📄 কবরের শান্তি ও শাস্তি
কবর কেবল একটি মাটির ঘর নয়। এটা মানুষের সুখ ও দুঃখের সংসার। কারও জন্য এটা জান্নাতের সবুজ বাগান। কারও জন্য জাহান্নামের আগুনে ভরা গর্ত। মানুষ সারা জীবন যা করেছে, সে কর্মফল ভোগ করা শুরু হবে এখান থেকেই। কবর জান্নাত ও জাহান্নামের সূচনাবিন্দু। এটার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থানে লাশ থাকা জরুরি নয়। বরং কেউ প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হোক, পুড়ে ছাই হয়ে যাক, মাটিতে মিশে যাক—তাকে এই বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে। শরিয়তের পরিভাষায় এটাকে বলা হয় 'আলমে বারজাখ' তথা অন্তরালের দুনিয়া।
অতীতে মুক্তমনা দার্শনিক এবং বর্তমানে নিজেদের অতি পণ্ডিত দাবিদার সেকুলাররা কবর তথা মৃত্যুপরবর্তী এই 'বারজাখী' জীবনের বাস্তবতা অস্বীকার করে। কারণ, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মানদণ্ড হচ্ছে বিবেকবোধ। যা যুক্তির পরাকাষ্ঠায় উত্তীর্ণ, সেটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। যা উত্তীর্ণ নয়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের যুক্তি, মানুষকে কবরে রাখলে আমরা দেখি তার কিছুই হয় না, কিছুদিন পরে শরীর পচেগলে শেষ হয়ে যায়। অথবা অনেক সময় মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সুতরাং কবরে কীভাবে শান্তি বা শাস্তি হবে? এ বক্তব্য এতটাই স্থূল যে, খণ্ডন নিষ্প্রয়োজন। আমরা যা চোখে দেখি, সেটাই বাস্তব, আর যা দেখি না, সেটাই অবাস্তব এমন নয়। আল্লাহকে তো আমরা দেখি না, তবে কি আল্লাহর অস্তিত্ব নেই? ফেরেশতা দেখি না, ফেরেশতার অস্তিত্ব নেই? জান্নাত ও জাহান্নাম দেখি না, তাই জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব নেই? বরং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথা হলেও তো আমরা দেখি না। তা হলে এগুলো নেই? আমরা রুহ দেখি না, তা হলে রুহ নেই? বাস্তবতা হলো, সবকিছু দেখার প্রয়োজন হয় না, অনুভবেও বোঝা যায়। আমাদের মনের সুখ-দুঃখ, হৃদয় ও শরীরের ব্যথা আমরা অনুভব করি। রুহ আমরা অনুভব করি। আল্লাহ, ফেরেশতা, জান্নাত-জাহান্নাম আমরা অনুভব করি। এগুলো থাকার অপরিহার্যতা বুঝি। তবে যেহেতু এগুলো আমাদের উপলব্ধির বাইরে, তাই এ ব্যাপারে আমরা আল্লাহর জ্ঞান তথা ওহির মুখাপেক্ষী। আল্লাহ আমাদের যা জানিয়েছেন, ততটুকু আমরা গ্রহণ করি। যা জানাননি, সেসব ব্যাপারে নীরব থাকি। ইমাম আবু হানিফা রাহি. বলেন, 'যে ব্যক্তি কবরের আজাব অস্বীকার করবে, সে পথভ্রষ্ট জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে।'¹
কুরআন থেকেই কবরের শাস্তি প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّلِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ . অর্থ: 'আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের মজবুত বাক্য দ্বারা শক্তিশালী করেন, পার্থিব জীবনে এবং পরকালে। আর আল্লাহ জালেমদের পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।' [ইবরাহিম: ২৭] উক্ত আয়াতটিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে মুনকার-নাকির কর্তৃক তিন প্রশ্ন দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন।² অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, فَوَقْهُ اللهُ سَيِّاتِ مَا مَكَرُوا وَحَاقَ بِالِ فِرْعَوْনَ سُوءُ الْعَذَابِ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْমَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ. অর্থ: 'অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউনের গোত্রকে শোচনীয় আজাব গ্রাস করল। সকালে-সন্ধ্যায় তাদের (জাহান্নামের) আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে যে, ফেরাউনের গোত্রকে কঠিনতর আজাবে ছুড়ে ফেলো।' [গাফের ৪৫-৪৬]
