📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাদের সত্যের মাপকাঠি

📄 সাহাবাদের সত্যের মাপকাঠি


'সত্যের মাপকাঠি' শব্দটি খুব সম্ভব উর্দু শব্দ 'মি'ইয়ারে হক'-এর বাংলা অনুবাদ। পাক-ভারতের উলামায়ে কেরাম সাহাবায়ে কেরামের শানে উক্ত শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি যুগযুগ ধরে সালাফ ও খালাফের আলিমদের মাঝে ব্যবহৃত পরিভাষা 'আদালত' বা 'আদালাতুস সাহাবাহ'-এর উর্দু ও বাংলা অনুবাদ। আদালত-এর অর্থ হলো দ্বীন ও চারিত্রিক বিশুদ্ধতা, যার বলে একজন মানুষ তাকওয়া ও আত্মমর্যাদার অধিকারী হয়।¹ সাহাবাদের ক্ষেত্রে যখন 'আদালত' শব্দটা ব্যবহার করা হয়, তখন বাংলাতে এর সর্বাধিক যথাযথ অনুবাদ 'হকের কষ্টিপাথর' বা 'সত্যের মাপকাঠি'ই হয়। উম্মাহর ইমামদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, সাধারণভাবে সকল সাহাবি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। সামগ্রিকভাবে সকল সাহাবি সর্বতোভাবে সত্যের মাপকাঠি; বরং একমাত্র তারাই হকের কষ্টিপাথর। তারা যেটাকে হক বলবেন সেটাই হক, তারা যেটাকে বাতিল বলবেন সেটাই বাতিল।
কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘অন্যান্য মানুষ যেভাবে ঈমান এনেছে, তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো।’ [বাকারা: ১৩] এখানে 'মানুষ' বলতে সাহাবায়ে কেরাম উদ্দেশ্য। সাহাবাদের ঈমানকে আদর্শ ঈমানের কষ্টিপাথর সাব্যস্ত করে এটাকেই হিদায়াতপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘অতএব, তারা যদি ঈমান আনে তোমাদের ঈমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে।’ [বাকারা: ১৩৭] ইবনে আবু হাতেম রাহি. লিখেন, 'আল্লাহ তায়ালা তাদের রাসুলুল্লাহর সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করেছেন, তাদের আমাদের জন্য আদর্শ বানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্মানিত করেছেন এবং পরবর্তী সকলের জন্য আদর্শ বানিয়েছেন। তাদের তিনি সন্দেহ, মিথ্যা, ভুল, পারস্পরিক সমালোচনা ইত্যাদি থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।'

টিকাঃ
১. আল-মুসতাসফা, গাজালি (১২৫)।
২. নুজহাতুন নাজার, ইবনে হাজার (৬৯)।
৩. আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, সুযুতি (৩৮৪)।
৪. আল-জারহ ওয়াত তাদিল, ইবনে আবি হাতেম (১/৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাদের সমালোচনা নিষিদ্ধ

📄 সাহাবাদের সমালোচনা নিষিদ্ধ


সাহাবাদের ভালোবাসা প্রত্যেক মুমিনের উপর ওয়াজিব। আর সাহাবাদের ভালোবাসার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হচ্ছে তাদের কেবল উত্তম দিকগুলো আলোচনা করা; তাদের মাঝে যেসব বিবাদ, বিভেদ ও লড়াই হয়েছে, সেসব ব্যাপারে নীরব থাকা। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে জটিলতা দেখা দিয়েছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলো তারা দুনিয়ার জন্য করেননি; ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। উম্মাহর সকল ইমামের মতে প্রত্যেক মুসলিমের উপর সেসব ঘটনা নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব এবং সাহাবায়ে কেরামকে পরম সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করা আবশ্যক। এ কারণেই ইমাম তহাবি লিখেছেন, 'আমরা তাদের কেবল উত্তম পন্থায় স্মরণ করি।'
ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, 'তোমরা রাসুলের সাহাবাদের গালি দিয়ো না; কারণ আল্লাহ আমাদের তাদের জন্য ইসতিগফারের নির্দেশ দিয়েছেন, অথচ তিনি জানতেন যে, তারা নিজে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।'¹ কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর মুহাজির ও আনসারদের মাঝে যারা ইসলামে প্রথম ও অগ্রসর, আর যারা তাদের সত্যের সঙ্গে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।’ [তাওবা: ১০০] ইবনুস সালাহ লিখেন, 'সকল সাহাবির একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর তা হলো, তাদের কারও আদালত (সততা ও সত্যের উপর অবিচলতা) নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। এটা তাদের ব্যাপারে একটি মীমাংসিত সিদ্ধান্ত।'² ইমাম নববি লিখেন, 'আলি ও মুআবিয়া রাজি.-এর মাঝে যে দ্বন্দ্ব হয়েছিল, সেখানে আলি রাজি.-এর খেলাফত ছিল বিশুদ্ধ। অপরদিকে মুআবিয়াও আদেল সম্মানিত ও মর্যাদাময় সাহাবি। তারা সকলেই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে আহলে সুন্নাতের নির্ভরযোগ্য ইমামদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই দ্বন্দ্বের পরও তাদের সবার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।'³

