📄 আলি ইবনে আবু তালিব রাজি
আলি ইবনে আবু তালিব রাজি. (মৃ. ৪০ হি.): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও রাসুলুল্লাহর পরে চতুর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আলি ইবনে আবু তালিব রাজি.। কিশোর হিসেবে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই এবং তাঁর কলিজার টুকরা কন্যা ফাতিমার স্বামী। হিজরত করেন, রাসুলুল্লাহর সঙ্গে অসংখ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। তাকে বলেন, ‘আলি, মুসার কাছে হারুন যেমন, আমার কাছে তুমি তেমন। তবে আমার পরে কোনো নবি নেই।’¹ উসমান রাজি.-এর শাহাদাতের পরে তিনি সর্বসম্মতভাবে মুসলিম জাহানের খলিফা নিযুক্ত হন। প্রায় পাঁচ বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। উসমান রাজি-এর শাহাদাতের মাধ্যমে মুসলিম জাহানে যে অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, আলি রাজি.-এর শাসনামলে তা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে এবং আরও বৃদ্ধি পায়। চরম অস্থিরতাপূর্ণ সময়ে মুসলিম জাহানের দায়িত্ব নেওয়া সত্ত্বেও আলি রাজি. মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, জেল ও পুলিশ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো-সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্কার ও সমৃদ্ধি সাধন করেন। ৪০ হিজরিতে খারেজি ইবনে মুলজামের ছুরিকাঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। নাসেবি খারেজিদের কাছে এই নিকৃষ্ট হত্যাকারী আল্লাহর ওলি হিসেবে বরিত।
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৭০৬); মুসলিম (২৪০৪)।
২. তারিখে তাবারি (৫/১৪৩); আস-সিরাহ নববিয়্যাহ, ইবনে কাসির (২/৫৪৪)।
📄 খেলাফত: ইজতেহাদ না বাস্তবতা?
অনেকে মনে করেন, খেলাফত মুসলমানদের বাস্তব জীবনের ময়দান থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের একটি অংশমাত্র। ফলে ইতিহাসের বই থেকে এ সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়াই যথেষ্ট। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। খেলাফত ইতিহাসের বিষয় নয়, খেলাফত মুসলিম উম্মাহর আকিদা এবং তাদের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। আর এ কারণেই সালাফের অধিকাংশ আকিদার বইয়েই খেলাফত সম্পর্কে আলোচনা থাকে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, মুসলিম উম্মাহর কাছে খেলাফতের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা তত কমেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর এতগুলো প্রাচীন ও সমকালীন ব্যাখ্যাগ্রন্থের মাঝে কোনো ব্যাখ্যাগ্রন্থে খেলাফত নিয়ে কোনো আলোচনা অধমের চোখে পড়েনি। এর মাধ্যমেই উম্মাহর জীবনে খেলাফতের গুরুত্ব কতটা লঘু হয়ে গেছে সেটা অনুভব করা যায়। সাধারণ মুসলমান তো খেলাফত কী তাও জানে না। যারা শিক্ষিত, তারা গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ-সহ ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার অবিরাম প্রোপাগান্ডা ইত্যাদির ফলে খেলাফত-ফোবিয়ায় ভোগে, খেলাফতের বিরোধিতা করে। তারা নিজের অজান্তেই ইসলামের বিভিন্ন আকিদার বিরোধিতা করে।
📄 খেলাফতের অপরিহার্যতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে গত শতাব্দের প্রথম ভাগ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর অভিভাবক ছিলেন খলিফা। মুসলমানরা খলিফার অধীনে তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম বাস্তবায়ন করতেন। তাওহিদের গৌরব নিয়ে বিশ্বের সর্বত্র পতপত করে উড়ত খেলাফতের পতাকা। খলিফা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর সুরক্ষা নিশ্চিত করতেন। কিন্তু আজ এক শতাব্দের বেশি সময় মুসলিম জাতি খেলাফতবিহীন। ফলে অভিভাবকহীন, রাষ্ট্রহীন, ঠিকানাবিহীন।
