📄 সামর্থ্যের প্রকারভেদ
সামর্থ্য দুই প্রকারের — একটা হচ্ছে তাওফিক যা আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত। আরেকটা হচ্ছে শারীরিক সুস্থতা, দৈহিক সামর্থ্য, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও উপায়- উপকরণ ঠিক থাকা। এটা বান্দার সঙ্গে সম্পৃক্ত। পৃথিবীর সকল কাজ করার জন্য এই দুটি সামর্থ্যের দরকার হয়। মানুষের সুস্থতা, শারীরিক সক্ষমতা সবকিছু থাকার পরেও যদি আল্লাহর তাওফিক না থাকে তবে সে কাজটি হবে না। আবার আল্লাহর তাওফিক দেওয়ার অর্থ হলো তিনি শারীরিক সুস্থতা দান করবেন, উপায়-উপকরণও প্রস্তুত করে দেবেন। সুতরাং বান্দার সকল কাজ এই দুই সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল।
শরিয়তের আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারাম মৌলিকভাবে দ্বিতীয় প্রকারের (বাহ্যিক) সামর্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ কেউ যদি শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল থাকে, শরিয়তের পক্ষ থেকে তার উপর নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদির মতো বিধান আরোপিত হয়। কিন্তু কেউ যদি অসুস্থ থাকে, তবে এসব বিধান আরোপিত হয় না। কারণ, হজে যাওয়ার উপকরণ না থাকলে হজ ফরজ হয় না। চোখ না থাকলে চোখের পর্দা ফরজ হয় না। বিবেকবুদ্ধি ঠিক না থাকলে (অন্য কথায় পাগল হলে) শরিয়তের কোনো নির্দেশই প্রযোজ্য হয় না ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় প্রকারের সামর্থ্য কাজের আগে বিদ্যমান থাকা জরুরি। যদি বিদ্যমান থাকে, আল্লাহ কাজের নির্দেশ দেবেন। বিদ্যমান না থাকলে আল্লাহ সে কাজের নির্দেশ দেবেন না। আর প্রথম প্রকারের (সুপ্ত) সামর্থ্য কাজের সময় বিদ্যমান থাকা জরুরি। ফলে শারীরিক সুস্থতা ও উপকরণ আগে থেকে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কাজটি ঠিক করার সময় আল্লাহর তাওফিক না থাকলে কাজটি সম্পাদিত হবে না।
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (৪৩৫-৪৩৬); সালেহ ফাওজান (১৬২)।
📄 আল্লাহর সৃষ্টি বান্দার উপার্জন—তাকদির রহস্যের উদ্ঘাটন
বান্দার সকল কাজ আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু বান্দার উপার্জন বা হাতের কামাই (কাসব)। এটি পূর্ববর্তী আলোচনার তাগিদ। অর্থাৎ আমাদের আল্লাহ তায়ালা পরাধীন করে বানানি, কিন্তু একেবারে স্বাধীনও নয়। আল্লাহ আমাদের থেকে সকল ইচ্ছাশক্তি ছিনিয়ে নেননি, আবার আমাদের সবকিছু করার মতো ক্ষমতাও দেননি। আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা; কিন্তু আমাদের স্বেচ্ছায় ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের ইচ্ছা দিয়েছেন, কিন্তু সেই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে। এভাবে দুটো প্রান্তিকতার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় গোটা সৃষ্টি বিদ্যমান। সৃষ্টি সুশৃঙ্খলভাবে চলমান থাকার জন্য এই ভারসাম্য অপরিহার্য। আল্লাহ মানুষকে তার ইচ্ছার অধীন করে, মানুষের সামর্থ্যকে তার কুদরতের উপর নির্ভরশীল করে সৃষ্টি করার পরেও মানুষ আজ নিজের হাতে পৃথিবী ধ্বংস করছে। আল্লাহর বানানো মানুষ ধ্বংস করছে। ইচ্ছা ও সামর্থ্যের তুচ্ছ একটা অংশ পাওয়ার পরেও মানুষ যদি এই পর্যায়ের সীমালঙ্ঘন করে, তবে পুরো ক্ষমতা ও সামর্থ্য দিয়ে দিলে মানুষ কতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠত কল্পনা করা যায়?