টিকাঃ
১. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৭/১৩১৮)।
২. মুকাদ্দিমাতু ইবনিস সালাহ (২৯৫)।
৩. শরহে মুসলিম, নববি (১৫/১৪৯)।
৪. আল-বায়িসুল হাসিস, ইবনে কাসির (১৮১-১৮২)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 একটি সংশয় নিরসন

📄 একটি সংশয় নিরসন


প্রশ্ন হতে পারে, কেন সাহাবাদের মাঝে ঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দ্বন্দ্বের আলোচনা থেকে বিরত থাকতে হবে? এটা কি তাদের দোষ লুকানো নয়? স্রেফ লুকানোর জন্য কখনোই নয়। কারণ, আমাদের ইমামগণই এসব ইতিহাস সংরক্ষণ করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য মুসলমানদের ঈমান বাঁচানো। কারণ, সাধারণ একজন মুসলমান যখন আজ সেসব ঘটনা পড়বে, সে নিজের অজান্তেই সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ধীরে ধীরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়বে। একপর্যায়ে স্বয়ং কুরআন, রাসুলুল্লাহ, সুন্নাহ—এগুলোর প্রতিও অশ্রদ্ধা তৈরি হবে। অথচ সাহাবাগণ ছিলেন উম্মাহর সর্বাপেক্ষা পবিত্র মানুষ। তারা প্রবৃত্তির অনুসরণে যুদ্ধ করেননি, বরং কিছু বিষয়ে তাদের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তারা আবার পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছেন। আমাদের সালাফ সত্য লিখে বিভ্রান্তির দরজা আজীবনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন।
উমর ইবনে আবদুল আজিজ রাহি.-কে বলা হলো, জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধের ব্যাপারে যদি আপনার মতামত চাওয়া হয়, তবে কী বলবেন? তিনি বললেন, 'যে যুদ্ধে আমার হাত ডোবাইনি, তাতে আমার মুখ কেন ডোবাব?'¹ ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে আলি ও মুআবিয়ার মধ্যকার যুদ্ধের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন: ‘তারা এক সম্প্রদায় যারা অতীত হয়ে গেছে। তারা যা কামাই করেছে তা তাদের জন্য এবং তোমরা যা কামাই করেছ তা তোমাদের জন্য।’ [বাকারা: ১৩৪]²

টিকাঃ
১. আল-হুজ্জাহ ফি বায়ানিল মাহাজ্জাহ, কিওয়ামুস সুন্নাহ (২/৫৬৩)।
২. মানাকিবুল ইমাম আহমদ, ইবনুল জাওজি (২২১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 শিয়াদের সাহাবাবিদ্বেষ

📄 শিয়াদের সাহাবাবিদ্বেষ


শিয়াদের এই বিভ্রান্তির ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ আজ সজাগ নয়। শিয়া মতবাদ দাঁড়িয়েই আছে সাহাবাবিদ্বেষের উপর। তারা সাহাবাদের মুসলমানই মনে করে না; কাফের ও মুরতাদ মনে করে। উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আবু বকর ও উমর তাদের কাছে কাফের। আয়েশা ও আবু বকরকে তারা ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি মনে করে। শিয়ারা মনে করত শাইখাইন তথা আবু বকর ও উমর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারকে খেলাফত ও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা কি তা-ই? আবু বকর রাজি. খেলাফত দখল করেননি, বরং সাহাবাগণ সর্বসম্মতিক্রমে তাকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন।
আহলে বাইতের সদস্যদের অনেকেই আবু বকর, উমর ও আয়েশার নামে নাম রাখতেন—আলি রাজি.-এর ছেলের নাম ছিল আবু বকর; তাঁর আরেক ছেলের নাম ছিল উমর। বুখারিতে এসেছে, আলি রাজি.-কে তাঁর ছেলে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, রাসূলুল্লাহর পরে সর্বোত্তম মানুষ কে? তিনি বলেছিলেন, ‘আবু বকর।’¹ উমর রাজি. যখন ইন্তেকাল করেন, আলি রাজি. তাঁকে দেখতে আসেন এবং কাঁদেন।² এই ছিল তাদের প্রতি আহলে বাইতের দৃষ্টিভঙ্গি।

টিকাঃ
১. বুখারি (৩৬৭১); আবু দাঊদ (৪৬২৯)।
২. বুখারি (৩৬৮৫); ইবনে মাজা (৯৮)।
৩. রিজালুল কাশশি (১৮)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px