📄 বিশেষ কোনো সাহাবির ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি না করা
ইমাম তহাবির উক্ত বক্তব্য শিয়াদের খণ্ডনে। যেহেতু সাহাবায়ে কেরামের স্তরভেদ সুস্পষ্ট এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাও বিভিন্ন পর্যায়ে, ফলে সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসায়ও তারতম্য হবে—এটাই স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ আবু বকর, উমর, উসমান, আলি রাজি.-এর প্রতি যে ভালোবাসা ও সম্মান থাকবে, সেটা অন্যদের প্রতি নাও থাকতে পারে। কারণ, ইসলামে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। একইভাবে আহলে বাইত তথা রাসুলুল্লাহর পরিবার, স্ত্রী-কন্যা ও দৌহিত্রদের প্রতি যতটা আগ্রহ থাকবে, অন্যান্য সাহাবার পরিবারের প্রতি ততটা আগ্রহ থাকবে না—এটা স্বাভাবিক। এটা প্রাকৃতিক এবং শরিয়তবিরুদ্ধ নয়। তবে শরিয়তবিরুদ্ধ হলো বিশেষ কোনো সাহাবির ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা, বিশেষ কাউকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা। কারণ, সেটা তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ যারা তাদের অবমাননার শামিল, কুরআন-সন্নাহর আলোকে সাহাবাদের মর্যাদাগত তফাতকে অস্বীকারের অন্তর্ভুক্ত। বরং এটাই যুগে যুগে ফিরকাবাজির জন্ম দিয়েছে; দু-একজন সাহাবি বাদ দিয়ে অন্য সকলের প্রতি বিদ্বেষ রাখার পথ সুগম করেছে। এটা ভয়ংকর ফাঁদ। শিয়ারা এ ফাঁদেই আটকে গেছে।
আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী উসমান রাজি. তৃতীয় এবং চুতর্থ স্থানে থাকেন আলি রাজি.; কিন্তু তারা সবাই মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। কেউ যদি আলি রাজি.-কে উসমান রাজি.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে সে সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের বিরোধিতা করল। কিন্তু এ জন্য তাকে আমরা বিদআতি বা শিয়া বলব না, যেহেতু সালাফের কারও কারও থেকে এমন বক্তব্য পাওয়া যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এমন বক্তব্য ঘৃণা করতেন, তথাপি এমন ব্যক্তিকে বিদআতি বলতেন না। জাহাবি লিখেন, আলি রাজি.-কে উসমান রাজি.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বললে সে বিদআতি বা রাফেজি হবে না। কারণ, অনেকে এমন কথা বলেছেন। তারা দুজনই সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। ইলম ও মর্যাদার ক্ষেত্রে দুজন কাছাকাছি। হতে পারে আখিরাতে তারা দুজন বরাবর থাকবেন। দুজনেই শহিদদের প্রথম সারিতে থাকবেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফ উসমান রাজি.-কে আলি রাজি.-এর চেয়ে অগ্রে রাখেন; আমরাও তা-ই করি।
তিন খলিফাকে এড়িয়ে সারা দিন আলিকে নিয়ে পড়ে থাকা, আবু বকর ও উমরের নাম দায়সারাভাবে উচ্চারণ করে আলির নামের শুরুতে 'মাওলা' লাগানো, শেষে 'আলাইহিস সালাম' লাগানো, সারা দিন 'মাওলা আলি', 'আলি মাওলা' জপা আর 'ইয়া আলি' লেখা টুপি পরে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি আহলে সুন্নাতের আকিদা ও রীতি নয়। এগুলো হচ্ছে দ্বীনের নামে বাড়াবাড়ি। এগুলো ভ্রান্ত শিয়া সম্প্রদায়ের আকিদা ও প্রথা, যারা কুরআন-সুন্নাহ ছুড়ে ফেলে তাদের প্রবৃত্তিকে দ্বীন বানিয়ে নিয়েছে। কারণ, তাদের প্রকৃত ভালোবাসা যদি আল্লাহর রাসুল, তাঁর সাহাবি এবং পরিবারকেন্দ্রিক হতো, তবে প্রথম তিনজন বাদ দিয়ে চতুর্থ জনকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করত না; নবিপরিবারের সকল স্ত্রী ও অন্য কন্যাদের বাদ দিয়ে কেবল ফাতিমা ও হুসাইন রাজি.-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করত না। আমরা পিছনে বলে এসেছি, কোনো সাহাবিকে বিশেষভাবে ভালোবাসা নিষেধ নয়, কিন্তু বাড়াবাড়ি নিষেধ। আহলে সুন্নাতের চৌদ্দশো বছরের ইতিহাসে কেউ আলি রাজি., ফাতিমা ও হুসাইন রাজি.-কে নিয়ে এভাবে বাড়াবাড়ি করেনি যা শিয়ারা করেছে। দুঃখজনকভাবে এখন আহলে সুন্নাতের অনেকের মাঝেও তাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এগুলোর কারণে তাদের শিয়া বলা যায় না। তবে এই বাড়াবাড়ির পরিণতি শিয়াদের ফাঁদে ফেঁসে যাওয়া।
