📄 দোয়া কেন কবুল হয় না?
দোয়া কেন কবুল হয় না? স্বাভাবিকভাবে আল্লাহ মুমিনের সকল দোয়া কবুল করেন। তবে দোয়া কবুলের কিছু শর্ত রয়েছে, কিছু আদাব রয়েছে; কবুলের পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যদি শর্ত ও আদাবগুলো পূর্ণ করা হয়, প্রতিবন্ধকতাগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়, তবে সেই দোয়া কবুলের ব্যাপারে আল্লাহর উপরে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো প্রযোজ্য। আর যদি শর্তগুলো লঙ্ঘিত হয়, প্রতিবন্ধকতা দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেসব দোয়া কবুল হয় না। তাই দোয়ার পাশাপাশি সেগুলোর দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। কারণ দোয়া হলো তরবারির মতো। কিন্তু তরবারি থাকলেই কাটা যায় না। তরবারিতে ধার থাকতে হয়, জায়গামতো আঘাত করতে হয়। সেটা না করতে পারলে তরবারি কোনো কাজে আসে না। দোয়া কবুলের কিছু প্রতিবন্ধকতা হলো:
এক. দোয়া কবুলের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো দোয়ায় ইখলাস তথা নিষ্ঠা না থাকা। মানুষকে দেখানোর জন্য দোয়ায় সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করা, অথচ দোয়াকারীর অন্তর সেগুলোর মর্ম থেকে গাফেল। শুধু শুধু অতিরিক্ত কান্নার ভান করা অথবা অযথা জোরে জোরে চ্যাঁচামেচি করা, অথচ সেখানে কান্না নিষ্প্রয়োজন কিংবা হৃদয়ের কান্না অনুপস্থিত। আল্লাহ বলেন, اُدْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ. অর্থ: 'তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাকো কাকুতিমিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।' [আরাফ: ৫৫]
দুই. দোয়ায় সীমালঙ্ঘন করা। অর্থাৎ এমন দোয়া করা, যেগুলো অন্যায় তথা কুরআন-সুন্নাহে আসা মূলনীতিবিরুদ্ধ। যেমন: কোনো গুনাহ করার তাওফিক কামনা করা, আরেকজনের স্ত্রী/সম্পদকে নিজের করতে চাওয়া, অন্যের সর্বনাশের দোয়া করা, পৃথিবীতে চিরস্থায়ী থাকার জন্য দোয়া করা, কাফেরের জন্য ক্ষমা চাওয়া আর মুসলমানের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের দোয়া করা, সবার আগে জান্নাতে প্রবেশের দোয়া করা (কারণ রাসুলুল্লাহ সবার আগে প্রবেশ করবেন) ইত্যাদি।
তিন. গাফেল হয়ে দোয়া করা; ফলে কী দোয়া করছে নিজেও জানে না। অমুখাপেক্ষী হয়ে এমনভাবে দোয়া করা, যেন নিজের কোনো প্রয়োজনই নেই। এমন দোয়া কবুলের কোনো সম্ভাবনা নেই। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমরা দোয়া করো, তখন এভাবে দোয়া করো না, 'হে আল্লাহ, আপনি চাইলে ক্ষমা করুন, আপনি চাইলে দান করুন।' বরং মিনতি সহকারে এবং অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। কারণ, আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই।¹ আরেকটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর কাছে দোয়া কবুলের দৃঢ় ইয়াকিন রেখে দোয়া করো। জেনে রাখো, আল্লাহ গাফেল ও উদাসীন হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন না।'²
চার. আল্লাহর সঙ্গে দোয়ার আদব রক্ষা না করা। অর্থাৎ এমনভাবে দোয়া করা, যাতে মনে হয় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা নয়, আল্লাহকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত সংঘবদ্ধ দোয়ায় অনেককে জোরে জোরে মাইকে হাঁক ছাড়তে দেখা যায়। বোঝা যায় না দোয়া করছে নাকি ধমক দিচ্ছে; অথচ দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হচ্ছে বিনয় ও নিজেদের প্রয়োজন প্রকাশ, আল্লাহকে নির্দেশ নয়।
