📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মৃতের ইশালে সওয়াব

📄 মৃতের ইশালে সওয়াব


ইসালে সওয়াব: ইসলামের সৌন্দর্য, উপযোগিতা, সর্বজনীনতা ও মানবিকতার যেসব গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই আকিদাটি। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত আকিদা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর নিজের স্বার্থের জন্য তৈরি করেননি; তিনি মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য তৈরি করেছেন। এতে মানুষের লাভ, আল্লাহর নয়। একটি লম্বা হাদিসে (কুদসিতে) আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, তোমরা আমার ক্ষতি পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না যে, আমার ক্ষতি করবে; আর না তোমরা আমার উপকার পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে যে, আমার উপকার করবে। যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষটির মতো হয়ে যাও, সেটা আমার রাজত্ব সামান্য বৃদ্ধি করবে না। হে আমার বান্দাগণ, যদি তোমাদের প্রথম ও শেষ মানুষ-সহ জগতের সকল মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লোকটির মতো হয়ে যাও, সেটা আমার রাজত্ব সামান্য হ্রাস করবে না।’¹

কিন্তু মানুষকে যেহেতু তিনি স্বাধীনতা দিয়েছেন, ফলে সকল মানুষ তার ইবাদত করবে না এটা তিনি জেনেছেন। যারা অবাধ্য হবে, তাদের শাস্তির জন্য তিনি জাহান্নাম তৈরি করেছেন। অর্থাৎ জাহান্নামকে তিনি সৃষ্টি করেছেন অবাধ্যদের শাস্তির প্রয়োজনে, জাহান্নামের প্রয়োজনে মানুষকে সৃষ্টি করেননি। তাই তিনি জান্নাতের পথ সহজ করে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময় ও সুযোগে তিনি মানুষকে জান্নাতের কাছাকাছি যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। যেমনটা পিছনে আমরা উল্লেখ করেছি, আল্লাহ একটি পুণ্যের বিনিময় বান্দার নিয়তের কারণে দশ গুণ থেকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন। বিপরীতে একটি পাপ করলে একটিই লিখেন। অর্থাৎ পাপের ক্ষেত্রে একে এক, অথচ পুণ্যের ক্ষেত্রে একে সাতশো।² একইভাবে হাদিসে এসেছে, মানুষ কোনো পাপ করলে বাম কাঁধের ফেরেশতা সেটা না লিখে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। যদি এ সময়ে সে লজ্জিত হয়ে তাওবা করে, তবে সেটা আর লিখেন না। আর যদি তাওবা না করে, তখন একটি পাপই লিখেন।³

এভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আল্লাহ মানুষকে জান্নাত যাওয়ার পথ প্রশস্ত রেখেছেন। মানুষ যেন ছোট থেকে ছোট কোনো সুযোগও নষ্ট না করে, তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষুদ্র মাধ্যমগুলোকেও সে সফলভাবে ব্যবহার করে—ইসলাম এটা নিশ্চিত করেছে। এমন একটি সুযোগ হচ্ছে যা ইমাম তহাবি উপরে উল্লেখ করেছেন, অর্থাৎ জীবিত কর্তৃক মৃতের জন্য দোয়া করা।

দুনিয়া মানুষের পরীক্ষাক্ষেত্র। দুনিয়ার জীবন ইবাদত ও পুণ্যের জায়গা। সে হিসেবে স্বাভাবিক নিয়ম হলো, দুনিয়া ছেড়ে গেলে ইবাদতও বন্ধ হয়ে যাবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ যা করবে, সেটাই তার বলে গণ্য হবে। মৃত্যুর পরে তার কিছুই করার ক্ষমতা থাকবে না। তার পুণ্য বাড়বে না। কিন্তু আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল। তাঁর রহমত ক্রোধের উপর সদা বিজয়ী। ফলে তিনি চান মৃত্যুর পরেও মানুষ উপকৃত হোক, কবরে থেকেও মানুষের পুণ্য বাড়ুক, অপরাধ মার্জিত হোক। ইসলামে এর অনেকগুলো পথ রয়েছে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো দোয়া, অর্থাৎ পৃথিবীতে জীবিত কেউ যখন মৃতের জন্য দোয়া করে, আল্লাহ তায়ালা সেই দোয়া কবুল করেন, মৃতের কষ্ট লাঘব করেন, তার মর্যাদা বুলন্দ করেন। এটাকেই ইমাম তহাবি বলেছেন, ‘জীবিতদের দোয়া ও সদকার মাধ্যমে মৃতরা উপকৃত হয়।’