টিকাঃ
১. তুর্কিস্তানি (১৭০); আকহাসারি (২৩৯)।
২. আস-সুন্নাহ, খাল্লাল (২/৩৮১)।
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা (১/৭৬)।
📄 সাহাবাবিদ্বেষ কুফর ও নিফাক
আহলে বাইতকে নিয়ে শিয়াদের অতিরঞ্জনের স্বাভাবিক ফলাফল ছিল রাসুলুল্লাহর অন্যান্য সাহাবির প্রতি বিদ্বেষ রাখা। এ কারণে শিয়াদের অসংখ্য সম্প্রদায় কয়েকজন সাহাবি বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে কাফের মনে করে। অনেকে কাফের মনে না করলেও নিশ্চিতভাবে ফাসেক মনে করে। সাহাবাদের মাঝে নবিপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাদের রাজনৈতিক জটিলতা ও বিভিন্ন কারণে মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল, সেসব সাহাবাকে তারা মুরতাদ মনে করে। এ কারণেই আহলে সুন্নাতের ইমামগণ সাহাবাবিদ্বেষকে কুফর ও নিফাক আখ্যা দিয়েছেন। এটা দ্বারা তারা খারেজি-নাসেবি-সহ অনেক সম্প্রদায় উদ্দেশ্য নিলেও মূলত শিয়ারাই প্রধান উদ্দেশ্য। তারাই আহলে বাইতের ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে অন্যান্য সাহাবার প্রতি বিদ্বেষ রাখে।
ইমাম তহাবি যেন এখানে ভ্রান্ত শিয়াদেরই খণ্ডন করেছেন। তার বক্তব্য দেখুন: 'আমরা রাসুলুল্লাহর সকল সাহাবাকে ভালোবাসি। কারও ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করি না। কারও থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করি না। যারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, তাদের মন্দ আলোচনা করে, আমরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখি। আমরা তাদের কেবল উত্তম পন্থায় স্মরণ করি। তাদের ভালোবাসাকে দ্বীন, ঈমান ও ইহসান আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখাকে কুফর, নিফাক ও সীমালঙ্ঘন মনে করি।' ইমাম তহাবি রাহি. বেশ সচেতনভাবেই সাহাবাদের ভালোবাসার পরে কারও প্রতি ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন, যা শিয়ারা আহলে বাইতের ক্ষেত্রে করে। এর পরই অন্য কোনো সাহাবি থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করতে, তাদের মন্দ আলোচনা করতে এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখতে নিষেধ করেছেন, যা শিয়া মতবাদের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন আমার সাহাবাদের আলোচনা আসে, তখন (তাদের সমালোচনা থেকে) বিরত থাকো।'¹ আরেক হাদিসে বলেছেন, 'আনসারদের কেবল মুমিনরাই ভালোবাসে, আর তাদের কেবল মুনাফিকরাই ঘৃণা করে। যে ব্যক্তি তাদের ভালোবাসবে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন। যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, আল্লাহ তার প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন।'² অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি আমার সাহাবাদের গালি দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সকল মানুষের অভিশাপ।'³
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিয়ো না। আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবে তাদের এক মুষ্টি কিংবা অর্ধেক মুষ্টি সমান পুণ্যও লাভ করতে পারবে না।'⁴ ইমাম নববি উক্ত অধ্যায়ের শিরোনাম লিখেছেন, 'সাহাবাদের গালি দেওয়া হারাম'।
