📄 পরকালের ব্যাপারে বিভিন্ন জাতির বিশ্বাস
পৃথিবীর শুরু থেকে আল্লাহ সকল সম্প্রদায়ের মাঝে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবি-রাসুল তাদের সম্প্রদায়কে ইহকাল-উত্তর পরকাল, পুনরুত্থান, হাশর, হিসাব-নিকাশ ইত্যাদি সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ সম্প্রদায় সেগুলো ভুলে গিয়েছে বা অস্বীকার করেছে। অনেক সম্প্রদায়ের সেসব বিশ্বাসের মাঝে বিকৃতি প্রবেশ করেছে। আবার অনেক সম্প্রদায় সেগুলো অনেকাংশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মানুষের পুনরুত্থানকেন্দ্রিক বিশ্বাস বেশ বিচিত্র এবং এক্ষেত্রে মানুষ একাধিক ভাগে বিভক্ত।
কিছু সম্প্রদায় মৃত্যুকে সম্পূর্ণ বিনাশ মনে করে না। তবে মৃত্যুপরবর্তী পরিণতি নিয়ে তারা বিভ্রান্ত ও বিকৃত বিশ্বাসে লিপ্ত। এসব সম্প্রদায় সাধারণত সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে এবং আত্মার মাঝেও বিশ্বাস করে। কেউ একজন যেহেতু তাদের সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং মৃত্যুর পরে তিনি তাদের পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম, অথবা মৃত্যুর পরে জীবন চলমান থাকতে সক্ষম—তারা এটাতে বিশ্বাস রাখে। তবে এই পুনরায় সৃষ্টি কিংবা জীবন অব্যাহত থাকার ব্যাখ্যা তারা বিভিন্নভাবে দেয়। এদের সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগ হলো আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান) এবং এগুলোর কাছাকাছি বিভিন্ন ধর্ম। তারা পরকালে বিশ্বাস করে, পুনরুত্থান-সহ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ঈমান রাখে। দ্বিতীয় ভাগ হলো হিন্দু, বৌদ্ধ-সহ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারী, যারা পুনর্জন্ম, মোক্ষ, নির্বাণ ইত্যাদি-সহ বিভিন্নভাবে পরকালের ব্যাখ্যা দেয়।
আর কিছু সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আত্মায় বিশ্বাস করে। কিন্তু পুনরুত্থানের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা হচ্ছে মুসলমানদের কিছু বিভ্রান্ত সম্প্রদায়, যারা ইতিহাসে ঈমানের চেয়ে যুক্তিকে আগে রেখেছে। তারা ভ্রান্ত দার্শনিকগণ (ফালাসিফা)। তাদের যুক্তি তাদের বলেছে, মানুষ মরে গেলে পচে যায়, সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যায়। সুতরাং মানুষের শরীরকে আবার নতুন করে গড়া সম্ভব নয়। বিপরীতে মানুষের আত্মা চিরন্তন। এর কোনো মৃত্যু নেই। ফলে পুনরুত্থান হবে, কিন্তু সেটা আত্মিকভাবে, দৈহিকভাবে নয়।¹
টিকাঃ
১. কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (১১৯); বিস্তারিত দেখুন: ইবনে সিনা কৃত ‘আল-আজহাবিয়্যাহ ফিল মাআদ’ গ্রন্থ।
📄 পরকাল সকল নবি-রাসূলের দাওয়াত
আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গোটা পৃথিবীর সকল সম্প্রদায়ের কাছে তাদের নবি-রাসুলগণ পরকালের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু তারা সেগুলো গ্রহণ করেনি বা হারিয়ে ফেলেছে এবং এক পর্যায়ে পরকালকে অস্বীকার করে সেখানে বিভিন্ন বিভ্রান্ত আকিদা ঢুকিয়েছে। কাফেরদের মিথ্যা কসম ও তার খণ্ডনে আল্লাহ বলেন, وَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَا يَبْعَثُ اللَّهُ مَنْ يَمُوتُ بَلَى وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ. অর্থ: 'তারা আল্লাহর নামে কঠোর শপথ করে বলে যে, আল্লাহ মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করবেন না। অবশ্যই (করবেন)। এটা আল্লাহর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।' [নাহল: ৩৮] কাফেররা মনে করত, মানুষ পচেগলে নিঃশেষ হয়ে গেলে আল্লাহ তাদের জীবিত করতে পারবেন না। আল্লাহ তাদের খণ্ডনে বলেন, وَقَالُواءَ إِذَا كُنَّا عِظَامًا وَرُفَاتًا وَإِنَّا لَمَبْعُوثُونَ خَلْقًا جَدِيدًا . অর্থ: 'তারা বলে, যখন আমরা বিচূর্ণ অস্থিতে পরিণত হব, তখনও কি নতুন করে সৃজিত হয়ে উত্থিত হব? আপনি বলে দিন, যিনি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।'
