📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 জিহাদের অর্থ ও প্রকারভেদ

📄 জিহাদের অর্থ ও প্রকারভেদ


জিহাদের অর্থ ও প্রকারভেদ: জিহাদ শব্দের শাব্দিক অর্থ শ্রম দেওয়া, চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যয় করা, সংগ্রাম করা। আল্লাহর পথে ব্যয়িত সব ধরনের সংগ্রাম ও কষ্ট-ক্লেশকে জিহাদ বলা হয়। সে হিসেবে জিহাদের অর্থ বেশ ব্যাপক এবং প্রকারভেদও অনেক। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে যা-কিছু অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, সেসব লঙ্ঘন করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার নামই জিহাদ। সুতরাং নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের নাম জিহাদ, শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নাম জিহাদ, দ্বীনের জন্য সম্পদ ব্যয় করা জিহাদ, ইলমের মাধ্যমে ইসলামের দুশমনকে পরাজিত করা জিহাদ, দ্বীনের জন্য মুখে সংগ্রাম করা জিহাদ, লেখালিখি করা জিহাদ, কাফেরদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে যুদ্ধ করা জিহাদ। আর এ কারণে জিহাদের অর্থের ক্ষেত্রে সালাফের একেক রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। বস্তুত জিহাদ এই সবগুলো অর্থকেই ধারণ করে।¹
সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একেক জিহাদের গুরুত্ব ও মান একেক রকম। বরং ব্যক্তিভেদেও জিহাদের বিধান ও গুরুত্ব ভিন্ন ভিন্ন হবে। কখনও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ গুরুত্বপূর্ণ; বরং এটা অন্যান্য জিহাদের উপক্রমণিকা। কারও আত্মা যদি বিশুদ্ধ ও সুস্থ না থাকে, প্রবৃত্তি যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে সে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কীভাবে? তাই হালাল-হারাম মেনে চলা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করাও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।² এ কারণে ইবনে মাসউদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সময়মতো নামাজ আদায় করা, মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ করা। তৃতীয় পর্যায়ে বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা।³ ইবনে মাসউদ নামাজে অবহেলা করতেন, কিংবা মাতা-পিতার অবাধ্য ছিলেন, তাই তাকে এমন বলেছেন—এ ধরনের ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট গলদ। বরং অন্যান্য আমলও যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝানো উদ্দেশ্য। যে ঠিক মতো নামাজ পড়ে না, মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ করে না, সে কীভাবে তরবারির জিহাদ করবে, কিংবা তার সে জিহাদের কী মূল্য? তা ছাড়া জিহাদের জন্য নামাজ আসেনি, বরং নামাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ এসেছে। ফলে নামাজ লক্ষ্য, জিহাদ উপলক্ষ্য। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রাহি. লিখেছেন, জিহাদের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি প্রকার হচ্ছে মানুষের জাহির ও বাতিন সংশোধন করা। এটাই সকল নবির কাজ।⁴
কখনও আবার কেবল মুখ ও কলমের জিহাদই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকে বলেন, فَلَا تُطِعِ الْكَفِرِيْنَ وَ جَاهِدْهُمْ بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا. অর্থ: ‘আর আপনি কাফেরদের আনুগত্য করবেন না, বরং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর জিহাদ করুন।’ [ফুরকান: ৫২] এখানে জিহাদ বলতে দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে কাফেরদের পরাজিত করা উদ্দেশ্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলা।⁵
কিন্তু যখন স্বাভাবিকভাবে জিহাদ শব্দটা ব্যবহার করা হবে, তখন এর দ্বারা তরবারির জিহাদই উদ্দেশ্য হবে। কারণ, সকল প্রকারের জিহাদের মাঝে তরবারির জিহাদ সর্বোত্তম। এতে অন্য সব ধরনের কুরবানি অন্তর্ভুক্ত; বরং জগতের সর্বাপেক্ষা প্রিয় জীবনটাই এখানে বাজি ধরা হয়। দুর্গম পাহাড়ে কিংবা বিজন মরুভূমিতে দুশমনের বিধ্বংসী ড্রোনের জন্য অপেক্ষমাণ মুজাহিদ, আর নিজ ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের পাশে গায়ে কম্বল জড়িয়ে কলম কিংবা কী-বোর্ড চাপা মুজাহিদ সমান হতে পারে না।