পাঁচ. হারাম সম্পদ ভক্ষণ করা। এটা দোয়া কবুলের পথে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। সুতরাং হারাম কামাই, হারাম চাকুরির হারাম বেতন, সেসব বেতনে গড়া বাড়িতে বসে, সেই বেতনে কেনা খাবার পেটে রেখে, সেই বেতনে কেনা জামা ও টুপি গায়ে জড়িয়ে যত দোয়া করা হোক, সেগুলো কবুল হবে না। কারণ, হারাম সবকিছু অপবিত্র। আর আল্লাহ নিজে পবিত্র। তাই তিনি অপবিত্রকে গ্রহণ করেন না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে হালাল ভক্ষণের নির্দেশ-সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত পড়ে বলেন, 'ধুলোমলিন এলোকেশী দীর্ঘ পথে ভ্রমণ করা এক মুসাফির দুই হাত আকাশের দিকে তুলে বলে, হে আমার রব, হে আমার রব; অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, তার শরীর হারামে গড়া। এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হবে?'³
ছয়. দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা। দোয়া করার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা কবুলের জন্য অপেক্ষা করা, কবুলের কোনো আলামত না দেখা গেলে বিরক্ত হওয়া বা ভেঙে পড়া ইত্যাদি। কয়েকবার দোয়া করে কবুল হওয়ার লক্ষণ দেখা না গেলে দোয়া ছেড়ে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের দোয়া কবুল করা হতে থাকে যতক্ষণ না কেউ বলে, 'আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল করা হয়নি'।”⁴ আরেকটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ বিরক্ত হন না। বিরক্ত তো তোমরা হও।'⁵
টিকাঃ
১. বুখারি (৬৩৩৮); মুসলিম (২৬৭৯)।
২. তিরমিজি (৩৪৭৯); মুসতাদরাকে হাকেম (১৮২৩); বাজ্জার (১০০৬১)।
৩. মুসলিম (১০১৫); তিরমিজি (২৯৮৯); দারেমি (২৭৫৯)।
৪. বুখারি (৬৩৪০); মুসলিম (২৭৩৫)।
৫. বুখারি (৪৩, ১১৫১); মুসলিম (৭৮২, ৭৮৫)।
📄 দোয়া কবুলের উপায়
দোয়া কবুলের উপায়: যেসব বিষয় দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:
এক. ইখলাস তথা নিষ্ঠার সঙ্গে দোয়া করা। আল্লাহ কুরআনের একাধিক আয়াতে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন, فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكُفِرُوْনَ অর্থ: 'তোমরা আল্লাহর জন্য দ্বীনের প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ডাকো।' [গাফের: ১৪] সুতরাং দোয়ার সময় মনে রাখতে হবে, আল্লাহ দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই আমি দোয়া করছি। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দোয়া কবুল করার, প্রয়োজন পূর্ণ করার কিংবা কোনো উপকার করার সামর্থ্য রাখে না। আল্লাহই একমাত্র দোয়া কবুলকারী। তা ছাড়া দোয়ার মাঝে সব ধরনের লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। লোকদেখানো দোয়া করা যাবে না।
দুই. বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে দোয়া করা, আল্লাহর কাছে আশা ও ভয় নিয়ে দোয়া করা, আল্লাহকে দোয়া কবুলের জন্য বাধ্য মনে না করা। আল্লাহ বলেন, ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ. অর্থ: 'তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাকো কাকুতিমিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।' [আরাফ: ৫৫] নবিদের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল বিনয়-নম্রতা ও মিনতির সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। আল্লাহ বলেন, إِنَّهُمْ كَانُوْا يُسْرِعُوْনَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خُشِعِينَ. অর্থ: 'তারা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আশা ও ভীতি সহকারে আমার কাছে দোয়া করত। আর তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।' [আম্বিয়া: ৯০]
