এসে যাবে এবং তারা বুঝেই উঠতে পারবে না।' [জুখরুখ: ৬৬] হাদিসে এসেছে, কেনাবেচার জন্য দোকানে ক্রেতা ও বিক্রেতা ভাঁজ-করা কাপড় খুলে দেখবে, সে সময়ে কিয়ামত হয়ে যাবে, কেনাবেচার সুযোগ পাবে না; কেউ দুধ দোহন করার পরে ঘরে আসবে, কিন্তু পানের সুযোগ পাবে না; বরং কেউ খাওয়ার জন্য লোকমা মুখে তুলবে, কিন্তু মুখে দেওয়ার আগেই কিয়ামত এসে যাবে।

টিকাঃ
১. বুখারি (৫০); মুসলিম (৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কিয়ামতের আলামতের প্রকারভেদ

📄 কিয়ামতের আলামতের প্রকারভেদ


কিয়ামতের আলামতের প্রকারভেদ: আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক জাতিকে তাদের নবি-রাসুলের মাধ্যমে মহাপ্রলয় দিবস সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সকল নবি এ ব্যাপারে তাদের উম্মতকে জানিয়ে গিয়েছেন যাতে সবাই প্রস্তুতি নিতে পারে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে গিয়েছেন সবার চেয়ে বিস্তারিতভাবে। ফলে কুরআন ও সুন্নাহে এ দিন সম্পর্কে বেশ সুদীর্ঘ আলোচনা রয়েছে। এ দিন ঘনিয়ে আসার আলামতগুলো সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমরা জানতে পারি, কিয়ামতের আলামতগুলো দুই ধরনের। এক. ছোট আলামত, দুই. বড় আলামত।

ছোট আলামতগুলো প্রকাশিত হলে নির্ধারিত মুহূর্তটি বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে মনে করতে হবে; আর বড় বড় আলামত প্রকাশিত হলে সেই মুহূর্তের জন্য ক্ষণ গণনা করতে হবে। কিয়ামতের ছোট আলামতগুলো সংখ্যায় অনেক। বড় আলামতগুলো সংখ্যায় সীমিত। ছোট আলামতগুলো ইতোমধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরু করেছে। বড় আলামত প্রকাশিত হলে সেই মুহূর্তের জন্য ক্ষণ গণনা করতে হবে।

টিকাঃ
১. বুখারি (৬৫০৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কিয়ামতের ছোট আলামত

📄 কিয়ামতের ছোট আলামত


কিয়ামতের ছোট আলামত: এসব আলামতের সংখ্যা অনেক এবং এগুলো কয়েক ভাগে বিভক্ত। তন্মধ্যে কিছু রয়েছে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে, আবার কিছু বাকি আছে এবং প্রকাশিত হবে। এসব আলামতের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো:

এক. আমাদের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে বলেছেন, তিনি কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে প্রেরিত হয়েছেন।¹ যদিও আজ প্রায় চৌদ্দশো বছরের বেশি হয়ে গেছে, তবুও কিয়ামত আসেনি; তথাপি পৃথিবীর বয়সের তুলনায় এক-দুই হাজার বছর নিতান্তই ক্ষুদ্র। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন শেষ নবি। তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবেন না। তাঁর উম্মতই সর্বশেষ উম্মত। এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় পৃথিবী পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে। আর কোনো নতুন পয়গাম, নতুন উম্মত আসবে না। আর কিছুর অপেক্ষা নেই।

দুই. চন্দ্র বিদীর্ণ হয়ে যাওয়া। সকল মুহাক্কিক আলিমের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতের ইশারায় আকাশের চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল। এটা ছিল রাসুলুল্লাহর অন্যতম শক্তিশালী একটি মুজিজা, পাশাপাশি কিয়ামত সন্নিকটে আসার নিদর্শন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন,

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ

অর্থ: 'কিয়ামত আসন্ন। চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।' [কামার: ১]

