📄 সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ কেন?
এক. সাহাবাগণ কুরআন সংরক্ষণ করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সাহাবাগণ সুন্নাহ সংরক্ষণ করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ফলে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা মূলত কুরআন-সুন্নাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখা; তাদের সন্দেহ করা মূলত কুরআন-সুন্নাহর মাঝে সন্দেহ করা। কারণ, তারাই কুরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক। তাদের প্রতি বিদ্বেষ রেখে কুরআন-সুন্নাহকে ভালোবাসা যায় না। দুই. তারা রাসুলুল্লাহর সঙ্গী, তাঁর মেহনত ও মুজাহাদার প্রথম ফল ও ফসল। ফলে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা মূলত রাসুলুল্লাহ ও তাঁর দাওয়াতের প্রতি বিদ্বেষ রাখা। স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুমিন আনসারদের ভালোবাসে, কেবল মুনাফিক তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে।¹ তিন. কুরআন-সুন্নাহে সাহাবায়ে কেরামের সকলের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির ঘোষণা এসেছে। সুতরাং সকল সাহাবার প্রতি বিদ্বেষ রাখা মানে কুরআনের সেসব আয়াত এবং সেসব সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করা। আর এটা সুস্পষ্ট কুফর। চার. সাহাবাদের ত্যাগ, কুরবানি এবং কুরআন-সুন্নাহে তাদের এত প্রশংসা দেখার পরে কোনো মুমিন সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখতে পারে না। ফলে যে ব্যক্তি সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, বোঝা যায়, সে মূলত ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, রাসুলুল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখে। কিন্তু ইসলাম বা রাসুলুল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ যেহেতু মুখে প্রকাশ করার সাহস পায় না, তাই সাহাবাদের সমালোচনা করে, যাতে স্বয়ং কুরআন-সুন্নাহর সমালোচনার পথ উন্মুক্ত হয়। কারণ, সাহাবায়ে কেরামের 'আদালত' নষ্ট হয়ে গেলে কুরআন-সুন্নাহ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ইসলামি শরিয়ত্-এর ভিত ভেঙে যায়। আর এমন হলে তখন কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই বলা সম্ভব হয়। ফলে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা একদিকে কুফর, অন্যদিকে নিফাক। কুফর কারণ সে মনে মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ রাখে। নিফাক এ জন্য যে, মুখে সেটা প্রকাশ করে না। এ জন্য ইমাম তহাবি সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষকে কুফর ও নিফাক দুটোই বলেছেন।
ইমাম আবু জরআ বলেন, 'যখন কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করতে দেখবে, তখন বুঝবে সে একটা জিন্দিক। কারণ, আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে সত্য, কুরআন সত্য; কিন্তু তা আমাদের কাছে পৌঁছেছে সাহাবাদের মাধ্যমে। তারা আল্লাহর রাসুলের সাহাবাদের সমালোচনা করে মূলত কুরআন ও সুন্নাহকে বাতিল করার জন্য; অথচ সেসব সমালোচক অধিক সমালোচনার উপযুক্ত। তারা জিন্দিক।'² ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, 'যদি কাউকে রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করতে দেখো, তবে তার ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আছে তোমার।'³
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৭৮৩); মুসলিম (৭৫)।
২. আল-কিফায়াহ, খতিবে বাগদাদি (৪৯)।
৩. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৭/১৩২৬)।
📄 খুলাফায়ে রাশেদিনের শ্রেষ্ঠত্ব
খলিফা অর্থ স্থলাভিষিক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে যেসব সাহাবা মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের জন্য তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তাদের খুলাফায়ে রাশেদুন বা পথপ্রাপ্ত খলিফা বলা হয়। তারা হলেন: আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনুল খাত্তাব, উসমান ইবনে আফফান এবং আলি ইবনে আবু তালিব রাজি.। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নাম ও কালের ধারাবাহিকতা অনুক্রমেই। তারা সকলে নবি-রাসুলদের পরে মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। মাত্র ত্রিশ বছরে তারা রাসুলুল্লাহর রেখে যাওয়া দ্বীনকে অর্ধ পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন, মদিনার ছোট্ট রাষ্ট্রটিকে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। নিষ্ঠা, তাকওয়া, ন্যায়-ইনসাফ, পরোপকারিতা, জনহিতৈষণা, রাষ্ট্রশৃঙ্খলা, জ্ঞানগত বিকাশ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—মোট কথা, জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তারা পূর্ণাঙ্গতা ও শ্রেষ্ঠত্বের যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন, তা মানব ইতিহাসে বিরল। ফলে ইসলামের চৌদ্দশো বছরের মাঝে আজও খেলাফতে রাশেদার ত্রিশ বছর সর্বশ্রেষ্ঠ সোনালি যুগ, মুসলমানদের স্বপ্নের যুগ, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় যুগ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে উক্ত যুগের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমার উম্মতের মাঝে খেলাফত থাকবে ত্রিশ বছর; অতঃপর আসবে রাজতন্ত্র।'¹ আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, 'নবুওতের খেলাফত অব্যাহত থাকবে ত্রিশ বছর; অতঃপর আল্লাহ যাকে চান রাজত্ব দান করবেন।'²
ওফাতের আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেলাফতে রাশেদার আদর্শকে আঁকড়ে ধরার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইরবাজ ইবনে সারিয়া রাজি. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে। দায়িত্বশীল যদি একজন হাবশি দাসও হয়, তার আনুগত্য করবে। তোমরা আমার পরে প্রচণ্ড মতানৈক্য দেখতে পাবে। তাই আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো। দাঁতে কামড়ে সেগুলো ধরে রাখো। সকল সব-উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান থাকো। কারণ, প্রত্যেকটা বিদআত গোমরাহি।'³ আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমার পরে তোমরা আবু বকর ও উমরের আনুগত্য করো।'⁴