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, কেবল তিনটি আমল অব্যাহত থাকে: এক. সাদাকায়ে জারিয়া। দুই. এমন ইলম যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয়। তিন. নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।⁴ অর্থাৎ দুনিয়াতে সাদাকায়ে জারিয়া তথা মানবহিতকর কোনো কাজ (পুল, পথ, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) রেখে যাওয়া, ইলম তথা বই-পুস্তক বা ছাত্র-ছাত্রী রেখে যাওয়া, পুণ্যবান সন্তান রেখে যাওয়া। এই সবকিছুর ফলাফল একটাই, তা হলো—জীবিত সাধারণ মানুষ যারা তার রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, বই-পুস্তক থেকে উপকৃত হবে, তার জন্য দোয়া করবে। নেক সন্তান তার পিতার জন্য দোয়া করবে। ফলে যেকোনো উপায়ে জীবিত ব্যক্তি যদি মৃতের জন্য দোয়া করে, আল্লাহ মৃতের কবরে সেটা পৌঁছিয়ে দেন। মৃত্যুর পরে সে কবরে থেকেও ইবাদতের সওয়াব পেতে থাকে।

কুরআন কারিমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের মৃতদের জন্য দোয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। এটাকে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন, وَ الَّذِينَ جَاءُوْ مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْফِرْ لَنَا وَ لِاخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُوْنَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوْبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ . অর্থ: 'আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এবং ভ্রাতাদের যারা আমাদের অগ্রে ঈমান এনেছে, ক্ষমা করুন। আর ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।' [হাশর: ১০] এর দ্বারা বোঝা যায়, মৃতের জন্য জীবিতদের দোয়া উপকারী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেউ মারা গেলে তার দাফনকার্য শেষ করে বলতেন, 'তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ইস্তিগফার করো এবং তার অবিচলতা কামনা করো। কারণ, এখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে।'⁵ অন্য হাদিসে বলেন, যখন তোমরা মৃত ব্যক্তির উপর নামাজ আদায় করো, তার জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে দোয়া করো।⁶

তাই আমরা মৃতের উপর যে জানাজার নামাজ পড়ি সেটাও মূলত মৃতের জন্য দোয়াই। আয়েশা রাজি. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, 'যদি একশত মানুষ কোনো ব্যক্তির জানাজা পড়ে, আল্লাহ সে ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করেন।'⁷ ইবনে আব্বাস থেকে আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যদি চল্লিশজন মুসলমান, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়ে, আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের সুপারিশ কবুল করেন।'⁸ সংখ্যার পার্থক্য থাকার কারণ হলো, যত সংখ্যার কথা জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, রাসুল তত সংখ্যার দোয়া কবুল হওয়ার কথা বলেছেন। তাকে চল্লিশ ও একশোর কথা জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তাই তাদের কথা বলেছেন। ইবনে বাত্তাল বলেন, আল্লাহর রাসুলকে যদি এর কম সংখ্যার কথা জিজ্ঞাসা করা হতো, খুব সম্ভবত তখনও তিনি তাদের দোয়া কবুল হওয়ার কথা বলতেন।⁹

মোট কথা, সংখ্যা যত কমবেশি হোক, উদ্দেশ্য হচ্ছে মৃত মুমিনদের জন্য জীবিত মুমিনদের দোয়া উপকারী। আল্লাহ চাইলে এর মাধ্যমে মৃতের সগিরা-কবিরা যেকোনো গুনাহ মাফ হতে পারে। জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা যত বেশি হবে, দোয়াও তত বেশি হবে। তাই জানাজার সংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই কল্যাণকর। কিন্তু জানাজার সংখ্যা নিয়ে গর্ব করা, কিংবা সংখ্যা বেশি হলেই মৃত ব্যক্তিকে জান্নাতি বলে ঘোষণা করা বৈধ নয়। কারণ জানাজা একটি দোয়া; দোয়া করা আমাদের দায়িত্ব। কবুল করা-না করা আল্লাহর মর্জির উপর নির্ভরশীল।