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আনাস ইবনে মালেক, ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, আলি, হুজাইফা-সহ অন্যান্য সাহাবা চন্দ্ৰ বিদীর্ণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তারা এই ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। ফলে এটাকে অস্বীকার করা দুঃসাহসিকতা ও সত্য অস্বীকার। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'রাসুলুল্লাহর যুগে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল। তখন আমরা তাঁর সঙ্গে মিনাতে ছিলাম। তিনি বললেন, তোমরা দেখো। আমরা দেখলাম চাঁদের একটি টুকরো (হেরা) পাহাড়ের একদিকে, অন্য টুকরো আরেক দিকে।'²

তিন. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন—কিয়ামতের আগে হিজাজ থেকে একটি আগুন বের হবে, যার আলোতে (শামের) বুসরা শহরের লোকেরা তাদের উটের ঘাড় দেখতে পাবে।³ এটা সপ্তম শতাব্দে (৬৫৪ হিজরিতে) ঘটেছে। ইতিহাসবিদগণ নিজেদের চোখে দেখে সেই ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

চার. বাইতুল মাকদিস বিজয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের আগে বাইতুল মাকদিস বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন।৪ উমর রাজি.-এর যুগে ১৬ হিজরিতে মুসলমানগণ বাইতুল মাকদিস বিজয় করেন।

পাঁচ. ফিতনা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা ও রক্তপাত বৃদ্ধি পাবে।⁵
ছয়. মিথ্যা নবুওতের দাবিদারদের প্রকাশ ঘটবে।⁶ বিভিন্ন সময়ে একাধিক মিথ্যা নবি দাবিদারের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের সর্বশেষ ছিল ভারতের গোলাম আহমদ কাদিয়ানি।
সাত. দাসীর গর্ভে মনিব জন্ম নেবে।
আট. ভুখা-নাঙ্গা ছাগলের রাখালরা অভ্রভেদী অট্টালিকা গড়ে গর্ব করবে।⁷
নয়. ইলম উঠে যাবে এবং মূর্খতার প্রসার ঘটবে।⁸
দশ. মদ্যপান ও ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে।⁹
এগারো. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে খারাপ আচরণ বাড়বে। অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়বে।
বারো. অধিক হারে ভূমিকম্প ও ভূমিধ্বস হবে। মানুষের আকার বিকৃত হবে।¹⁰

টিকাঃ
১. বুখারি (৫৩০১); মুসলিম (৮৬৭)।
২. বুখারি (৩৬৩৬, ৩৮৬৯, ৪৮৬৪); মুসলিম (২৮০১); তিরমিজি (৩২৮৭)।
৩. বুখারি (৭১১৮); মুসলিম (২৯০২)।
৪. বুখারি (৩১৭৬); ইবনে মাজা (৪০৪২)।
৫. বুখারি (৭০৬২)।
৬. বুখারি (৩৬০৯); মুসলিম (১৫৭)।
৭. মুসলিম (৮); আবু দাউদ (৪৬৯৫)।
৮. বুখারি (৭০৬২)।
৯. মুসলিম (২৬৭১)।
১০. তিরমিজি (২১৮৫); ইবনে মাজা (৪০৬০)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কিয়ামতের বড় আলামত

📄 কিয়ামতের বড় আলামত


কিয়ামতের বড় আলামত: ছোট আলামতের মতো কিয়ামতের বড় বড় কিছু আলামত রয়েছে। ইমাম তহাবি তন্মধ্যে মাত্র চারটি উল্লেখ করেছেন। আমরা উপযুক্ত চারটির সঙ্গে আরও কিছু আলামত যোগ করে সংক্ষেপে সেগুলো উল্লেখ করছি। এসব আলামত যখন একটার পর একটা প্রকাশ পাওয়া শুরু করবে, তখন কিয়ামতের জন্য চূড়ান্ত ক্ষণ গণনা শুরু করতে হবে।

১. মাহদির আগমন।
২. দাজ্জালের আবির্ভাব।
৩. ঈসা আলাইহিস সালামের আকাশ থেকে অবতরণ।
৪. ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাদুর্ভাব।
৫. পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া।
৬. দাব্বাতুল আরদ বা জমিন থেকে একটি বিশেষ প্রাণীর বের হওয়া।
৭. প্রকাণ্ড ধোঁয়া নির্গত হওয়া।
৮. তিনটি বিশাল ভূমিধস হওয়া।

ফন্ট সাইজ
15px
17px