তিন. আগ্রহ নিয়ে বারবার দোয়া করা, একই দোয়া একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করা; বিরক্ত, অতিষ্ঠ না হওয়া; নিজের অভাব ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার করে দোয়া করা, তিন বার করে ইস্তিগফার করা পছন্দ করতেন।¹
চার. নিরাশ না হওয়া; বরং বিভিন্নভাবে নিজের মুখাপেক্ষিতা ও দুর্বলতা তুলে ধরা। কুরআনে জাকারিয়া আলাইহিস সালামের বৃদ্ধ বয়সে দোয়া করার যে চিত্র এসেছে, তা প্রত্যেক মুমিনের জন্য বেশ আশা জাগানিয়া। তিনি সারা জীবন নিঃসন্তান ছিলেন। তার স্ত্রী বন্ধ্যা ছিলেন। জীবনের সকল বসন্ত পার করার পরে যখন যৌবন পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে, তখন তার হৃদয় সন্তানের জন্য বেচাইন হয়ে ওঠে। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। নিভৃতে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। শুরু করেন এমন কিছু বাক্য দিয়ে, যাতে দুনিয়ার সকল বিনয় ও মিনতি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে আল্লাহ তার দোয়া কবুলও করেন। তার দোয়ার সূচনা ছিল এমন:
ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا . قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَ اشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا . وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَاعِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا. يَرِثُنِي وَيَرِথُ مِنْ آلِ يَعْقُوْبَ وَ اجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا . يزَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَمِ اسْمُهُ يَحْيَى لَمْ نَজْعَلْ لَهُ مِنْ قَبْلُ سَمِيًّا . قَالَ رَبِّ أَنِّي يَكُونُ لِي غُلْمٌ وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا وَ قَدْ بَلَغْتُ مِنَ الْكِبَرِ عِتِيًّا . قَالَ كَذلِكَ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَ قَدْ خَلَقْتُكَ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ تَكُ شَيْئًا .
অর্থ: 'এটা আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা জাকারিয়ার প্রতি, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিলেন নিভৃতে। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে; বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে; হে আমার পালনকর্তা, তবুও আপনার কাছে দোয়া করা থেকে আমি কখনও নিরাশ হইনি। আমি আশঙ্কা করি আমার পর আমার স্বগোত্র নিয়ে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; তাই আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন সন্তান দান করুন, যে ইয়াকুব বংশে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে এবং হে আমার পালনকর্তা, তাকে করুন সন্তোষজনক। (আল্লাহ বলেন) হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নাম হবে ইয়াহইয়া। ইতঃপূর্বে এই নামে আমি কারও নামকরণ করিনি। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, কেমন করে আমার পুত্র হবে, অথচ আমার স্ত্রী বন্ধ্যা আর আমিও বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে উপনীত? তিনি বললেন, এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলে দিয়েছেন, এটা আমার পক্ষে সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, অথচ তুমি কিছুই ছিলে না।' [মারইয়াম: ২-৯]
আমাদের সমাজের নিঃসন্তান দম্পতিগুলোর জন্য জাকারিয়া আলাইহিস সালাম হতে পারেন উত্তম আদর্শ। তাবিজ কবচ না ঝুলিয়ে, নিয়মিত চিকিৎসা ও দোয়া অব্যাহত রাখলে আশি বছর বয়সে, শূন্যগর্ভ নারীকেও আল্লাহ সন্তান দিতে পারেন, কারণ এটা তাঁর জন্য সহজ।
