📄 পরকালের সফর-কবর থেকে জান্নাত পর্যন্ত
পৃথিবীর সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালা শিঙার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা ইরসাফিল আলাইহিস সালামকে শিঙায় ফুঁক দিতে বলবেন। নির্ধারিত একটা সময় পরে ইসরাফিল আবার শিঙায় ফুঁক দেবেন। তখন সবাই পুনরায় জীবিত হয়ে যাবে এবং যার যার কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকবে। কিয়ামতের দিন মানুষ তিনভাবে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে: একদল পায়ে হেঁটে, আরেক দল বাহনে চড়ে, আরেক দল মুখে ভর দিয়ে আসবে। সবাই নগ্নপদ, নগ্নশরীর ও খতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত হবে।
এই কঠিন অবস্থায় তারা হাশরের ময়দানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবে। হাশরের দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। [মাআরিজ: ৪] সূর্যের কাছে আসার কারণে গরম ও পিপাসায় তাদের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হবে। মুসলিমের হাদিসে এসেছে, সূর্য মানুষের এক মাইল দূরে থাকবে।¹ ঘাম বাড়তে থাকবে—কারও থাকবে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত, কারও ঘাম হবে হাঁটু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত, কারও কাঁধ পর্যন্ত, কারও কান পর্যন্ত; আবার কেউ পুরোটাই ঘামে ডুবে যাবে।² একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, প্রায় চল্লিশ বছর এভাবে মানুষ দাঁড়িয়ে হিসাবের অপেক্ষা করবে।³ কিন্তু আল্লাহর কাছের বান্দাদের জন্য এটা সহজ হবে।⁴
তখন আল্লাহ তায়ালা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাউজে কাওসার দান করবেন।⁵ একপর্যায়ে মানুষ অস্থির হয়ে বিভিন্ন নবির কাছে গিয়ে আল্লাহর কাছে হিসাব শুরুর সুপারিশ করতে বলবে। নবিগণ অপারগতা প্রকাশ করবেন। সবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে তিনি আরজি পেশ করবেন। আল্লাহ সেটা গ্রহণ করবেন। তখন প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে এবং তার সামনে প্রত্যেকের আমলনামা পেশ করা হবে। এটাকে 'আরজ' বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা যখন প্রশ্ন করা শুরু করবেন, তাঁর মাঝে এবং বান্দার মাঝে কোনো দোভাষী থাকবে না।¹ অনেকের মুখে সিল মেরে দেওয়া হবে; তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।²
যাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, তাদের হিসাব সহজ হবে, আর যাদের বাম হাতে দেওয়া হবে, তাদের হিসাব কঠিন হবে। অতঃপর মিজান তথা দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে।³ তাতে প্রত্যেকের আমল মাপা হবে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের একপাশে এবং কাফেরদের অন্যপাশে আলাদা করবেন। কাফেরদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ৪ মুমিনদের জন্য জাহান্নামের উপর পুল (সিরাত) স্থাপন করা হবে। ৫ মুমিনদের মাঝে সর্বপ্রথম উম্মতে মুহাম্মাদি এটা পার হবে। ৬ মুনাফিকরা যখন পার হতে যাবে, হঠাৎ তাদের আলো নিভে যাবে এবং তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ৭ পুল পার হয়ে সকল মুমিন জান্নাতের সামনে গিয়ে একত্র হবেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন। ৮
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৮৬৪)।
২. বুখারি (৪৯৩৮); মুসলিম (২৮৬২, ২৮৬৪)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৯৭৬৩)।
৪. ইবনে হিব্বান (৭৩৩৩); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৬০২৫)।
৫. তিরমিজি (২৪৪৩); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৬৮৮১)।
১. ইবনে খুজাইমা (৮৪৯); ইবনে হিব্বান (৭৩৭২)।
১. মুসলিম (২৯৬৮); ইবনে হিব্বান (৪৬৪২)।
২. ইবনে হিব্বান (৪৬৪২)।
৩. বুখারি (২০৯৭, ৬৪০৬, ৬৫৬৩); মুসলিম (৭১৫); আবু দাউদ (৪৭৯৯); মুসতাদরাকে হাকেম (৮৮৩৭)।
৪. ইবনে হিব্বান (৪৬৪২)।
১. ফাতহুল বারি (৩/২৪৬)।
২. মুসলিম (১৮৩); ইবনে হিব্বান (৭৩৭৭)।
৩. মুসলিম (৩১৫); ইবনে খুজাইমা (২৩২)।
৪. মুসলিম (১৯৫); মুসতাদরাকে হাকেম (৮৮৪৭)।
১. মুসলিম (১৯১)।
২. মুসলিম (১৯৭); মুসনাদে আহমদ (১২৫৯২)।
৩. তিরমিজি (২৩৫৪); ইবনে মাজা (৪১২৪)।
📄 জান্নাতের পরিচয়
জান্নাত আল্লাহর একটি সৃষ্টি। তাঁর প্রিয় মুমিন বান্দাদের চিরস্থায়ী আবাস হিসেবে তিনি এটা তৈরি করেছেন। আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, জান্নাত বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে।¹ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাত দেখেছেন। মিরাজের রাতে তিনি সিদরাতুল মুনতাহার পাশে 'আদন জান্নাত' দেখেছেন।² পুণ্যবান ব্যক্তি যখন মারা যায়, জান্নাতের দিকে তার কবরের একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।³ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় জান্নাতের ফল ধরেছেন। ৪ জান্নাতের অবস্থান কোথায় সেটা আমাদের জানা নেই। কুরআনে জান্নাতকে উপরে [মুতাফফিফিন: ১৮] এবং হাদিসে সপ্তম আকাশে বলা হয়েছে।⁵
জান্নাতে আল্লাহ যা রেখেছেন তা মানুষের কল্পনারও বাইরে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দাদের জন্য (জান্নাতে) যা প্রস্তুত করে রেখেছি, তা কোনো চোখ দেখেনি, কান শুনেনি, কোনো মানুষের কল্পনাতেও উদিত হয়নি।'⁶ জান্নাতবাসী জান্নাতে সর্বোত্তম আকৃতি এবং সবচেয়ে সুন্দর দেহাবয়ব নিয়ে প্রবেশ করবে। বয়স থাকবে ত্রিশ থেকে তেত্রিশের মাঝামাঝি। সবাই আদম আলাইহিস সালামের আকৃতিতে থাকবে। জান্নাতবাসী পূর্ণিমার চাঁদের মতো চমকাতে থাকবে। তাদের শারীরিক সব ধরনের রোগ থেকে মুক্ত থাকবে। তাদের কারও মাঝে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (৪২০)।
২. বুখারি (৩৩৪২); মুসলিম (১৬৩)।
৩. আবু দাউদ (৪৭৫৩); মুসনাদে আহমদ (১৮৮৩২)।
৪. বুখারি (৭৪৮, ১০৫২); মুসলিম (৯০৭)।
৫. মুসতাদরাকে হাকেম (৮৭৯৫)।
৬. বুখারি (৩২৪৪); মুসলিম (২৮২৪)।
📄 জান্নাতে কী আছে?
