📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাদের পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য

📄 সাহাবাদের পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য


সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুমিনের উপর ওয়াজিব। সকল সাহাবিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়াও প্রত্যেক মুমিনের উপর অপরিহার্য। তবে সকল সাহাবির প্রতি সমান ভালোবাসা ও আকর্ষণ থাকা জরুরি নয়। কারণ, সকল সাহাবির মর্যাদা সমস্তরে নয়। পিছনে নবি-রাসুলদের ক্ষেত্রে আমরা যা উল্লেখ করেছি, এখানেও একই মূলনীতি প্রযোজ্য। অর্থাৎ সাহাবি হিসেবে প্রত্যেক সাহাবি আমাদের সম্মান, মর্যাদা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পাবার উপযুক্ত। কিন্তু তাদের সবাই সমস্তরে নয়। বরং প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিষ্ঠা, কুরবানি, রাসুলের ভালোবাসা ও সান্নিধ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত।
স্বয়ং কুরআনেও আল্লাহ তায়ালা তাদের মর্যাদার মাঝে পার্থক্য করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে কেন ব্যয় করছ না যখন আল্লাহর জন্যই আকাশসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকার? তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে, সে (পরবর্তী লোকদের সঙ্গে) সমান নয়। তাদের মর্যাদা অনেক বেশি তাদের অপেক্ষা যারা (বিজয়ের) পরে ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।’ [হাদিদ: ১০] উক্ত আয়াতে আল্লাহ হুদাইবিয়ার সন্ধি অথবা মক্কা বিজয়ের ঘটনার আগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাদের হুদাইবিয়া/মক্কা বিজয়ের পরে ইসলামগ্রহণকারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, আয়াতের শেষাংশে সবার জন্য আল্লাহ কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের মাঝে কারও মর্যাদা কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেও সার্বিকভাবে সকল সাহাবি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। অন্য আয়াতে আল্লাহ প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী মুজাহির ও আনসার সাহাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রসঙ্গে বলেন, ‘আর মুহাজির ও আনসারদের মাঝে যারা ইসলামে প্রথম ও অগ্রসর, আর যারা তাদের সত্যের সঙ্গে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হলো সবচেয়ে বড় সাফল্য।’ [তাওবা: ১০০]
অসংখ্য হাদিসে অনেক সাহাবির শ্রেষ্ঠত্বের কথা এসেছে, যা অন্যদের ব্যাপারে আসেনি। তা ছাড়া ইসলামের জন্য সবার ত্যাগ সমান নয়, রাসুলুল্লাহর সঙ্গে সবার সম্পর্ক সমান গভীর নয়, তাঁর সঙ্গে কাটানো সময় সবার জন্য সমান নয়। কেউ রাসুলুল্লাহর হাতে সর্বপ্রথম মুসলমান হয়েছেন, সারা জীবন তাঁর সঙ্গে সকল দাওয়াত ও জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন, সম্পদ বিসর্জন দিয়েছেন, রাসুলুল্লাহর ইন্তিকালের পরেও তার দাওয়াত ও উম্মতের পিছনে জীবন ব্যয় করেছেন, তা হলে বিদায় হজ কিংবা অন্য যেকোনো সময় রাসুলুল্লাহকে এক নজর দেখা সাহাবি তার সমান হতে পারেন? কখনোই নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন আবু বকর, অতঃপর উমর, অতঃপর উসমান, অতঃপর আলি। তাদের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আশারায়ে মুবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের বাকি ছয়জন সাহাবা। তারা উম্মতের বাকি সবার চেয়ে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বশ্রেষ্ঠ। অতঃপর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছেন।¹ অতঃপর হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ।
বুখারিতে ইবনে উমর রাজি.-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য এসেছে এভাবে: নবিজির যুগে আমরা মানুষের মাঝে উত্তম কারা কারা সেটা বলতাম। আমরা সর্বোত্তম বলতাম আবু বকর রাজি.-কে, অতঃপর উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি.-কে, অতঃপর উসমান ইবনে আফফান রাজি.-কে।² অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো শুনতেন, কিন্তু আমাদের নিষেধ করতেন না।³ অন্য বর্ণনায় ইবনে উমর রাজি. থেকেই উক্ত তিনজনের পরে আলি রাজি.-এর নাম এসেছে।⁴
দশজন সাহাবিকে তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। সবার ক্ষেত্রে এই সুসংবাদ থাকলেও সুনির্ধারিতভাবে নেই। ফলে তারা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আহলে বদর ও আহলে হুদাইবিয়ার জন্য তিনি বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিয়েছেন, যা অন্যদের ক্ষেত্রে দেননি। ফলে অন্যদের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এটাই পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদায় পরিণত হয়। বাগদাদি লিখেন এবং এটা আহলে সুন্নাতের সকল ইমামের মত, আমরা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন চার খলিফা, অতঃপর জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বাকি ছয়জন। তারা হলেন: তালহা, জুবাইর, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সাইদ ইবনে জায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, অতঃপর বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ, অতঃপর হুদাইবিয়ার বাইআতুর রিজওয়ানে অংশগ্রহণকারীগণ।⁵ ইবনে হাজার আসকালানি লিখেন: উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলি, অতঃপর জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন, অতঃপর বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ।⁶