পাঁচ. সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় দোয়া করা। এমন যেন না হয় যে, কেবল দুঃখের সময় দোয়া করব আর সুখের সময় তাকে ভুলে যাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সুখের সময় আল্লাহর সঙ্গে পরিচিত থাকো (তার বিধান মানার মধ্য দিয়ে), তা হলে দুঃখের সময় তিনি তোমাকে চিনবেন।²
ছয়. আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণের উসিলায় দোয়া করা। যেমন: হে রহমান, আপনি পরম করুণাময় দয়ালু মালিক। আমাদের দয়া করুন। কুরআনে আল্লাহ তার নামগুলোর মাধ্যমে দোয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوْهُ بِهَا " 'আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০]
সাত. কিবলামুখী হয়ে পবিত্রাবস্থায় দোয়া করা, হাত উঠিয়ে দোয়া করা, আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে দোয়া শুরু করা, রাসুলুল্লাহর উপর সালাম পাঠ করা। সেসব সময়ে দোয়া করা, যেগুলোতে দোয়া কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন: রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, সাহরি ও ইফতারের সময়, বৃষ্টি বর্ষণের সময়, আজান ও ইকামতের মাঝে, সিজদার মাঝে, জুমার দিন শেষ বিকেলে, প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে ইত্যাদি। পাশাপাশি রোজাদার, মজলুম ব্যক্তির দোয়া, অন্যের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করা, সন্তানের জন্য পিতামাতার দোয়া কবুলের বিশেষ ওয়াদা রয়েছে। ফলে সেসব অবস্থায় দোয়া করা। পাশাপাশি সেসব স্থানে দোয়ার চেষ্টা করা, যেখানে দোয়া কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন: মসজিদে দোয়া করা। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, নেক আমল, নবি-রাসুল ও পুণ্যবান ব্যক্তিদের উসিলা দিয়েও আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে। পিছনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
টিকাঃ
১. আবু দাঊদ (১৫২৪); ইবনে হিব্বান (৯২৩); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (১০২১৮)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৬৩৫৯); মুসনাদে আহমদ (২৮৩১)।
📄 বিশেষ দ্রষ্টব্য: মুমিনের কোনো দোয়া বৃথা যায় না
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মুমিনের কোনো দোয়া বৃথা যায় না। তাই অন্তরকে সর্বদা আল্লাহমুখী করে রাখা এবং সবসময়, বিশেষত প্রত্যেক নামাজের পরে, আল্লাহর কাছে কিছু-না-কিছু চাওয়া উচিত। কারণ, মানুষ যা-কিছু চাচ্ছে, সেগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বৃথা যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতঃপর আল্লাহর সিদ্ধান্ত তিনি কীভাবে কবুল করবেন। কখনও কখনও মুমিন যা চায়, আল্লাহ দ্রুত সেটাই তাকে দিয়ে দেন।
এই একটি ক্ষেত্রে মানুষ বুঝতে পারে যে, তার দোয়া কবুল হয়েছে। অথচ দোয়া কবুল শুধু এই একভাবে হয় না, বরং আল্লাহ অনেক সময় একটি দোয়া করলে সেটার পরিবর্তে অন্য দোয়া কবুল করেন। অর্থাৎ তার মঙ্গলের জন্য তাকে প্রত্যাশিত বস্তু না দিয়ে এমন বস্তু দেন যা সে দোয়াই করেনি। কখনও কখনও দোয়ার মাঝে সরাসরি প্রার্থিত বস্তু না দিয়ে তাকে বিভিন্ন বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন। কখনও তার চেয়েও উত্তম বস্তু দান করেন, কখনও তার গুনাহ ক্ষমা করেন, কখনও দোয়াগুলো পরকালের জন্য সংরক্ষণ করেন; অথচ এগুলো সম্পর্কে বান্দার কোনো ধারণাই থাকে না। ফলে দেখা যায়, জীবনের অধিকাংশ সময় সে এমন অনেক বস্তু পেয়ে যায়, যার জন্য কখনও দোয়াই করেনি। সে ভাবে এমনিতেই চলে এসেছে; অথচ হতে পারে আল্লাহ তার ভিন্ন কোনো দোয়ার কারণে সেটা দিয়েছেন। মোট কথা, মুমিনের কোনো দোয়া বিফলে যায় না। তাই দোয়া যত বেশি করা যায়, তত উত্তম। এখানে বিরক্তি কিংবা হতাশা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'প্রত্যেক ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয়—হয়তো তাকে দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয়, নয়তো পরকালের জন্য রেখে দেওয়া হয়, অথবা তার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়...।'