ইমাম তিরমিজি কবরে মুনকার-নাকির সংক্রান্ত হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন—আলি, জায়েদ ইবনে সাবেত, ইবনে আব্বাস, বারা বিন আজেব, আবু আইউব আনসারি, আনাস ইবনে মালেক, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, আবু সাঈদ খুদরি রাজি.—প্রত্যেকেই কবরের আজাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।¹
• ইমাম বুখারি রাহি. তাঁর সহিহ গ্রন্থের জানাজা অধ্যায়ে কবরের আজাব-সম্পর্কিত একাধিক হাদিস উল্লেখ করেছেন। আয়েশা রাজি. বলেন, আল্লাহর রাসুল নামাজের মাঝে দোয়া করতেন, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই, দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে গুনাহ ও ঋণে ফেঁসে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই।'²
• অন্য একটি হাদিসে আয়েশা রাজি. বলেন, এক ইহুদি নারী আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে কবরের শাস্তির কথা বর্ণনা করে। তখন রাসুল বলেন, আল্লাহ তোমাকে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। তখন আয়েশা রাজি. রাসুলুল্লাহকে কবরের শাস্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, কবরে শাস্তি রয়েছে।' আয়েশা রাজি. বলেন, এর পর থেকে রাসুলুল্লাহ যখনই নামাজ পড়তেন, কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।³
• সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা রাজি. বলেন, আমার কাছে মদিনার দুজন ইহুদি (নারী) এসে বলল, কবরে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়। আমি তখন তাদের কথা বিশ্বাস করিনি। তারা চলে যাওয়ার পরে আল্লাহর রাসুল এলে আমি তাকে বলি, হে আল্লাহর রাসুল, মদিনার দুজন ইহুদি আমার কাছে এসেছিল। তারা মনে করে, কবরে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়। তখন তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তারা সত্য বলেছে। কবরে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়। চতুষ্পদ জন্তু সেগুলো শুনতে পায়।' আয়েশা রাজি. বলেন, এর পর থেকে আমি সবসময় খেয়াল করতাম, তিনি কবরের আজাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।⁴
জায়দ ইবনে সাবেত রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বনু নাজ্জারের একটি বাগানে খচ্চরের উপর আরোহী ছিলেন। আমরা তার সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ খচ্চরটি লাফিয়ে উঠল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমরা খেয়াল করলাম, সেখানে পাঁচ/ছয়টি কবর ছিল। তিনি বললেন, 'এগুলো কাদের কবর কেউ জানো?' এক ব্যক্তি বললেন, 'হ্যাঁ, আমি জানি।' তিনি বললেন, 'তারা কবে মারা গেছে?' লোকটি বললেন, 'তারা মুশরিক অবস্থায় মারা গেছে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এই উম্মতকে কবরে শাস্তি দেওয়া হয়। যদি আমার এই আশঙ্কা না থাকত যে, তোমরা দাফন করা বন্ধ করে দেবে, তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম তিনি যেন তোমাদের কবরের আজাব শুনিয়ে দেন যা আমি শুনি।" অতঃপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, 'তোমরা জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো।' সাহাবাগণ বললেন, আমরা জাহান্নামের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। তিনি বললেন, 'তোমরা কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।' সাহাবাগণ বললেন, আমরা কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।' সাহাবাগণ বললেন, আমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। রাসুল বললেন, 'তোমরা দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।' তারা বললেন, আমরা দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।¹
