📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 কবরের শাস্তি আত্মিক নাকি দৈহিক?

📄 কবরের শাস্তি আত্মিক নাকি দৈহিক?


প্রশ্ন হতে পারে, অনেক সময় মৃতের লাশ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়, মমি করে রেখে দেওয়া হয়। তা হলে তার শাস্তি হবে কী করে? উত্তরে আমরা বলব, এগুলো সব গায়েবি বিষয়। আমাদের এগুলো উপলব্ধি করার সামর্থ্যই দেওয়া হয়নি। মানুষ তো নিজের শরীরে বিদ্যমান রুহ দেখতে পায় না, ফলে এগুলো দেখার ক্ষমতা রাখবে কীভাবে? তা ছাড়া বোধগম্য না হওয়ার যুক্তিতে কবরের শাস্তিকে অস্বীকার করা হলে আল্লাহ, ফেরেশতা, রুহ, জান্নাত, জাহান্নাম কোনোটিতেই বিশ্বাস করা অপরিহার্য হবে না। সবগুলিকেই কোনো-না-কোনো যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তাই এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো মানুষের কাজ নয়। মানুষের কাজ আমল করা, অনুগত হওয়া। আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া, কুরআন-সুন্নাহে যা এসেছে, যতটুকু এসেছে, সেটুকুতে বিশ্বাস রাখা; এর বাইরে যুক্তির হাল না চালানো। কবরের শাস্তি স্রেফ আত্মিক না দৈহিক, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে হুবহু এমন শব্দে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তাই এ ব্যাপারে নীরব থাকা শ্রেয়। তা ছাড়া মৃত্যুপরবর্তী জীবন পার্থিব জীবনের মতো নয়। ফলে এখানে আমরা যেভাবে কল্পনা করি, ওখানেও তেমন হবে সেটা জরুরি নয়।
তবে নসগুলো বিশ্লেষণ করলে সন্দেহাতীতভাবে বোঝা যায়, কবর ও জাহান্নামের শাস্তি আত্মিক এবং দৈহিক দুটোই। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা।¹ তাদের দলিল, যেমন উপরে একটি হাদিসে এসেছে, ‘অতঃপর তার আত্মা দেহের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’² অন্য হাদিসে এসেছে, মুনকার নাকির প্রশ্ন করার জন্য কবরে এলে তাকে বসানো হয়, অতঃপর প্রশ্ন করা হয়।³ রুহকে কেন বসাতে হবে? আর দেহের উপরই যদি শাস্তি না হয়, তবে রুহ কবরে কেন থাকবে? আর কবরেই কেন আসতে হবে ফেরেশতাদের? আর কিছু হাদিসে এসেছে, কবরের চাপে বুকের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। ফেরেশতা হাতুড়ি দিয়ে দুই কানের মাঝে আঘাত করেন।⁴
তা ছাড়া কুরআনের অসংখ্য আয়াতে কিয়ামতের দিন মানুষের হাড়গোড় একত্র করে পুনরুত্থিত করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَّن নَّجْمَعَ عِظَامَهُ. بَلَى قُدِرِينَ عَلَى أَنْ نُّসَوِّيَ بَنَانَهُ. অর্থ: মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করব না? অবশ্যই। বরং আমি তার আঙুলগুলো পর্যন্ত সঠিকভাবে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম। [কিয়ামাহ: ৩-৪] আল্লাহ আরও বলেন, قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعִظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ . قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَোলَ মَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ অর্থ: সে বলে, কে জীবিত করবে অস্থিসমূহ যখন সেগুলো পচেগলে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলো সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত। [ইয়াসিন: ৭৮-৭৯] যদি আত্মাই যথেষ্ট হয়, তা হলে অযথা হাড়গোড় একত্র করে শরীর সৃষ্টি করার কী দরকার? আত্মার উপর হিসাব, শান্তি বা শাস্তি প্রয়োগ করলেই তো হয়। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, শান্তি আত্মা ও দেহ দুটোর উপরেই হয়। এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের মতামত।
হ্যাঁ, আল্লাহ চাইলে কখনও কখনও কেবল আত্মার উপরও শাস্তি দিতে পারেন, আত্মার উপরও শান্তি হতে পারে। যেমন: একটি হাদিসে এসেছে, মুমিনের রুহ কখনও কখনও জান্নাত থেকে ঘুরে আসবে।¹ এবং তা বিচার দিবসের আগেই। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ, শরীর ও আত্মার মাঝে আত্মাই মূল। শরীর না থাকলেও আত্মা থাকে। ফলে আত্মার উপর শাস্তি বা শান্তি দিলে সেটা মানুষের উপরই দেওয়া হয়।

