📄 মৃত্যু ও মৃত্যুর ফেরেশতা
মানুষের যখন জীবনকাল ফুরিয়ে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তখন আল্লাহ তায়ালা তার রুহ গ্রহণের জন্য একদল ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাদের প্রধানকে বলা হয় 'মালাকুল মাওত' তথা মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাদের দেশে যিনি 'আজরাইল' নামে পরিচিত। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও তাকে এ নামে ডাকা হয়নি; বরং এটা বনি ইসরাইলের বর্ণনা থেকে গৃহীত। তাই এমন নাম পরিত্যাগ করা উচিত।
সৃষ্টির মৃত্যুদানে ঠিক কতজন ফেরেশতা নিয়োজিত কুরআন-সুন্নাহে দ্ব্যর্থহীনভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। কোনো কোনো আয়াতে বোঝা যায় তিনি একজন ফেরেশতা। যেমন: আল্লাহ বলেন, قُلْ يَتَوَفَّىكُمْ مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْনَ. অর্থ: 'আপনি বলুন, তোমাদের ওফাত দান করে মৃত্যুর ফেরেশতা, যাকে তোমাদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ফিরে যাবে।' [সাজদা: ১১] আবার কোনো কোনো আয়াত দেখলে বোঝা যায় তারা একাধিক ফেরেশতা। যেমন: আল্লাহ বলেন, حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُوْনَ. অর্থ: 'আর যখন তোমাদের কারও মৃত্যু চলে আসে, তখন আমার দূতগণ তাকে মৃত্যুদান করে, আর তারা ত্রুটি করে না।' [আনআম: ৬১] আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِينَ أَنْفُسِهِمْ অর্থ: 'আর যাদের ফেরেশতারা এমন অবস্থায় মৃত্যুদান করে, যখন তারা নিজেদের উপর অত্যাচার করছিল...।' [নিসা: ৯৭] অন্যত্র বলেন, حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا يَتَوَفَّوْنَهُمْ অর্থ: 'ফলে যখন আমার দূতগণ তাদের কাছে মৃত্যুদান করতে চলে আসে...।' [আরাফ: ৩৭] আলিমগণ এসব বর্ণনার মাঝে সমন্বয় বিধান করেছেন। অর্থাৎ মূলত একজন ফেরেশতাই মানুষের রুহ গ্রহণ করে থাকেন, কিন্তু তার পাশাপাশি অন্য ফেরেশতাগণ সহায়ক হিসেবে থাকেন। ফলে কুরআন-সুন্নাহে কোনো অসামঞ্জস্যতা নেই। মুজাহিদ রাহি. থেকে বর্ণিত, মৃত্যুর ফেরেশতার সামনে পুরো দুনিয়াটা একটা থালার মতো। তিনি সেখান থেকে যার সময় ঘনিয়ে আসে, তাকে মৃত্যুদান করেন।¹
টিকাঃ
১. তাফসিরে তাবারি (২০/১৭৫); আকহাসারি (২১িল-২১২); সালেহ ফাওজান (১৫০)।
📄 মৃত্যুর স্বরূপ
মৃত্যু মানবজীবনের এক বিস্ময়কর ব্যাপার। জন্মের চেয়েও মৃত্যু বেশি বিস্ময়কর। পৃথিবীতে জন্মে একটা মানুষ জীবিত হয় না, বরং জীবিত হয়েই জন্মগ্রহণ করে। জীবিত অবস্থায় কয়েক মাস মায়ের গর্ভে থাকে। তার আত্মীয়-স্বজন সবাই জানে সে জীবিত। ফলে এই নতুন মেহমানের জন্য ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করে। ধীরে ধীরে একদিন সে পৃথিবীর আলো-বাতাসে চোখ মেলে। বিপরীতে একজন জীবিত মানুষ লম্বা সময় সবার সঙ্গে সময় কাটায়, গল্প করে, সুখে-দুঃখে পথ চলে, জীবনে বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করে, গল্প বলে, এর মাঝে হঠাৎ একদিন চিরকালের জন্য থমকে দাঁড়ায়, চোখ বন্ধ করে ফেলে। যে মানুষটি বছরের পর বছর কথা বলত, গল্প বলত, হঠাৎ চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে যায়। জীবনের খেলাঘরের সব খেলা তার জন্য সেখানেই শেষ হয়ে যায়। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিজন কিছুদিন কান্নাকাটি করে ভুলে যায়। পৃথিবীতে তার জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ তাকে ভোলেন না। কারণ, মাটির নিচে যে তার জন্য প্রস্তুতি চলছে এক নতুন জীবনের।
মৃত্যুর সময় মানুষ বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। এগুলো এমন অভিজ্ঞতা, যা পৃথিবীর কোনো জীবিত মানুষ আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি। যারা জানতে পারে, তারা কাউকে বলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আমরা রাসুলের মাধ্যমে এগুলো সম্পর্কে অনেককিছু জানতে পাই। আমরা জানতে পাই, মৃত্যুর সময়ই প্রত্যেকটি মানুষ বুঝে ফেলে তার সারা জীবনের কর্মের পরিণতি কী হতে যাচ্ছে। ফলে তাকে কবর কিংবা হাশর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। পুণ্যবান হলে তার সুখের যাত্রা মুমূর্ষু অবস্থা থেকেই শুরু হয়, আর পাপী হলে দুর্ভাগ্যের যাত্রাও তখন থেকেই।
