📄 উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি
উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি. (মৃ. ২৩ হি.): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি.। আবু বকর রাজি.-এর পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।¹ তিনি রাসুলুল্লাহর প্রায় বারো বছরের ছোট ছিলেন। কুরাইশের হাতেগোনা সাহসী ও বীরপুরুষদের একজন তিনি। তাঁর ইসলামগ্রহণ ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বিশাল অর্জন।² রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ে হাফসাকে বিবাহ করায় তিনি তাঁর শ্বশুর হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। আবু বকর রাজি.-এর যুগে তাঁর সর্বপ্রধান উপদেষ্টা ও সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। আবু বকর রাজি. মৃত্যুর সময় তাকে খলিফা নিযুক্ত করে যান। দশ বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। ইসলামি রাষ্ট্রের বিস্তৃতি, ইরাক, খোরাসান, আজারবাইজান, মকরান, শাম, মিশর, লিবিয়া, রোম ও পারস্যের বড় বড় বিজয়াভিযান, ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি সংহতকরণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সংস্কার, সুশাসন, ন্যায়-ভিত্তিক বিচার-ব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, ইসলামি আইন বাস্তবায়ন ও সুদৃঢ়করণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, আমির-উমারা ও রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের তদারকি, জ্ঞানের বিস্তার, প্রজাপালন, ইসলামি সমাজ ও সভ্যতার বিনির্মাণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি গুণে উমর রাজি. চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। উমর রাজি. আমাদের বাইতুল মাকদিস বিজেতাও। ২৩ হিজরিতে এক অগ্নিপূজারীর ছুরিকাঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন যে, কোনো মুসলিমের হাত তার রক্তে রঞ্জিত হয়নি।³ রাফেজিদের কাছে উমর রাজি.-এর হত্যাকারী এই নিকৃষ্ট একজন আল্লাহর ওলি হিসেবে বরিত।
টিকাঃ
১. ইবনে হিব্বান (৬৮৮৫)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৪৫১৩); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৮৮০৬)।
৩. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৮২২৯); আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৫৭৯)।
📄 উসমান ইবনে আফফান রাজি
উসমান ইবনে আফফান রাজি. (মৃ. ৩৫ হি.): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুযায়ী ইসলামের তৃতীয় খলিফা ও রাসুলুল্লাহর পরে তৃতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন উসমান ইবনে আফফান রাজি.। তাঁকে জুন-নুরাইন বলা হয়; কারণ, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই কন্যা রুকাইয়্যা এবং তাঁর মৃত্যুর পরে উম্মে কুলসুমকে বিবাহ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। ইসলামের প্রথম দিনগুলোতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, হিজরত করেন, রাসুলুল্লাহর সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উমর রাজি.-এর শাহাদাতের পরে আশারায়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত শীর্ষস্থানীয় সাহাবাদের পরামর্শক্রমে তিনি মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলিফা নিযুক্ত হন। প্রায় বারো বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামি রাষ্ট্রের বিস্তৃতি, আর্মেনিয়া, খোরাসান, আফ্রিকা, সাইপ্রাস বিজয়, ইসলামি নৌবহর তৈরি, অর্থনৈতিক সংস্কার-সহ বিভিন্ন অবদানে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাঁর অন্যতম ঋণ হলো কুরআন সংকলন চূড়ান্তকরণ। উসমান রাজি. ছিলেন শীর্ষস্থানীয় ধনী সাহাবাদের একজন। আল্লাহ তার সম্পদকে ইসলামের কাজে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় এবং তাঁর চলে যাওয়ার পরে মুসলিম উম্মাহ উসমানের সম্পদ দিয়ে যারপরনাই উপকৃত হয়েছে। উসমান রাজি.-এর স্বভাব-প্রকৃতি ছিল অত্যন্ত শান্ত, লাজুক, বিনয়ী ও ভদ্র। ৩৫ হিজরিতে একদল বিভ্রান্ত বিদ্রোহী এই বিনয়ী, ন্যায়নিষ্ঠ, জনদরদি শাসককে জুলুমের মাধ্যমে শহিদ করে দেয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগেই যা ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন।¹
টিকাঃ
১. মুসতাদরাকে হাকেম (৪৫৬৯); মুসনাদে আহমদ (২৪৮৯১)।
📄 আলি ইবনে আবু তালিব রাজি
আলি ইবনে আবু তালিব রাজি. (মৃ. ৪০ হি.): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী ইসলামের চতুর্থ খলিফা ও রাসুলুল্লাহর পরে চতুর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ আলি ইবনে আবু তালিব রাজি.। কিশোর হিসেবে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই এবং তাঁর কলিজার টুকরা কন্যা ফাতিমার স্বামী। হিজরত করেন, রাসুলুল্লাহর সঙ্গে অসংখ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। তাকে বলেন, ‘আলি, মুসার কাছে হারুন যেমন, আমার কাছে তুমি তেমন। তবে আমার পরে কোনো নবি নেই।’¹ উসমান রাজি.-এর শাহাদাতের পরে তিনি সর্বসম্মতভাবে মুসলিম জাহানের খলিফা নিযুক্ত হন। প্রায় পাঁচ বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। উসমান রাজি-এর শাহাদাতের মাধ্যমে মুসলিম জাহানে যে অস্থিরতার সূচনা হয়েছিল, আলি রাজি.-এর শাসনামলে তা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে এবং আরও বৃদ্ধি পায়। চরম অস্থিরতাপূর্ণ সময়ে মুসলিম জাহানের দায়িত্ব নেওয়া সত্ত্বেও আলি রাজি. মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, জেল ও পুলিশ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো-সহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্কার ও সমৃদ্ধি সাধন করেন। ৪০ হিজরিতে খারেজি ইবনে মুলজামের ছুরিকাঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। নাসেবি খারেজিদের কাছে এই নিকৃষ্ট হত্যাকারী আল্লাহর ওলি হিসেবে বরিত।
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৭০৬); মুসলিম (২৪০৪)।
২. তারিখে তাবারি (৫/১৪৩); আস-সিরাহ নববিয়্যাহ, ইবনে কাসির (২/৫৪৪)।
📄 খেলাফত: ইজতেহাদ না বাস্তবতা?
অনেকে মনে করেন, খেলাফত মুসলমানদের বাস্তব জীবনের ময়দান থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের একটি অংশমাত্র। ফলে ইতিহাসের বই থেকে এ সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়াই যথেষ্ট। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। খেলাফত ইতিহাসের বিষয় নয়, খেলাফত মুসলিম উম্মাহর আকিদা এবং তাদের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। আর এ কারণেই সালাফের অধিকাংশ আকিদার বইয়েই খেলাফত সম্পর্কে আলোচনা থাকে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, মুসলিম উম্মাহর কাছে খেলাফতের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা তত কমেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহর এতগুলো প্রাচীন ও সমকালীন ব্যাখ্যাগ্রন্থের মাঝে কোনো ব্যাখ্যাগ্রন্থে খেলাফত নিয়ে কোনো আলোচনা অধমের চোখে পড়েনি। এর মাধ্যমেই উম্মাহর জীবনে খেলাফতের গুরুত্ব কতটা লঘু হয়ে গেছে সেটা অনুভব করা যায়। সাধারণ মুসলমান তো খেলাফত কী তাও জানে না। যারা শিক্ষিত, তারা গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ-সহ ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার অবিরাম প্রোপাগান্ডা ইত্যাদির ফলে খেলাফত-ফোবিয়ায় ভোগে, খেলাফতের বিরোধিতা করে। তারা নিজের অজান্তেই ইসলামের বিভিন্ন আকিদার বিরোধিতা করে।