মানুষ যখন দাফন শেষ করে চলে যায়, তখন মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। অতঃপর তার কবরে দুজন ফেরেশতা এসে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে? (মুমিন হলে) সে বলে, আমার রব আল্লাহ। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার দ্বীন কী? সে বলে, আমার দ্বীন ইসলাম। (রাসুলকে দেখিয়ে) তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কে? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসুল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কীভাবে জানো? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি এবং তাতে ঈমান এনেছি, সত্যায়ন করেছি। তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করে বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে। সুতরাং তোমরা তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। জান্নাত থেকে তার কবরে বাতাস ও প্রশান্তি আসতে থাকবে এবং তার কবরটি দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যাবে। আর (কাফের হলে) যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমার রব কে? সে বলবে, হায়! আমি জানি না। তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, সে মিথ্যা বলেছে। তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তার কবর থেকে জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। তখন জাহান্নামের গরম ও বিষবাষ্প সেখানে আসতে থাকবে এবং তার কবরটিকে এমনভাবে সংকীর্ণ করে দেওয়া হবে যে, তার পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির ভিতরে ঢুকে যাবে।¹
• উসমান ইবনে আফফান রাজি. যখনই কোনো কবরের পাশ দিয়ে যেতেন, কেঁদে কেঁদে দাড়ি ভিজিয়ে ফেলতেন। তাকে বলা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনায়ও তো আপনি এত কাঁদেন না। এটা নিয়ে এত কাঁদার রহস্য কী? তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, কবর পরকালের প্রথম মনজিল। এখান থেকে কেউ ছাড়া পেয়ে গেলে পরবর্তী সকল মনজিল তার জন্য সহজ। আর এখানে ধরা খেয়ে গেলে পরবর্তী সকল মনজিল তার জন্য কঠিন। উসমান বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি কবরের চেয়ে ভয়ংকর কোনো দৃশ্য দেখিনি।'¹
টিকাঃ
১. শাইবানি (৩৬)।
২. তিরমিজি (৩১২০); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (১১২২৯)।
১. তিরমিজি (১০৭১)।
২. বুখারি (৮৩২, ৬৩৭৬)।
৩. বুখারি (১৩৭২)।
৪. মুসলিম (৫৮৬)।
১. মুসলিম (২৮৬৭, ২৮৬৮)।
১. আবু দাউদ (৭৪৫৩); বুখারি (১৩৩৮)।
১. সুনানে ইবনে মাজা (৪২৬৭); মুসতাদারাকে হাকেম (১৩৭৭); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (৭১৬৪)।
📄 কবরের শাস্তি আত্মিক নাকি দৈহিক?
প্রশ্ন হতে পারে, অনেক সময় মৃতের লাশ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হয়, মমি করে রেখে দেওয়া হয়। তা হলে তার শাস্তি হবে কী করে? উত্তরে আমরা বলব, এগুলো সব গায়েবি বিষয়। আমাদের এগুলো উপলব্ধি করার সামর্থ্যই দেওয়া হয়নি। মানুষ তো নিজের শরীরে বিদ্যমান রুহ দেখতে পায় না, ফলে এগুলো দেখার ক্ষমতা রাখবে কীভাবে? তা ছাড়া বোধগম্য না হওয়ার যুক্তিতে কবরের শাস্তিকে অস্বীকার করা হলে আল্লাহ, ফেরেশতা, রুহ, জান্নাত, জাহান্নাম কোনোটিতেই বিশ্বাস করা অপরিহার্য হবে না। সবগুলিকেই কোনো-না-কোনো