টিকাঃ
১. আকহাসারি (২১৬); গুনাইমি (১১৭)।
২. হাকেম (১০৮); মুসানদে আহমদ (১৮৭৬৬); তয়ালিসি (৭৯১)।
৩. বুখারি (১৩৭৪); মুসলিম (২৮৭০)।
৪. বুখারি (১৩৩৮); তিরমিজি (১০৭১); মুসলিম (২৮৭০); আবু দাউদ (৪৭৫১); ইবনে হিব্বান (৩১১৭); বাজ্জার (৮৪৬২)।
১. ইবনে মাজা (৪২৭১); ইবনে হিব্বান (৪৬৫৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 হিসাবের আগে শাস্তি কেন?

📄 হিসাবের আগে শাস্তি কেন?


প্রাচীন মুতাজিলা ও তাদের উত্তরাধিকার বহনকারী সমকালীন অনেকের যুক্তি হলো, পরকালে হিসাব-নিকাশের আগে কবরে শাস্তি দেওয়ার অর্থ কী? কারও ব্যাপারে ফয়সালা দেওয়ার আগে তাকে শাস্তি দেওয়া জুলুম নয় কি? তাদের কথা শুনলে মনে হয়, কবরে শাস্তি মানুষ কিংবা জিন দেয়। অথবা ফেরেশতাদের যাদের পেটাতে মনে চায়, কবরে এসে পিটিয়ে যায়। কারণ, তারা যদি একটু খেয়াল করে দেখত কবরে শাস্তি আল্লাহর নির্দেশে হচ্ছে, আল্লাহ জানেন পরকালে তার কীভাবে বিচার হবে এবং ফলাফল কী হবে। ফলে যে জান্নাতি কবর থেকেই তাকে জান্নাতের সমাদর শুরু করবেন, আর যে জাহান্নামি হবে কবর থেকেই তার শাস্তি শুরু করবেন। তা ছাড়া পরকালে বিচারের আগে পুরস্কার-তিরস্কার জুলুম হবে কীভাবে? শুধু কবর নয়, আল্লাহ তো অনেক সময় মানুষের কর্মফল দুনিয়াতেই দিয়ে দেন।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 পরকাল থাকার প্রয়োজনীতা

📄 পরকাল থাকার প্রয়োজনীতা


এই জীবনই শেষ নয়; এই পৃথিবী ঠিকানা নয়; মৃত্যু সবকিছুর সমাপ্তি নয়; বরং মৃত্যুর পরে এমন কিছু থাকা উচিত যেখানে পৃথিবীর সকল অতৃপ্তি তৃপ্তির পথ খুঁজে পায়। এমন একটা দিন থাকা উচিত যেদিন নিহত তার হত্যার বদলা নিতে পারে, যেখানে মজলুম জালেমের কাছ থেকে তার অধিকার বুঝে নিতে পারে। এমন একটা ব্যবস্থা থাকা উচিত যাতে দুর্বল সবলের প্রতি জমে থাকা সহস্র বছরের ঋণ শোধ করে নিতে পারে। যেখানে সন্তান হারানো মাতা, স্বামী হারানো স্ত্রী তাদের প্রিয়জনের বিচার পায়। যেখানে প্রত্যেককে তাদের কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। যাতে ভালো মানুষ তার ভালো কাজের প্রতিদান পায়, মন্দ লোক তার কর্মের যথাযথ বিচার পায়। আর সেটাই আখিরাত, পরকাল, পুনরুত্থান, হাশর, নাশর, হিসাব, জান্নাত ও জাহান্নাম। এটা সেই দিন, যেদিন জগতের সকল সৃষ্টিকে তাদের সৃষ্টিকর্তার সামনে উপস্থিত হতে হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন, পুণ্যবানদের প্রতিদান দেবেন। পাপাচারীদের পাপের শাস্তি দেবেন, কারও প্রতি সেদিন একবিন্দু জুলুম করা হবে না। এমনকি অবলা পশুপাখির পাওনাও তাদের পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। শিংবিশিষ্ট যে ছাগলটি শিংহীন ছাগলকে গুঁতা দিয়েছিল, সে গুঁতা মেরে নিজ পাওনা বুঝে নেবে।¹
কুরআনের একাধিক জায়গায় পরকালের অস্তিত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ وَالْمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ بِقُدِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِ الْمَوْتَى * بَلَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . অর্থ: 'তারা কি জানে না যে, আল্লাহ যিনি আকাশসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এগুলোর সৃষ্টিতে কোনো ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম? কেন নয়? নিশ্চয় তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।' [আহকাফ: ৩৩] মৃতকে জীবিত করা তার জন্য সহজ উল্লেখ করে বলেন, أَوْ لَيْসَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاتِ وَالْأَرْضَ بِقُدِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ صُ بَلَى وَ هُৱ الْخَلْقُ الْعَلِيمُ . অর্থ: 'যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ, তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।' [ইয়াসিন: ৮১] অন্যত্র বলেন, أَلَيْসَ ذَلِكَ بِقُদِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِ الْمَوْتَى. অর্থ: 'সেই সত্তা (আল্লাহ) কি মৃতদের জীবিত করতে সক্ষম নন?' [কিয়ামাহ: ৪৪]