দোয়ার মতো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকাও তার জন্য উপকারী। সাদ বিন উবাদা রাজি.-এর মাতা ইন্তিকাল করলে সাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, মায়ের পক্ষ থেকে আমি যদি কিছু সদকা করি, তাতে তিনি উপকৃত হবেন?' রাসুল বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাদ বিন উবাদা মায়ের পক্ষ থেকে কিছু বাগান সদকা করে দেন।¹⁰ উক্ত হাদিসটি উল্লেখ করার পরে ইবনে আবদুল বার রাহি. লিখেন, 'উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মৃতের পক্ষ থেকে জীবিত মানুষ সদকা করতে পারেন, বরং সদকা করা মুস্তাহাব। সাদ বিন উবাদার হাদিসটি এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য হাদিস আলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং এর উপর আমল প্রচলিত। ...এসব হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, জীবিতরা মৃতদের জন্য সম্পদ সদকা করতে পারেন এবং এটা আলিমদের সর্বসম্মত মত...।'¹¹

জীবিতদের দোয়ার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির উপকৃত হওয়ার মাঝে হজ এবং অন্য অনেক ইবাদত অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যদি কেউ তার মৃত কোনো আত্মীয়-স্বজনের নামে হজ করে, তবে তার কবরে হজের পুণ্য পৌঁছবে। বুখারির বর্ণনায় এসেছে, এক নারী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, 'আমার মা হজের মানত করেছিলেন। কিন্তু পূর্ণ করার আগেই ওফাতলাভ করেছেন। আমি সেটা করতে পারব?' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'যদি তার উপর ঋণ থাকত, তুমি আদায় করতে না?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' রাসুল বললেন, 'তা হলে এগুলোও আদায় করো। কেননা আল্লাহর ঋণ (তথা ইবাদত) আদায়ের আরও বেশি উপযুক্ত।'¹²

তবে ইবাদতের প্রকার নিয়ে আলিমদের মাঝে কিছুটা মতানৈক্য দেখা যায়। অর্থাৎ মৃতের জন্য জীবিতদের দোয়া, সদকা, হজ ও কুরবানির বৈধতা এবং এর মাধ্যমে মৃতের উপকৃত হওয়ার ব্যাপারে সবাই একমত। কিন্তু নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদির ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কোনো কোনো আলিম এগুলোর সওয়াব পৌঁছবে না বলে মনে করেন। তাদের দলিল হলো, হাদিসে সুস্পষ্টভাবে যা এসেছে এর বাইরে যাওয়া যাবে না।¹³ তবে মাজহাবের জমহুর তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম মনে করেন, সকল ইবাদতের সওয়াব পৌঁছবে। তাদের দলিল হচ্ছে—সদকা, দোয়া ও হজ প্রত্যেকটি ইবাদত। সুতরাং এগুলোর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির সকল ইবাদত এর অন্তর্ভুক্ত হবে এবং মৃতের প্রতি সকল ইবাদতের ইসালে সওয়াব করা যাবে। এটাই অগ্রগণ্য এবং অধিকতর বিশুদ্ধ, ইনশাআল্লাহ।¹⁴

তবে পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, দোয়া ও সদকা কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই। ফলে মতভেদপূর্ণ বিষয়ের পরিবর্তে কেউ যদি সর্বসম্মত মতের উপর আমল করতে চায়, সেটা বরং আরও ভালো। এ কারণেই আমরা ইমাম তহাবি রাহি.-কে দেখি কেবল সর্বসম্মত বিষয় দুটোই উল্লেখ করেছেন, মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলো উল্লেখ করেননি। তা ছাড়া হুজুরদের ডেকে কুরআন পড়িয়ে অর্থ ব্যয় করার চেয়ে সেই অর্থটা মৃতের পক্ষ থেকে মাদ্রাসায় দেওয়াই তো বরং উত্তম। মৃতের পক্ষ থেকে অর্থ সদকা করা, তার নামে মসজিদ-মাদ্রাসা করা, মুজাহিদদের সাহায্য করা, কুরআন ওয়াকফ করা, ইসলামি কিতাবাদি প্রকাশ করা, টিউবওয়েল বসানো, বৃক্ষরোপণ কিংবা সাঁকো নির্মাণ-সহ সবকিছুই করা যাবে। তবে মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট কাজে সদকা, ইলম, দরিদ্রের সাহায্য-সহ একাধিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই এদিকে অধিক দৃষ্টি রাখা উত্তম।

