📄 আহলে বাইতকে ভালোবাসার মূলনীতি
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হচ্ছে তাঁর আহলে বাইত তথা পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনকে ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আপনি বলুন, আমি আমার দাওয়াতের বিনিময়ে কোনো কিছু চাই না। তবে কেবল আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ চাই।’ [শুরা: ২৩] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাতের আগে বলেছিলেন, 'আমি রেখে যাচ্ছি আমার আহলে বাইত। আমার পরিবারের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।'¹ জাবের রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি—আল্লাহর কিতাব এবং আমার পরিবার।'² আলি রাজি. বলেন, আল্লাহর রাসুল আমাকে বলেছেন, 'আমাকে ভালোবাসবে কেবল মুমিনরা; আর আমার প্রতি বিদ্বেষ রাখবে কেবল মুনাফিকরা।'³
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৪০৮)।
২. তিরমিজি (৩৭৮৬, ৩৭৮৮)।
৩. মুসলিম (৭৮); ইবনে মাজা (১১৪)।
📄 সালাফের আহলে বাইত এর প্রতি ভালোবাসার উদাহরণ
সাহাবায়ে কেরাম আহলে বাইতকে সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছেন। আবু বকর রাজি. বলেন, 'আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! আমার নিজের আত্মীয়দের চেয়ে রাসুলুল্লাহর আত্মীয়বর্গ বেশি প্রিয়।'¹ উমর রাজি. যখন খলিফা হলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়-স্বজন তথা আহলে বাইতকে সর্বপ্রথম ভাতা দেওয়া শুরু করলেন। আব্বাস রাজি. যখন উমর কিংবা উসমানের পাশ দিয়ে যেতেন, তারা রাসুলুল্লাহর চাচার সম্মানে বাহন থেকে নেমে যেতেন। মুয়াবিয়া রাজি. হাসান রাজি.-কে তিন লক্ষ অর্থ প্রদান করে বলেছিলেন, ‘রাসুলুল্লাহর নাতিকে স্বাগতম।’²
উমর রাজি. যখন ইন্তেকাল করেন, আলি রাজি. তাঁকে দেখতে আসেন এবং কাঁদেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আপনার চেয়ে উত্তম কোনো কিছু নিয়ে আল্লাহর কাছে আমার যাওয়ার নেই।’³ এই ছিল সাহাবাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৭১১)।
২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির (৮/১৪৬)।
৩. বুখারি (৩৬৮৫); ইবনে মাজা (৯৮)।
📄 আহলে সুন্নাত রাফেজি ও নাসেবিদের বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত
আহলে সুন্নাত আহলে বাইত তথা নবি পরিবারের সবাইকে ভালোবাসে। পথভ্রষ্ট রাফেজিদের মতো নয়, যারা মাত্র কয়েকজন সদস্যের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করে আর বাকিদের ঘৃণা করে। আহলে সুন্নাত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের প্রতি সম্মান জানায়। আহলে সুন্নাত আহলে বাইতকে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে। নাসেবিদের মতো যেমন তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে না, একইভাবে বাড়াবাড়িও করে না। আহলে সুন্নাত আহলে বাইতের সবাইকে নিষ্পাপ মনে করে না। কিন্তু রাফেজিরা তাদের নিষ্পাপ মনে করে। আহলে সুন্নাত নাসেবিদের মতো আহলে বাইতের বিরুদ্ধে দুশমনি রাখে না। নাসেবি হলো সেসব ফিরকা, যারা আহলে বাইত, বিশেষত আলি রাজি.-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। খারেজি সম্প্রদায় এই নাসেবি দলের অন্তর্ভুক্ত। আহলে সুন্নাত নাসেবি ও রাফেজি উভয় প্রান্তিকতা থেকে মুক্ত থেকে আহলে বাইতের প্রতি সঠিক ভালোবাসা পোষণ করে যা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা নির্দেশিত।
📄 শেষ কথা
সাহাবাদের ভালোবাসার ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের মানহাজ হলো সবাইকে ভালোবাসা, কারও প্রতি বিদ্বেষ না রাখা, কারও ভালোবাসার ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন না করা। সকল সাহাবিকে ভালোবাসতে হবে। আহলে বাইতের সাহাবাদের হৃদয়ের গভীর থেকে মহব্বত করতে হবে। তাদের প্রতি সরষেদানা পরিমাণ বিদ্বেষ রাখা যাবে না। আহলে বাইতের বাইরের সাহাবাদেরও দিলের গভীর থেকে ভালোবাসতে হবে। ইমাম আইউব সাখতিয়ানি রাহি.-এর কথাগুলো মনে রাখুন: 'যে ব্যক্তি আবু বকর সিদ্দিক রাজি.-কে ভালোবাসল, সে দ্বীন কায়েম করল; যে ব্যক্তি উমর রাজি.-কে ভালোবাসল, সে সুস্পষ্ট হকের উপর আছে; যে উসমান রাজি.-কে ভালোবাসল, সে দ্বীনের নুর অর্জন করল; যে আলি রাজি.-কে ভালোবাসল, সে দ্বীনকে মজবুত করে আঁকড়ে ধরল; যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাদের ব্যাপারে উত্তম কথা বলল, সে নিফাকি থেকে মুক্ত হয়ে গেল।'¹ একইভাবে ইমাম তহাবি রাহি.-এর বক্তব্য মনে রাখুন, 'যে ব্যক্তি রাসুলের সাহাবি, তাঁর পবিত্র সহধর্মিনী এবং তাঁর নিষ্কলুষ সন্তানদের ক্ষেত্রে উত্তম কথা বলে, সে মুনাফিকি থেকে মুক্ত।'
টিকাঃ
১. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৭/১৩১৬)।