📄 বিশেষ দ্রষ্টব্য: মুমিনের কোনো দোয়া বৃথা যায় না
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মুমিনের কোনো দোয়া বৃথা যায় না। তাই অন্তরকে সর্বদা আল্লাহমুখী করে রাখা এবং সবসময়, বিশেষত প্রত্যেক নামাজের পরে, আল্লাহর কাছে কিছু-না-কিছু চাওয়া উচিত। কারণ, মানুষ যা-কিছু চাচ্ছে, সেগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃথা যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতঃপর আল্লাহর সিদ্ধান্ত তিনি কীভাবে কবুল করবেন। কখনও কখনও মুমিন যা চায়, আল্লাহ দ্রুত সেটাই তাকে দিয়ে দেন।
এই একটি ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতে পারে যে, তার দোয়া কবুল হয়েছে। অথচ দোয়া কবুল শুধু এই একভাবে হয় না, বরং আল্লাহ অনেক সময় একটি দোয়া করলে সেটার পরিবর্তে অন্য দোয়া কবুল করেন। অর্থাৎ তার মঙ্গলের জন্য তাকে প্রত্যাশিত বস্তু না দিয়ে এমন বস্তু দেন যা সে দোয়াই করেনি। কখনও কখনও দোয়ার মাঝে সরাসরি প্রার্থিত বস্তু না দিয়ে তাকে বিভিন্ন বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন। কখনও তার চেয়েও উত্তম বস্তু দান করেন, কখনও তার গুনাহ ক্ষমা করেন, কখনও দোয়াগুলো পরকালের জন্য সংরক্ষণ করেন; অথচ এগুলো সম্পর্কে বান্দার কোনো ধারণাই থাকে না। ফলে দেখা যায়, জীবনের অধিকাংশ সময় সে এমন অনেক বস্তু পেয়ে যায়, যার জন্য কখনও দোয়াই করেনি। সে ভাবে এমনিতেই চলে এসেছে; অথচ হতে পারে আল্লাহ তার ভিন্ন কোনো দোয়ার কারণে সেটা দিয়েছেন। মোট কথা, মুমিনের কোনো দোয়া বিফলে যায় না। তাই দোয়া যত বেশি করা যায়, তত উত্তম। এখানে বিরক্তি কিংবা হতাশা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয়—হয়তো তাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয়, নয়তো পরকালের জন্য রেখে দেওয়া হয়, অথবা তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়...।'¹ এ জন্য ইমাম তহাবিও লিখেছেন, 'এক মুহূর্তও তাঁর অমুখাপেক্ষী হওয়া যায় না। যে ব্যক্তি নিজেকে এক মুহূর্তও আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষী ভাববে, সে কাফের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'
প্রশ্ন আসতে পারে, মসজিদে মসজিদে জুমার দিন ও বিভিন্ন নামাজের পরে মুসলিম উম্মাহর জন্য কোটি কোটি মানুষ দোয়া করে, কিন্তু তাদের দোয়া কোথায় যায়? কোনো দোয়া তো কবুল হতে দেখা যায় না। এর পূর্ণ উত্তর লম্বা আলোচনাসাপেক্ষ। তবে আমাদের মূলনীতি মনে রাখতে হবে। সেটা হলো, দোয়ার শর্তসমূহ পূর্ণ করা। আজ আমাদের সমাজের কতজন মুসলিম নিজের মাঝে এসব শর্ত পূরণের ভ্রুক্ষেপ করেন? তা হলে দোয়া কবুল হবে কী করে? তা ছাড়া দোয়া কবুল হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত হলো হতাশ না হওয়া। অনেক মুসলিম এসব দোয়াকে অর্থহীন মনে করে সামাজিকতা কিংবা নিছক লোক দেখানোর জন্য হাত তোলেন। এমন দোয়াও কবুল হওয়ার নয়। অনেকে হাত তুলে গাফেল থাকেন। এমন দোয়াও কবুল হওয়ার নয়। যিনি দোয়া করছেন, তিনি অনেক সময় লৌকিকতায় আক্রান্ত থাকেন। ফলে এমন দোয়াও কবুলের আশা করা যায় না। এমন বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় মুসলিমদের দোয়া আটকে যাচ্ছে। তা ছাড়া দোয়ার পাশাপাশি দাওয়া তথা কর্মও জরুরি। মুসলমানরা অহর্নিশ দুনিয়ার জন্য কাফেরদের চেয়েও অধিকতর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকবে, কেবল শুক্রবার কিংবা ঈদের দিন মসজিদে এসে মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের বিজয়ের জন্য দোয়া করবে, আর সাথে সাথে মুসলানদের বিজয় চলে আসবে—এটা একধরনের উপহাস। এমন হলে সাহাবাগণ মসজিদে নববি ছেড়ে পুরা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়তেন না। পৃথিবীর পথে পথে বেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শুষ্ক মাটি নিজেদের ঘাম ও খুনে রঙিন করতেন না। সবাই মসজিদে নববির রিয়াজুল জান্নাহতে বসে দিনরাত মানুষের হিদায়াত ও উম্মাহর বিজয় কামনা করে নিরাপদেই জীবন কাটাতেন। তা ছাড়া সকল শর্ত পূরণের পরেও বাহ্যিকভাবে সরাসরি দোয়া কবুল হওয়া শর্ত নয়; বরং আল্লাহ এসব দোয়ার পরিবর্তে তাদের অন্যভাবেও সহায়তা করতে পারেন, যা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোট কথা, কোনো যুক্তিতেই দোয়ার গুরুত্বকে হালকা করা যাবে না। নিরবচ্ছিন্নভাবে দোয়া অব্যাহত রাখতে হবে, পাশাপাশি কাজও করতে