এগুলো করার সামর্থ্য না থাকলে দোয়া করবে। কারণ, এই সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কবরে দোয়া পৌঁছানো। আর সেটা অর্থ ছাড়াই করা সম্ভব। এটাই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব। পাশাপাশি দোয়া করা সহজও বটে। সবসময় অর্থের মাধ্যমে সবার জন্য মৃতদের পক্ষ থেকে সদকা করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকে কিছুই করেন না। আবার অনেকে মৃতদের জন্য এত বেশি সদকা করেন যে, নিজের জন্য করার ফুরসত পান না। অথচ ক-দিন পরে তারও সেই জায়গাতেই যেতে হবে। তাই মধ্যমপন্থা হলো সাধারণভাবে মৃতদের জন্য দোয়া করা। আর নিজের কবরের জন্য দোয়া, সদকা-সহ সবকিছু করা। তবে মাঝে মাঝে যদি মৃতদের জন্যও দান-সদকা করা যায়, সেটা নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম। অর্থাৎ প্রত্যেকে প্রত্যেকের সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী করবে।

উল্লেখ্য, দোয়া-সদকা অন্য কথায় ঈসালে সওয়াব কবুল হওয়ার জন্য অন্যান্য ইবাদতের মতো সর্বপ্রধান শর্ত হলো, ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা এবং শরিয়তসম্মত পন্থায় করা। সুতরাং আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে যদি দুনিয়ার সুনাম-সুখ্যাতি, মৃতের স্মৃতি অম্লান রাখা-সহ পার্থিব উদ্দেশ্য থাকে, কিংবা শরিয়তবিরুদ্ধ কিছু করা হয়, তবে যত কিছুই করা হোক না কেন মৃতের কাছে এর কানাকড়িও পৌঁছয় না। মৃতের কবরে ফুল দেওয়া, বড় মাজার ও গম্বুজ তৈরি করা, মৃতের জন্য ভাস্কর্যের নামে মূর্তি বানানো, স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা ইত্যাদি একবোরেই নিষ্ফল কর্ম; বরং বড় ধরনের গুনাহ। তাই সচেতন মুমিনের জন্য এসব কুসংস্কার ও পাপে নিজের শ্রম ও অর্থ নষ্ট না করা কাম্য।

টিকাঃ
১. মুসলিম (২৫৭৭); মুসতাদরাকে হাকেম (৭৭০১)।
২. মুসলিম (১২৯); ইবনে হিব্বান (৩৭৯); মুসনাদে আহমদ (৮২৮২)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৭৭৬৫, ৭৭৮৭)।
৪. মুসলিম (১৬৩১); আবু দাঊদ (২৮৮০); তিরমিজি (১৩৭৬)।
৫. মুসতাদরাকে হাকেম (১৩৭৬); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (৭১৬৪)।
৬. আবু দাঊদ (৩১৯৯); ইবনে মাজা (১৪৯৭)।
৭. মুসলিম (৯৪৭); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (২১৩১)।
৮. মুসলিম (৯৪৮); ইবনে হিব্বান (৩০৮২); মুসনাদে আহমদ (২৫৫০)।
৯. শরহুল বুখারি, ইবনে বাত্তাল (৩/৩০২)।
১০. ইবনে হিব্বান (৩৩৫৪); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৬৪৪৪); (মুসলিম ১০০৪)।
১১. আল-ইসতিজকার (৭/২৫৭-২৫৮)।
১২. বুখারি (১৮৫২, ৭৩১৫); মুসলিম (১১৪৮)।
১৩. সালেহ ফাওজান (১৬৯)।
১৪. দেখুন: রদ্দুল মুহতার (২/২৪৩); শরহে মুসলিম, নববি (১/৯০)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 দোয়া কবুলের মালিক আল্লাহ তায়ালা

