📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব

📄 সাহাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব


সাহাবাগণ নবিদের পরে গোটা মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজেদের চোখে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। অতঃপর তারা তাঁর উপর ঈমান এনেছেন, তাঁর সঙ্গে দাওয়াত দিয়েছেন, জিহাদ করেছেন। তারা পৃথিবীর সবার চেয়ে রাসুলুল্লাহকে বেশি ভালোবেসেছেন। রাসুলুল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের জন্য তারা তাদের জানমাল সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায়ের পরে তাঁর দ্বীন ও দাওয়াত নিয়ে গোটা পৃথিবীতে তারা ছড়িয়ে পড়েছেন। কুরআন তারাই সংরক্ষণ করেছেন। রাসুলুল্লাহর বাণী তারাই আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আল্লাহ, রাসুল, নামাজ, রোজা, হজ, আখিরাত—সবকিছু আমরা তাদের মাধ্যমেই জেনেছি। ফলে গোটা মুসলিম উম্মাহ কিয়ামত পর্যন্ত তাদের কাছে ঋণী থাকবে।
সাহাবাগণ ছিলেন এমন এক প্রজন্ম, পৃথিবীতে যেমন প্রজন্মের মানুষ আর নেই। তাদের ঈমান, তাদের নিষ্ঠা, তাদের ভালোবাসা, তাদের আত্মত্যাগ, তাদের সরলতা ও পবিত্রতা, তাদের আমল ও আধ্যাত্মিকতা—এক কথায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে তারা পূর্ণাঙ্গতা ও শ্রেষ্ঠত্বের এমন স্বাক্ষর রেখেছেন, যা মানব ইতিহাসে কেউ পারেনি, আর পারবেও না।
কুরআনের একাধিক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(এই ধন-সম্পদ) হিজরতকারী (মুহাজির) দরিদ্রদের জন্য যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টিলাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারাই সত্যবাদী। যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে, মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে সেজন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না; বরং তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের অগ্রাধিকার দান করে। বস্তুত যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই প্রকৃত সফলকাম। আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে, তারা বলে—হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এবং আমাদের আগে যারা ঈমান এনেছে সেসব ভাইকে ক্ষমা করুন এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।’ [হাশর: ৮-১০]
বরং আল্লাহ তায়ালা তাওরাত-ইনজিলের মতো পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থগুলোতেও সাহাবাদের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সিজদার চিহ্ন। তাওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ। আর ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা যেমন একটি চারাগাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়। অতঃপর তা শক্ত ও মজবুত হয়, কাণ্ডের উপর মজবুত হয়ে দাঁড়ায় এবং তা কৃষককে আনন্দিত করে। (এটা এ জন্য) যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দেন। আর তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন।’ [ফাতহ: ২৯]
কুরআনের একাধিক জায়গাতে উম্মতে মুহাম্মাদিকে শ্রেষ্ঠ জাতি বলা হয়েছে; আগেকার সকল জাতির উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি যাদের মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে আর আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।’ [আলে ইমরান: ১১০] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এমনিভাবে আমি তোমাদের মধ্যপন্থি সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলের জন্য এবং যাতে রাসুল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য...।’ [বাকারা: ১৪৩]
এসব আয়াতে যদিও উম্মত বলতে গোটা উম্মত বোঝানো হয়েছে, তথাপি প্রথম সম্বোধিত প্রজন্ম হচ্ছেন সাহাবায়ে কেরাম। যেহেতু উম্মতে মুহাম্মাদি সকল নবির উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠ উম্মত, আর সাহাবাগণ উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ জামায়াত, সুতরাং সাহাবাগণ নবি-রাসুলদের পরে গোটা মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ দল। এখানে প্রথমোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমাদের মাধ্যমে সত্তরটি উম্মাহ পরিপূর্ণ হলো। তাদের মাঝে সর্বোত্তম আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাময় হলে তোমরা।' একবার তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কারা সর্বোত্তম মানুষ? তিনি বললেন, 'আমার যুগের লোকজন।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য হাদিসে আপন সাহাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব বলে গিয়েছেন। আবু বুরদা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে মাগরিবের নামাজ আদায় করলাম। নামাজের পরে আমরা ভাবলাম ইশার নামাজও রাসুলের সঙ্গে পড়ি। ইশার সময় আল্লাহর রাসুল বের হয়ে আমাদের দেখে বললেন, 'তোমরা এখনও এখানে?' আমরা বললাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার সঙ্গে মাগরিবের নামাজ আদায়ের পরে চিন্তা করলাম ইশাও পড়ে যাই।' আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'ভালো করেছ।' অতঃপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আকাশের তারকাগুলো তার সুরক্ষা। যখন এগুলো থাকবে না, তখন আকাশ সুরক্ষিত থাকবে না। আমি আমার সাহাবাদের জন্য সুরক্ষা। আমি যখন চলে যাব, আমার সাহাবারা বিপদে আক্রান্ত হবে। আর আমার সাহাবারা আমার উম্মতের জন্য রক্ষাকবচ। তারা যখন চলে যাবে, তখন আমার উম্মত মুসিবতে আক্রান্ত হবে।'

টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩০০১); মুসতাদরাকে হাকেম (৭০৭৯)।
২. বুখারি (৩৬৭১, ৬৬৫৮); মুসলিম (২৫৩৩)।
৩. মুসলিম (২৫৩১); ইবনে হিব্বান (৭২৪৯)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাদের ভালোবাসা ইমান

📄 সাহাবাদের ভালোবাসা ইমান


যেহেতু কুরআন, সুন্নাহ ও সুস্থ বিবেক দ্বারা সাহাবায়ে কেরামের শ্রেষ্ঠত্ব সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, তাই মুসলিম উম্মাহর সকল আলিমের সর্বসম্মত মত হলো, সাহাবায়ে কেরাম সকলে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। মর্যাদার দিক থেকে সর্বকনিষ্ঠ সাহাবিও তাদের পরে উম্মাহর সকল মুমিন-মুসলিম, ওলি-আউলিয়া, গাউস-কুতুব, পির-মাশায়েখ সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। উম্মাহর কেউ যদি বালেগ হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সারা জীবন সিজদায় পড়ে থাকে, সারাজীবন যদি ঘোড়ার পিঠে জিহাদের ময়দানে কাটিয়ে দেন, সারাজীবন যদি দাওয়াত ও তালিমের কাজে ব্যস্ত থাকে, জীবনের সবকিছু যদি আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেয়, তবুও সে সেই সাহাবির ধারেকাছেও পৌঁছতে পারবে না যিনি রাসুলুল্লাহকে তাঁর জীবদ্দশায় একবার দূর থেকেও একনজর দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। এ এমন সৌভাগ্য, কিয়ামত পর্যন্ত সাধনা করেও যা লাভ করা সম্ভব নয়।
এটা মুসলমানদের আবেগী কথা নয়, বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আনীত দ্বীন ও ঈমানের দাবি। আমাদের দ্বীন, আমাদের কুরআন, সুন্নাহ, শরিয়ত—সবকিছু সাহাবাদের মাধ্যমে প্রাপ্ত। ফলে আমরা যত ইবাদত করি, সবগুলো সাহাবাদের আমলনামায় যোগ হয়। এমনকি যে সাহাবি আল্লাহর রাসুলের কোনো হাদিস বর্ণনা করেননি, দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের জানা উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান রাখেননি, তিনিও পরবর্তী উম্মতের সকল মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কারণ, রাসুলুল্লাহর দিদার তাদের অন্তরে যে ঈমান তৈরি করে দিয়েছিল, তাদের অন্তরে ইয়াকিনের যে নুর ঢেলে দিয়েছিল, সেই ঈমান আর সেই ইয়াকিনের কাছে স্রেফ আমল দ্বারা পৌঁছানো সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহকে তাঁর প্রত্যেক সাহাবি যতটা ভালোবেসেছেন, তেমন ভালোবাসা উম্মাহর আর কারও পক্ষে সম্ভব নয়। বস্তুত সাহাবায়ে কেরামকে স্বয়ং আল্লাহ রাসুলুল্লাহর জন্য মনোনীত করেছিলেন। আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে এমন একটি শ্রেষ্ঠ সম্প্রদায়কে তাঁর রাসুলের জন্য বাছাই করেছিলেন, পৃথিবীতে তাদের আগে কিংবা পরে তাদের মতো আর কেউ আসবে না।
সাহাবা-বিদ্বেষী শিয়াদের উত্থানের আগ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জানাই ছিল না যে, সাহাবাদের প্রতিও বিদ্বেষ রাখা যায়, তাঁদের সমালোচনা করা যায়, তাঁদের ঘৃণা করা যায়। শিয়া ও শিয়াদের সমমনা বিভিন্ন সাহাবা-বিদ্বেষী সম্প্রদায়ের প্ররোচনা-প্রোপাগান্ডার ফলে ধীরে ধীরে মুসলমানদের মাঝেও সাহাবাবিদ্বেষের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসলমান সাহাবাদের শানে জবান দরাজিতে লিপ্ত হয়, নিজেদের অতি পণ্ডিত মনে করে সাহাবাদের ব্যাপারে কলম ধরে হেদায়েতের পথ থেকে ছিটকে পড়ে। এ কারণে যুগে যুগে আহলে সুন্নাতের ইমামগণ যখন আকিদার কিতাব লিখেছেন, তাতে সাহাবাদের ভালোবাসা ঈমানের অপরিহার্য অংশ হিসেবে উক্ত আলোচনার অবতারণা করেছেন।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সাহাবাদের পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য