জাবরিয়্যাহ সম্প্রদায় এই দুই সামর্থ্য কিংবা আল্লাহ ও বান্দার দুটি পক্ষের সমন্বয় বুঝতে পারেনি। সৃষ্টি ও উপার্জন দুটোর পার্থক্য ধরতে পারেনি। তারা মনে করেছে সবকিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং এখানে মানুষের কোনো দায় নেই। তারা যদি বুঝত যে, মূল কাজটি আল্লাহর সৃষ্টি হলেও এবং আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্য ছাড়া কাজটি না হলেও কাজটি মানুষ নিজের ইচ্ছাতে করেছে, কেউ তাকে বাধ্য করেনি, আল্লাহ তার উপর চাপিয়ে দেননি; এমন হয় না যে, সে একটা জিনিস স্বেচ্ছায় না করা সত্ত্বেও হয়ে যাচ্ছে; যেমন: সে সামনের দিকে যেতে চাচ্ছে না, কিন্তু শরীর তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে—এমন হয় না; আর হলেও সেটা তাকলিফের মাঝে পড়ে না। এটা বুঝলে জাবরিয়্যাহরা সবকিছু আল্লাহর উপর চাপিয়ে নিজেদের পরাধীন ও পুতুল মনে করত না। তাদের মাজহাব সুস্পষ্ট ভ্রান্ত। কারণ, তাতে আল্লাহকে জালেম সাব্যস্ত করা হয়। ফলে তারা তাকদির মেনে নিয়েও বাড়াবাড়ির কারণে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। আহলে সুন্নাতের মত হলো, আল্লাহ সকল কাজের সৃষ্টিকর্তা ঠিকই, কিন্তু কাজটি বান্দা নিজে করে। ফলে এর দায়-দায়িত্বও তার। নতুবা কেউ কথা বললে বলতে হবে—সে নয়, আল্লাহ কথা বলেছেন। কেউ খেলে বলতে হবে—আল্লাহ খেয়েছেন। কেউ চুরি করলে বলতে হবে—আল্লাহ করেছেন। নাউজুবিল্লাহ।¹
আবার কাদারিয়্যাহ (ও মুতাজিলা) সম্প্রদায়ও এই দুই প্রকার সামর্থ্য বুঝতে পারেনি। সৃষ্টি ও উপার্জন দুটোর পার্থক্য করেনি। ফলে তারা মনে করেছে, মানুষের সবকিছু মানুষের হাতে। মানুষ তার কাজগুলোকে সৃষ্টি করছে, আল্লাহর কিছুই করার নেই। মানুষ তার ভাগ্যের ও কর্মের স্রষ্টা। অথচ তারা যদি বুঝত, মানুষের সব সামর্থ্য বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্য না থাকলে কোনো কাজ করা সম্ভব নয়, বাহ্যিকভাবে মানুষ নিজের ইচ্ছায় কাজটি করলেও মূল কাজটি আল্লাহর সৃষ্টি—সে যেটা করেছে সেটা কেবলই এখতিয়ার ও হাতের বাস্তবায়ন (কাসব), তা হলে তারা মানুষকে তার কর্মের স্রষ্টা বলত না। আর মানুষকে কর্মের স্রষ্টা বলা মানে তাকে সৃষ্টিকর্তা বলা, আল্লাহ ও মানুষ দুজন সৃষ্টিকর্তা সাব্যস্ত করা। এ কারণেই তাদের এ উম্মতের অগ্নিপূজারী বলা হয়েছে।²
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (৪৩৯); আকহাসারি (২২৯-২৩০)।
২. তাবারানি, আল-মুজামুস সাগির (৮০০); আল-আওসাত (৫৩০৩)।
📄 আল্লাহ মানুষকে সাধ্যের অতীত চাপিয়ে দেন না
পিছনে এ সম্পর্কে একাধিক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতীত চাপিয়ে দেন না।' [বাকারা: ২৮৬] কারণ, সাধ্যের বাইরে চাপিয়ে দিলে তার কাছে সে ব্যাপারে কৈফিয়ত চাওয়া যায় না। আল্লাহ মানুষকে এখতিয়ার ও কামাইয়ের ক্ষমতা দিলেও মানুষের ক্ষমতা সীমিত। আর পরকালে যেহেতু প্রত্যেকটা কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন, তাই স্বাভাবিকভাবেই সাধ্যের বাইরে চাপিয়ে দেবেন না। কারণ, সাধ্যের অতীত চাপিয়ে দিলে আমরা সেটা করতে সক্ষম হতাম না। তখন আল্লাহ আমাদের কাছে জবাবদিহি চাইলে সেটা জুলুম হিসেবে পরিগণিত হতো। ফলে আল্লাহ আমাদের সাধ্যের ভিতরেই সকল বিধি-নিষেধ প্রদান করেন। তাই সেগুলো অমান্য করলে এর দায়ভার আমাদের কাঁধেই। আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তার ইচ্ছাতেই সবকিছু হয় বলে নিজেদের অপরাধ ঢাকার সুযোগ নেই। কারণ, কাজটা মূলত আল্লাহর সৃষ্টি হলেও কামাই করেছি আমার দুই হাতে। আমি না করলে আল্লাহ জোর করে করাতেন না।
