📄 কিরামান কাতিবিন
মুসলমানদের আকিদার মধ্য থেকে ফেরেশতা-সংক্রান্ত একটি আকিদা হলো 'কিরামুন কাতিবুন' তথা সম্মানিত লেখক ফেরেশতাগণকে বিশ্বাস করা। আল্লাহ কুরআনের একাধিক আয়াতে তাদের কথা আলোচনা করেছেন: وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحْفِظِينَ . كِرَامًا كَاتِبِينَ. يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ. অর্থ: 'অবশ্যই তোমাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছেন সম্মানিত লেখকবৃন্দ; তারা জানেন যা তোমরা করো।' [ইনফিতার: ১০-১২] অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّينِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ . مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْলٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ অর্থ: 'যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে, সে যে কথাই উচ্চারণ করে, সেটা সংরক্ষণের জন্য তার কাছে নিযুক্ত রয়েছে সদা প্রস্তুত প্রহরী।' [কাফ: ১৭-১৮]
বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরাইরা রাজি. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের মাঝে দিন ও রাতে পালাক্রমে ফেরেশতাদের বিভিন্ন দল আসতে থাকেন। তারা ফজর ও আসরের নামাজে মিলিত হন। এরপর যারা তোমাদের মাঝে রাত যাপন করেছিলেন, তারা আল্লাহর কাছে চলে যান। তাদের প্রভু তাদের জিজ্ঞাসা করেন, অথচ তিনি তাদের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন, তোমরা আমার বান্দাদের কী অবস্থায় রেখে এসেছ? জবাবে তারা বলেন, আমরা নামাজরত অবস্থায় তাদের কাছে গিয়েছিলাম, আবার নামাজরত অবস্থায় তাদের রেখে এসেছি।¹
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, لَهُ مُعَقِّبْتٌ مِّنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَ مِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُوْনَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ . অর্থ: 'তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে। আল্লাহর নির্দেশে তারা তাদের হেফাজত করে।' [রাদ: ১১] উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসির রাহি. লিখেন, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একদল প্রহরী ফেরেশতা বান্দার কাছে পালাক্রমে আগমন করেন; রাতে একদল, দিনে একদল। তারা মানুষকে বিপদ ও দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেন। আরেক দল ফেরেশতা বান্দার ভালোমন্দ আমল লিপিবদ্ধ করার জন্য আগমন করেন; একদল রাতে, আরেক দল দিনে; একজন ডানে, আরেকজন বামে; ডানের জন পুণ্য লিখেন, বামের জন পাপ লিখেন। আরও দুজন প্রহরী ফেরেশতা থাকেন মানুষের সঙ্গে; একজন সামনে, আরেকজন পিছনে। তারা মানুষকে সুরক্ষিত রাখেন। এভাবে মানুষ দিনে চারজন ও রাতে চারজন ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে, যাদের দুজন আমল লিপিবদ্ধের কাজ করেন, অন্য দুজন প্রহরার কাজ করেন।²