📄 সাহাবাদের পারস্পরিক মর্যাদার তারতম্য


সাহাবাদের প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুমিনের উপর ওয়াজিব। সকল সাহাবিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়াও প্রত্যেক মুমিনের উপর অপরিহার্য। তবে সকল সাহাবির প্রতি সমান ভালোবাসা ও আকর্ষণ থাকা জরুরি নয়। কারণ, সকল সাহাবির মর্যাদা সমস্তরে নয়। পিছনে নবি-রাসুলদের ক্ষেত্রে আমরা যা উল্লেখ করেছি, এখানেও একই মূলনীতি প্রযোজ্য। অর্থাৎ সাহাবি হিসেবে প্রত্যেক সাহাবি আমাদের সম্মান, মর্যাদা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পাবার উপযুক্ত। কিন্তু তাদের সবাই সমস্তরে নয়। বরং প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিষ্ঠা, কুরবানি, রাসুলের ভালোবাসা ও সান্নিধ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত।
স্বয়ং কুরআনেও আল্লাহ তায়ালা তাদের মর্যাদার মাঝে পার্থক্য করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে কেন ব্যয় করছ না যখন আল্লাহর জন্যই আকাশসমূহ ও জমিনের উত্তরাধিকার? তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে, সে (পরবর্তী লোকদের সঙ্গে) সমান নয়। তাদের মর্যাদা অনেক বেশি তাদের অপেক্ষা যারা (বিজয়ের) পরে ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।’ [হাদিদ: ১০] উক্ত আয়াতে আল্লাহ হুদাইবিয়ার সন্ধি অথবা মক্কা বিজয়ের ঘটনার আগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাদের হুদাইবিয়া/মক্কা বিজয়ের পরে ইসলামগ্রহণকারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, আয়াতের শেষাংশে সবার জন্য আল্লাহ কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের মাঝে কারও মর্যাদা কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ হলেও সার্বিকভাবে সকল সাহাবি অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। অন্য আয়াতে আল্লাহ প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী মুজাহির ও আনসার সাহাবাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রসঙ্গে বলেন, ‘আর মুহাজির ও আনসারদের মাঝে যারা ইসলামে প্রথম ও অগ্রসর, আর যারা তাদের সত্যের সঙ্গে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত প্রস্রবণসমূহ। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই হলো সবচেয়ে বড় সাফল্য।’ [তাওবা: ১০০]
অসংখ্য হাদিসে অনেক সাহাবির শ্রেষ্ঠত্বের কথা এসেছে, যা অন্যদের ব্যাপারে আসেনি। তা ছাড়া ইসলামের জন্য সবার ত্যাগ সমান নয়, রাসুলুল্লাহর সঙ্গে সবার সম্পর্ক সমান গভীর নয়, তাঁর সঙ্গে কাটানো সময় সবার জন্য সমান নয়। কেউ রাসুলুল্লাহর হাতে সর্বপ্রথম মুসলমান হয়েছেন, সারা জীবন তাঁর সঙ্গে সকল দাওয়াত ও জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছেন, সম্পদ বিসর্জন দিয়েছেন, রাসুলুল্লাহর ইন্তিকালের পরেও তার দাওয়াত ও উম্মতের পিছনে জীবন ব্যয় করেছেন, তা হলে বিদায় হজ কিংবা অন্য যেকোনো সময় রাসুলুল্লাহকে এক নজর দেখা সাহাবি তার সমান হতে পারেন? কখনোই নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরে উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন আবু বকর, অতঃপর উমর, অতঃপর উসমান, অতঃপর আলি। তাদের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আশারায়ে মুবাশশারা তথা জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের বাকি ছয়জন সাহাবা। তারা উম্মতের বাকি সবার চেয়ে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বশ্রেষ্ঠ। অতঃপর বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছেন।¹ অতঃপর হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ।
বুখারিতে ইবনে উমর রাজি.-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য এসেছে এভাবে: নবিজির যুগে আমরা মানুষের মাঝে উত্তম কারা কারা সেটা বলতাম। আমরা সর্বোত্তম বলতাম আবু বকর রাজি.-কে, অতঃপর উমর ইবনুল খাত্তাব রাজি.-কে, অতঃপর উসমান ইবনে আফফান রাজি.-কে।² অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো শুনতেন, কিন্তু আমাদের নিষেধ করতেন না।³ অন্য বর্ণনায় ইবনে উমর রাজি. থেকেই উক্ত তিনজনের পরে আলি রাজি.-এর নাম এসেছে।⁴
দশজন সাহাবিকে তিনি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। সবার ক্ষেত্রে এই সুসংবাদ থাকলেও সুনির্ধারিতভাবে নেই। ফলে তারা অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আহলে বদর ও আহলে হুদাইবিয়ার জন্য তিনি বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিয়েছেন, যা অন্যদের ক্ষেত্রে দেননি। ফলে অন্যদের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এটাই পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদায় পরিণত হয়। বাগদাদি লিখেন এবং এটা আহলে সুন্নাতের সকল ইমামের মত, আমরা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, সাহাবাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন চার খলিফা, অতঃপর জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বাকি ছয়জন। তারা হলেন: তালহা, জুবাইর, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সাইদ ইবনে জায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, অতঃপর বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ, অতঃপর হুদাইবিয়ার বাইআতুর রিজওয়ানে অংশগ্রহণকারীগণ।⁵ ইবনে হাজার আসকালানি লিখেন: উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলি, অতঃপর জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন, অতঃপর বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণ।⁶