📄 দোয়া কবুলের মালিক আল্লাহ তায়ালা


দোয়া কবুলের মালিক আল্লাহ তায়ালা: পিছনে বলা হয়েছে, জীবিত ব্যক্তিদের দোয়া মৃতদের উপকার করে। কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে, দোয়া নিজে নিজেই উপকার করে কিংবা জীবিতরা মৃতদের কিছু করার ক্ষমতা রাখে; বরং আল্লাহ দোয়া কবুল করেন; আল্লাহ উপকার করেন; আল্লাহ প্রয়োজন পূর্ণ করেন; আল্লাহ ক্ষমা করেন। মানুষ কেবল দোয়াই করতে পারে, এর বাইরে আর কিছু করার সক্ষমতা রাখে না। আল্লাহকে দোয়া কবুলের জন্য বাধ্য করতে পারে না; বরং কবুল করা-না করা সম্পূর্ণ আল্লাহর এখতিয়ার।

কিন্তু আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মুমিনদের দোয়া কবুলের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং যদি কোনো অন্যায় কিংবা অন্যায্য দোয়া না হয়, দোয়াতে সীমালঙ্ঘন না থাকে, তবে আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, وَقَالَ رَبِّكُمُ ادْعُوْنِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِيْنَ يَسْتَكْبِرُوْনَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دْخِرِينَ. অর্থ: 'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। আর যারা আমার ইবাদত থেকে অহংকার করে, তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' [গাফের: ৬০] অন্যত্র বলেন, وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ. অর্থ: 'আর আমার বান্দারা যখন আপনার কাছে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, বস্তুত আমি রয়েছি সন্নিকটেই। যখন কেউ আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। কাজেই তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার উপর ঈমান আনে। এতে তারা সুপথপ্রাপ্ত হবে।' [বাকারা: ১৮৬] অসহায়ের সহায় একমাত্র আল্লাহ। তিনি বলেন, أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْশِفُ السُّوءَ অর্থ: 'বলো তো কে অসহায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন?' [নামল: ৬২] আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দোয়া কবুলের ক্ষমতা রাখে না। ফলে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ডাকা শিরক। আল্লাহ বলেন, إِنْ تَدْعُوْهُمْ لَا يَسْمَعُوْا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوْا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَ يَوْمَ الْقِيمَةِ يَكْفُرُوْنَ بِشِرْكِكُمْ . অর্থ: 'তোমরা তাদের ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শোনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে।' [ফাতির: ১৪] অন্য আয়াতে বলেন, قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُوْنِ اللهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَ مَا لَهُمْ فِيهِمَا مِنْ شِرْلٍ وَমَا لَهُ مِنْهُمْ مِنْ ظَهِيْرٍ . অর্থ: 'বলুন, তোমরা তাদের আহ্বান করো যাদের উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত। তারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অণু পরিমাণ কোনোকিছুর মালিক নয়। এতে তাদের কোনো অংশ নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়।' [সাবা: ২২]

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 দোয়া কেন কবুল হয় না?

📄 দোয়া কেন কবুল হয় না?


দোয়া কেন কবুল হয় না? স্বাভাবিকভাবে আল্লাহ মুমিনের সকল দোয়া কবুল করেন। তবে দোয়া কবুলের কিছু শর্ত রয়েছে, কিছু আদাব রয়েছে; কবুলের পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যদি শর্ত ও আদাবগুলো পূর্ণ করা হয়, প্রতিবন্ধকতাগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়, তবে সেই দোয়া কবুলের ব্যাপারে আল্লাহর উপরে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো প্রযোজ্য। আর যদি শর্তগুলো লঙ্ঘিত হয়, প্রতিবন্ধকতা দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেসব দোয়া কবুল হয় না। তাই দোয়ার পাশাপাশি সেগুলোর দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। কারণ দোয়া হলো তরবারির মতো। কিন্তু তরবারি থাকলেই কাটা যায় না। তরবারিতে ধার থাকতে হয়, জায়গামতো আঘাত করতে হয়। সেটা না করতে পারলে তরবারি কোনো কাজে আসে না। দোয়া কবুলের কিছু প্রতিবন্ধকতা হলো:

এক. দোয়া কবুলের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো দোয়ায় ইখলাস তথা নিষ্ঠা না থাকা। মানুষকে দেখানোর জন্য দোয়ায় সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করা, অথচ দোয়াকারীর অন্তর সেগুলোর মর্ম থেকে গাফেল। শুধু শুধু অতিরিক্ত কান্নার ভান করা অথবা অযথা জোরে জোরে চ্যাঁচামেচি করা, অথচ সেখানে কান্না নিষ্প্রয়োজন কিংবা হৃদয়ের কান্না অনুপস্থিত। আল্লাহ বলেন, اُدْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ. অর্থ: 'তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাকো কাকুতিমিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।' [আরাফ: ৫৫]