যুক্তিতে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। তাই এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো মানুষের কাজ নয়। মানুষের কাজ আমল করা, অনুগত হওয়া। আল্লাহর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া, কুরআন-সুন্নাহে যা এসেছে, যতটুকু এসেছে, সেটুকুতে বিশ্বাস রাখা; এর বাইরে যুক্তির হাল না চালানো। কবরের শাস্তি স্রেফ আত্মিক না দৈহিক, এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহে হুবহু এমন শব্দে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তাই এ ব্যাপারে নীরব থাকা শ্রেয়। তা ছাড়া মৃত্যুপরবর্তী জীবন পার্থিব জীবনের মতো নয়। ফলে এখানে আমরা যেভাবে কল্পনা করি, ওখানেও তেমন হবে সেটা জরুরি নয়।
তবে নসগুলো বিশ্লেষণ করলে সন্দেহাতীতভাবে বোঝা যায়, কবর ও জাহান্নামের শাস্তি আত্মিক এবং দৈহিক দুটোই। এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা।¹ তাদের দলিল, যেমন উপরে একটি হাদিসে এসেছে, ‘অতঃপর তার আত্মা দেহের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’² অন্য হাদিসে এসেছে, মুনকার নাকির প্রশ্ন করার জন্য কবরে এলে তাকে বসানো হয়, অতঃপর প্রশ্ন করা হয়।³ রুহকে কেন বসাতে হবে? আর দেহের উপরই যদি শাস্তি না হয়, তবে রুহ কবরে কেন থাকবে? আর কবরেই কেন আসতে হবে ফেরেশতাদের? আর কিছু হাদিসে এসেছে, কবরের চাপে বুকের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। ফেরেশতা হাতুড়ি দিয়ে দুই কানের মাঝে আঘাত করেন।⁴
তা ছাড়া কুরআনের অসংখ্য আয়াতে কিয়ামতের দিন মানুষের হাড়গোড় একত্র করে পুনরুত্থিত করার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَّن নَّجْمَعَ عِظَامَهُ. بَلَى قُدِرِينَ عَلَى أَنْ نُّসَوِّيَ بَنَانَهُ. অর্থ: মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করব না? অবশ্যই। বরং আমি তার আঙুলগুলো পর্যন্ত সঠিকভাবে সন্নিবেশিত করতে সক্ষম। [কিয়ামাহ: ৩-৪] আল্লাহ আরও বলেন, قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعִظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ . قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَোলَ মَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ অর্থ: সে বলে, কে জীবিত করবে অস্থিসমূহ যখন সেগুলো পচেগলে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলো সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত। [ইয়াসিন: ৭৮-৭৯] যদি আত্মাই যথেষ্ট হয়, তা হলে অযথা হাড়গোড় একত্র করে শরীর সৃষ্টি করার কী দরকার? আত্মার উপর হিসাব, শান্তি বা শাস্তি প্রয়োগ করলেই তো হয়। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, শান্তি আত্মা ও দেহ দুটোর উপরেই হয়। এটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ সালাফের মতামত।
হ্যাঁ, আল্লাহ চাইলে কখনও কখনও কেবল আত্মার উপরও শাস্তি দিতে পারেন, আত্মার উপরও শান্তি হতে পারে। যেমন: একটি হাদিসে এসেছে, মুমিনের রুহ কখনও কখনও জান্নাত থেকে ঘুরে আসবে।¹ এবং তা বিচার দিবসের আগেই। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ, শরীর ও আত্মার মাঝে আত্মাই মূল। শরীর না থাকলেও আত্মা থাকে। ফলে আত্মার উপর শাস্তি বা শান্তি দিলে সেটা মানুষের উপরই দেওয়া হয়।
টিকাঃ
১. আকহাসারি (২১৬); গুনাইমি (১১৭)।
২. হাকেম (১০৮); মুসানদে আহমদ (১৮৭৬৬); তয়ালিসি (৭৯১)।
৩. বুখারি (১৩৭৪); মুসলিম (২৮৭০)।
৪. বুখারি (১৩৩৮); তিরমিজি (১০৭১); মুসলিম (২৮৭০); আবু দাউদ (৪৭৫১); ইবনে হিব্বান (৩১১৭); বাজ্জার (৮৪৬২)।
১. ইবনে মাজা (৪২৭১); ইবনে হিব্বান (৪৬৫৭)।
📄 হিসাবের আগে শাস্তি কেন?