কিরামাত কাতিবিন ফেরেশতাগণ মানুষের কেবল কথা ও কর্মকে লিখেন না, বরং নিয়তের কথাও জানেন এবং লিখেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের এ ক্ষমতা দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (হাদিসে কুদসিতে) 'আল্লাহ বলেছেন, যখন আমার বান্দা কোনো পুণ্য করার ইচ্ছা করে, তখন সেটা করার আগেই আমি তার পুণ্য লিপিবদ্ধ করি। আর যখন সে সেটা করে, তখন দশ গুণ বাড়িয়ে দিই। আর যখন কোনো পাপ করার ইচ্ছা করে, তখন সেটা করার আগ পর্যন্ত আমি লিখি না। কিন্তু যখন করে ফেলে, তখন কেবল একটি পাপই লিখি। আল্লাহর রাসুল বলেন, ফেরেশতারা আল্লাহকে বলেন—হে প্রভু, আপনার অমুক বান্দা খারাপ কাজের ইচ্ছা করেছে; অথচ আল্লাহ তায়ালা তাদের চেয়ে ভালো জানেন। তিনি বলেন, তোমরা তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকো। যদি সেটা করে, তবে একটি খারাপ কাজ লিখো। আর যদি না করে, তবে তার জন্য একটি পুণ্য লিখো। কারণ, সে আমার জন্যই ছেড়ে দিয়েছে। আল্লাহর রাসুল বলেন, যখন তোমাদের কারও ইসলাম সুন্দর হয়, তখন তার প্রত্যেকটি পুণ্যের বিনিময় দশ গুণ থেকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আর প্রত্যেকটি পাপ যতটুকু করে ততটুকুই লেখা হয়। এভাবে একসময় সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।'¹ আবু উমামা থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, 'মানুষ কোনো পাপ করলে বাম কাঁধের ফেরেশতা সেটা না লিখে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। যদি এ সময়ে সে লজ্জিত হয়ে তাওবা করে, তবে সেটা লিখেন না। যদি তাওবা না করে, তখন একটি পাপই লিখেন।'²
টিকাঃ
১. বুখারি (৫৫৫, ৭৪২৯); মুসলিম (৬৩২)।
২. তাফসিরে ইবনে কাসির (৪/৩৭৫); সালেহ ফাওজান (১৪৯)।
১. মুসলিম (১২৯); ইবনে হিব্বান (৩৭৯); মুসনাদে আহমদ (৮২৮২)।
২. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৭৭৬৫, ৭৭৮৭); এখানে ছয় ঘণ্টা বলতে কি প্রচলিত ঘণ্টার হিসাব বিদ্যমান ছিল? বিভিন্ন হাদিস ও ইতিহাসের গ্রন্থে আমরা আরব ও মুসলিম সভ্যতার এক ব্যাপক সমৃদ্ধি লক্ষ করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেখানে ভারতে মুঘল যুগেও দেখা যায় তারা প্রাচ্য রীতিতে 'প্রহর'-এর ভিত্তিতে দিনরাত গণনা করতেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাগণ তাদের যুগে আধুনিক 'ঘণ্টা'র হিসাব করতেন। তাদের দিনরাত আমাদের মতোই ২৪ ঘণ্টা ছিল। তবে আধুনিক সময়ের সঙ্গে সেটার একটু পার্থক্য রয়েছে। তারা দিন ও রাতকে বারো ঘণ্টা করে বিভক্ত করতেন। দিনের হিসাব শুরু করতেন সূর্যোদয় থেকে। আর রাতের হিসাব সূর্যাস্ত থেকে। ফলে তাদের সময়ে যদি কেউ বলত দিন ৫টার সময় সাক্ষাৎ হবে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতো আমাদের সকাল ১০টা। আমাদের বিকাল ৫টা তাদের হিসেবে ছিল দিন প্রায় ১১টা। কেউ যদি বলত রাত ১টা, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হতো মাগরিবের কিছু সময় পরে। বর্তমান সময়ের সঙ্গে আরেকটু পার্থক্য ছিল। দিন ও রাতের বারো ঘণ্টা যেহেতু তাদের কাছে আলাদা আলাদা ছিল, এ কারণে গ্রীষ্ম ও শীতে দিনরাত হ্রাসবৃদ্ধির ফলে ঘণ্টাও বাড়ত-কমত। দিনের ঘণ্টাগুলো গরমকালে বৃদ্ধি পেয়ে ৭০ মিনিটের কাছাকাছি পৌঁছত। আর রাতের ঘণ্টাগুলো ৫০ মিনিটে পৌঁছত। অপরদিকে শীতের দিন ঠিক উলটো হতো।
📄 মৃত্যু ও মৃত্যুর ফেরেশতা
মানুষের যখন জীবনকাল ফুরিয়ে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তখন আল্লাহ তায়ালা তার রুহ গ্রহণের জন্য একদল ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাদের প্রধানকে বলা হয় 'মালাকুল মাওত' তথা মৃত্যুর ফেরেশতা, আমাদের দেশে যিনি 'আজরাইল' নামে পরিচিত। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর কোথাও তাকে এ নামে ডাকা হয়নি; বরং এটা বনি ইসরাইলের বর্ণনা থেকে গৃহীত। তাই এমন নাম পরিত্যাগ করা উচিত।