টিকাঃ
১. বাদায়েউস সানায়ে (৭/৯৭)।
২. ফাতহুল বারি (১১/৩৩৮); আহসানুল ফাতাওয়া (১/৫৫০)।
৩. বুখারি (২৭৮২)।
৪. আত-তাফহিমাত (২/১০৩)।
৫. আবু দাউদ (৪৩৩৫); তিরমিজি (২৩৪৬)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 জিহাদের বিধান

📄 জিহাদের বিধান


জিহাদের বিধান: পূর্বে আমরা যেমনটা বলেছি, আল্লাহ তায়ালা জিহাদ তথা কিতালের বিধান দিয়েছেন প্রয়োজন-সাপেক্ষে। অর্থাৎ দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণে জিহাদ একটি হাতিয়ার, দ্বীন জিহাদের হাতিয়ার নয়। ইমাম আবু হানিফা রাহি. বলেন, জিহাদ মুসলমানদের উপর ওয়াজিব... যখন প্রয়োজন।¹ তাই জিহাদ মানুষের প্রাণ রক্ষার জন্য বৈধ করা হয়েছে, ধ্বংসের জন্য নয়। কারণ, হত্যা ও রক্তপাত মৌলিকভাবে আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। আল্লাহ বলেন, مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّهَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا. অর্থ: 'যে ব্যক্তি হত্যার বিনিময় (কিসাস) কিংবা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ব্যতীত একটি প্রাণকে হত্যা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একটি প্রাণকে বাঁচাল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল। [মায়িদা: ৩২] তবে দ্বীন জীবনের চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেনই তার দাসত্বের জন্য। ফলে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা মানবজীবনের প্রথম উদ্দেশ্য। দ্বীন ব্যতীত মানবজীবন অর্থহীন। ফলে এই দ্বীন প্রতিষ্ঠার সামনে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধে অপরাধী হবে। আর কিছু প্রাণের জন্য যেহেতু দ্বীন নষ্ট হতে পারে না, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে না, তাই বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ বলি দেওয়া হবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের হত্যা করা হবে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, 'আমি মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল, আর নামাজ আদায় করে, জাকাত প্রদান করে। যখন তারা এগুলো করবে, তাদের রক্ত ও সম্পদ আমার থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। তবে ইসলামের কোনো হক থাকলে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের হিসাব থাকবে আল্লাহর উপর।'²
উপরের আলোচনায় স্পষ্ট যে, জিহাদ আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ও এ দ্বীনের অনুসারীদের সুরক্ষার হাতিয়ার। এ কারণে জিহাদের বিধানকে উলামায়ে কেরাম মৌলিকভাবে ফরজে কিফায়াহ বলেন। অর্থাৎ উম্মাহর সবার জিহাদ করতে হবে না। বরং একদল করলে গোটা উম্মাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে।³ এটা তখনকার বিধান, যখন মুসলিম রাষ্ট্র ও মুসলিমরা শক্তিশালী থাকবে। এ অবস্থায় খলিফা প্রতি বছর একবার বা দুইবার মুজাহিদদের কিছু দল দুশমনের বিরুদ্ধে পাঠাবেন। তারা পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে আল্লাহর দ্বীনের পতাকা বুলন্দ করবেন। দুশমনদের অন্তরে ইসলামের সম্ভ্রম ও মুসলিমদের প্রভাব ছড়িয়ে দেবেন, তাদের আতঙ্কিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত রাখবেন। মুসলমানরা তাদের দ্বীন কিংবা দায়িত্ব থেকে গাফিল নয় এটা বুঝিয়ে দেবেন। পরিভাষায় এটাকে জিহাদুত তলব/জিহাদুল ফাতহ/ইকদামি বা আক্রমণাত্মক জিহাদ বলা হয়।⁴ এ ধরনের জিহাদে হত্যা কিংবা যুদ্ধই মুখ্য নয়, বরং শত্রুকে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হবে: এক. ইসলামের দাওয়াত। দুই. ইসলাম অস্বীকার করলে জিজইয়ার মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার। তিন. প্রথম দুটো প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধ। ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সম্প্রদায়কে ইসলামের দিকে ডাকার আগে যুদ্ধ করেননি।⁵ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এখানে মুখ্য হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন, যুদ্ধ নয়। তাই এমন সাধারণ অবস্থায় সকল মুসলিমের উপর এমন জিহাদ ফরজ নয়। বরং দু-একটা দল যদি আদায় করে, তবে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর যদি কেউ আদায় না করে, তবে সবাই গুনাহগার হবে।⁶
দুশমনরা যত ভয়ংকর ও আগ্রাসী হয়ে উঠবে, ধীরে ধীরে জিহাদের পরিসর তত বিস্তৃত হবে। অর্থাৎ পূর্ণ নিরাপত্তার সময় কেবল দু-একটি দলের পক্ষ থেকে জিহাদ করলেই হয়ে যাবে। কিন্তু যখন কোনো ভূখণ্ডের মুসলিম সীমানা আক্রান্ত হবে এবং সেখানের মুসলমানদের পক্ষে শত্রুর মোকাবিলা করা সম্ভব না হবে, তখন আশেপাশের মুসলমানদের উপর তাদের সহায়তা করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। কারণ, তখন একটি দলের মাধ্যমে উদ্দেশ্য পূর্ণ হচ্ছে না। ফলে অন্যদের উপরও ধীরে ধীরে ফরজ হতে থাকবে। এটাকে পরিভাষায় জিহাদুদ দিফা বা প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ বলা হয়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত সীমানা এবং তার আশেপাশের লোকদের উপর জিহাদ ফরজে আইন (তথা সবার উপর ফরজ) হয়ে পড়বে। আর যারা তুলনামূলক দূরে থাকবে, তাদের উপর তখনও ফরজে কিফায়াহ হিসেবে বিবেচিত হবে। লড়াইয়ের পরিধি যত বৃদ্ধি পাবে, ফরজে কিফায়াহ থেকে ফরজে আইনের পরিধিও বিস্তৃত হবে। ফলে যদি পুরো উম্মাহ আক্রান্ত হয়, তবে গোটা উম্মাহর প্রত্যেকের উপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যাবে। আর কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে শত্রু আক্রমণ করলে সেখানের নারী-পুরুষ প্রত্যেকের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে যায়। তখন ইমাম (শাসক) সবাইকে জিহাদের জন্য ডাক দেন। এটাকে বলা হয় ‘নাফিরে আম’। এটা জিহাদের চূড়ান্ত অবস্থা। এমন অবস্থায় শাসকের অনুমতি থাকা জরুরি নয়, বরং শাসক থাকাও জরুরি নয়। কেউ কারও অনুমতি নেওয়া জরুরি নয়; বরং যে যেভাবে পারবে শত্রুকে প্রতিহত করবে।⁷