জান্নাত মুমিনদের আবাস্থল হিসেবে একটি জায়গা; কিন্তু সেখানে বিভিন্ন স্তর রয়েছে। সেখানে আটটি দরজার কথা এসেছে। জান্নাতের প্রশস্ততা সম্পর্কে বলা হয়েছে আসমান ও জমিনের প্রশস্ততার মতো। এর একটি ইট সোনার, অপরটি রুপার। জান্নাতের কঙ্কর ও নুড়িগুলো মোতি ও ইয়াকুতের। মাটি জাফরানের।¹ জান্নাতের প্রাসাদ এবং তাঁবুগুলো সোনা-রুপা ও মণিমুক্তার দ্বারা নির্মিত।² জান্নাতে অসংখ্য সবুজ বাগান, নদী-নহর, ঝরনা-প্রস্রবণ থাকবে। সেসব নদীর কোনোটা মিষ্টি পানির, কোনোটা দুধের, কোনোটা মদের এবং কোনোটা মধুর হবে। জান্নাতের বাগানের গাছগুলো একশত বছরের পথ সমান দীর্ঘ ও বড় থাকবে।³ জান্নাতে সব ধরনের ফল-ফুল ও পশুপাখি থাকবে।
জান্নাতে মানুষ সবকিছু করার অনুমতি পাবে। সেখানে মদ্যপান ও স্বর্ণালংকার হালাল হবে। রেশম, সোনা-রুপা যা ইচ্ছা পরিধান করতে পারবে। জান্নাতে হুরগণ পুরুষদের মধুর কণ্ঠে গান শোনাবেন। জান্নাতবাসী প্রত্যেকে প্রত্যেকের বোধগম্য ভাষায় কথা বলবে। পরিবারের সবাই জান্নাতে গেলে মানুষ একসঙ্গেই থাকবে। জান্নাতবাসী দুনিয়ার প্রিয় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গাতে মিশবে, একসঙ্গে বসবে, গল্প করবে। ৪ তবে সেখানে মানুষ এমন কিছু চাইবে না যা শোভনীয় নয়; যেমন ব্যভিচার বা অজাচার।
টিকাঃ
১. তিরমিজি (২৫২৬)।
২. বুখারি (৭০২৪); মুসলিম (২৮৩৮)।
৩. বুখারি (৩২৫১); মুসলিম (২৮২৬)।
১. মুসলিম (১৮৭)।
১. তিরমিজি (২৫৪৩); তয়ালিসি (৮৪৩)।
২. বুখারি (৫৫৭৫, ৫৬৩৩, ২০০৩); মুসলিম (২০৬৭); তিরমিজি (১৮৬১); আবু দাউদ (৩৭২৩)।
৩. আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৭৩৪); আল-আওসাত (৪৯১৭)।
৪. বুখারি (৬১৬৮); মুসলিম (২৬৩৯)।
📄 জান্নাতের স্তর
জান্নাত মৌলিক বস্তু হিসেবে একটিই, কিন্তু গুণাবলি ও স্তর তারতম্যে জান্নাত অনেকগুলো। প্রত্যেকে তার ঈমান, তাকওয়া, আমল এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সেখানে ভিন্ন ভিন্ন স্তর লাভ করবে। সবচেয়ে উন্নত স্তর হলো ফিরদাউস। এর পরে অন্যান্য জান্নাত। হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, এগুলো একটা অপরটার নিচে হবে। ফলে নিম্নস্তরের লোকজন উপরে তাকিয়ে উঁচু স্তরের লোকদের দেখতে পাবে। আর উপরের লোকজন নিচের লোকদের দেখতে আসবে। এটি ইনসাফপূর্ণ; কারণ যারা দ্বীনের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, তাদের মর্যাদা সাধারণ মুমিনদের মতো হতে পারে না। তবে জান্নাতবাসীর পরস্পরের মাঝে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না। সবাই একটি হৃদয়ের মতো থাকবে।