টিকাঃ
১. বুখারি (৩০০৭, ৬২৫৯); মুসলিম (২৪৯৪)।
২. বুখারি (৩৬৫৫); ইবনে হিব্বান (৭২৫০); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৩১৩২)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৩১৩২); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৫৬০১)।
৪. মুসনাদে আবু ইয়ালা (৫৬০১); শরহু মুশকিলিল আসার (৩৫৫৯)।
৫. উসুলুদ্দিন, বাগদাদি (৩০৪)।
৬. ফাতহুল বারি (৭/৫৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 নবী সাহাবাদের মর্যাদার তারতম্য

📄 নবী সাহাবাদের মর্যাদার তারতম্য


নারী সাহাবাদের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের (স্ত্রী-কন্যা) মর্যাদা অন্য সকল নারীর উপরে। এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহর পরিবারকে অন্য সকল নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে বলেন, ‘হে নবিপত্নীগণ, তোমরা অন্য নারীদের মতো নও যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তাই পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না। তাতে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। বরং তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।’ [আহজাব: ৩২] ইবনে আব্বাস রাজি. উক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন, 'অর্থাৎ আমার কাছে তোমাদের মর্যাদা অন্য পুণ্যবতী নারীদের মতো নয়; তোমরা আমার কাছে তাদের চেয়ে অধিকতর মর্যাদাময় এবং অধিকতর পুণ্যের অধিকারী।'
তাই আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মতিক্রমে রাসুলের পরিবারবর্গ সাধারণভাবে সকল নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাদের মাঝে খাদিজা, আয়েশা ও ফাতিমা রাজি. সর্বশ্রেষ্ঠ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নারীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ। নারীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে মারইয়াম বিনতে ইমরান (ঈসা আলাইহিস সালামের মাতা)।¹ উক্ত হাদিসটিতে খাদিজা রাজি.-এর মর্যাদা সুস্পষ্ট। বুখারির এই হাদিসটির বর্ণনাকারী হচ্ছেন আলি রাজি.।
আয়েশা রাজি.-এর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সারিদ যেমন সকল খাবারের মাঝে শ্রেষ্ঠ, আয়েশা রাজি. তেমন সকল নারীর মাঝে শ্রেষ্ঠ।² অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা।³ এগুলো ছাড়াও অসংখ্য হাদিসে আয়েশা রাজি.-এর মর্যাদা ফুটে ওঠে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁর এই প্রিয়তমা স্ত্রীর ঘরেই কাটিয়েছেন। তাঁর বুকে মাথা রেখেই রাসুলুল্লাহ স্বীয় বন্ধুর পানে যাত্রা শুরু করেন।⁴ অপরদিকে ফাতিমার শ্রেষ্ঠত্বও অনেক হাদিসের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
ফাতিমা রাজি.-কে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি কি জান্নাতে নারীদের সর্দার হতে চাও না? অথবা এই উম্মতের নারীদের সর্দার হতে চাও না?⁵ এর মাধ্যমে ফাতিমা রাজি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়। অপর বর্ণনায় এসেছে, জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নারীরা হলো খাদিজা, ফাতিমা, মারইয়াম ও আসিয়া।⁶
তবে প্রথম তিনজনের মাঝে খাদিজা এবং ফাতিমা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ সর্বপ্রথম খাদিজা রাজি., অতঃপর তার মেয়ে ফাতিমা রাজি., অতঃপর আয়েশা রাজি.। কারণ, খাদিজা ও ফাতিমার শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহর বক্তব্য সুস্পষ্ট। বিপরীতে আয়েশাকে নারীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে তুলনার ভিত্তিতে, সার্বিকভাবে নয়। ইবনে হাজার আসকালানি এটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।⁷ বাগদাদি এটাকে ইমাম শাফেয়ি ও আবুল হাসান আশআরি-সহ অন্যান্য ইমামের মত হিসেবে অভিহিত করেছেন। অতঃপর বাগদাদি লিখেন: খাদিজা, ফাতিমা ও আয়েশার পরে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন উম্মে সালামা, অতঃপর হাফসা বিনতে উমর, অতঃপর অন্য স্ত্রীগণ। কারও কারও মতে, নবিদের কন্যাগণ তাদের স্ত্রীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সেটা সঠিক হওয়া জরুরি নয়। খাদিজা রাজি. নবির স্ত্রী: অথচ তিনি তার মেয়ে ফাতিমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আয়েশা রাজি. নবিজির অন্যান্য কন্যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তবে এগুলো একান্তই ইজতিহাদি বক্তব্য, সুনিশ্চিত নয়। কিংবা এগুলোর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয়ও নয়। তাই এ ব্যাপারে নীরব থাকাই উত্তম।