টিকাঃ
১. শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি (১৮৭)।
২. বুখারি (২৫); মুসলিম (২২); দারাকুতনি (৮৯৮)।
৩. শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি (১৮৯); আল-মুগনি, ইবনে কুদামা (৯/১৯৬)।
৪. দেখুন: আল-হাবিল কাবির, মাওয়ারদি (১৪/১১২-১১৩)।
৫. মুসনাদে আহমদ (২০৮১); আল মুজামুল কাবির, তাবারানি (১১১৫৯)।
৬. বাদায়েউস সানায়ে (৭/৯৭)।
৭. তাফসিরে কুরতুবি (৩/৩৮); হিদায়া (২/৩৭৮); আহকামুল কুরআন, জাসসাস (৪/৩১২); তাতারখানিয়া (৭/৮-৯); ফাতহুল বারি (৬/৩৭); আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ইবনে তাইমিয়া (৫/৫৩৮); রদ্দুল মুহতার (৪/১২২-১২৪); ইলাউস সুনান (১২/১১)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 জিহাদের জন্য কি শাসক শর্ত?

📄 জিহাদের জন্য কি শাসক শর্ত?


জিহাদের জন্য কি শাসক শর্ত?: জিহাদ এলোপাতাড়ি হত্যা, রাহাজানি, খুন কিংবা বিশৃঙ্খলার নাম নয়; বরং এটা ইসলামি শরিয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাময় ইবাদত। ফলে এটা বাস্তবায়নের জন্য বেশকিছু শর্ত রয়েছে:
এক. নিয়ত ও উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ করা। অর্থাৎ জিহাদ একমাত্র আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দ্বীনের কালিমা বুলন্দ করার জন্য হতে হবে। পার্থিব কোনো স্বার্থে জিহাদ করলে সেটা আল্লাহর পথের জিহাদ হবে না। পরকালে এমন মুজাহিদের জন্য পুণ্য নেই, শাস্তি রয়েছে। কারণ, আল্লাহর পথে জিহাদ না হলে সেটা অনর্থক মারামারি ও রক্তপাতে পরিণত হবে। সেক্ষেত্রে মুসলিমের জিহাদ আর অমুসলিমের সন্ত্রাসবাদের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
দুই. মুজাহিদদের মাঝে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ের শর্তগুলো বিদ্যমান থাকা। যেমন বালেগ হওয়া, সুস্থ ও সমর্থ হওয়া, মাতা-পিতার অনুমতি থাকা ইত্যাদি।
তিন. ইমামের তত্ত্বাবধানে জিহাদ করা। ইমাম ছাড়া জিহাদ বৈধ নয়। কারণ, ইমাম ছাড়া জিহাদ বিশৃঙ্খলার পথ উন্মুক্ত করে, মুসলমানদের মাঝে ফিতনার দরজা খুলে দেয়। যার যখন ইচ্ছা, যার বিরুদ্ধে ইচ্ছা যুদ্ধের ডাক দেবে, তাদের লোকালয়ে গিয়ে তরবারি চালাবে; এ কারণে জিহাদের ডাক দেবেন খলিফা বা তার নির্ধারিত প্রতিনিধি। তারা জিহাদের আয়োজন করবেন, নেতৃত্ব দেবেন।
প্রশ্ন হলো, সকল জিহাদে কি ইমামের অনুমতি প্রয়োজন? অনেক আলিম জিহাদের ক্ষেত্রে ইমামের অনুমতির শর্ত নিয়ে অতিরঞ্জন করেন। ফলে তারা ইমাম ছাড়া কোনো প্রকারের জিহাদ কল্পনা করতে পারেন না।¹ এটা গলদ। আবার অনেকে ইমামের শর্তকে একেবারে মূল্যহীন মনে করেন। ফলে তাদের দৃষ্টিতে কোনো জিহাদেই কোনো ইমাম বা অনুমতি দরকার নেই; এটাও গলদ।