টিকাঃ
১. মুসতাদরাকে হাকেম (৮৮১৪); আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৫৪৮৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 পরকালের ব্যাপারে বিভিন্ন জাতির বিশ্বাস

📄 পরকালের ব্যাপারে বিভিন্ন জাতির বিশ্বাস


পৃথিবীর শুরু থেকে আল্লাহ সকল সম্প্রদায়ের মাঝে নবি-রাসুল পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবি-রাসুল তাদের সম্প্রদায়কে ইহকাল-উত্তর পরকাল, পুনরুত্থান, হাশর, হিসাব-নিকাশ ইত্যাদি সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ সম্প্রদায় সেগুলো ভুলে গিয়েছে বা অস্বীকার করেছে। অনেক সম্প্রদায়ের সেসব বিশ্বাসের মাঝে বিকৃতি প্রবেশ করেছে। আবার অনেক সম্প্রদায় সেগুলো অনেকাংশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মানুষের পুনরুত্থানকেন্দ্রিক বিশ্বাস বেশ বিচিত্র এবং এক্ষেত্রে মানুষ একাধিক ভাগে বিভক্ত।
কিছু সম্প্রদায় মৃত্যুকে সম্পূর্ণ বিনাশ মনে করে না। তবে মৃত্যুপরবর্তী পরিণতি নিয়ে তারা বিভ্রান্ত ও বিকৃত বিশ্বাসে লিপ্ত। এসব সম্প্রদায় সাধারণত সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে এবং আত্মার মাঝেও বিশ্বাস করে। কেউ একজন যেহেতু তাদের সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং মৃত্যুর পরে তিনি তাদের পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম, অথবা মৃত্যুর পরে জীবন চলমান থাকতে সক্ষম—তারা এটাতে বিশ্বাস রাখে। তবে এই পুনরায় সৃষ্টি কিংবা জীবন অব্যাহত থাকার ব্যাখ্যা তারা বিভিন্নভাবে দেয়। এদের সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগ হলো আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান) এবং এগুলোর কাছাকাছি বিভিন্ন ধর্ম। তারা পরকালে বিশ্বাস করে, পুনরুত্থান-সহ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ঈমান রাখে। দ্বিতীয় ভাগ হলো হিন্দু, বৌদ্ধ-সহ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারী, যারা পুনর্জন্ম, মোক্ষ, নির্বাণ ইত্যাদি-সহ বিভিন্নভাবে পরকালের ব্যাখ্যা দেয়।
আর কিছু সম্প্রদায় আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আত্মায় বিশ্বাস করে। কিন্তু পুনরুত্থানের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা হচ্ছে মুসলমানদের কিছু বিভ্রান্ত সম্প্রদায়, যারা ইতিহাসে ঈমানের চেয়ে যুক্তিকে আগে রেখেছে। তারা ভ্রান্ত দার্শনিকগণ (ফালাসিফা)। তাদের যুক্তি তাদের বলেছে, মানুষ মরে গেলে পচে যায়, সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যায়। সুতরাং মানুষের শরীরকে আবার নতুন করে গড়া সম্ভব নয়। বিপরীতে মানুষের আত্মা চিরন্তন। এর কোনো মৃত্যু নেই। ফলে পুনরুত্থান হবে, কিন্তু সেটা আত্মিকভাবে, দৈহিকভাবে নয়।¹

টিকাঃ
১. কারি মুহাম্মাদ তৈয়ব (১১৯); বিস্তারিত দেখুন: ইবনে সিনা কৃত ‘আল-আজহাবিয়্যাহ ফিল মাআদ’ গ্রন্থ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px