টিকাঃ
১. বুখারি (৩৪৩০); মুসলিম (২৪৩০); তিরমিজি (৩৮৭৭)।
২. বুখারি (৩৪১১); মুসলিম (২৪৩১); তিরমিজি (৩৮৮৭)।
৩. বুখারি (৩৬৬২); মুসলিম (২৩৮৪); তিরিমজি (৩৮৮৫)।
৪. বুখারি (১৩৮৯); মুসলিম (২৪৪৩)।
৫. বুখারি (৬২৮৫); মুসলিম (২৪৫০); ইবনে মাজা (১৬২১)।
৬. ইবনে হিব্বান (৭০১০); হাকেম (৩৮৫৭); মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ (৫৯৭); মুসনাদে আহমদ (২৭১২)।
৭. ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার (৭/১০৭)।
৮. উসুলুদ্দিন, বাগদাদি (৩০৬)।
৯. ফাতহুল বারি (৭/১৩৯); শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 বিশেষ কোনো সাহাবির ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি না করা

📄 বিশেষ কোনো সাহাবির ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি না করা


ইমাম তহাবির উক্ত বক্তব্য শিয়াদের খণ্ডনে। যেহেতু সাহাবায়ে কেরামের স্তরভেদ সুস্পষ্ট এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাও বিভিন্ন পর্যায়ে, ফলে সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসায়ও তারতম্য হবে—এটাই স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ আবু বকর, উমর, উসমান, আলি রাজি.-এর প্রতি যে ভালোবাসা ও সম্মান থাকবে, সেটা অন্যদের প্রতি নাও থাকতে পারে। কারণ, ইসলামে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। একইভাবে আহলে বাইত তথা রাসুলুল্লাহর পরিবার, স্ত্রী-কন্যা ও দৌহিত্রদের প্রতি যতটা আগ্রহ থাকবে, অন্যান্য সাহাবার পরিবারের প্রতি ততটা আগ্রহ থাকবে না—এটা স্বাভাবিক। এটা প্রাকৃতিক এবং শরিয়তবিরুদ্ধ নয়। তবে শরিয়তবিরুদ্ধ হলো বিশেষ কোনো সাহাবির ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা, বিশেষ কাউকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে গিয়ে সীমালঙ্ঘন করা। কারণ, সেটা তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ যারা তাদের অবমাননার শামিল, কুরআন-সন্নাহর আলোকে সাহাবাদের মর্যাদাগত তফাতকে অস্বীকারের অন্তর্ভুক্ত। বরং এটাই যুগে যুগে ফিরকাবাজির জন্ম দিয়েছে; দু-একজন সাহাবি বাদ দিয়ে অন্য সকলের প্রতি বিদ্বেষ রাখার পথ সুগম করেছে। এটা ভয়ংকর ফাঁদ। শিয়ারা এ ফাঁদেই আটকে গেছে।
আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী উসমান রাজি. তৃতীয় এবং চুতর্থ স্থানে থাকেন আলি রাজি.; কিন্তু তারা সবাই মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। কেউ যদি আলি রাজি.-কে উসমান রাজি.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে সে সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের বিরোধিতা করল। কিন্তু এ জন্য তাকে আমরা বিদআতি বা শিয়া বলব না, যেহেতু সালাফের কারও কারও থেকে এমন বক্তব্য পাওয়া যায়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি এমন বক্তব্য ঘৃণা করতেন, তথাপি এমন ব্যক্তিকে বিদআতি বলতেন না। জাহাবি লিখেন, আলি রাজি.-কে উসমান রাজি.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ বললে সে বিদআতি বা রাফেজি হবে না। কারণ, অনেকে এমন কথা বলেছেন। তারা দুজনই সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। ইলম ও মর্যাদার ক্ষেত্রে দুজন কাছাকাছি। হতে পারে আখিরাতে তারা দুজন বরাবর থাকবেন। দুজনেই শহিদদের প্রথম সারিতে থাকবেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফ উসমান রাজি.-কে আলি রাজি.-এর চেয়ে অগ্রে রাখেন; আমরাও তা-ই করি।
তিন খলিফাকে এড়িয়ে সারা দিন আলিকে নিয়ে পড়ে থাকা, আবু বকর ও উমরের নাম দায়সারাভাবে উচ্চারণ করে আলির নামের শুরুতে 'মাওলা' লাগানো, শেষে 'আলাইহিস সালাম' লাগানো, সারা দিন 'মাওলা আলি', 'আলি মাওলা' জপা আর 'ইয়া আলি' লেখা টুপি পরে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি আহলে সুন্নাতের আকিদা ও রীতি নয়। এগুলো হচ্ছে দ্বীনের নামে বাড়াবাড়ি। এগুলো ভ্রান্ত শিয়া সম্প্রদায়ের আকিদা ও প্রথা, যারা কুরআন-সুন্নাহ ছুড়ে ফেলে তাদের প্রবৃত্তিকে দ্বীন বানিয়ে নিয়েছে। কারণ, তাদের প্রকৃত ভালোবাসা যদি আল্লাহর রাসুল, তাঁর সাহাবি এবং পরিবারকেন্দ্রিক হতো, তবে প্রথম তিনজন বাদ দিয়ে চতুর্থ জনকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করত না; নবিপরিবারের সকল স্ত্রী ও অন্য কন্যাদের বাদ দিয়ে কেবল ফাতিমা ও হুসাইন রাজি.-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করত না। আমরা পিছনে বলে এসেছি, কোনো সাহাবিকে বিশেষভাবে ভালোবাসা নিষেধ নয়, কিন্তু বাড়াবাড়ি নিষেধ। আহলে সুন্নাতের চৌদ্দশো বছরের ইতিহাসে কেউ আলি রাজি., ফাতিমা ও হুসাইন রাজি.-কে নিয়ে এভাবে বাড়াবাড়ি করেনি যা শিয়ারা করেছে। দুঃখজনকভাবে এখন আহলে সুন্নাতের অনেকের মাঝেও তাদের নিয়ে বাড়াবাড়ি একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এগুলোর কারণে তাদের শিয়া বলা যায় না। তবে এই বাড়াবাড়ির পরিণতি শিয়াদের ফাঁদে ফেঁসে যাওয়া।

টিকাঃ
১. তুর্কিস্তানি (১৭০); আকহাসারি (২৩৯)।
২. আস-সুন্নাহ, খাল্লাল (২/৩৮১)।
৩. সিয়ারু আলামিন নুবালা (১/৭৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাবিদ্বেষ কুফর ও নিফাক

