📄 জিহাদ ইসলামের চূড়া
জিহাদ ইসলামের চূড়া: জিহাদ ইসলামের প্রথম সারির ইবাদতগুলোর একটি। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। হক ও হক্কানিয়্যাতের দুর্গ সুরক্ষার অতন্দ্র প্রহরী। তাওহিদ, সত্য, ইনসাফ ও ইনসানিয়্যাতের রক্ষাকবচ। সকল নবি-রাসুলের সুন্নাহ ও আদর্শ। যতদিন জিহাদ থাকবে, ততদিন পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন, সত্য ও ন্যায়ের বিজয় অব্যাহত থাকবে। যখন মুসলমানরা জিহাদ ছেড়ে দেবে, আল্লাহ তাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন; জীবন ও জগতের সর্বত্র তারা পরাজিত হবে; আল্লাহর দ্বীনের ঝান্ডা অবনত হয়ে যাবে; শয়তান ও তার অনুসারীদের পতাকা উঁচু হবে; সত্য ও সততা, ন্যায় ও ইনসাফের পরাজয় ঘটবে; পৃথিবীর সর্বত্র বিশৃঙ্খলা বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, জগতের একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো, কেবল মিষ্টি কথা কিংবা সোহাগের মাধ্যমে সকল অন্যায় রোখা সম্ভব নয়। ফলে দুষ্টের দমনে জিহাদের আবশ্যকতা কেবল ধর্মীয় নয়, মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রমাণিত।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মুসলমানদের জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি মুমিনদের সরাসরি জিহাদে নামার নির্দেশ দিয়ে বলেন, انْفِرُوْا خِفَافًا وَثِقَالًا وَ جَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ ذَلِكُمْ খَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ. অর্থ: 'তোমরা বের হয়ে পড়ো স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে। এটি তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা বুঝতে পারো।' [তাওবা: ৪১] জিহাদকে আল্লাহ তায়ালা কল্যাণকর ও লাভজনক সওদা উল্লেখ করে সেটার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيْكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيْمٍ . تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَتُجَاهِدُوْنَ فِي سَبِيْلِ اللهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَاَنْفُসِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ . অর্থ: 'হে মুমিনগণ, আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেবো, যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবনপণ করে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বোঝো।' [সফ: ১০-১১] মুমিনদের প্রাণকে আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। ফলে তাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর পথে তা উৎসর্গ করা। এই পবিত্র সওদা-প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُوْনَ وَيُقْتَلُوْনَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيْلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذُلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ . অর্থ: 'আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহে, অতঃপর মারে ও মরে। তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেনদেনের উপর, যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হলো মহা সাফল্য।' [তাওবা: ১১১] মুজাহিদদের প্রকৃত মুমিন উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, وَالَّذِينَ آمَنُوا وَهָاجَرُوا وَجُهَدُوا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَالَّذِينَ أَوَوْا وَنَصَرُوا أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُوْনَ حَقًّا لَهُمْ مَّগْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ . অর্থ: 'আর যারা ঈমান এনেছে, নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়েছে, আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে এবং যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য-সহায়তা করেছে, তাঁরাই হলো সত্যিকার মুমিন। তাঁদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিক।' [আনফাল: ৭৪] আল্লাহ তাঁর নিজের কাছে মুজাহিদদের মর্তবা উল্লেখ করে বলেন, الَّذِينَ آمَنُوا وَهָاجَرُوا وَجَاهِدُوا فِي سَبِيْلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ * وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ. অর্থ: যারা ঈমান এনেছে, দেশ ত্যাগ করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে, আর তারাই সফলকাম।' [তাওবা: ২০] মুজাহিদদের ভালোবাসা-প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُمْ بُنْيَانٌ مَّরْصُوصٌ. অর্থ: 'আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা সিসাঢালা প্রাচীর।' [সফ: ৪] অন্যত্র বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ . অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরেই আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনীত হবে এবং কাফেরদের প্রতি দুর্বিনীত হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কার ভয় পাবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী।' [মায়িদা: ৫৪] পৃথিবীর মাজলুম মানুষের সুরক্ষার জন্য মুসলমানদের আল্লাহ ডেকে বলেন, وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَّনَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا. অর্থ: 'তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এই অত্যাচারী জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান করুন। আর আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন। আর একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দিন।' [নিসা: ৭৫] এটি কুরআনের একটি মহা মাহাত্ম্যপূর্ণ আয়াত, যা পৃথিবীর সব ভূখণ্ডের সকল মুসলিমকে এক পরিবারের মতো বানিয়ে দিয়েছে; সবার দায়িত্ব সবার কাঁধে বণ্টন করে দিয়েছে। এ আয়াতের আলোকে ফিলিস্তিন কিংবা সিরিয়ার একটি মুসলিম শিশুকে সুরক্ষার দায়িত্ব বর্তাবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের মুসলমানদের উপর; উইঘর, কাশ্মীর কিংবা আরাকানের এক বোনকে সুরক্ষার দায়িত্ব যাবে সৌদি আরব, মিশর ও মরক্কোর মুসলমান ভাইদের কাঁধে। কারণ, গোটা পৃথিবী মুসলমানদের। ভৌগোলিক, জাতিগত ও ভাষাগত সীমাবদ্ধতা জাহেলিয়্যাতের প্রাচীর। মুসলমানদের এগুলো আলাদা করতে পারে না।