একইভাবে ফালাসিফা (দার্শনিকরা)-সহ যারা পরকালকে কেবল আত্মিক পুনরুত্থান মনে করেছে, তারাও বিভ্রান্ত। তারা মনে করেছে, মানুষ মরে গেলে শরীর পচে যায়। একপর্যায়ে সেটা মাটিতে মিশে নিঃশেষ হয়ে যায়। সুতরাং এগুলোকে আবার একত্র করা সম্ভব নয়। যে আল্লাহ অনস্তিত্ব থেকে সবকিছু অস্তিত্বে এনেছেন, তিনি নিঃশ্বেষ হওয়া শরীরকে পুনরায় জীবিত করতে পারবেন না? বরং দ্বিতীয়বার জীবিত করা আরও সহজ নয় কি? যুক্তিবাদী এসব নির্বোধ মানুষকে আল্লাহ তার অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, অনস্তিত্ব থেকে সৃষ্টি করতে পারলে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কঠিন কেন হবে? তিনি বলেন, وَيَقُولُ الْإِنْسَانُ وَإِذَا مَا مِتُ لَسَوْفَ أُخْرَجُ حَيًّا . أَوَلَا يَذْكُرُ الْإِنْسَانُ أَنَّا خَلَقْنَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَمْ يَكُ شَيْئًا. অর্থ: 'মানুষ বলে, আমার মৃত্যু হলে পরে আমি কি জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব? সে কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে ইতঃপূর্বে সৃষ্টি করেছি, অথচ সে তখন কিছুই ছিল না?” [মারইয়াম: ৬৬-৬৭]
📄 পরকালের সফর-কবর থেকে জান্নাত পর্যন্ত
পৃথিবীর সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালা শিঙার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা ইরসাফিল আলাইহিস সালামকে শিঙায় ফুঁক দিতে বলবেন। নির্ধারিত একটা সময় পরে ইসরাফিল আবার শিঙায় ফুঁক দেবেন। তখন সবাই পুনরায় জীবিত হয়ে যাবে এবং যার যার কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকবে। কিয়ামতের দিন মানুষ তিনভাবে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে: একদল পায়ে হেঁটে, আরেক দল বাহনে চড়ে, আরেক দল মুখে ভর দিয়ে আসবে। সবাই নগ্নপদ, নগ্নশরীর ও খতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত হবে।
এই কঠিন অবস্থায় তারা হাশরের ময়দানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবে। হাশরের দিনটি হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। [মাআরিজ: ৪] সূর্যের কাছে আসার কারণে গরম ও পিপাসায় তাদের ছাতি ফেটে যাওয়ার উপক্রম হবে। মুসলিমের হাদিসে এসেছে, সূর্য মানুষের এক মাইল দূরে থাকবে।¹ ঘাম বাড়তে থাকবে—কারও থাকবে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত, কারও ঘাম হবে হাঁটু পর্যন্ত, কারও কোমর পর্যন্ত, কারও কাঁধ পর্যন্ত, কারও কান পর্যন্ত; আবার কেউ পুরোটাই ঘামে ডুবে যাবে।² একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, প্রায় চল্লিশ বছর এভাবে মানুষ দাঁড়িয়ে হিসাবের অপেক্ষা করবে।³ কিন্তু আল্লাহর কাছের বান্দাদের জন্য এটা সহজ হবে।⁴
তখন আল্লাহ তায়ালা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাউজে কাওসার দান করবেন।⁵ একপর্যায়ে মানুষ অস্থির হয়ে বিভিন্ন নবির কাছে গিয়ে আল্লাহর কাছে হিসাব শুরুর সুপারিশ করতে বলবে। নবিগণ অপারগতা প্রকাশ করবেন। সবশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে তিনি আরজি পেশ করবেন। আল্লাহ সেটা গ্রহণ করবেন। তখন প্রত্যেককে আল্লাহর সামনে পেশ করা হবে এবং তার সামনে প্রত্যেকের আমলনামা পেশ করা হবে। এটাকে 'আরজ' বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা যখন প্রশ্ন করা শুরু করবেন, তাঁর মাঝে এবং বান্দার মাঝে কোনো দোভাষী থাকবে না।¹ অনেকের মুখে সিল মেরে দেওয়া হবে; তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।²
যাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, তাদের হিসাব সহজ হবে, আর যাদের বাম হাতে দেওয়া হবে, তাদের হিসাব কঠিন হবে। অতঃপর মিজান তথা দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে।³ তাতে প্রত্যেকের আমল মাপা হবে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের একপাশে এবং কাফেরদের অন্যপাশে আলাদা করবেন। কাফেরদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ৪ মুমিনদের জন্য জাহান্নামের উপর পুল (সিরাত) স্থাপন করা হবে। ৫ মুমিনদের মাঝে সর্বপ্রথম উম্মতে মুহাম্মাদি এটা পার হবে। ৬ মুনাফিকরা যখন পার হতে যাবে, হঠাৎ তাদের আলো নিভে যাবে এবং তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ৭ পুল পার হয়ে সকল মুমিন জান্নাতের সামনে গিয়ে একত্র হবেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবেন। ৮
টিকাঃ
১. মুসলিম (২৮৬৪)।
২. বুখারি (৪৯৩৮); মুসলিম (২৮৬২, ২৮৬৪)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৯৭৬৩)।
৪. ইবনে হিব্বান (৭৩৩৩); মুসনাদে আবু ইয়ালা (৬০২৫)।
৫. তিরমিজি (২৪৪৩); আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৬৮৮১)।
১. ইবনে খুজাইমা (৮৪৯); ইবনে হিব্বান (৭৩৭২)।
১. মুসলিম (২৯৬৮); ইবনে হিব্বান (৪৬৪২)।
২. ইবনে হিব্বান (৪৬৪২)।
৩. বুখারি (২০৯৭, ৬৪০৬, ৬৫৬৩); মুসলিম (৭১৫); আবু দাউদ (৪৭৯৯); মুসতাদরাকে হাকেম (৮৮৩৭)।
৪. ইবনে হিব্বান (৪৬৪২)।
১. ফাতহুল বারি (৩/২৪৬)।
২. মুসলিম (১৮৩); ইবনে হিব্বান (৭৩৭৭)।
৩. মুসলিম (৩১৫); ইবনে খুজাইমা (২৩২)।
৪. মুসলিম (১৯৫); মুসতাদরাকে হাকেম (৮৮৪৭)।
১. মুসলিম (১৯১)।
২. মুসলিম (১৯৭); মুসনাদে আহমদ (১২৫৯২)।
৩. তিরমিজি (২৩৫৪); ইবনে মাজা (৪১২৪)।
📄 জান্নাতের পরিচয়
জান্নাত আল্লাহর একটি সৃষ্টি। তাঁর প্রিয় মুমিন বান্দাদের চিরস্থায়ী আবাস হিসেবে তিনি এটা তৈরি করেছেন। আহলে সুন্নাতের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, জান্নাত বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে।¹ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাত দেখেছেন। মিরাজের রাতে তিনি সিদরাতুল মুনতাহার পাশে 'আদন জান্নাত' দেখেছেন।² পুণ্যবান ব্যক্তি যখন মারা যায়, জান্নাতের দিকে তার কবরের একটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।³ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবদ্দশায় জান্নাতের ফল ধরেছেন। ৪ জান্নাতের অবস্থান কোথায় সেটা আমাদের জানা নেই। কুরআনে জান্নাতকে উপরে [মুতাফফিফিন: ১৮] এবং হাদিসে সপ্তম আকাশে বলা হয়েছে।⁵
জান্নাতে আল্লাহ যা রেখেছেন তা মানুষের কল্পনারও বাইরে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দাদের জন্য (জান্নাতে) যা প্রস্তুত করে রেখেছি, তা কোনো চোখ দেখেনি, কান শুনেনি, কোনো মানুষের কল্পনাতেও উদিত হয়নি।'⁶ জান্নাতবাসী জান্নাতে সর্বোত্তম আকৃতি এবং সবচেয়ে সুন্দর দেহাবয়ব নিয়ে প্রবেশ করবে। বয়স থাকবে ত্রিশ থেকে তেত্রিশের মাঝামাঝি। সবাই আদম আলাইহিস সালামের আকৃতিতে থাকবে। জান্নাতবাসী পূর্ণিমার চাঁদের মতো চমকাতে থাকবে। তাদের শারীরিক সব ধরনের রোগ থেকে মুক্ত থাকবে। তাদের কারও মাঝে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না।
টিকাঃ
১. ইবনে আবিল ইজ (৪২০)।
২. বুখারি (৩৩৪২); মুসলিম (১৬৩)।
৩. আবু দাউদ (৪৭৫৩); মুসনাদে আহমদ (১৮৮৩২)।
৪. বুখারি (৭৪৮, ১০৫২); মুসলিম (৯০৭)।
৫. মুসতাদরাকে হাকেম (৮৭৯৫)।
৬. বুখারি (৩২৪৪); মুসলিম (২৮২৪)।