টিকাঃ
১. বুখারি (৩০০৭, ৬২৫৯); মুসলিম (২৪৯৪)।
২. বুখারি (৩৬৫৫); ইবনে হিব্বান (৭২৫০); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৩১৩২)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (১৩১৩২); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৫৬০১)।
৪. মুসনাদে আবু ইয়ালা (৫৬০১); শরহু মুশকিলিল আসার (৩৫৫৯)।
৫. উসুলুদ্দিন, বাগদাদি (৩০৪)।
৬. ফাতহুল বারি (৭/৫৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 নবী সাহাবাদের মর্যাদার তারতম্য

📄 নবী সাহাবাদের মর্যাদার তারতম্য


নারী সাহাবাদের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের (স্ত্রী-কন্যা) মর্যাদা অন্য সকল নারীর উপরে। এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসুলুল্লাহর পরিবারকে অন্য সকল নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে বলেন, ‘হে নবিপত্নীগণ, তোমরা অন্য নারীদের মতো নও যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তাই পরপুরুষের সাথে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না। তাতে সেই ব্যক্তি কুবাসনা করে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে। বরং তোমরা সঙ্গত কথাবার্তা বলবে।’ [আহজাব: ৩২] ইবনে আব্বাস রাজি. উক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন, 'অর্থাৎ আমার কাছে তোমাদের মর্যাদা অন্য পুণ্যবতী নারীদের মতো নয়; তোমরা আমার কাছে তাদের চেয়ে অধিকতর মর্যাদাময় এবং অধিকতর পুণ্যের অধিকারী।'
তাই আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মতিক্রমে রাসুলের পরিবারবর্গ সাধারণভাবে সকল নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাদের মাঝে খাদিজা, আয়েশা ও ফাতিমা রাজি. সর্বশ্রেষ্ঠ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নারীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ। নারীদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে মারইয়াম বিনতে ইমরান (ঈসা আলাইহিস সালামের মাতা)।¹ উক্ত হাদিসটিতে খাদিজা রাজি.-এর মর্যাদা সুস্পষ্ট। বুখারির এই হাদিসটির বর্ণনাকারী হচ্ছেন আলি রাজি.।
আয়েশা রাজি.-এর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সারিদ যেমন সকল খাবারের মাঝে শ্রেষ্ঠ, আয়েশা রাজি. তেমন সকল নারীর মাঝে শ্রেষ্ঠ।² অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা।³ এগুলো ছাড়াও অসংখ্য হাদিসে আয়েশা রাজি.-এর মর্যাদা ফুটে ওঠে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ দিনগুলো তাঁর এই প্রিয়তমা স্ত্রীর ঘরেই কাটিয়েছেন। তাঁর বুকে মাথা রেখেই রাসুলুল্লাহ স্বীয় বন্ধুর পানে যাত্রা শুরু করেন।⁴ অপরদিকে ফাতিমার শ্রেষ্ঠত্বও অনেক হাদিসের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