বারা বিন আজেব রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একজন আনসারি সাহাবির জানাজা পড়ার জন্য বের হলাম। কবরের কাছে পৌঁছে দেখলাম তখনও সেটা খনন সম্পন্ন হয়নি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বসলেন। আমরাও তার চতুষ্পার্শ্বে নীরবে বসে গেলাম, যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসে ছিল। আল্লাহর রাসুলের হাতে একটি কাঠের টুকরা ছিল। তিনি সেটা দিয়ে মাটিতে কিছু রেখা টানছিলেন। অতঃপর তিনি মাথা উঠিয়ে বলেন, 'তোমরা কবরের শান্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো।' কথাটি দুইবার অথবা তিনবার বললেন। অতঃপর বললেন, 'যখন মুমিন বান্দা দুনিয়া থেকে পরকালের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন শুভ্র বদনের ফেরেশতাদের একটি দল আকাশ থেকে নেমে আসে। তাদের মুখমণ্ডল সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকে। তাদের হাতে থাকে জান্নাতের কাফন, জান্নাতের কপূর। তারা তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা আগমন করে তার মাথার কাছে বসে বলেন—হে পবিত্র আত্মা, তুমি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে আসো।'
আল্লাহর রাসুল বলেন, 'তখন পানির পাত্র থেকে পানির ফোঁটা যেভাবে বেরিয়ে আসে, তার রুহ ওভাবে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। ফেরেশতারা সেটা গ্রহণ করে ঊর্ধ্বজগতে চলে যান। প্রত্যেক আকাশের ফেরেশতারা তাকে স্বাগত জানান, তার পরিচয় জানতে চান। রুহ বহনকারী ফেরেশতাগণ তার নাম, তার পিতার নাম-সহ সুন্দর করে পরিচয় দেন। এভাবে সপ্ত আকাশ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আল্লাহ বলেন, ঊর্ধ্ব জগতে (ইল্লিয়িয়নে) আমার বান্দার আমলনামা লিখে ফেলো। এর পর তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করো। কেননা আমি তাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি এবং মাটিতে ফিরিয়ে দেবো, অতঃপর মাটি থেকে আবার পুনরুত্থিত করব। আল্লাহর রাসুল বলেন, এরপর তাকে দেহের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন কবরে দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন...। আর যখন কোনো কাফের দুনিয়া থেকে আখিরাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে, তখন কৃষ্ণ চেহারার অধিকারী একদল ফেরেশতা জাহান্নামের কাপড় নিয়ে তার নিকট অবতীর্ণ হয়। তারা তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা আগমন করে তার মাথার কাছে বসেন এবং তাকে বলেন—হে অপবিত্র আত্মা, আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধের দিকে বের হয়ে আয়! তখন তার আত্মা শরীরের ভিতরে ছোটাছুটি করতে থাকে। মৃত্যুর ফেরেশতা সেটাকে এমনভাবে টেনে বের করেন, যেভাবে ভেজা কাপড়ের ভিতর থেকে লোহা টেনে বের করা হয়। এরপর তিনি সেটাকে ধরে সঙ্গে সঙ্গে সেই জাহান্নামের কাপড়ের ভিতরে রাখেন। সেখান থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। এরপর তাকে নিয়ে ঊর্ধ্বজগতে গমন করেন। সকল ফেরেশতা তার বদনাম করে। একপর্যায়ে তাকে দুনিয়ার আকাশে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার জন্য আকাশের দরজা খোলা হয় না; বরং আল্লাহ তায়ালা বলেন, ভূপৃষ্ঠের সর্বনিম্ন স্তরে তার নাম লিখে দাও। তখন তার আত্মাকে সেখান থেকে ছুড়ে ফেলা হয়। এরপর সেটাকে দেহের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তার কবরে দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন...।'¹
উক্ত হাদিস দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মানুষ ফেরেশতাদের দেখতে পায়, ফেরেশতাদের কথা শুনতে পায়; শুধু কিছু বলতে পারে না, কাউকে জানাতে পারে না। পবিত্র কুরআনও এটার সাক্ষ্য দেয়। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَئِكَةُ إِلَّا تَخَافُوْا وَلَا تَح্زَنُوا وَابْشِرُوْا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوْعَدُوْনَ. অর্থ: "নিশ্চয় যারা বলে, 'আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ', অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, 'তোমরা ভয় করো না। চিন্তা করো না। আর তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো'।” [ফুসসিলাত: ৩০]