দুই. দোয়ায় সীমালঙ্ঘন করা। অর্থাৎ এমন দোয়া করা, যেগুলো অন্যায় তথা কুরআন-সুন্নাহে আসা মূলনীতিবিরুদ্ধ। যেমন: কোনো গুনাহ করার তাওফিক কামনা করা, আরেকজনের স্ত্রী/সম্পদকে নিজের করতে চাওয়া, অন্যের সর্বনাশের দোয়া করা, পৃথিবীতে চিরস্থায়ী থাকার জন্য দোয়া করা, কাফেরের জন্য ক্ষমা চাওয়া আর মুসলমানের জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নামের দোয়া করা, সবার আগে জান্নাতে প্রবেশের দোয়া করা (কারণ রাসুলুল্লাহ সবার আগে প্রবেশ করবেন) ইত্যাদি।

তিন. গাফেল হয়ে দোয়া করা; ফলে কী দোয়া করছে নিজেও জানে না। অমুখাপেক্ষী হয়ে এমনভাবে দোয়া করা, যেন নিজের কোনো প্রয়োজনই নেই। এমন দোয়া কবুলের কোনো সম্ভাবনা নেই। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমরা দোয়া করো, তখন এভাবে দোয়া করো না, 'হে আল্লাহ, আপনি চাইলে ক্ষমা করুন, আপনি চাইলে দান করুন।' বরং মিনতি সহকারে এবং অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। কারণ, আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই।¹ আরেকটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর কাছে দোয়া কবুলের দৃঢ় ইয়াকিন রেখে দোয়া করো। জেনে রাখো, আল্লাহ গাফেল ও উদাসীন হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন না।'²

চার. আল্লাহর সঙ্গে দোয়ার আদব রক্ষা না করা। অর্থাৎ এমনভাবে দোয়া করা, যাতে মনে হয় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা নয়, আল্লাহকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষত সংঘবদ্ধ দোয়ায় অনেককে জোরে জোরে মাইকে হাঁক ছাড়তে দেখা যায়। বোঝা যায় না দোয়া করছে নাকি ধমক দিচ্ছে; অথচ দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হচ্ছে বিনয় ও নিজেদের প্রয়োজন প্রকাশ, আল্লাহকে নির্দেশ নয়।

পাঁচ. হারাম সম্পদ ভক্ষণ করা। এটা দোয়া কবুলের পথে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক। সুতরাং হারাম কামাই, হারাম চাকুরির হারাম বেতন, সেসব বেতনে গড়া বাড়িতে বসে, সেই বেতনে কেনা খাবার পেটে রেখে, সেই বেতনে কেনা জামা ও টুপি গায়ে জড়িয়ে যত দোয়া করা হোক, সেগুলো কবুল হবে না। কারণ, হারাম সবকিছু অপবিত্র। আর আল্লাহ নিজে পবিত্র। তাই তিনি অপবিত্রকে গ্রহণ করেন না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে হালাল ভক্ষণের নির্দেশ-সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত পড়ে বলেন, 'ধুলোমলিন এলোকেশী দীর্ঘ পথে ভ্রমণ করা এক মুসাফির দুই হাত আকাশের দিকে তুলে বলে, হে আমার রব, হে আমার রব; অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, তার শরীর হারামে গড়া। এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হবে?'³

ছয়. দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা। দোয়া করার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা কবুলের জন্য অপেক্ষা করা, কবুলের কোনো আলামত না দেখা গেলে বিরক্ত হওয়া বা ভেঙে পড়া ইত্যাদি। কয়েকবার দোয়া করে কবুল হওয়ার লক্ষণ দেখা না গেলে দোয়া ছেড়ে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের দোয়া কবুল করা হতে থাকে যতক্ষণ না কেউ বলে, 'আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল করা হয়নি'।”⁴ আরেকটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহ বিরক্ত হন না। বিরক্ত তো তোমরা হও।'⁵