মানুষ ততটুকুই সাধ্য রাখে যতটুকু আল্লাহ তাকে দায়িত্ব দেন: উক্ত বক্তব্যের অর্থ কী? উক্ত বক্তব্যটি বেশ জটিল। প্রাচীন ব্যাখ্যাতাগণ, যেমন গজনবি, শাইবানি, তুর্কিস্তানি, এটার কোনো ব্যাখ্যাই করেননি। ইবনে আবিল ইজ বলেছেন, বাক্যটি দুরূহ। কিন্তু সমকালীন একদল ব্যাখ্যাতা এটাকে সরাসরি ভুল সাব্যস্ত করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, আল্লাহ যতটুকু দায়িত্ব দিয়েছেন মানুষ এর বেশি করার সাধ্য রাখে। যেমন: আমাদের উপর প্রতি বছর ত্রিশটি রোজা ফরজ করা হয়েছে; অথচ আমরা চল্লিশটি রোজা পালনের সাধ্য রাখি। আল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন; আমরা এর বেশি আদায়ের সামর্থ্য রাখি। কিন্তু তিনি অনুগ্রহ করে সাধ্যের চেয়েও অনেক কম দায়িত্ব আমাদের দিয়েছেন। সুতরাং 'মানুষ ততটুকুই সাধ্য রাখে যতটুকু আল্লাহ তাকে দায়িত্ব দেন' কথাটি সঠিক নয়।¹
কিন্তু তাদের এই বক্তব্যও সঠিক নয়। ইমাম তহাবির কথার কথা বলেছেন কিংবা অজ্ঞাতসারে বলেছেন এমন নয়। বরং উক্ত বাক্যটিকে তিনি 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'র অর্থ ও ব্যাখ্যা হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বক্তব্য তিনি না বুঝেই বলে দেবেন ব্যাপারটা এমন নয়। সুতরাং তার বক্তব্যকে না বুঝে কিংবা আক্ষরিক অর্থ ধরে ভুল সাব্যস্ত করা সঠিক নয়। এ কারণে সমকালীন মুহাক্কিক ব্যাখ্যাতাগণ ইমাম তহাবির বক্তব্যকে ভুল বলেননি; বরং তারা সেটাকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশেষত শাইখ আবদুল হারারি ও শাইখ সাইদ ফুদাহ তারা উক্ত বক্তব্যকে সঠিক করার জন্য বেশ কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আবদুল্লাহ হারারি ইমাম তহাবির ব্যাক্যটি অন্যভাবে পড়ে অর্থ করেছেন, যা অধমের কাছে সঠিক মনে হয়নি।² সাইদ ফুদাহ এখানে তাকলিফের বিস্তৃত অর্থ ধরে ব্যাখ্যা করেছেন।³ অধমের সেটা ভালো লেগেছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মনে হয়নি।
অধমের ধারণা, ইমাম তহাবির উক্ত বক্তব্যের অর্থ তার বক্তব্যের মাঝেই বিদ্যমান। ফলে নিজেদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা যুক্ত করার দরকার হবে না। আরেকবার ইমাম তহাবির বক্তব্যে দৃষ্টি দেওয়া যাক। তিনি লিখেছেন, 'আল্লাহ মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেননি, একইভাবে মানুষ ততটুকুই সাধ্য রাখে যতটুকু আল্লাহ তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এটাই 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'র অর্থ। এখানে প্রথমে 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'র অর্থ দেখুন। কারণ, এর মাঝেই ইমাম তহাবির বক্তব্যের অর্থ লুক্কায়িত। এটার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো উপায় নেই, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই। কিন্তু আমরা কি এর শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করি? না, করি না। কারণ, আল্লাহ ছাড়া উপায় আছে। কেউ যদি আপনার সামনে দুটো উপায় বলে দেয়, আপনি চাইলে যেকোনোটা গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ ছাড়া শক্তি আছে- আমার শক্তি, আপনার শক্তি, রাজনীতিক নেতার শক্তি, রাষ্ট্রপতির শক্তি, জনগণের শক্তি। অন্য কথায়, আল্লাহ ছাড়া অনেক শক্তি আছে। তা হলে 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'র অর্থ কি ভুল? না, বরং এটার শাব্দিক অর্থ তোলা ভুল, মর্মার্থ ভুল নয়। এটার মর্মার্থ হলো, প্রকৃতপক্ষে আমরা পৃথিবীতে যত শক্তি-সামর্থ্য, উপায়-উপকরণ দেখি না কেন, বাস্তবে সেসব আল্লাহর মুখাপেক্ষী। আল্লাহ চাইলে সেসব উপায়-উপকরণ ও শক্তি আমাদের উপকার করবে। আল্লাহ না চাইলে কারও কোনো উপকার করার সাধ্য নেই। সুতরাং সকল উপায়-উপকরণের মালিক আল্লাহ তায়ালাই।
এবার দৃষ্টি দিন ইমাম তহাবির বক্তব্যে। ইমাম বলেন, 'আল্লাহ মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেননি, একইভাবে মানুষ ততটুকুই সাধ্য রাখে যতটুকু আল্লাহ তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।' বাহ্যিকভাবে তো দেখা যাচ্ছে আল্লাহ আমাদের যতটুকু দায়িত্ব দিয়েছেন আমরা তারচেয়ে বেশি সাধ্য রাখি। কিন্তু গভীরে গেলে আমরা দেখব, আল্লাহ আমাদের যতটুকু দায়িত্ব দিয়েছেন আমরা তারচেয়ে বেশি সাধ্য রাখি না। কীভাবে? এখানে তাকলিফ তথা দায়িত্ব বলতে যদি ফরজ-ওয়াজিব মনে করি তবেই সমস্যা। বরং এখানে তাকলিফ অর্থ জীবনের সবকিছু, সকল কাজ, সকল নির্দেশ ও নির্দেশনা। যেমন: 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা' কেবল ইবাদতের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে তাকলিফ বলতে আমাদের ইবাদত, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র, পারিবারিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন-সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ আমাদের সাধ্য আর আল্লাহর বিধান দুটো এক সমান্তরাল রেখায় অবস্থিত। আল্লাহ আমাদের সাধ্যের অতীত যেমন কিছু চাপিয়ে দেন না, তেমনই আমরা আল্লাহর নির্দেশের অতীত কিছু করতে পারি না। আল্লাহ আমাদের উপর যা-কিছু ফরজ করেছেন, এটুকুই আমাদের সাধ্যে আছে। হ্যাঁ, ব্যতিক্রম থাকবে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সকল মানুষ ততটুকুই পারে, যেটুকু আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের পারিবারিক দায়িত্ব আমরা ততটুকুই পারব, যতটুকু আল্লাহ করতে বলেছেন। এমনকি দায়িত্বের বাইরে আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মানবিক গুণাবলি ইত্যাদির ক্ষেত্রেও আমরা ততটুকু সাধ্য রাখি যতটুকু আল্লাহ আমাদের থেকে চান। কারণ, তিনি যদি আমাদের থেকে আরও বেশি চাইতেন, আমাদের আরও বেশি সামর্থ্যবান করে সৃষ্টি করতেন। সেটা না করে আমাদের এখন যেটুকু সাধ্য আছে, ঠিক এটুকু সাধ্য আমাদের আল্লাহ কেন দিলেন? কারণ, তিনি আমাদের যতটুকু দায়িত্ব (কেবল নামাজ-রোজা নয়) দেবেন, এরচেয়ে আর বেশি সামর্থ্যের দরকার হবে না। এভাবে দেখলে ইমাম তহাবির কথার ভিতরে কোনো ভুল নেই। বরং 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা'র ভিতরে যেই গভীর মর্ম রয়েছে, ইমাম তহাবির কথার ভিতরেও গভীর মর্ম রয়েছে।