আজকের মুসলিমরা খেলাফত ভুলে গেলেও ইহুদি-খ্রিষ্টান, শিয়া-রাফেজি-সহ ইসলামের কোনো শত্রু সেটা ভোলেনি। ফিলিস্তিন দখল, বাইতুল মাকদিস দখল, আফগানিস্তান-ইরাক-সিরিয়া-সহ বিভিন্ন ভূখণ্ডে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টানদের সামরিক আগ্রাসন—এগুলো সবই ক্রুসেড যুদ্ধ। খেলাফত ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর রক্ষাকবচ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইসলামকে জোড়াতালি দিয়ে রাখা যায়, কিন্তু ইসলাম ও মুসলিমদের স্বাভাবিক গৌরব, আল্লাহর দ্বীনের স্বাভাবিক ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইসলাম প্রচার করা যায়, কিন্তু ইসলামকে গালেব ও জাহের করা যায় না।
তাই মুসলমানদের জন্য খেলাফতের মতো একটি রব্বানি ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ততটা প্রয়োজন, যতটা তাদের বেঁচে থাকতে অক্সিজেনের প্রয়োজন। নাম যা-ই দেওয়া হোক, কিন্তু তা যেন গোটা পৃথিবীর মুসলমানদের এক প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি কোনো ইমামের হাতে বাইয়াতবিহীন অবস্থায় মারা গেল, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করল।'¹ ইমাম নববি লিখেছেন, 'আলিমদের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, সকল মুসলমানের উপর একজন খলিফা নিয়োগ দেওয়া ওয়াজিব।'²
কারি তৈয়ব সাহেব লিখেন, 'খেলাফত ইসলামের অন্যতম ভিত্তি, ইসলামের রাজনীতি ও সামাজিকতার খুঁটি। ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। যতদিন খেলাফত থাকবে, ইসলামের প্রভাব ও প্রতিপত্তি থাকবে, ইসলাম সুরক্ষিত থাকবে, হক বিজয়ী থাকবে। যদি খেলাফত না থাকে, তবে যার যা মন চায় ইসলামের সঙ্গে তা-ই করবে। প্রতিহত করার কেউ থাকবে না। ... পৃথিবীতে খেলাফত না থাকলে মুসলিম উম্মাহ বিশৃঙ্খল থাকবে, ইসলামের পূর্ণাঙ্গতাও বাস্তবায়িত হবে না...। সুতরাং খেলাফত কায়েমের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।'
টিকাঃ
১. ইবনে হিব্বান (৪৫৭৩); হাকেম (৪০২); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৭৩৭৫); বাজ্জার (৩৮১৭).
২. শরহে মুসলিম, নববি (১২/২০৫)।
৩. মাবানিল খিলাফাহ (১৫৯).
৪. কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (১৩৯-১৪০)।
📄 আশারায়ে মুবাশশারার শ্রেষ্ঠত্ব
আশারায়ে মুবাশশারা শব্দের অর্থ হলো সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন। তারা সেই সৌভাগ্যবান দশজন মানুষ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে থেকেই যাদের জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। ইসলামের সাধারণ নিয়ম হলো নির্ধারিত কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে জান্নাত ও জাহান্নামের সাক্ষ্য না দেওয়া। কারণ, প্রত্যেকের শেষ পরিণতি ও ভিতরের খবর আল্লাহ ভালো জানেন। কিন্তু তারা এর ব্যতিক্রম। স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবদুর রহমান ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আবু বকর জান্নাতে, উমর জান্নাতে, উসমান জান্নাতে, আলি জান্নাতে, তালহা জান্নাতে, জুবাইর জান্নাতে, আবদুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতে, সাদ জান্নাতে, সাইদ জান্নাতে, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ জান্নাতে।'¹ আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা অনিবার্য সত্য। ফলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ বিশ্বাস করে, উক্ত দশজন সাহাবি পরকালে সুনিশ্চিতভাবে জান্নাতি। আর এ কারণে তারা উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। ঘৃণ্য রাফেজিদের দুর্ভাগ্য যে, তারা উক্ত দশজনের মাঝে কেবল আলি রাজি. বাদে বাকি সবাইকে কাফের-ফাসেক মনে করে।
টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩৭৪৭); আবু দাউদ (৪৬৪৯); ইবনে মাজা (১৩৩)।