আরেক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সাবধান! আমি আমার সাহাবাদের ব্যাপারে তোমাদের সাবধান করছি। আমার পরে তাদের তোমরা (আক্রমণের) লক্ষ্যস্থল হিসেবে স্থির করো না। যে তাদের ভালোবাসবে, সে আমার ভালোবাসার কারণেই তাদের ভালোবাসবে; আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, আমার প্রতি বিদ্বেষের কারণেই সে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে; আর যে তাদের কষ্ট দিলো, সে যেন আমাকে কষ্ট দিলো; আর যে আমাকে কষ্ট দিলো, সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিলো; আর যে আল্লাহ কষ্ট দেবে, আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।'⁵
টিকাঃ
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৪২৭, ১০৪৪৮)।
২. বুখারি (৩৭৮৩); মুসলিম (৭৫)।
৩. মুসন্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৩০৮৬); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১২৭০৯); বাজ্জার (৫৭৫৩)।
৪. বুখারি (৩৬৭৩); মুসলিম (২৫৪০); তিরমিজি (৩৮৬১); আবু দাউদ (৪৬৫৮)।
৫. তিরমিজি (৩৮৬২); ইবনে হিব্বান (৭২৫৬); মুসনাদে আহমদ (২০৮৭৯)।
📄 সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ কেন?
এক. সাহাবাগণ কুরআন সংরক্ষণ করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সাহাবাগণ সুন্নাহ সংরক্ষণ করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ফলে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা মূলত কুরআন-সুন্নাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখা; তাদের সন্দেহ করা মূলত কুরআন-সুন্নাহর মাঝে সন্দেহ করা। কারণ, তারাই কুরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক। তাদের প্রতি বিদ্বেষ রেখে কুরআন-সুন্নাহকে ভালোবাসা যায় না। দুই. তারা রাসুলুল্লাহর সঙ্গী, তাঁর মেহনত ও মুজাহাদার প্রথম ফল ও ফসল। ফলে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা মূলত রাসুলুল্লাহ ও তাঁর দাওয়াতের প্রতি বিদ্বেষ রাখা। স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুমিন আনসারদের ভালোবাসে, কেবল মুনাফিক তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে।¹ তিন. কুরআন-সুন্নাহে সাহাবায়ে কেরামের সকলের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির ঘোষণা এসেছে। সুতরাং সকল সাহাবার প্রতি বিদ্বেষ রাখা মানে কুরআনের সেসব আয়াত এবং সেসব সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করা। আর এটা সুস্পষ্ট কুফর। চার. সাহাবাদের ত্যাগ, কুরবানি এবং কুরআন-সুন্নাহে তাদের এত প্রশংসা দেখার পরে কোনো মুমিন সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখতে পারে না। ফলে যে ব্যক্তি সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, বোঝা যায়, সে মূলত ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, রাসুলুল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ রাখে। কিন্তু ইসলাম বা রাসুলুল্লাহর প্রতি বিদ্বেষ যেহেতু মুখে প্রকাশ করার সাহস পায় না, তাই সাহাবাদের সমালোচনা করে, যাতে স্বয়ং কুরআন-সুন্নাহর সমালোচনার পথ উন্মুক্ত হয়। কারণ, সাহাবায়ে কেরামের 'আদালত' নষ্ট হয়ে গেলে কুরআন-সুন্নাহ প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ইসলামি শরিয়ত্-এর ভিত ভেঙে যায়। আর এমন হলে তখন কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই বলা সম্ভব হয়। ফলে সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা একদিকে কুফর, অন্যদিকে নিফাক। কুফর কারণ সে মনে মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ রাখে। নিফাক এ জন্য যে, মুখে সেটা প্রকাশ করে না। এ জন্য ইমাম তহাবি সাহাবাদের প্রতি বিদ্বেষকে কুফর ও নিফাক দুটোই বলেছেন।