টিকাঃ
১. মুসতাদরাকে হাকেম (১০৮); মুসানদে আহমদ (১৮৭৬৬); তয়ালিসি (৭৯১)।
📄 মুনকার ও নাকিরের প্রশ্ন
মৃত্যুর পরে কাফন-দাফন শেষ করে মানুষ যখন চলে যায়, মৃত ব্যক্তিকে তখনই জীবিত করা হয়। সে মানুষের চলে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পায়। তখন তার কবরে কৃষ্ণবর্ণ ও নীল চোখ বিশিষ্ট দুজন ফেরেশতা আগমন করেন। তাদের একজনকে বলা হয় মুনকার অন্যজনকে নাকির। তারা তাকে উঠিয়ে বসান এবং তিনটি প্রশ্ন করেন। তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? রাসুলুল্লাহকে দেখিয়ে বলেন, তিনি কে? যদি মুমিন হয়ে থাকে, তবে সে বলে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলেন, ওই দেখো জাহান্নাম। আল্লাহ সেটার বদলে তোমাকে জান্নাত দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। তখন তার কবরকে সত্তর হাত চড়া ও প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। কবরকে আলোকিত করা হয়। তাকে বলা হয়, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। সে বলে, আমি কি পৃথিবীতে গিয়ে আমার পরিবারকে জানাতে পারি? তারা বলেন, তুমি নব বরের মতো ঘুমাও। তোমার সবচেয়ে প্রিয়জন আল্লাহ পুনরুত্থান দিবসে তোমাকে জাগাবেন।
আর যদি কবরের লোকটি কাফের বা মুনাফিক হয় তবে বলে, আমি কিছুই জানি না। মানুষকে বলতে দেখে আমিও বলতাম: আমি কিছুই জানি না। তখন একটি গদা দিয়ে তার দুই কানের মাঝখানে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। সে এত জোরে চিৎকার করে, জিন ও মানুষ ছাড়া তার আশেপাশের সকল প্রাণী শুনতে পায়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ফেরেশতাদ্বয় বলেন, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। তখন কবরকে চাপ দিতে বলা হয়। কবর তাকে এমনভাবে চাপ দেয়, তার পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। এভাবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেওয়া হয়।¹
টিকাঃ
১. বুখারি (১৩৩৮); তিরমিজি (১০৭১); মুসলিম (২৮৭০); আবু দাউদ (৪৭৫১); ইবনে হিব্বান (৩১১৭); বাজ্জার (৮৪৬২)।
📄 কবরের শান্তি ও শাস্তি
কবর কেবল একটি মাটির ঘর নয়। এটা মানুষের সুখ ও দুঃখের সংসার। কারও জন্য এটা জান্নাতের সবুজ বাগান। কারও জন্য জাহান্নামের আগুনে ভরা গর্ত। মানুষ সারা জীবন যা করেছে, সে কর্মফল ভোগ করা শুরু হবে এখান থেকেই। কবর জান্নাত ও জাহান্নামের সূচনাবিন্দু। এটার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থানে লাশ থাকা জরুরি নয়। বরং কেউ প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হোক, পুড়ে ছাই হয়ে যাক, মাটিতে মিশে যাক—তাকে এই বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে। শরিয়তের পরিভাষায় এটাকে বলা হয় 'আলমে বারজাখ' তথা অন্তরালের দুনিয়া।
অতীতে মুক্তমনা দার্শনিক এবং বর্তমানে নিজেদের অতি পণ্ডিত দাবিদার সেকুলাররা কবর তথা মৃত্যুপরবর্তী এই 'বারজাখী' জীবনের বাস্তবতা অস্বীকার করে। কারণ, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মানদণ্ড হচ্ছে বিবেকবোধ। যা যুক্তির পরাকাষ্ঠায় উত্তীর্ণ, সেটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। যা উত্তীর্ণ নয়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের যুক্তি, মানুষকে কবরে রাখলে আমরা দেখি তার কিছুই হয় না, কিছুদিন পরে শরীর পচেগলে শেষ হয়ে যায়। অথবা অনেক সময় মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সুতরাং কবরে কীভাবে শান্তি বা শাস্তি হবে? এ বক্তব্য এতটাই স্থূল যে, খণ্ডন নিষ্প্রয়োজন। আমরা যা চোখে দেখি, সেটাই বাস্তব, আর যা দেখি না, সেটাই অবাস্তব এমন নয়। আল্লাহকে তো আমরা দেখি না, তবে কি আল্লাহর অস্তিত্ব নেই? ফেরেশতা দেখি না, ফেরেশতার অস্তিত্ব নেই? জান্নাত ও জাহান্নাম দেখি না, তাই জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব নেই? বরং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথা হলেও তো আমরা দেখি না। তা হলে এগুলো নেই? আমরা রুহ দেখি না, তা হলে রুহ নেই? বাস্তবতা হলো, সবকিছু