উক্ত ব্যাখ্যা লেখার পরে আমরা আকহাসারির ব্যাখ্যায় দেখলাম তিনি লিখেছেন, এটার অর্থ হচ্ছে তাওফিক, শরিয়তের বিধি-নিষেধ নয়, যা বিশ্লেষণ করলে মোটামুটি আমাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যাই দাঁড়ায়। আলহামদুলিল্লাহ।⁴
সুতরাং প্রমাণিত হলো, আমাদের জীবন ও জগতের সবকিছু আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের অধীন, আল্লাহপ্রদত্ত সামর্থ্য ও তাকদিরের অধীন। তাই ইমাম তহাবি বলেছেন, 'আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারও কোনো উপায় নেই, নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই; তাঁর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচার পথ নেই, তাঁর আনুগত্য করা এবং আনুগত্যে অবিচল থাকার সুযোগ নেই। ইমাম তহাবির এই বক্তব্যও শাব্দিকভাবে ধরা যাবে না। তাতে জাহমিয়্যাহ ও জাবরিয়্যাহদের আকিদা প্রবেশ করবে। বরং এর মর্ম হলো, আমাদের শারীরিক সক্ষমতা, সুস্থতা, উপায়-উপকরণ সবকিছু আছে, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সামর্থ্য (তাওফিক) ও সৃষ্টি অনুপস্থিত থাকলে কোনোকিছুই সংঘটিত হবে না। সুতরাং সবকিছুর মূল আল্লাহ তায়ালা। তিনি চাইলে সব হয়; তিনি না চাইলে কিছুই হয় না।
টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (১৬৫)।
২. আবদুল্লাহ হারারি ইমাম তহাবির ব্যাক্যটি অন্যভাবে পড়ে অর্থ করেছেন, যা অধমের কাছে সঠিক মনে হয়নি।
৩. সাইদ ফুদাহ (১২১৩)।
৪. আকহাসারি (২৩০)
📄 আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনোকিছু হয় না
সবকিছু তাঁর ইচ্ছা, জ্ঞান, ফয়সালা এবং নির্ধারণ অনুযায়ীই সম্পাদিত হয়। তাঁর ইচ্ছা সকল ইচ্ছার উপর বিজয়ী। তাঁর ফয়সালা সকল কলাকৌশল, উপায়-উপকরণের উর্ধ্বে। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন; কিন্তু তিনি কাউকে কখনও জুলুম করেন না। 'তিনি যা করেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হন না, কিন্তু তারা জিজ্ঞাসিত হবে।'
এটি পূর্ববর্তী আলোচনার তাগিদ। অর্থাৎ আমাদের আল্লাহ তায়ালা পরাধীন করে বানানি, কিন্তু একেবারে স্বাধীনও নয়। আল্লাহ আমাদের থেকে সকল ইচ্ছাশক্তি ছিনিয়ে নেননি, আবার আমাদের সবকিছু করার মতো ক্ষমতাও দেননি। আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা; কিন্তু আমাদের স্বেচ্ছায় ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার সামর্থ্য দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদের ইচ্ছা দিয়েছেন, কিন্তু সেই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে। এভাবে দুটো প্রান্তিকতার মাঝে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় গোটা সৃষ্টি বিদ্যমান। সৃষ্টি সুশৃঙ্খলভাবে চলমান থাকার জন্য এই ভারসাম্য অপরিহার্য। আল্লাহ মানুষকে তার ইচ্ছার অধীন করে, মানুষের সামর্থ্যকে তার কুদরতের উপর নির্ভরশীল করে সৃষ্টি করার পরেও মানুষ আজ নিজের হাতে পৃথিবী ধ্বংস করছে। আল্লাহর বানানো মানুষ ধ্বংস করছে। ইচ্ছা ও সামর্থ্যের তুচ্ছ একটা অংশ পাওয়ার পরেও মানুষ যদি এই পর্যায়ের সীমালঙ্ঘন করে, তবে পুরো ক্ষমতা ও সামর্থ্য দিয়ে দিলে মানুষ কতটা বিধ্বংসী হয়ে উঠত কল্পনা করা যায়?