📄 সাহাবাবিদ্বেষ কুফর ও নিফাক


আহলে বাইতকে নিয়ে শিয়াদের অতিরঞ্জনের স্বাভাবিক ফলাফল ছিল রাসুলুল্লাহর অন্যান্য সাহাবির প্রতি বিদ্বেষ রাখা। এ কারণে শিয়াদের অসংখ্য সম্প্রদায় কয়েকজন সাহাবি বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে কাফের মনে করে। অনেকে কাফের মনে না করলেও নিশ্চিতভাবে ফাসেক মনে করে। সাহাবাদের মাঝে নবিপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যাদের রাজনৈতিক জটিলতা ও বিভিন্ন কারণে মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল, সেসব সাহাবাকে তারা মুরতাদ মনে করে। এ কারণেই আহলে সুন্নাতের ইমামগণ সাহাবাবিদ্বেষকে কুফর ও নিফাক আখ্যা দিয়েছেন। এটা দ্বারা তারা খারেজি-নাসেবি-সহ অনেক সম্প্রদায় উদ্দেশ্য নিলেও মূলত শিয়ারাই প্রধান উদ্দেশ্য। তারাই আহলে বাইতের ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে অন্যান্য সাহাবার প্রতি বিদ্বেষ রাখে।
ইমাম তহাবি যেন এখানে ভ্রান্ত শিয়াদেরই খণ্ডন করেছেন। তার বক্তব্য দেখুন: 'আমরা রাসুলুল্লাহর সকল সাহাবাকে ভালোবাসি। কারও ভালোবাসার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করি না। কারও থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করি না। যারা তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখে, তাদের মন্দ আলোচনা করে, আমরা তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখি। আমরা তাদের কেবল উত্তম পন্থায় স্মরণ করি। তাদের ভালোবাসাকে দ্বীন, ঈমান ও ইহসান আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখাকে কুফর, নিফাক ও সীমালঙ্ঘন মনে করি।' ইমাম তহাবি রাহি. বেশ সচেতনভাবেই সাহাবাদের ভালোবাসার পরে কারও প্রতি ভালোবাসায় বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন, যা শিয়ারা আহলে বাইতের ক্ষেত্রে করে। এর পরই অন্য কোনো সাহাবি থেকে নিজেদের মুক্ত ঘোষণা করতে, তাদের মন্দ আলোচনা করতে এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখতে নিষেধ করেছেন, যা শিয়া মতবাদের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন আমার সাহাবাদের আলোচনা আসে, তখন (তাদের সমালোচনা থেকে) বিরত থাকো।'¹ আরেক হাদিসে বলেছেন, 'আনসারদের কেবল মুমিনরাই ভালোবাসে, আর তাদের কেবল মুনাফিকরাই ঘৃণা করে। যে ব্যক্তি তাদের ভালোবাসবে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন। যে ব্যক্তি তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, আল্লাহ তার প্রতি বিদ্বেষ রাখবেন।'² অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি আমার সাহাবাদের গালি দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সকল মানুষের অভিশাপ।'³
আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিয়ো না। আল্লাহর শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবে তাদের এক মুষ্টি কিংবা অর্ধেক মুষ্টি সমান পুণ্যও লাভ করতে পারবে না।'⁴ ইমাম নববি উক্ত অধ্যায়ের শিরোনাম লিখেছেন, 'সাহাবাদের গালি দেওয়া হারাম'।
আরেক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'সাবধান! আমি আমার সাহাবাদের ব্যাপারে তোমাদের সাবধান করছি। আমার পরে তাদের তোমরা (আক্রমণের) লক্ষ্যস্থল হিসেবে স্থির করো না। যে তাদের ভালোবাসবে, সে আমার ভালোবাসার কারণেই তাদের ভালোবাসবে; আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে, আমার প্রতি বিদ্বেষের কারণেই সে তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখবে; আর যে তাদের কষ্ট দিলো, সে যেন আমাকে কষ্ট দিলো; আর যে আমাকে কষ্ট দিলো, সে যেন আল্লাহকে কষ্ট দিলো; আর যে আল্লাহ কষ্ট দেবে, আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।'⁵

টিকাঃ
১. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৪২৭, ১০৪৪৮)।
২. বুখারি (৩৭৮৩); মুসলিম (৭৫)।
৩. মুসন্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৩০৮৬); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১২৭০৯); বাজ্জার (৫৭৫৩)।
৪. বুখারি (৩৬৭৩); মুসলিম (২৫৪০); তিরমিজি (৩৮৬১); আবু দাউদ (৪৬৫৮)।
৫. তিরমিজি (৩৮৬২); ইবনে হিব্বান (৭২৫৬); মুসনাদে আহমদ (২০৮৭৯)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px