সৃষ্টির মৃত্যুদানে ঠিক কতজন ফেরেশতা নিয়োজিত কুরআন-সুন্নাহে দ্ব্যর্থহীনভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। কোনো কোনো আয়াতে বোঝা যায় তিনি একজন ফেরেশতা। যেমন: আল্লাহ বলেন, قُلْ يَتَوَفَّىكُمْ مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُوْনَ. অর্থ: 'আপনি বলুন, তোমাদের ওফাত দান করে মৃত্যুর ফেরেশতা, যাকে তোমাদের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে। অতঃপর তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ফিরে যাবে।' [সাজদা: ১১] আবার কোনো কোনো আয়াত দেখলে বোঝা যায় তারা একাধিক ফেরেশতা। যেমন: আল্লাহ বলেন, حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُوْনَ. অর্থ: 'আর যখন তোমাদের কারও মৃত্যু চলে আসে, তখন আমার দূতগণ তাকে মৃত্যুদান করে, আর তারা ত্রুটি করে না।' [আনআম: ৬১] আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِينَ أَنْفُسِهِمْ অর্থ: 'আর যাদের ফেরেশতারা এমন অবস্থায় মৃত্যুদান করে, যখন তারা নিজেদের উপর অত্যাচার করছিল...।' [নিসা: ৯৭] অন্যত্র বলেন, حَتَّى إِذَا جَاءَتْهُمْ رُسُلُنَا يَتَوَفَّوْنَهُمْ অর্থ: 'ফলে যখন আমার দূতগণ তাদের কাছে মৃত্যুদান করতে চলে আসে...।' [আরাফ: ৩৭] আলিমগণ এসব বর্ণনার মাঝে সমন্বয় বিধান করেছেন। অর্থাৎ মূলত একজন ফেরেশতাই মানুষের রুহ গ্রহণ করে থাকেন, কিন্তু তার পাশাপাশি অন্য ফেরেশতাগণ সহায়ক হিসেবে থাকেন। ফলে কুরআন-সুন্নাহে কোনো অসামঞ্জস্যতা নেই। মুজাহিদ রাহি. থেকে বর্ণিত, মৃত্যুর ফেরেশতার সামনে পুরো দুনিয়াটা একটা থালার মতো। তিনি সেখান থেকে যার সময় ঘনিয়ে আসে, তাকে মৃত্যুদান করেন।¹
টিকাঃ
১. তাফসিরে তাবারি (২০/১৭৫); আকহাসারি (২১িল-২১২); সালেহ ফাওজান (১৫০)।
📄 মৃত্যুর স্বরূপ
মৃত্যু মানবজীবনের এক বিস্ময়কর ব্যাপার। জন্মের চেয়েও মৃত্যু বেশি বিস্ময়কর। পৃথিবীতে জন্মে একটা মানুষ জীবিত হয় না, বরং জীবিত হয়েই জন্মগ্রহণ করে। জীবিত অবস্থায় কয়েক মাস মায়ের গর্ভে থাকে। তার আত্মীয়-স্বজন সবাই জানে সে জীবিত। ফলে এই নতুন মেহমানের জন্য ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করে। ধীরে ধীরে একদিন সে পৃথিবীর আলো-বাতাসে চোখ মেলে। বিপরীতে একজন জীবিত মানুষ লম্বা সময় সবার সঙ্গে সময় কাটায়, গল্প করে, সুখে-দুঃখে পথ চলে, জীবনে বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করে, গল্প বলে, এর মাঝে হঠাৎ একদিন চিরকালের জন্য থমকে দাঁড়ায়, চোখ বন্ধ করে ফেলে। যে মানুষটি বছরের পর বছর কথা বলত, গল্প বলত, হঠাৎ চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে যায়। জীবনের খেলাঘরের সব খেলা তার জন্য সেখানেই শেষ হয়ে যায়। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিজন কিছুদিন কান্নাকাটি করে ভুলে যায়। পৃথিবীতে তার জীবনের অধ্যায় সমাপ্ত হয়। কিন্তু আল্লাহ তাকে ভোলেন না। কারণ, মাটির নিচে যে তার জন্য প্রস্তুতি চলছে এক নতুন জীবনের।
মৃত্যুর সময় মানুষ বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। এগুলো এমন অভিজ্ঞতা, যা পৃথিবীর কোনো জীবিত মানুষ আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি। যারা জানতে পারে, তারা কাউকে বলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু আমরা রাসুলের মাধ্যমে এগুলো সম্পর্কে অনেককিছু জানতে পাই। আমরা জানতে পাই, মৃত্যুর সময়ই প্রত্যেকটি মানুষ বুঝে ফেলে তার সারা জীবনের কর্মের পরিণতি কী হতে যাচ্ছে। ফলে তাকে কবর কিংবা হাশর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। পুণ্যবান হলে তার সুখের যাত্রা মুমূর্ষু অবস্থা থেকেই শুরু হয়, আর পাপী হলে দুর্ভাগ্যের যাত্রাও তখন থেকেই।