ফাতিমা রাজি.-কে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি কি জান্নাতে নারীদের সর্দার হতে চাও না? অথবা এই উম্মতের নারীদের সর্দার হতে চাও না?⁵ এর মাধ্যমে ফাতিমা রাজি.-এর শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়। অপর বর্ণনায় এসেছে, জান্নাতের সর্বশ্রেষ্ঠ নারীরা হলো খাদিজা, ফাতিমা, মারইয়াম ও আসিয়া।⁶
তবে প্রথম তিনজনের মাঝে খাদিজা এবং ফাতিমা শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ সর্বপ্রথম খাদিজা রাজি., অতঃপর তার মেয়ে ফাতিমা রাজি., অতঃপর আয়েশা রাজি.। কারণ, খাদিজা ও ফাতিমার শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহর বক্তব্য সুস্পষ্ট। বিপরীতে আয়েশাকে নারীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে তুলনার ভিত্তিতে, সার্বিকভাবে নয়। ইবনে হাজার আসকালানি এটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।⁷ বাগদাদি এটাকে ইমাম শাফেয়ি ও আবুল হাসান আশআরি-সহ অন্যান্য ইমামের মত হিসেবে অভিহিত করেছেন। অতঃপর বাগদাদি লিখেন: খাদিজা, ফাতিমা ও আয়েশার পরে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন উম্মে সালামা, অতঃপর হাফসা বিনতে উমর, অতঃপর অন্য স্ত্রীগণ। কারও কারও মতে, নবিদের কন্যাগণ তাদের স্ত্রীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সেটা সঠিক হওয়া জরুরি নয়। খাদিজা রাজি. নবির স্ত্রী: অথচ তিনি তার মেয়ে ফাতিমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আয়েশা রাজি. নবিজির অন্যান্য কন্যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তবে এগুলো একান্তই ইজতিহাদি বক্তব্য, সুনিশ্চিত নয়। কিংবা এগুলোর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দ্বীনের কোনো মৌলিক বিষয়ও নয়। তাই এ ব্যাপারে নীরব থাকাই উত্তম।

টিকাঃ
১. বুখারি (৩৪৩০); মুসলিম (২৪৩০); তিরমিজি (৩৮৭৭)।
২. বুখারি (৩৪১১); মুসলিম (২৪৩১); তিরমিজি (৩৮৮৭)।
৩. বুখারি (৩৬৬২); মুসলিম (২৩৮৪); তিরিমজি (৩৮৮৫)।
৪. বুখারি (১৩৮৯); মুসলিম (২৪৪৩)।
৫. বুখারি (৬২৮৫); মুসলিম (২৪৫০); ইবনে মাজা (১৬২১)।
৬. ইবনে হিব্বান (৭০১০); হাকেম (৩৮৫৭); মুসনাদে আবদ ইবনে হুমাইদ (৫৯৭); মুসনাদে আহমদ (২৭১২)।
৭. ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার (৭/১০৭)।
৮. উসুলুদ্দিন, বাগদাদি (৩০৬)।
৯. ফাতহুল বারি (৭/১৩৯); শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (৩৪৮)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px