ইমাম আবু জরআ বলেন, 'যখন কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করতে দেখবে, তখন বুঝবে সে একটা জিন্দিক। কারণ, আল্লাহর রাসুল আমাদের কাছে সত্য, কুরআন সত্য; কিন্তু তা আমাদের কাছে পৌঁছেছে সাহাবাদের মাধ্যমে। তারা আল্লাহর রাসুলের সাহাবাদের সমালোচনা করে মূলত কুরআন ও সুন্নাহকে বাতিল করার জন্য; অথচ সেসব সমালোচক অধিক সমালোচনার উপযুক্ত। তারা জিন্দিক।'² ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, 'যদি কাউকে রাসুলের কোনো সাহাবির সমালোচনা করতে দেখো, তবে তার ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আছে তোমার।'³
টিকাঃ
১. বুখারি (৩৭৮৩); মুসলিম (৭৫)।
২. আল-কিফায়াহ, খতিবে বাগদাদি (৪৯)।
৩. শরহুস সুন্নাহ, লালাকায়ি (৭/১৩২৬)।
📄 খুলাফায়ে রাশেদিনের শ্রেষ্ঠত্ব
খলিফা অর্থ স্থলাভিষিক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পরে যেসব সাহাবা মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের জন্য তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তাদের খুলাফায়ে রাশেদুন বা পথপ্রাপ্ত খলিফা বলা হয়। তারা হলেন: আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনুল খাত্তাব, উসমান ইবনে আফফান এবং আলি ইবনে আবু তালিব রাজি.। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নাম ও কালের ধারাবাহিকতা অনুক্রমেই। তারা সকলে নবি-রাসুলদের পরে মুসলিম উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। মাত্র ত্রিশ বছরে তারা রাসুলুল্লাহর রেখে যাওয়া দ্বীনকে অর্ধ পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন, মদিনার ছোট্ট রাষ্ট্রটিকে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। নিষ্ঠা, তাকওয়া, ন্যায়-ইনসাফ, পরোপকারিতা, জনহিতৈষণা, রাষ্ট্রশৃঙ্খলা, জ্ঞানগত বিকাশ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—মোট কথা, জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তারা পূর্ণাঙ্গতা ও শ্রেষ্ঠত্বের যে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন, তা মানব ইতিহাসে বিরল। ফলে ইসলামের চৌদ্দশো বছরের মাঝে আজও খেলাফতে রাশেদার ত্রিশ বছর সর্বশ্রেষ্ঠ সোনালি যুগ, মুসলমানদের স্বপ্নের যুগ, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় যুগ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে উক্ত যুগের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমার উম্মতের মাঝে খেলাফত থাকবে ত্রিশ বছর; অতঃপর আসবে রাজতন্ত্র।'¹ আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, 'নবুওতের খেলাফত অব্যাহত থাকবে ত্রিশ বছর; অতঃপর আল্লাহ যাকে চান রাজত্ব দান করবেন।'²
ওফাতের আগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেলাফতে রাশেদার আদর্শকে আঁকড়ে ধরার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। ইরবাজ ইবনে সারিয়া রাজি. বলেন, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে। দায়িত্বশীল যদি একজন হাবশি দাসও হয়, তার আনুগত্য করবে। তোমরা আমার পরে প্রচণ্ড মতানৈক্য দেখতে পাবে। তাই আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরো। দাঁতে কামড়ে সেগুলো ধরে রাখো। সকল সব-উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান থাকো। কারণ, প্রত্যেকটা বিদআত গোমরাহি।'³ আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমার পরে তোমরা আবু বকর ও উমরের আনুগত্য করো।'⁴
মুআবিয়া রাজি. ইসলামের প্রথম রাজা (ও খলিফা)। তিনি একজন বড় মাপের সাহাবি এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠ শাসকদের একজন। এটাও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছেন।⁵
টিকাঃ
১. তিরমিজি (২২২৬)।
২. আবু দাউদ (৪৬৪৬)।
৩. ইবনে মাজা (৪২)।
৪. তিরমিজি (৩৬৬২); মুসনাদে হুমাইদি (৪৫৪); বাজ্জার (২৮২৭); হাকেম (৪৪৮১)।
৫. দারেমি (২১৪৬); তয়ালিসি (২২৫)।