📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইমাম ওয়াজিব হওয়ার ব্যাখ্যা

📄 ইমাম ওয়াজিব হওয়ার ব্যাখ্যা


ইমাম তহাবির কথার ব্যাখ্যা: ইমাম তহাবির বক্তব্য 'মুসলিম শাসকদের অধীনে—তারা সৎ কিংবা অসৎ হোক—কিয়ামত পর্যন্ত হজ এবং জিহাদ অব্যাহত থাকবে'-এর দুটো অর্থ হতে পারে:
এক. পূর্বের আলোচনার ধারাবাহিকতা। ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, ইমাম তহাবি শাসকদের সঙ্গে মুসলমানদের কর্মপন্থা কী হবে সেটা আলোচনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, সৎ হোক অসৎ হোক, জালেম হোক ন্যায়নিষ্ঠ হোক, মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা যাবে না; বরং তাদের শুদ্ধির জন্য দোয়া করতে হবে, সবর করতে হবে। সেই ধারাবাহিকতায় এখানে বলা হচ্ছে, মুসলিম শাসক সৎ হোক অসৎ হোক, তাদের ঝান্ডাতলে জিহাদ করতে হবে। কারণ, তারা মুসলমানদের বৈধ অভিভাবক। ব্যক্তিজীবনে সৎ-অসৎ হলেও দ্বীন ও উম্মাহর সুরক্ষার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। ফলে তারা যখনই জিহাদের ডাক দেবে, মুসলমানদের সে ডাকে সাড়া দেওয়া কর্তব্য। জুলুমের অজুহাতে শাসকের জিহাদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। কারণ, তাতে খোদ দ্বীন ও উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবং যুগে যুগে সেটা হয়েছেও। শাসক ফাসেক ছিল, জালেম ছিল, কিন্তু জিহাদের ক্ষেত্রেও প্রথম সারিতে ছিল। বর্তমানের শাসকদের মতো তারা জিহাদকে ঘৃণা করত না। যেমন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কথাই ধরা যাক। ইতিহাসের কুখ্যাত জালিমদের একজন তিনি। বড় বড় তাবেয়ি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। অথচ ভারতবর্ষের মুসলমানদের ঈমান কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই মানুষটির কাছেই ঋণী। কারণ, তিনিই বারবার পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও ভারতে সেনা অভিযান পরিচালনা করেছেন। শেষ পর্যন্ত তারই পরামর্শ ও নির্দেশনাতে আমির মুহাম্মাদ বিন কাসিম রাহি. ভারতে ইসলামের বিজয় সূচিত করেন।
তখনকার মুসলিমগণ যদি বলতেন, যেহেতু হাজ্জাজ জালিম, তাই তার অধীনে আমরা জিহাদ করব না, তা হলে কেমন হতো? কেবল খেলাফতের ভিতরে নয়, অন্যান্য ভূখণ্ডের মুসলিমগণও বিদ্যমান শাসকদের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযান, মুহাম্মাদ ঘুরির ভারত বিজয় থেকে শুরু করে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পর্যন্ত ভারতের মুসলিম শাসকগণ কেউ খলিফা ছিলেন না, নিষ্পাপ ছিলেন না; কিন্তু মুসলমানগণ তাদের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। কেউ বলেননি যে, তারা জালিম, তাই তাদের অধীনে যুদ্ধ করব না। তারা ভারতের বড় বড় অঞ্চল ইসলামের জন্য জয় করেছেন। এসব যুদ্ধের অধিকাংশি ইকদামি জিহাদ ছিল। বাংলাতেও ইসলামের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি রাহি.-এর ইকদামি জিহাদের মাধ্যমে।
এভাবে ইকদামি জিহাদ যুগে যুগে ইসলামের আলো গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। মুসলমানগণ যদি কেবল দিফায়ি জিহাদের মাঝে বসে থাকতেন, ইসলাম তা হলে কেবল জাজিরাতুল আরবেই থেকে যেত। এগুলোর পিছনে রাজা-বাদশাহদের কী উদ্দেশ্য ছিল সেটা আল্লাহর কাছে সোপর্দ রইল, কিন্তু এর মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ যে উপকৃত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং পশ্চিমা উপনিবেশের উত্থানের আগ পর্যন্ত জিহাদ মুসলিম শাসকদের কাছে একটি স্বীকৃত দায়িত্ব ছিল এবং শাসকদের অধীনে যুদ্ধ করা তখন একটা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। খারেজিরা ছাড়া আর কেউ এটা অস্বীকার করত না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক শাসকের সঙ্গে তোমাদের উপর জিহাদ ওয়াজিব, চাই সে সৎ হোক বা অসৎ হোক।¹
দুই. জিহাদের জন্য শাসক শর্ত। কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ শাসকের ঝান্ডাতলে থাকবে। সুতরাং জিহাদ করতে হলে শাসকের অনুমতিক্রমে তার নির্দেশনাতে করতে হবে। যদি এ অর্থ ধরা হয়, তবে তা উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করা যাবে না; বরং আগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।

