📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছু হয় না

📄 আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছু হয় না


সবকিছু তাঁর ইচ্ছা, জ্ঞান, ফয়সালা এবং নির্ধারণ অনুযায়ীই সম্পাদিত হয়। তাঁর ইচ্ছা সকল ইচ্ছার উপর বিজয়ী। তাঁর ফয়সালা সকল কলাকৌশল, উপায়-উপকরণের উর্ধ্বে। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন; কিন্তু তিনি কাউকে কখনও জুলুম করেন না। 'তিনি যা করেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হন না, কিন্তু তারা জিজ্ঞাসিত হবে।'
এটি পূর্ববর্তী আলোচনার তাগিদ। অর্থাৎ আমাদের আল্লাহ তায়ালা পরাধীন করে বানানি, কিন্তু একেবারে স্বাধীনও নয়। আল্লাহ আমাদের থেকে সকল ইচ্ছাশক্তি ছিনিয়ে নেননি, আবার আমাদের সবকিছু করার মতো ক্ষমতাও দেননি। আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা; কিন্তু আমাদের স্বেচ্ছায় ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের ইচ্ছা দিয়েছেন, কিন্তু সেই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে। এভাবে দুটো প্রান্তিকতার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় গোটা সৃষ্টি বিদ্যমান। সৃষ্টি সুশৃঙ্খলভাবে চলমান থাকার জন্য এই ভারসাম্য অপরিহার্য। আল্লাহ মানুষকে তার ইচ্ছার অধীন করে, মানুষের সামর্থ্যকে তার কুদরতের উপর নির্ভরশীল করে সৃষ্টি করার পরেও মানুষ আজ নিজের হাতে পৃথিবী ধ্বংস করছে। আল্লাহর বানানো মানুষ ধ্বংস করছে। ইচ্ছা ও সামর্থ্যের তুচ্ছ একটা অংশ পাওয়ার পরেও মানুষ যদি এই পর্যায়ের সীমালঙ্ঘন করে, তবে পুরো ক্ষমতা ও সামর্থ্য দিয়ে দিলে মানুষ কতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠত কল্পনা করা যায়?
এ কারণেই জগতের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান ও নির্ধারণ অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়া জরুরি। তিনি যেহেতু সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, সকল ইচ্ছার উপর তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়িত হওয়া জরুরি। তাই জগতের সবকিছু সামগ্রিকভাবে তার ইচ্ছা ও সৃষ্টি অনুযায়ীই হয়। মৌলিকভাবে তার ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না। হ্যাঁ, তার ইচ্ছার অধীনে আমাদের ইচ্ছার অস্তিত্ব রয়েছে।
কেউ পূর্বের প্রশ্ন আবারও তুলতে পারেন, আমাদের ইচ্ছাটা যেহেতু তার ইচ্ছার অধীনেই, তবে চূড়ান্তভাবে তো তাঁর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হচ্ছে, আমাদের ইচ্ছা নয়। তিনি যদি সেটা ইচ্ছা না করতেন, তবে তো বাস্তবায়িত হতো না। তা হলে আমাদের দায় কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত লম্বা। কিন্তু অত্যন্ত খাটো করেও এটার উত্তর দেওয়া যায়। আর ইমাম তহাবি সেটাই করেছেন। তিনি এক কথায় উত্তর দিয়েছেন, 'আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না।' এর মানে, আপনাকে তাকদির সম্পর্কে সবকিছু বোঝানোর পরেও যদি আপনার মনে খটকা থাকে, আল্লাহর সৃষ্টি ও আপনার উপার্জন (কাসব), আল্লাহর দেওয়া তাওফিক এবং আপনার সামর্থ্য—এ সবকিছু তুলে ধরার পরেও যদি আপনার মনে হয় আপনি বাধ্য, আপনি পরাধীন, আপনার কিছু করার ক্ষমতা নেই; যদি ভাবেন, আপনার জীবন ও ইবাদত সবকিছু আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন, সুতরাং আপনাকে পরকালে কেন শাস্তি দেওয়া হবে? তবে একটি মূলনীতিই আপনার সকল কুমন্ত্রণার ঔষধ। তা হলো 'আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না।'¹
এই একটি বাক্য আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর, আপনার সকল সন্দেহ ও অস্থিরতার চিকিৎসা। আপনি পরাধীন হোন, আপনার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন হোক, আপনার জীবন অন্যের মাধ্যমে পরিচালিত হোক, আপনার জীবনের চাবি আপনার হাতে না থাকুক, অর্থাৎ তাকদির নিয়ে আপনার মনে যত ধোঁয়াশাই তৈরি হোক, আপনি যদি আপনার হৃদয়ে বসিয়ে নিতে পারেন যে, আল্লাহ কাউকে বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না, তবে আপনার সব জটিলতা দূর হয়ে যাবে। তাকদির নিয়ে লম্বা লম্বা গবেষণা পড়তে হবে না। বরং তাকদির সম্পর্কে কিছু না জেনেও আপনি তাকদিরের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রশান্তির অধিকারী হবেন। কারণ, যখনই আপনার মনে কোনো বিষয় খটকা লাগবে, আপনি বলবেন, আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না। এর মানে আপনার-আমার বুঝতে ভুল হচ্ছে। বুঝতে যেহেতু ভুল হচ্ছে, তাই এ ব্যাপারে নীরব থাকতে হবে। কারণ, আল্লাহ মানুষকে কেন জুলুম করবেন? মানুষ কি তার প্রতিপক্ষ? মানুষ কি তার রাজত্বে ভাগ বসাবে? মানুষকে কি তিনি মনের খাহেশ মেটাতে তৈরি করেছেন? মানুষকে কি তিনি নিজের কোনো স্বার্থে তৈরি করেছেন? কখনও নয়। আল্লাহ এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মানুষকে তিনি মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। গোটা জগতে আল্লাহর সমকক্ষ আর কেউ নেই। তাঁর কোনো শরিক নেই। ফলে তিনি কাউকে জুলুম করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। জুলুম তার ব্যাপারে কল্পনাতেও স্থান দেওয়া যায় না। ফলে তাকদির না বুঝলে আল্লাহ আপনাকে জুলুম করেন না—এটুকু বুঝেই নীরব থাকতে হবে। কিন্তু আপনি যদি এখানে মনগড়া কথা বলেন, সেটা সীমালঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ, আল্লাহ যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার কেউ নেই, কিন্তু মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হবে।

টিকাঃ
১. দেখুন: শিফাউল আলিল (১৬৪); কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (১২৫); সাইদ ফুদাহ (৪২৩)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px