এ কারণেই জগতের সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান ও নির্ধারণ অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়া জরুরি। তিনি যেহেতু সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, সকল ইচ্ছার উপর তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়িত হওয়া জরুরি। তাই জগতের সবকিছু সামগ্রিকভাবে তার ইচ্ছা ও সৃষ্টি অনুযায়ীই হয়। মৌলিকভাবে তার ইচ্ছার বাইরে কিছুই হয় না। হ্যাঁ, তার ইচ্ছার অধীনে আমাদের ইচ্ছার অস্তিত্ব রয়েছে।
কেউ পূর্বের প্রশ্ন আবারও তুলতে পারেন, আমাদের ইচ্ছাটা যেহেতু তার ইচ্ছার অধীনেই, তবে চূড়ান্তভাবে তো তাঁর ইচ্ছাই বাস্তবায়িত হচ্ছে, আমাদের ইচ্ছা নয়। তিনি যদি সেটা ইচ্ছা না করতেন, তবে তো বাস্তবায়িত হতো না। তা হলে আমাদের দায় কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত লম্বা। কিন্তু অত্যন্ত খাটো করেও এটার উত্তর দেওয়া যায়। আর ইমাম তহাবি সেটাই করেছেন। তিনি এক কথায় উত্তর দিয়েছেন, 'আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না।' এর মানে, আপনাকে তাকদির সম্পর্কে সবকিছু বোঝানোর পরেও যদি আপনার মনে খটকা থাকে, আল্লাহর সৃষ্টি ও আপনার উপার্জন (কাসব), আল্লাহর দেওয়া তাওফিক এবং আপনার সামর্থ্য—এ সবকিছু তুলে ধরার পরেও যদি আপনার মনে হয় আপনি বাধ্য, আপনি পরাধীন, আপনার কিছু করার ক্ষমতা নেই; যদি ভাবেন, আপনার জীবন ও ইবাদত সবকিছু আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ করছেন, সুতরাং আপনাকে পরকালে কেন শাস্তি দেওয়া হবে? তবে একটি মূলনীতিই আপনার সকল কুমন্ত্রণার ঔষধ। তা হলো 'আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না।'¹
এই একটি বাক্য আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর, আপনার সকল সন্দেহ ও অস্থিরতার চিকিৎসা। আপনি পরাধীন হোন, আপনার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন হোক, আপনার জীবন অন্যের মাধ্যমে পরিচালিত হোক, আপনার জীবনের চাবি আপনার হাতে না থাকুক, অর্থাৎ তাকদির নিয়ে আপনার মনে যত ধোঁয়াশাই তৈরি হোক, আপনি যদি আপনার হৃদয়ে বসিয়ে নিতে পারেন যে, আল্লাহ কাউকে বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না, তবে আপনার সব জটিলতা দূর হয়ে যাবে। তাকদির নিয়ে লম্বা লম্বা গবেষণা পড়তে হবে না। বরং তাকদির সম্পর্কে কিছু না জেনেও আপনি তাকদিরের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি প্রশান্তির অধিকারী হবেন। কারণ, যখনই আপনার মনে কোনো বিষয় খটকা লাগবে, আপনি বলবেন, আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না। এর মানে আপনার-আমার বুঝতে ভুল হচ্ছে। বুঝতে যেহেতু ভুল হচ্ছে, তাই এ ব্যাপারে নীরব থাকতে হবে। কারণ, আল্লাহ মানুষকে কেন জুলুম করবেন? মানুষ কি তার প্রতিপক্ষ? মানুষ কি তার রাজত্বে ভাগ বসাবে? মানুষকে কি তিনি মনের খাহেশ মেটাতে তৈরি করেছেন? মানুষকে কি তিনি নিজের কোনো স্বার্থে তৈরি করেছেন? কখনও নয়। আল্লাহ এ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মানুষকে তিনি মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন। গোটা জগতে আল্লাহর সমকক্ষ আর কেউ নেই। তাঁর কোনো শরিক নেই। ফলে তিনি কাউকে জুলুম করা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। জুলুম তার ব্যাপারে কল্পনাতেও স্থান দেওয়া যায় না। ফলে তাকদির না বুঝলে আল্লাহ আপনাকে জুলুম করেন না—এটুকু বুঝেই নীরব থাকতে হবে। কিন্তু আপনি যদি এখানে মনগড়া কথা বলেন, সেটা সীমালঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ, আল্লাহ যা করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার কেউ নেই, কিন্তু মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হবে।
টিকাঃ
১. দেখুন: শিফাউল আলিল (১৬৪); কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (১২৫); সাইদ ফুদাহ (৪২৩)।