টিকাঃ
১. বুখারি (৬৮৩০); বাজ্জার (২৮৬); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৩৫৩৯)। ২. ফাতহুল বারি (৭/৪৯৪); শরহে মুসলিম, নববি (১২/৭৮)। ৩. মুসতাদরাকে হাকেম (৪৪৮৩); আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৫/২৭০)। 1. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৮৫৪৯)। 1. আল-ইসতিজকার, ইবনে আবদুল বার (৫/১৬); আল-আওয়াসিম, ইবনুল উজির (৮/১৮); ইলাউস সুনান (১২/৬৫৭)। 2. শরহে মুসলিম, নববি (১২/২২৯)। 3. নাইলুল আওতার, শাওকানি (৭/২০৮)। 4. গজনবি (১২৯); গুনাইমি (১১০)। 5. তাহজিবুত তাহজিব, ইবনে হাজার (২/২৮৮)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 জিহাদ সবসময় চলমান থাকবে

📄 জিহাদ সবসময় চলমান থাকবে


জিহাদ সবসময় চলমান থাকবে: প্রশ্ন হতে পারে, ইমাম তহাবির 'জিহাদ অব্যাহত থাকবে' বক্তব্যের অর্থ কী? তা ছাড়া একাধিক হাদিসে এসেছে, উম্মতের একটি দল সবসময় আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে থাকবে। যেমন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আমার নবুওতপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে উম্মতের সর্বশেষ দলের দাজ্জালের বিরুদ্ধে কিতাল পর্যন্ত জিহাদ অব্যাহত থাকবে। কোনো জালেমের জুলুম, আদিলের আদল এটাকে বাতিল করতে পারবে না।'¹ মুসলিম শাসকদের অধীনে বর্তমানে যেহেতু ইকদামি জিহাদ করা সম্ভব নয়, আবার বিভিন্ন দেশ পারস্পরিক চুক্তিবদ্ধ থাকায় দিফায়ি জিহাদেরও প্রয়োজন হচ্ছে না, কিংবা প্রয়োজন হলেও উম্মাহর দুর্বলতা ও গাফিলতির কারণে বাস্তবায়িত হচ্ছে না, তা হলে জিহাদ কোথায়? মুহাক্কিক আলিমদের মতে হাদিসের অর্থ হলো, কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদের বিধান বলবৎ থাকবে। জিহাদ কখনও রহিত (মানসুখ) হবে না।² প্রয়োজন হলে এবং শর্তাবলি বিদ্যমান থাকলে মুসলিম উম্মাহ জিহাদ করবে। শর্ত বিদ্যমান না থাকলে অপেক্ষা করবে। এ জন্যই আকিদার কিতাবে হজ ও জিহাদকে একত্রে উল্লেখ করা হয়। অথচ হজ প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে পালিত হয় না, বরং নির্দিষ্ট সময়ে, শর্তের ভিত্তিতেই পালিত হয়। একই কথা জিহাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

টিকাঃ
১. আবু দাউদ (২৫৩২); সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর (২৩৬৭)।
২. মিরকাত, আলি কারি (৬/২৪৫৩)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px