টিকাঃ
১. বুখারি (৬৩৩৮); মুসলিম (২৬৭৯)।
২. তিরমিজি (৩৪৭৯); মুসতাদরাকে হাকেম (১৮২৩); বাজ্জার (১০০৬১)।
৩. মুসলিম (১০১৫); তিরমিজি (২৯৮৯); দারেমি (২৭৫৯)।
৪. বুখারি (৬৩৪০); মুসলিম (২৭৩৫)।
৫. বুখারি (৪৩, ১১৫১); মুসলিম (৭৮২, ৭৮৫)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 দোয়া কবুলের উপায়

📄 দোয়া কবুলের উপায়


দোয়া কবুলের উপায়: যেসব বিষয় দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

এক. ইখলাস তথা নিষ্ঠার সঙ্গে দোয়া করা। আল্লাহ কুরআনের একাধিক আয়াতে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন, فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكُفِرُوْনَ অর্থ: 'তোমরা আল্লাহর জন্য দ্বীনের প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ডাকো।' [গাফের: ১৪] সুতরাং দোয়ার সময় মনে রাখতে হবে, আল্লাহ দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই আমি দোয়া করছি। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ দোয়া কবুল করার, প্রয়োজন পূর্ণ করার কিংবা কোনো উপকার করার সামর্থ্য রাখে না। আল্লাহই একমাত্র দোয়া কবুলকারী। তা ছাড়া দোয়ার মাঝে সব ধরনের লৌকিকতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। লোকদেখানো দোয়া করা যাবে না।

দুই. বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে দোয়া করা, আল্লাহর কাছে আশা ও ভয় নিয়ে দোয়া করা, আল্লাহকে দোয়া কবুলের জন্য বাধ্য মনে না করা। আল্লাহ বলেন, ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ. অর্থ: 'তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাকো কাকুতিমিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।' [আরাফ: ৫৫] নবিদের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল বিনয়-নম্রতা ও মিনতির সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। আল্লাহ বলেন, إِنَّهُمْ كَانُوْا يُسْرِعُوْনَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خُشِعِينَ. অর্থ: 'তারা সৎকর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আশা ও ভীতি সহকারে আমার কাছে দোয়া করত। আর তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।' [আম্বিয়া: ৯০]

তিন. আগ্রহ নিয়ে বারবার দোয়া করা, একই দোয়া একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করা; বিরক্ত, অতিষ্ঠ না হওয়া; নিজের অভাব ও মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার করে দোয়া করা, তিন বার করে ইস্তিগফার করা পছন্দ করতেন।¹

চার. নিরাশ না হওয়া; বরং বিভিন্নভাবে নিজের মুখাপেক্ষিতা ও দুর্বলতা তুলে ধরা। কুরআনে জাকারিয়া আলাইহিস সালামের বৃদ্ধ বয়সে দোয়া করার যে চিত্র এসেছে, তা প্রত্যেক মুমিনের জন্য বেশ আশা জাগানিয়া। তিনি সারা জীবন নিঃসন্তান ছিলেন। তার স্ত্রী বন্ধ্যা ছিলেন। জীবনের সকল বসন্ত পার করার পরে যখন যৌবন পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে, তখন তার হৃদয় সন্তানের জন্য বেচাইন হয়ে ওঠে। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। নিভৃতে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। শুরু করেন এমন কিছু বাক্য দিয়ে, যাতে দুনিয়ার সকল বিনয় ও মিনতি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে আল্লাহ তার দোয়া কবুলও করেন। তার দোয়ার সূচনা ছিল এমন:

ذِكْرُ رَحْمَتِ رَبِّكَ عَبْدَهُ زَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا . قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَ اشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُنْ بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا . وَإِنِّي خِفْتُ الْمَوَالِيَ مِنْ وَرَاعِي وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا. يَرِثُنِي وَيَرِথُ مِنْ آلِ يَعْقُوْبَ وَ اجْعَلْهُ رَبِّ رَضِيًّا . يزَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَمِ اسْمُهُ يَحْيَى لَمْ نَজْعَلْ لَهُ مِنْ قَبْلُ سَمِيًّا . قَالَ رَبِّ أَنِّي يَكُونُ لِي غُلْمٌ وَكَانَتِ امْرَأَتِي عَاقِرًا وَ قَدْ بَلَغْتُ مِنَ الْكِبَرِ عِتِيًّا . قَالَ كَذلِكَ قَالَ رَبُّكَ هُوَ عَلَى هَيِّنٌ وَ قَدْ خَلَقْتُكَ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ تَكُ شَيْئًا .