হক উভয় মতাদর্শের মাঝামাঝি। অর্থাৎ উপরে জিহাদের যেসব প্রকারভেদ উল্লেখ করা হয়েছে, সবগুলোর বিধান ও শর্ত অভিন্ন নয়। বরং প্রকারভেদ হিসেবে শর্ত ও বিধান ভিন্ন। মুহাক্কিক আলিমদের মতে, জিহাদুত তলব তথা আক্রমণাত্মক জিহাদে ইমামের অনুমতি থাকা প্রয়োজন। যদিও কুরআন-সুন্নাহে এ প্রকারের জিহাদের মাঝে সরাসরি ইমামের শর্তের উপস্থিতি পাওয়া যায় না, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশেদিনের ইতিহাস দেখলে সুস্পষ্ট যে, খলিফার পরামর্শ, প্রস্তুতি ও অনুমতি ছাড়া আক্রমণাত্মক জিহাদ হতো না। বরং খলিফাই ঠিক করতেন মুজাহিদদের কোথায় পাঠানো হবে, কখন পাঠানো হবে, কতজন পাঠানো হবে। দু-একজন সাহাবির ব্যতিক্রম কিছু ঘটনা থাকলেও রাসুলুল্লাহর গোটা জীবন, সকল সাহাবার সচরাচর আমল বাদ দিয়ে দু-একটা ঘটনা দলিলযোগ্য নয়। আর দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হলেও উত্তম কিংবা সাধারণ আমল বলা সম্ভব নয়। কারণ, এগুলো পরবর্তী সময়ে যে বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে না, সেটা বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ পাশের রাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কোনো মাসলাহাতের কারণে ইমাম ‘আহদ’ তথা কোনো একটা চুক্তি করেছেন; আর চুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামের সরল ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে চুক্তি রক্ষা করতে হবে। সুতরাং তাদের উপর হুট করে চোরাগুপ্তা আক্রমণ করা যাবে না। এখন যদি এ ধরনের জিহাদে ইমামের অনুমতির শর্ত না রাখা হয়, যে-কেউ গিয়ে চুক্তিবদ্ধ পক্ষের উপর আক্রমণ করবে, যা মুসলমানদের পক্ষ থেকে গাদ্দারি হিসেবে বিবেচিত হবে। মোট কথা, এ প্রকারের জিহাদে ইমামের অনুমতি ও ইমামের পরামর্শের প্রয়োজন হবে।
ইবনে কুদামা রাহি. লিখেন, জিহাদ ইমাম এবং তার ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল।² জফর আহমদ উসমানি রাহি. ইলাউস সুনানে লিখেছেন, ‘জিহাদের জন্য ইমাম শর্ত। যদি মুসলমানদের ইমাম না থাকে, তবে ‘উজলাহ’ তথা নিঃসঙ্গতা অবলম্বন করবে। বিষয়টি... হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। সুতরাং যদি মুসলমানদের ইমাম না থাকে, তবে জিহাদ নেই...।³ কেবল ইমাম নয়, সন্তানের জন্য মাতা-পিতার অনুমতি লাগবে। ইমাম মুহাম্মাদ রাহি. লিখেন, মাতা-পিতার অনুমতি ছাড়া জিহাদে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, মাতা-পিতার আনুগত্য ফরজে আইন।⁴ স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি লাগবে; দাসের জন্য মনিবের অনুমতি লাগবে। কারণ, এটা সবার জন্য ফরজ নয়। আর নফল কাজ করতে গেলে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়।⁵

টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (১৪৮)।
২. আল-মুগনি (৯/২০২)।
৩. ইলাউস সুনান (১২/৪)।
৪. শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি (১৮৩)।
৫. কোনো কোনো আলিম মনে করেন, এই প্রকারের জিহাদেও অনুমতির দরকার নেই। তারা সাহাবি আবু বাসির, আবু জান্দাল রাজি.-এর ঘটনা দিয়ে দলিল দেন। কিন্তু আমাদের কাছে যেটা অগ্রাধিকারযোগ্য তা উপরে লেখা হয়েছে। এক-দুইজন সাহাবির আমল সকল সাহাবি ও গোটা উম্মাহর আমলের বিপরীতে দলিল হতে পারে না।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ইমাম ওয়াজিব হওয়ার ব্যাখ্যা

📄 ইমাম ওয়াজিব হওয়ার ব্যাখ্যা


ইমাম তহাবির কথার ব্যাখ্যা: ইমাম তহাবির বক্তব্য 'মুসলিম শাসকদের অধীনে—তারা সৎ কিংবা অসৎ হোক—কিয়ামত পর্যন্ত হজ এবং জিহাদ অব্যাহত থাকবে'-এর দুটো অর্থ হতে পারে:
এক. পূর্বের আলোচনার ধারাবাহিকতা। ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, ইমাম তহাবি শাসকদের সঙ্গে মুসলমানদের কর্মপন্থা কী হবে সেটা আলোচনা করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, সৎ হোক অসৎ হোক, জালেম হোক ন্যায়নিষ্ঠ হোক, মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা যাবে না; বরং তাদের শুদ্ধির জন্য দোয়া করতে হবে, সবর করতে হবে। সেই ধারাবাহিকতায় এখানে বলা হচ্ছে, মুসলিম শাসক সৎ হোক অসৎ হোক, তাদের ঝান্ডাতলে জিহাদ করতে হবে। কারণ, তারা মুসলমানদের বৈধ অভিভাবক। ব্যক্তিজীবনে সৎ-অসৎ হলেও দ্বীন ও উম্মাহর সুরক্ষার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। ফলে তারা যখনই জিহাদের ডাক দেবে, মুসলমানদের সে ডাকে সাড়া দেওয়া কর্তব্য। জুলুমের অজুহাতে শাসকের জিহাদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। কারণ, তাতে খোদ দ্বীন ও উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এবং যুগে যুগে সেটা হয়েছেও। শাসক ফাসেক ছিল, জালেম ছিল, কিন্তু জিহাদের ক্ষেত্রেও প্রথম সারিতে ছিল। বর্তমানের শাসকদের মতো তারা জিহাদকে ঘৃণা করত না। যেমন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কথাই ধরা যাক। ইতিহাসের কুখ্যাত জালিমদের একজন তিনি। বড় বড় তাবেয়ি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। অথচ ভারতবর্ষের মুসলমানদের ঈমান কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই মানুষটির কাছেই ঋণী। কারণ, তিনিই বারবার পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও ভারতে সেনা অভিযান পরিচালনা করেছেন। শেষ পর্যন্ত তারই পরামর্শ ও নির্দেশনাতে আমির মুহাম্মাদ বিন কাসিম রাহি. ভারতে ইসলামের বিজয় সূচিত করেন।
তখনকার মুসলিমগণ যদি বলতেন, যেহেতু হাজ্জাজ জালিম, তাই তার অধীনে আমরা জিহাদ করব না, তা হলে কেমন হতো? কেবল খেলাফতের ভিতরে নয়, অন্যান্য ভূখণ্ডের মুসলিমগণও বিদ্যমান শাসকদের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযান, মুহাম্মাদ ঘুরির ভারত বিজয় থেকে শুরু করে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পর্যন্ত ভারতের মুসলিম শাসকগণ কেউ খলিফা ছিলেন না, নিষ্পাপ ছিলেন না; কিন্তু মুসলমানগণ তাদের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। কেউ বলেননি যে, তারা জালিম, তাই তাদের অধীনে যুদ্ধ করব না। তারা ভারতের বড় বড় অঞ্চল ইসলামের জন্য জয় করেছেন। এসব যুদ্ধের অধিকাংশি ইকদামি জিহাদ ছিল। বাংলাতেও ইসলামের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি রাহি.-এর ইকদামি জিহাদের মাধ্যমে।
এভাবে ইকদামি জিহাদ যুগে যুগে ইসলামের আলো গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। মুসলমানগণ যদি কেবল দিফায়ি জিহাদের মাঝে বসে থাকতেন, ইসলাম তা হলে কেবল জাজিরাতুল আরবেই থেকে যেত। এগুলোর পিছনে রাজা-বাদশাহদের কী উদ্দেশ্য ছিল সেটা আল্লাহর কাছে সোপর্দ রইল, কিন্তু এর মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ যে উপকৃত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং পশ্চিমা উপনিবেশের উত্থানের আগ পর্যন্ত জিহাদ মুসলিম শাসকদের কাছে একটি স্বীকৃত দায়িত্ব ছিল এবং শাসকদের অধীনে যুদ্ধ করা তখন একটা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। খারেজিরা ছাড়া আর কেউ এটা অস্বীকার করত না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক শাসকের সঙ্গে তোমাদের উপর জিহাদ ওয়াজিব, চাই সে সৎ হোক বা অসৎ হোক।¹
দুই. জিহাদের জন্য শাসক শর্ত। কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ শাসকের ঝান্ডাতলে থাকবে। সুতরাং জিহাদ করতে হলে শাসকের অনুমতিক্রমে তার নির্দেশনাতে করতে হবে। যদি এ অর্থ ধরা হয়, তবে তা উন্মুক্তভাবে গ্রহণ করা যাবে না; বরং আগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।

টিকাঃ
১. বুখারি (৬৮৩০); বাজ্জার (২৮৬); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩৩৫৩৯)। ২. ফাতহুল বারি (৭/৪৯৪); শরহে মুসলিম, নববি (১২/৭৮)। ৩. মুসতাদরাকে হাকেম (৪৪৮৩); আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (৫/২৭০)। 1. সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৮৫৪৯)। 1. আল-ইসতিজকার, ইবনে আবদুল বার (৫/১৬); আল-আওয়াসিম, ইবনুল উজির (৮/১৮); ইলাউস সুনান (১২/৬৫৭)। 2. শরহে মুসলিম, নববি (১২/২২৯)। 3. নাইলুল আওতার, শাওকানি (৭/২০৮)। 4. গজনবি (১২৯); গুনাইমি (১১০)। 5. তাহজিবুত তাহজিব, ইবনে হাজার (২/২৮৮)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px