দেখার প্রয়োজন হয় না, অনুভবেও বোঝা যায়। আমাদের মনের সুখ-দুঃখ, হৃদয় ও শরীরের ব্যথা আমরা অনুভব করি। রুহ আমরা অনুভব করি। আল্লাহ, ফেরেশতা, জান্নাত-জাহান্নাম আমরা অনুভব করি। এগুলো থাকার অপরিহার্যতা বুঝি। তবে যেহেতু এগুলো আমাদের উপলব্ধির বাইরে, তাই এ ব্যাপারে আমরা আল্লাহর জ্ঞান তথা ওহির মুখাপেক্ষী। আল্লাহ আমাদের যা জানিয়েছেন, ততটুকু আমরা গ্রহণ করি। যা জানাননি, সেসব ব্যাপারে নীরব থাকি। ইমাম আবু হানিফা রাহি. বলেন, 'যে ব্যক্তি কবরের আজাব অস্বীকার করবে, সে পথভ্রষ্ট জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হবে।'¹
কুরআন থেকেই কবরের শাস্তি প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّلِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ . অর্থ: 'আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের মজবুত বাক্য দ্বারা শক্তিশালী করেন, পার্থিব জীবনে এবং পরকালে। আর আল্লাহ জালেমদের পথভ্রষ্ট করেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা-ই করেন।' [ইবরাহিম: ২৭] উক্ত আয়াতটিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে মুনকার-নাকির কর্তৃক তিন প্রশ্ন দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন।² অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, فَوَقْهُ اللهُ سَيِّاتِ مَا مَكَرُوا وَحَاقَ بِالِ فِرْعَوْনَ سُوءُ الْعَذَابِ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْমَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ. অর্থ: 'অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউনের গোত্রকে শোচনীয় আজাব গ্রাস করল। সকালে-সন্ধ্যায় তাদের (জাহান্নামের) আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে যে, ফেরাউনের গোত্রকে কঠিনতর আজাবে ছুড়ে ফেলো।' [গাফের ৪৫-৪৬]
ইমাম তিরমিজি কবরে মুনকার-নাকির সংক্রান্ত হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন—আলি, জায়েদ ইবনে সাবেত, ইবনে আব্বাস, বারা বিন আজেব, আবু আইউব আনসারি, আনাস ইবনে মালেক, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, আবু সাঈদ খুদরি রাজি.—প্রত্যেকেই কবরের আজাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।¹
• ইমাম বুখারি রাহি. তাঁর সহিহ গ্রন্থের জানাজা অধ্যায়ে কবরের আজাব-সম্পর্কিত একাধিক হাদিস উল্লেখ করেছেন। আয়েশা রাজি. বলেন, আল্লাহর রাসুল নামাজের মাঝে দোয়া করতেন, 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই, দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে গুনাহ ও ঋণে ফেঁসে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই।'²
• অন্য একটি হাদিসে আয়েশা রাজি. বলেন, এক ইহুদি নারী আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে কবরের শাস্তির কথা বর্ণনা করে। তখন রাসুল বলেন, আল্লাহ তোমাকে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। তখন আয়েশা রাজি. রাসুলুল্লাহকে কবরের শাস্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, কবরে শাস্তি রয়েছে।' আয়েশা রাজি. বলেন, এর পর থেকে রাসুলুল্লাহ যখনই নামাজ পড়তেন, কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।³
• সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় এসেছে, আয়েশা রাজি. বলেন, আমার কাছে মদিনার দুজন ইহুদি (নারী) এসে বলল, কবরে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়। আমি তখন তাদের কথা বিশ্বাস করিনি। তারা চলে যাওয়ার পরে আল্লাহর রাসুল এলে আমি তাকে বলি, হে আল্লাহর রাসুল, মদিনার দুজন ইহুদি আমার কাছে এসেছিল। তারা মনে করে, কবরে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়। তখন তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, তারা সত্য বলেছে। কবরে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হয়। চতুষ্পদ জন্তু সেগুলো শুনতে পায়।' আয়েশা রাজি. বলেন, এর পর থেকে আমি সবসময় খেয়াল করতাম, তিনি কবরের আজাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।⁴