¹ এ জন্য ইমাম তহাবিও লিখেছেন, 'এক মুহূর্তও তাঁর অমুখাপেক্ষী হওয়া যায় না। যে ব্যক্তি নিজেকে এক মুহূর্তও আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষী ভাববে, সে কাফের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'
প্রশ্ন আসতে পারে, মসজিদে মসজিদে জুমার দিন ও বিভিন্ন নামাজের পরে মুসলিম উম্মাহর জন্য কোটি কোটি মানুষ দোয়া করে, কিন্তু তাদের দোয়া কোথায় যায়? কোনো দোয়া তো কবুল হতে দেখা যায় না। এর পূর্ণ উত্তর লম্বা আলোচনাসাপেক্ষ। তবে আমাদের মূলনীতি মনে রাখতে হবে। সেটা হলো, দোয়ার শর্তসমূহ পূর্ণ করা। আজ আমাদের সমাজের কতজন মুসলিম নিজের মাঝে এসব শর্ত পূরণের ভ্রুক্ষেপ করেন? তা হলে দোয়া কবুল হবে কী করে? তা ছাড়া দোয়া কবুল হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত হলো হতাশ না হওয়া। অনেক মুসলিম এসব দোয়াকে অর্থহীন মনে করে সামাজিকতা কিংবা নিছক লোক দেখানোর জন্য হাত তোলেন। এমন দোয়াও কবুল হওয়ার নয়। অনেকে হাত তুলে গাফেল থাকেন। এমন দোয়াও কবুল হওয়ার নয়। যিনি দোয়া করছেন, তিনি অনেক সময় লৌকিকতায় আক্রান্ত থাকেন। ফলে এমন দোয়াও কবুলের আশা করা যায় না। এমন বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় মুসলিমদের দোয়া আটকে যাচ্ছে। তা ছাড়া দোয়ার পাশাপাশি দাওয়া তথা কর্মও জরুরি। মুসলমানরা অহর্নিশ দুনিয়ার জন্য কাফেরদের চেয়েও অধিকতর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকবে, কেবল শুক্রবার কিংবা ঈদের দিন মসজিদে এসে মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের বিজয়ের জন্য দোয়া করবে, আর সাথে সাথে মুসলানদের বিজয় চলে আসবে—এটা একধরনের উপহাস। এমন হলে সাহাবাগণ মসজিদে নববি ছেড়ে পুরা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়তেন না। পৃথিবীর পথে পথে বেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শুষ্ক মাটি নিজেদের ঘাম ও খুনে রঙিন করতেন না। সবাই মসজিদে নববির রিয়াজুল জান্নাহতে বসে দিনরাত মানুষের হিদায়াত ও উম্মাহর বিজয় কামনা করে নিরাপদেই জীবন কাটাতেন। তা ছাড়া সকল শর্ত পূরণের পরেও বাহ্যিকভাবে সরাসরি দোয়া কবুল হওয়া শর্ত নয়; বরং আল্লাহ এসব দোয়ার পরিবর্তে তাদের অন্যভাবেও সহায়তা করতে পারেন, যা পিছনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোট কথা, কোনো যুক্তিতেই দোয়ার গুরুত্বকে হালকা করা যাবে না। নিরবচ্ছিন্নভাবে দোয়া অব্যাহত রাখতে হবে, পাশাপাশি কাজও করতে হবে। বাহ্যিকভাব দোয়া কবুল না হলে মনে কোনো হতাশার স্থান দেওয়া যাবে না। কারণ, দোয়া কবুল না হলে বান্দার কিছু করার আছে? আল্লাহ ছাড়া সে অন্য কারও কাছে যেতে পারবে? আল্লাহর গড়া পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো পৃথিবীতে যেতে পারবে? ইমাম তহাবি বলেন, 'এক মুহূর্তও তাঁর অমুখাপেক্ষী হওয়া যায় না। যে ব্যক্তি নিজেকে এক মুহূর্তও আল্লাহ থেকে অমুখাপেক্ষী ভাববে, সে কাফের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' ফলে দোয়া কবুল হোক বা না হোক, চালিয়েই যেতে হবে। একদিন-না-একদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে সাড়া আসবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩৬০৪); মুসনাদে আবু ইয়ালা (১০১৯); দেখুন: আল-ইসতিজকার, ইবনে আবদুল বার (১০/২৯৭); কাশফুল মুশকিল, ইবনুল জাওজি (৩/৪০১)।
📄 মুসতাজাবুদ দাওয়াত কে?