মুআবিয়া রাজি. ইসলামের প্রথম রাজা (ও খলিফা)। তিনি একজন বড় মাপের সাহাবি এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠ শাসকদের একজন। এটাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন।⁵
টিকাঃ
১. তিরমিজি (২২২৬)।
২. আবু দাউদ (৪৬৪৬)।
৩. ইবনে মাজা (৪২)।
৪. তিরমিজি (৩৬৬২); মুসনাদে হুমাইদি (৪৫৪); বাজ্জার (২৮২৭); হাকেম (৪৪৮১)।
৫. দারেমি (২১৪৬); তয়ালিসি (২২৫)।
📄 আবু বকর সিদ্দিক রাজি
আবু বকর সিদ্দিক রাজি. (মৃ. ১৩ হি.): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী ইসলামের প্রথম খলিফা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন আবু বকর রাজি.। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে প্রায় দুই বছরের ছোট ছিলেন, জীবনের শুরু থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাসুলুল্লাহর প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিলেন, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মাঝে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাঁর দাওয়াতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের কমপক্ষে পাঁচজন ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি রাসুলের সঙ্গে হিজরত করেছেন। [তাওবা: ৪০] সকল যুদ্ধে, সুখে ও দুঃখে তাঁর পাশে পরম বন্ধু হয়ে থেকেছেন।¹ তাঁর কন্যা আয়েশা রাজি.-কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করার মাধ্যমে তিনি রাসুলের শ্বশুর হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। রাসুলের জীবদ্দশায় ইমাম হয়ে নামাজ পড়িয়েছেন। বিভিন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে রাসুলও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বুঝিয়েছেন।² এ জন্য রাসুলের ওফাতের পরে সাহাবাদের সর্বসম্মত পরামর্শক্রমে তিনি মুসলিম উম্মাহর খলিফা নিযুক্ত হন। প্রায় দুই বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে হিজরি ১৩ সনে স্বাভাবিকভাবে ওফাত লাভ করেন। ছিপছিপে গড়নের এই মানুষটি একদিকে দৃঢ় ঈমান, গভীর তাকওয়া, অসীম ইখলাস এবং বিনয়ের সমুদ্র ছিলেন, অপরদিকে মুরতাদ ও মিথ্যা নবুওতের দাবিদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ইরাক ও শামে ইসলামের বিজয়াভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়সংকল্প।
রাসুলুল্লাহর পরে ইসলামকে সুসংহতকরণ, শক্তিশালী ইসলামি কল্যাণকর রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন, মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বমঞ্চে একটি অপরাজেয় জাতি হিসেবে উপস্থাপন, আল্লাহর কুরআন সংকলন ইত্যাদি-সহ অসংখ্য বৈশিষ্ট্যের কারণে আজও তিনি ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর দুই বছর কয়েক মাসের খেলাফত শত বছরের চেয়ে বেশি বরকতপূর্ণ ছিল।³
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৬৫৬); মুসলিম (২৩৮৩)।
২. বুখারি (৩৬৫৯, ৩৬৬২, ৩৯০৪); মুসলিম (২৩৮২, ২৩৮৪); তিরমিজি (৩৬৭৬)।
৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির (৭/৩৮)।
📄 উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি
উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি. (মৃ. ২৩ হি.): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা অনুযায়ী ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে দ্বিতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি.। আবু বকর রাজি.-এর পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।¹ তিনি রাসুলুল্লাহর প্রায় বারো বছরের ছোট ছিলেন। কুরাইশের হাতেগোনা সাহসী ও বীরপুরুষদের একজন তিনি। তাঁর ইসলামগ্রহণ ছিল ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বিশাল অর্জন।² রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ে হাফসাকে বিবাহ করায় তিনি তাঁর শ্বশুর হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। আবু বকর রাজি.-এর যুগে তাঁর সর্বপ্রধান উপদেষ্টা ও সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। আবু বকর রাজি. মৃত্যুর সময় তাকে খলিফা নিযুক্ত করে যান। দশ বছর খেলাফত পরিচালনা করেন। ইসলামি রাষ্ট্রের বিস্তৃতি, ইরাক, খোরাসান, আজারবাইজান, মকরান, শাম, মিশর, লিবিয়া, রোম ও পারস্যের বড় বড় বিজয়াভিযান, ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি সংহতকরণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সংস্কার, সুশাসন, ন্যায়-ভিত্তিক বিচার-ব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, ইসলামি আইন বাস্তবায়ন ও সুদৃঢ়করণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, আমির-উমারা ও রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের তদারকি, জ্ঞানের বিস্তার, প্রজাপালন, ইসলামি সমাজ ও সভ্যতার বিনির্মাণ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি গুণে উমর রাজি. চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। উমর রাজি. আমাদের বাইতুল মাকদিস বিজেতাও। ২৩ হিজরিতে এক অগ্নিপূজারীর ছুরিকাঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন যে, কোনো মুসলিমের হাত তার রক্তে রঞ্জিত হয়নি।³ রাফেজিদের কাছে উমর রাজি.-এর হত্যাকারী এই নিকৃষ্ট একজন আল্লাহর ওলি হিসেবে বরিত।
টিকাঃ
১. ইবনে হিব্বান (৬৮৮৫)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৪৫১৩); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৮৮০৬)।
৩. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৮২২৯); আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৫৭৯)।