জায়দ ইবনে সাবেত রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন বনু নাজ্জারের একটি বাগানে খচ্চরের উপর আরোহী ছিলেন। আমরা তার সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ খচ্চরটি লাফিয়ে উঠল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমরা খেয়াল করলাম, সেখানে পাঁচ/ছয়টি কবর ছিল। তিনি বললেন, 'এগুলো কাদের কবর কেউ জানো?' এক ব্যক্তি বললেন, 'হ্যাঁ, আমি জানি।' তিনি বললেন, 'তারা কবে মারা গেছে?' লোকটি বললেন, 'তারা মুশরিক অবস্থায় মারা গেছে।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এই উম্মতকে কবরে শাস্তি দেওয়া হয়। যদি আমার এই আশঙ্কা না থাকত যে, তোমরা দাফন করা বন্ধ করে দেবে, তবে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম তিনি যেন তোমাদের কবরের আজাব শুনিয়ে দেন যা আমি শুনি।" অতঃপর তিনি আমাদের দিকে ফিরে বললেন, 'তোমরা জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো।' সাহাবাগণ বললেন, আমরা জাহান্নামের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। তিনি বললেন, 'তোমরা কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।' সাহাবাগণ বললেন, আমরা কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।' সাহাবাগণ বললেন, আমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। রাসুল বললেন, 'তোমরা দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।' তারা বললেন, আমরা দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।¹
মানুষ যখন দাফন শেষ করে চলে যায়, তখন মৃত ব্যক্তি তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। অতঃপর তার কবরে দুজন ফেরেশতা এসে জিজ্ঞাসা করেন, তোমার রব কে? (মুমিন হলে) সে বলে, আমার রব আল্লাহ। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তোমার দ্বীন কী? সে বলে, আমার দ্বীন ইসলাম। (রাসুলকে দেখিয়ে) তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কে? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসুল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কীভাবে জানো? সে বলে, আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি এবং তাতে ঈমান এনেছি, সত্যায়ন করেছি। তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করে বলেন, আমার বান্দা সত্য বলেছে। সুতরাং তোমরা তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। জান্নাত থেকে তার কবরে বাতাস ও প্রশান্তি আসতে থাকবে এবং তার কবরটি দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যাবে। আর (কাফের হলে) যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমার রব কে? সে বলবে, হায়! আমি জানি না। তখন আকাশ থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, সে মিথ্যা বলেছে। তার জন্য জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। তার কবর থেকে জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। তখন জাহান্নামের গরম ও বিষবাষ্প সেখানে আসতে থাকবে এবং তার কবরটিকে এমনভাবে সংকীর্ণ করে দেওয়া হবে যে, তার পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির ভিতরে ঢুকে যাবে।¹
• উসমান ইবনে আফফান রাজি. যখনই কোনো কবরের পাশ দিয়ে যেতেন, কেঁদে কেঁদে দাড়ি ভিজিয়ে ফেলতেন। তাকে বলা হলো, জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনায়ও তো আপনি এত কাঁদেন না। এটা নিয়ে এত কাঁদার রহস্য কী? তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল বলেছেন, কবর পরকালের প্রথম মনজিল। এখান থেকে কেউ ছাড়া পেয়ে গেলে পরবর্তী সকল মনজিল তার জন্য সহজ। আর এখানে ধরা খেয়ে গেলে পরবর্তী সকল মনজিল তার জন্য কঠিন। উসমান বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি কবরের চেয়ে ভয়ংকর কোনো দৃশ্য দেখিনি।'¹
টিকাঃ
১. শাইবানি (৩৬)।
২. তিরমিজি (৩১২০); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (১১২২৯)।
১. তিরমিজি (১০৭১)।
২. বুখারি (৮৩২, ৬৩৭৬)।
৩. বুখারি (১৩৭২)।
৪. মুসলিম (৫৮৬)।
১. মুসলিম (২৮৬৭, ২৮৬৮)।
১. আবু দাউদ (৭৪৫৩); বুখারি (১৩৩৮)।
১. সুনানে ইবনে মাজা (৪২৬৭); মুসতাদারাকে হাকেম (১৩৭৭); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (৭১৬৪)।