হবে। বাহ্যিকভাব দোয়া কবুল না হলে মনে কোনো হতাশার স্থান দেওয়া যাবে না। কারণ, দোয়া কবুল না হলে বান্দার কিছু করার আছে? আল্লাহ ছাড়া সে অন্য কারও কাছে যেতে পারবে? আল্লাহর গড়া পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো পৃথিবীতে যেতে পারবে? ইমাম তহাবি বলেন, 'এক মুহূর্তও তাঁর অমুখাপেক্ষী হওয়া যায় না। যে ব্যক্তি নিজেকে এক মুহূর্তও আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষী ভাববে, সে কাফের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' ফলে দোয়া কবুল হোক বা না হোক, চালিয়েই যেতে হবে। একদিন-না-একদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাড়া আসবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩৬০৪); মুসনাদে আবু ইয়ালা (১০১৯); দেখুন: আল-ইসতিজকার, ইবনে আবদুল বার (১০/২৯৭); কাশফুল মুশকিল, ইবনুল জাওজি (৩/৪০১)।
📄 মুসতাজাবুদ দাওয়াত কে?
মুসতাজাবুদ দাওয়াহ কে? 'মুসতাজাবুদ দাওয়াহ' শব্দের অর্থ হলো এমন মানুষ যার দোয়া কবুল করা হয়। আমাদের সমাজে বিভিন্ন বুজুর্গকে 'মুসতাজাবুদ দাওয়াহ' বলা হয় এবং তাদের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হয়। এর ভিত্তি কী? প্রথম কথা হলো, মুসতাজাবুদ দাওয়াহ কোনো বিশেষ পদ কিংবা বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ তায়ালা সকল মুমিনের দোয়া কবুল করেন। যার মাঝেই উপরে বর্ণিত দোয়া কবুলের শর্তগুলো বিদ্যমান থাকবে এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো অবিদ্যমান থাকবে, তার দোয়াই কবুল হবে। সে হিসেবে সকল মুমিনই মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হতে পারবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসকে লক্ষ্য করে বলেন—সাদ, পবিত্র খাবার খাও। তুমি মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হয়ে যাবে।¹
তবে কিছু কিছু মানুষকে বিশেষ কিছু আমলের বিনিময়ে আল্লাহ একটু ভিন্ন মর্যাদা দেন। তারা যেকোনো দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন। এসব মানুষ ‘মুসতাজাবুদ দাওয়াহ’ হিসেবে পরিচিত হন। এ কারণে আমরা দেখি, সকল নবি ও সাহাবি পুণ্যবান হওয়া সত্ত্বেও, তাদের দোয়া কবুল হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো নবি ও সাহাবি মুসতাজাবুদ দাওয়াহ নামেই পরিচিত ছিলেন। যেমন: নবিদের মাঝে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মুসতাজাবুদ দাওয়াহ ছিলেন। কুরআনে তার অনেকগুলো দোয়া কবুলের কথা এসেছে। সাহাবাদের মাঝে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাজি. মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। উপরে তার ব্যাপারে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। এতদ্ব্যতীত হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে তার বিভিন্ন দোয়া কবুলের অনেক ঘটনা রয়েছে। আরেকজন মুসতাজাবুদ দাওয়াহ সাহাবি হলেন আনাস ইবনে মালেক রাজি.। তৃতীয় আরেকজন হলেন বারা বিন মালেক রাজি.; স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হওয়ার ঘোষণা করেছেন।² সাহাবাদের পরেও এমন ব্যক্তিত্ব বিদ্যমান ছিলেন; তাদের একজন হলেন তাবেয়ি ওয়াইস আল-করনি রাহি.। খোদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।³ পরবর্তীকালেও এমন অনেক মানুষ বিদ্যমান ছিলেন।⁴
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে; সেটা হচ্ছে, মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হওয়া ব্যক্তির কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং তার বিশেষ আমলের কারণে তার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। ফলে তিনি সকল দিক থেকে অন্যদের চেয়ে উত্তম হবেন জরুরি নয়। এ কারণে সাহাবাদের মাঝে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আনাস ও বারা প্রমুখ মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আবু বকর, উমর, উসমান, আলি রাজি. এই বৈশিষ্ট্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন না; অথচ তারা সর্বসম্মতিক্রমে সাদ, আনাস ও বারার চেয়ে উত্তম।
টিকাঃ
১. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৬৪৯৫)।
২. তিরমিজি (৩৮৫৪); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৩৯৮৭)।
৩. মুসলিম (২৫৪২); মুসতাদরাকে হাকেম (৫৭৬৮)।
৪. বিস্তারিত দেখতে পারেন ইবনে আবিদ দুনইয়ার ‘মুজাবুদ দাওয়াহ’ গ্রন্থে।