অর্থ: 'এটা আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহের বিবরণ তাঁর বান্দা জাকারিয়ার প্রতি, যখন তিনি তাঁর পালনকর্তাকে আহ্বান করেছিলেন নিভৃতে। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে; বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে; হে আমার পালনকর্তা, তবুও আপনার কাছে দোয়া করা থেকে আমি কখনও নিরাশ হইনি। আমি আশঙ্কা করি আমার পর আমার স্বগোত্র নিয়ে এবং আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; তাই আপনি নিজের পক্ষ থেকে আমাকে একজন সন্তান দান করুন, যে ইয়াকুব বংশে আমার স্থলাভিষিক্ত হবে এবং হে আমার পালনকর্তা, তাকে করুন সন্তোষজনক। (আল্লাহ বলেন) হে জাকারিয়া, আমি তোমাকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিচ্ছি, যার নাম হবে ইয়াহইয়া। ইতঃপূর্বে এই নামে আমি কারও নামকরণ করিনি। তিনি বললেন, হে আমার পালনকর্তা, কেমন করে আমার পুত্র হবে, অথচ আমার স্ত্রী বন্ধ্যা আর আমিও বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে উপনীত? তিনি বললেন, এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলে দিয়েছেন, এটা আমার পক্ষে সহজ। আমি তো ইতঃপূর্বে তোমাকে সৃষ্টি করেছি, অথচ তুমি কিছুই ছিলে না।' [মারইয়াম: ২-৯]

আমাদের সমাজের নিঃসন্তান দম্পতিগুলোর জন্য জাকারিয়া আলাইহিস সালাম হতে পারেন উত্তম আদর্শ। তাবিজ কবচ না ঝুলিয়ে, নিয়মিত চিকিৎসা ও দোয়া অব্যাহত রাখলে আশি বছর বয়সে, শূন্যগর্ভ নারীকেও আল্লাহ সন্তান দিতে পারেন, কারণ এটা তাঁর জন্য সহজ।

পাঁচ. সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় দোয়া করা। এমন যেন না হয় যে, কেবল দুঃখের সময় দোয়া করব আর সুখের সময় তাকে ভুলে যাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সুখের সময় আল্লাহর সঙ্গে পরিচিত থাকো (তার বিধান মানার মধ্য দিয়ে), তা হলে দুঃখের সময় তিনি তোমাকে চিনবেন।²

ছয়. আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ও গুণের উসিলায় দোয়া করা। যেমন: হে রহমান, আপনি পরম করুণাময় দয়ালু মালিক। আমাদের দয়া করুন। কুরআনে আল্লাহ তার নামগুলোর মাধ্যমে দোয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوْهُ بِهَا " 'আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম, তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো।' [আরাফ: ১৮০]

সাত. কিবলামুখী হয়ে পবিত্রাবস্থায় দোয়া করা, হাত উঠিয়ে দোয়া করা, আল্লাহর প্রশংসার মাধ্যমে দোয়া শুরু করা, রাসুলুল্লাহর উপর সালাম পাঠ করা। সেসব সময়ে দোয়া করা, যেগুলোতে দোয়া কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন: রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, সাহরি ও ইফতারের সময়, বৃষ্টি বর্ষণের সময়, আজান ও ইকামতের মাঝে, সিজদার মাঝে, জুমার দিন শেষ বিকেলে, প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে ইত্যাদি। পাশাপাশি রোজাদার, মজলুম ব্যক্তির দোয়া, অন্যের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করা, সন্তানের জন্য পিতামাতার দোয়া কবুলের বিশেষ ওয়াদা রয়েছে। ফলে সেসব অবস্থায় দোয়া করা। পাশাপাশি সেসব স্থানে দোয়ার চেষ্টা করা, যেখানে দোয়া কবুলের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন: মসজিদে দোয়া করা। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, নেক আমল, নবি-রাসুল ও পুণ্যবান ব্যক্তিদের উসিলা দিয়েও আল্লাহর কাছে দোয়া করা যেতে পারে। পিছনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

টিকাঃ
১. আবু দাঊদ (১৫২৪); ইবনে হিব্বান (৯২৩); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (১০২১৮)।
২. মুসতাদরাকে হাকেম (৬৩৫৯); মুসনাদে আহমদ (২৮৩১)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px