প্রাচীন মুতাজিলা ও তাদের উত্তরাধিকার বহনকারী সমকালীন অনেকের যুক্তি হলো, পরকালে হিসাব-নিকাশের আগে কবরে শাস্তি দেওয়ার অর্থ কী? কারও ব্যাপারে ফয়সালা দেওয়ার আগে তাকে শাস্তি দেওয়া জুলুম নয় কি? তাদের কথা শুনলে মনে হয়, কবরে শাস্তি মানুষ কিংবা জিন দেয়। অথবা ফেরেশতাদের যাদের পেটাতে মনে চায়, কবরে এসে পিটিয়ে যায়। কারণ, তারা যদি একটু খেয়াল করে দেখত কবরে শাস্তি আল্লাহর নির্দেশে হচ্ছে, আল্লাহ জানেন পরকালে তার কীভাবে বিচার হবে এবং ফলাফল কী হবে। ফলে যে জান্নাতি কবর থেকেই তাকে জান্নাতের সমাদর শুরু করবেন, আর যে জাহান্নামি হবে কবর থেকেই তার শাস্তি শুরু করবেন। তা ছাড়া পরকালে বিচারের আগে পুরস্কার-তিরস্কার জুলুম হবে কীভাবে? শুধু কবর নয়, আল্লাহ তো অনেক সময় মানুষের কর্মফল দুনিয়াতেই দিয়ে দেন।
📄 পরকাল থাকার প্রয়োজনীতা
এই জীবনই শেষ নয়; এই পৃথিবী ঠিকানা নয়; মৃত্যু সবকিছুর সমাপ্তি নয়; বরং মৃত্যুর পরে এমন কিছু থাকা উচিত যেখানে পৃথিবীর সকল অতৃপ্তি তৃপ্তির পথ খুঁজে পায়। এমন একটা দিন থাকা উচিত যেদিন নিহত তার হত্যার বদলা নিতে পারে, যেখানে মজলুম জালেমের কাছ থেকে তার অধিকার বুঝে নিতে পারে। এমন একটা ব্যবস্থা থাকা উচিত যাতে দুর্বল সবলের প্রতি জমে থাকা সহস্র বছরের ঋণ শোধ করে নিতে পারে। যেখানে সন্তান হারানো মাতা, স্বামী হারানো স্ত্রী তাদের প্রিয়জনের বিচার পায়। যেখানে প্রত্যেককে তাদের কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হয়। যাতে ভালো মানুষ তার ভালো কাজের প্রতিদান পায়, মন্দ লোক তার কর্মের যথাযথ বিচার পায়। আর সেটাই আখিরাত, পরকাল, পুনরুত্থান, হাশর, নাশর, হিসাব, জান্নাত ও জাহান্নাম। এটা সেই দিন, যেদিন জগতের সকল সৃষ্টিকে তাদের সৃষ্টিকর্তার সামনে উপস্থিত হতে হবে। তিনি তাদের প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেবেন, পুণ্যবানদের প্রতিদান দেবেন। পাপাচারীদের পাপের শাস্তি দেবেন, কারও প্রতি সেদিন একবিন্দু জুলুম করা হবে না। এমনকি অবলা পশুপাখির পাওনাও তাদের পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। শিংবিশিষ্ট যে ছাগলটি শিংহীন ছাগলকে গুঁতা দিয়েছিল, সে গুঁতা মেরে নিজ পাওনা বুঝে নেবে।¹
কুরআনের একাধিক জায়গায় পরকালের অস্তিত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّ اللَّهَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَواتِ وَالْأَرْضَ وَالْمْ يَعْيَ بِخَلْقِهِنَّ بِقُدِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِ الْمَوْتَى * بَلَى إِنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . অর্থ: 'তারা কি জানে না যে, আল্লাহ যিনি আকাশসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং এগুলোর সৃষ্টিতে কোনো ক্লান্তি বোধ করেননি, তিনি মৃতকে জীবিত করতে সক্ষম? কেন নয়? নিশ্চয় তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।' [আহকাফ: ৩৩] মৃতকে জীবিত করা তার জন্য সহজ উল্লেখ করে বলেন, أَوْ لَيْসَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاتِ وَالْأَرْضَ بِقُدِرٍ عَلَى أَنْ يَخْلُقَ مِثْلَهُمْ صُ بَلَى وَ هُৱ الْخَلْقُ الْعَلِيمُ . অর্থ: 'যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, তিনিই কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ, তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।' [ইয়াসিন: ৮১] অন্যত্র বলেন, أَلَيْসَ ذَلِكَ بِقُদِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِ الْمَوْتَى. অর্থ: 'সেই সত্তা (আল্লাহ) কি মৃতদের জীবিত করতে সক্ষম নন?' [কিয়ামাহ: ৪৪]
টিকাঃ
১. মুসতাদরাকে হাকেম (৮৮১৪); আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি (৫৪৮৩)।