মুসতাজাবুদ দাওয়াহ কে? 'মুসতাজাবুদ দাওয়াহ' শব্দের অর্থ হলো এমন মানুষ যার দোয়া কবুল করা হয়। আমাদের সমাজে বিভিন্ন বুজুর্গকে 'মুসতাজাবুদ দাওয়াহ' বলা হয় এবং তাদের বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হয়। এর ভিত্তি কী? প্রথম কথা হলো, মুসতাজাবুদ দাওয়াহ কোনো বিশেষ পদ কিংবা বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ তায়ালা সকল মুমিনের দোয়া কবুল করেন। যার মাঝেই উপরে বর্ণিত দোয়া কবুলের শর্তগুলো বিদ্যমান থাকবে এবং প্রতিবন্ধকতাগুলো অবিদ্যমান থাকবে, তার দোয়াই কবুল হবে। সে হিসেবে সকল মুমিনই মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হতে পারবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসকে লক্ষ্য করে বলেন—সাদ, পবিত্র খাবার খাও। তুমি মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হয়ে যাবে।¹
তবে কিছু কিছু মানুষকে বিশেষ কিছু আমলের বিনিময়ে আল্লাহ একটু ভিন্ন মর্যাদা দেন। তারা যেকোনো দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন। এসব মানুষ ‘মুসতাজাবুদ দাওয়াহ’ হিসেবে পরিচিত হন। এ কারণে আমরা দেখি, সকল নবি ও সাহাবি পুণ্যবান হওয়া সত্ত্বেও, তাদের দোয়া কবুল হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো নবি ও সাহাবি মুসতাজাবুদ দাওয়াহ নামেই পরিচিত ছিলেন। যেমন: নবিদের মাঝে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মুসতাজাবুদ দাওয়াহ ছিলেন। কুরআনে তার অনেকগুলো দোয়া কবুলের কথা এসেছে। সাহাবাদের মাঝে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাজি. মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। উপরে তার ব্যাপারে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। এতদ্ব্যতীত হাদিসের বিভিন্ন কিতাবে তার বিভিন্ন দোয়া কবুলের অনেক ঘটনা রয়েছে। আরেকজন মুসতাজাবুদ দাওয়াহ সাহাবি হলেন আনাস ইবনে মালেক রাজি.। তৃতীয় আরেকজন হলেন বারা বিন মালেক রাজি.; স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হওয়ার ঘোষণা করেছেন।² সাহাবাদের পরেও এমন ব্যক্তিত্ব বিদ্যমান ছিলেন; তাদের একজন হলেন তাবেয়ি ওয়াইস আল-করনি রাহি.। খোদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন।³ পরবর্তীকালেও এমন অনেক মানুষ বিদ্যমান ছিলেন।⁴
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে; সেটা হচ্ছে, মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হওয়া ব্যক্তির কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং তার বিশেষ আমলের কারণে তার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। ফলে তিনি সকল দিক থেকে অন্যদের চেয়ে উত্তম হবেন জরুরি নয়। এ কারণে সাহাবাদের মাঝে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আনাস ও বারা প্রমুখ মুসতাজাবুদ দাওয়াহ হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আবু বকর, উমর, উসমান, আলি রাজি. এই বৈশিষ্ট্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন না; অথচ তারা সর্বসম্মতিক্রমে সাদ, আনাস ও বারার চেয়ে উত্তম।
টিকাঃ
১. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৬৪৯৫)।
২. তিরমিজি (৩৮৫৪); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৩৯৮৭)।
৩. মুসলিম (২৫৪২); মুসতাদরাকে হাকেম (৫৭৬৮)।
৪. বিস্তারিত দেখতে পারেন ইবনে আবিদ দুনইয়ার ‘মুজাবুদ দাওয়াহ’ গ্রন্থে।