📄 সিফাতে দুটোই তাবিল নিষিদ্ধ
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মনে রাখতে হবে; তা হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ সৃষ্টির মতো নয়। এগুলো তাঁর স্বরূপহীন গুণাবলি। ফলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন-ক্রুদ্ধ হন বলার সময় আল্লাহকে সৃষ্টির মতো কল্পনা করব না। একইভাবে আমরা এগুলোর তাবিলও করব না, যেমনটা খালাফ তথা পরবর্তী যুগের একদল আলিম করেছেন। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকে 'পুরস্কারের ইচ্ছা' দিয়ে এবং ক্রোধকে 'প্রতিশোধের ইচ্ছা' দিয়ে তাবিল করেছেন।¹ কিন্তু আমাদের ইমাম আজম-সহ সালাফের ইমামগণ এ দুটোর তাবিল করেননি। ইমাম আবু হানিফা রাহি. বলেন, 'তাঁর ক্রোধ ও সন্তুষ্টি তাঁর দুটো সিফাত। এগুলোর স্বরূপ নেই।'² আল-ফিকহুল আবসাতে এসেছে, 'আল্লাহকে মাখলুকের বিশেষণে বিশেষিত করা যাবে না। রাগ ও সন্তুষ্টি তার দুটো সিফাত, স্বরূপহীন। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বক্তব্য। আল্লাহ রাগ করেন, সন্তুষ্ট হন। তার রাগকে 'শাস্তি' আর সন্তুষ্টিকে 'পুরস্কার' বলা যাবে না। বরং তিনি যেমন নিজেকে বলেছেন, আমরাও তা-ই বলব।'³ মোল্লা আলি কারি উক্ত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বলেন, এই দুটো আল্লাহর সিফাতে মুতাশাবিহাত। এটাই জমহুর সালাফের মত। সুতরাং এগুলোকে পুরস্কার বা প্রতিশোধের ইচ্ছা দিয়ে তাবিল করা যাবে না।'⁴
ইমাম তহাবিও এগুলোকে তাবিল করেননি। ত্বহাবিয়্যাহর হানাফি ব্যাখ্যাতাগণ—যেমন কাজি ইসমাইল শাইবানি ও আকহাসারি—লিখেন, আল্লাহকে সৃষ্টির সাদৃশ্য থেকে পবিত্র ঘোষণা করে এগুলো মেনে নিতে হবে। কারণ, কুরআন-সুন্নাহে এগুলো এসেছে। তাই আমরা বলব, 'আল্লাহ সন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হন। যেভাবে তার জন্য শোভনীয়।'⁵ হানাফি ব্যাখ্যাতা গুনাইমিও উক্ত সিফাতগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবে সাব্যস্ত করার কথা বলেছেন এবং তাবিলকে সুস্পষ্ট ভাষায় নাকচ করেছেন।⁶ এটাই সালাফের মানহাজ এবং হক ও নিরাপদ মানহাজ।
বরাবরের মতো এখানেও স্পষ্টভাষী কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব সাহেব। তিনি লিখেন, ‘এ ব্যাপারে হক মাজহাব হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি, ক্রোধ, শত্রুতা (আদাওত), বন্ধুত্ব (বেলায়াত), পছন্দ, অপছন্দ ইত্যাদি সেভাবে মেনে নেওয়া হয় যেভাবে শ্রবণ, দর্শন, জীবন (হায়াত), ক্ষমতা (কুদরত), ইলম, কালাম ও অন্যান্য সিফাত মেনে নেওয়া হয়। এগুলো সব হাকিকত, মাজাজ নয়। হ্যাঁ, আমরা এগুলোর স্বরূপ জানি না। কিন্তু তাই বলে এগুলোকে তাবিল করা যাবে না যা হাকিকি অর্থকে নাকচ করে দেয়। ক্রোধ ও রহমত ইত্যাদি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলেও সাদৃশ্য কেবল শব্দের ক্ষেত্রে। অর্থের ক্ষেত্রে কোনো সাদৃশ্য নেই। তাই আল্লাহর জন্য সন্তুষ্টি, ক্রোধ ইত্যাদি সিফাত তার শোভা অনুযায়ী প্রযোজ্য। জাহান্নামের ফেরেশতা মালেক-সহ অন্যান্য ফেরেশতাও রাগ করেন। তাই বলে তাদের রাগ কি মানুষের মতো? তাদেরও কি শরীরে রক্ত গরম হয়ে যেতে হয়, যেমন মানুষের হয়? তা হলে আল্লাহর কেন হতে হবে, যিনি সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে পবিত্র?’⁷
টিকাঃ
১. গজনবি (১৫০); সাইদ ফুদাহ (১২৪৯)।
২. আল-ফিকহুল আকবার (২৭)।
৩. আল-ফিকহুল আবসাত (৫৮)।
৪. শরহুল ফিকহিল আকবার, আলি কারি (১২৪)।
৫. শাইবানি (৪৩); আকহাসারি (২৩৭)।
৬. গুনাইমি (১৩৩)।
৭. কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (১৩৬)।