বারা বিন আজেব রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একজন আনসারি সাহাবির জানাজা পড়ার জন্য বের হলাম। কবরের কাছে পৌঁছে দেখলাম তখনও সেটা খনন সম্পন্ন হয়নি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে বসলেন। আমরাও তার চতুষ্পার্শ্বে নীরবে বসে গেলাম, যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসে ছিল। আল্লাহর রাসুলের হাতে একটি কাঠের টুকরা ছিল। তিনি সেটা দিয়ে মাটিতে কিছু রেখা টানছিলেন। অতঃপর তিনি মাথা উঠিয়ে বলেন, 'তোমরা কবরের শান্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো।' কথাটি দুইবার অথবা তিনবার বললেন। অতঃপর বললেন, 'যখন মুমিন বান্দা দুনিয়া থেকে পরকালের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন শুভ্র বদনের ফেরেশতাদের একটি দল আকাশ থেকে নেমে আসে। তাদের মুখমণ্ডল সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করতে থাকে। তাদের হাতে থাকে জান্নাতের কাফন, জান্নাতের কপূর। তারা তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা আগমন করে তার মাথার কাছে বসে বলেন—হে পবিত্র আত্মা, তুমি আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে আসো।'
আল্লাহর রাসুল বলেন, 'তখন পানির পাত্র থেকে পানির ফোঁটা যেভাবে বেরিয়ে আসে, তার রুহ ওভাবে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। ফেরেশতারা সেটা গ্রহণ করে ঊর্ধ্বজগতে চলে যান। প্রত্যেক আকাশের ফেরেশতারা তাকে স্বাগত জানান, তার পরিচয় জানতে চান। রুহ বহনকারী ফেরেশতাগণ তার নাম, তার পিতার নাম-সহ সুন্দর করে পরিচয় দেন। এভাবে সপ্ত আকাশ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আল্লাহ বলেন, ঊর্ধ্ব জগতে (ইল্লিয়িয়নে) আমার বান্দার আমলনামা লিখে ফেলো। এর পর তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করো। কেননা আমি তাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি এবং মাটিতে ফিরিয়ে দেবো, অতঃপর মাটি থেকে আবার পুনরুত্থিত করব। আল্লাহর রাসুল বলেন, এরপর তাকে দেহের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তখন কবরে দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন...। আর যখন কোনো কাফের দুনিয়া থেকে আখিরাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে, তখন কৃষ্ণ চেহারার অধিকারী একদল ফেরেশতা জাহান্নামের কাপড় নিয়ে তার নিকট অবতীর্ণ হয়। তারা তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে যায়। অতঃপর মৃত্যুর ফেরেশতা আগমন করে তার মাথার কাছে বসেন এবং তাকে বলেন—হে অপবিত্র আত্মা, আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধের দিকে বের হয়ে আয়! তখন তার আত্মা শরীরের ভিতরে ছোটাছুটি করতে থাকে। মৃত্যুর ফেরেশতা সেটাকে এমনভাবে টেনে বের করেন, যেভাবে ভেজা কাপড়ের ভিতর থেকে লোহা টেনে বের করা হয়। এরপর তিনি সেটাকে ধরে সঙ্গে সঙ্গে সেই জাহান্নামের কাপড়ের ভিতরে রাখেন। সেখান থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। এরপর তাকে নিয়ে ঊর্ধ্বজগতে গমন করেন। সকল ফেরেশতা তার বদনাম করে। একপর্যায়ে তাকে দুনিয়ার আকাশে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার জন্য আকাশের দরজা খোলা হয় না; বরং আল্লাহ তায়ালা বলেন, ভূপৃষ্ঠের সর্বনিম্ন স্তরে তার নাম লিখে দাও। তখন তার আত্মাকে সেখান থেকে ছুড়ে ফেলা হয়। এরপর সেটাকে দেহের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তার কবরে দুইজন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন...।'¹
উক্ত হাদিস দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মানুষ ফেরেশতাদের দেখতে পায়, ফেরেশতাদের কথা শুনতে পায়; শুধু কিছু বলতে পারে না, কাউকে জানাতে পারে না। পবিত্র কুরআনও এটার সাক্ষ্য দেয়। আল্লাহ বলেন, إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَئِكَةُ إِلَّا تَخَافُوْا وَلَا تَح্زَنُوا وَابْشِرُوْا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوْعَدُوْনَ. অর্থ: "নিশ্চয় যারা বলে, 'আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ', অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, 'তোমরা ভয় করো না। চিন্তা করো না। আর তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো'।” [ফুসসিলাত: ৩০]
টিকাঃ
১. মুসতাদরাকে হাকেম (১০৮); মুসানদে আহমদ (১৮৭৬৬); তয়ালিসি (৭৯১)।
📄 মুনকার ও নাকিরের প্রশ্ন
মৃত্যুর পরে কাফন-দাফন শেষ করে মানুষ যখন চলে যায়, মৃত ব্যক্তিকে তখনই জীবিত করা হয়। সে মানুষের চলে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পায়। তখন তার কবরে কৃষ্ণবর্ণ ও নীল চোখ বিশিষ্ট দুজন ফেরেশতা আগমন করেন। তাদের একজনকে বলা হয় মুনকার অন্যজনকে নাকির। তারা তাকে উঠিয়ে বসান এবং তিনটি প্রশ্ন করেন। তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? রাসুলুল্লাহকে দেখিয়ে বলেন, তিনি কে? যদি মুমিন হয়ে থাকে, তবে সে বলে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসুল। তখন ফেরেশতাদ্বয় বলেন, ওই দেখো জাহান্নাম। আল্লাহ সেটার বদলে তোমাকে জান্নাত দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। তখন তার কবরকে সত্তর হাত চড়া ও প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। কবরকে আলোকিত করা হয়। তাকে বলা হয়, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। সে বলে, আমি কি পৃথিবীতে গিয়ে আমার পরিবারকে জানাতে পারি? তারা বলেন, তুমি নব বরের মতো ঘুমাও। তোমার সবচেয়ে প্রিয়জন আল্লাহ পুনরুত্থান দিবসে তোমাকে জাগাবেন।
আর যদি কবরের লোকটি কাফের বা মুনাফিক হয় তবে বলে, আমি কিছুই জানি না। মানুষকে বলতে দেখে আমিও বলতাম: আমি কিছুই জানি না। তখন একটি গদা দিয়ে তার দুই কানের মাঝখানে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। সে এত জোরে চিৎকার করে, জিন ও মানুষ ছাড়া তার আশেপাশের সকল প্রাণী শুনতে পায়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ফেরেশতাদ্বয় বলেন, আমরা জানতাম তুমি এটাই বলবে। তখন কবরকে চাপ দিতে বলা হয়। কবর তাকে এমনভাবে চাপ দেয়, তার পাঁজরের হাড়গুলো একটি অপরটির মাঝে ঢুকে যায়। এভাবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তাকে শাস্তি দেওয়া হয়।¹
টিকাঃ
১. বুখারি (১৩৩৮); তিরমিজি (১০৭১); মুসলিম (২৮৭০); আবু দাউদ (৪৭৫১); ইবনে হিব্বান (৩১১৭); বাজ্জার (৮৪৬২)।