জিহাদের শ্রেষ্ঠত্ব, মুজাহিদদের মর্যাদা, কিতালের গুরুত্ব, জিহাদ ও কিতালের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এত অধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণিত হয়েছে যে, সেগুলো উল্লেখ করতে গেলে কয়েক খণ্ডের বই হয়ে যাবে। আমরা তাই এখানে মাত্র কয়েকটা হাদিস উল্লেখ করছি, যাতে মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে সমানভাবে বিদ্যমান জিহাদফোবিয়ার এই যুগে জিহাদের শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠে।
* মুআজ ইবনে জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া হলো আল্লাহর পথে জিহাদ করা।'¹
* আবু হুরাইরা রাজি. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন যা জিহাদের সমপর্যায়ের।' রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'এমন আমল নেই। একজন মুজাহিদ আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়ার পরে তুমি কি পারবে মসজিদে গিয়ে কোনোরকম বিশ্রাম ছাড়া একটানা নামাজ পড়তে এবং ভাঙা ছাড়া একটানা রোজা রাখতে?' তখন সে বলল, 'এটা কে পারবে?' আবু হুরাইরা বলেন, 'মুজাহিদের বাঁধা ঘোড়া যখন একটু হাঁটাহাঁটি করে, এর বিনিময়েও তার পুণ্য লেখা হতে থাকে।'²
* আরেক হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনবে, নামাজ কায়েম করবে, রমজানের রোজা রাখবে, তাকে আল্লাহ নিজ দায়িত্বে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, চাই সে আল্লাহর পথে জিহাদ করুক, অথবা নিজের জন্মভূমিতে বসে থাকুক।' তখন সাহাবারা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, তা হলে আমরা কি মানুষকে এ ব্যাপারে সুসংবাদ দেবো না?' তিনি বললেন, 'জান্নাতের একশোটি স্তর রয়েছে। আল্লাহ সেগুলো তার পথে জিহাদকারীদের জন্য প্রস্তুত করেছেন। দুটি স্তরের মাঝে দূরত্ব আকাশ ও মাটির ব্যবধান পরিমাণ। যখন তোমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করো, তখন ফিরদাউস প্রার্থনা করো। কেননা সেটা মধ্যবর্তী এবং সর্বোচ্চ জান্নাত। আর তার উপরে রয়েছে আল্লাহর আরশ।'³
* আনাস ইবনে মালেক থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর পথে এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যা কাটানো গোটা দুনিয়া এবং এর মাঝে যা-কিছু রয়েছে, তারচেয়ে উত্তম।'⁴
* আরেকটি হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এত নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন যে, মৃত্যুর পরে পুরা দুনিয়া দিয়ে দেওয়া হলেও কেউ দুনিয়াতে ফেরত আসতে চাইবে না। তবে শহিদ এর ব্যতিক্রম। কারণ, শাহাদাতের মর্যাদা এত বেশি যে, শহিদ জান্নাতে থেকেও পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে এসে আবার শহিদ হতে চাইবে।'⁵
* আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি, 'যদি মুমিনদের একটি দল না থাকত, যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে চায়, কিন্তু আমি তাদের বাহন দিতে পারি না (ফলে তারা অংশগ্রহণ করতে পারে না), তবে আমি আল্লাহর পথে জিহাদকারী কোনো দলের সঙ্গে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতাম না। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তো চাই যে, আমি আল্লাহর পথে শহিদ হব, আবার জীবিত হব; আবার শহিদ হব, আবার জীবিত হব; আবার শহিদ হব, আবার জীবিত হব, আবার শহিদ হব।'⁶
* অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে বান্দার দুই পা আল্লাহর পথের ধুলোয় ধূসরিত হয়, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।'⁷
* জিহাদে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ঘোড়াও আল্লাহর কাছে সম্মানিত প্রাণী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ঘোড়ার কপালের কেশগুচ্ছে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ রাখা হয়েছে।'⁸ এই হাদিসের মাধ্যমে এটাও বোঝা যায়, আল্লাহর বান্দারা কিয়ামত পর্যন্ত যুদ্ধে ঘোড়া ব্যবহার করবেন। আর জিহাদও কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
* জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাজি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একটি দল সত্যের পথে যুদ্ধ করে বিজয়ী থাকবে।'⁹
* জিহাদ পরিত্যাগ করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যখন তোমরা সুদভিত্তিক লেনদেন করবে, গরুর লেজ ধরে চাষাবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, জিহাদ পরিত্যাগ করবে, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর এমন লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেবেন, যা থেকে পরিত্রাণ পাবে না, যতক্ষণ না তোমাদের দ্বীনের পথে ফিরে আসবে।'¹⁰
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (২২৪৭৫); আল মুজামুল কাবির (৭৮৮৫)।
২. বুখারি (২৭৮৫); সুনানে কুবরা, নাসায়ি (৪৩২১)।
৩. বুখারি (২৭৯০); বাজ্জার (৮৭১১); ইবনে হিব্বান (৪৬১১)।
৪. বুখারি (২৭৯২); মুসলিম (১৮৮০)।
৫. বুখারি (২৭৯৫); তিরমিজি (১৬৪৩)।
৬. বুখারি (২৭৮২, ৭২২৭); মুসনাদে হুমাইদি (১০৭০); বাজ্জার (৭৬৭০)।
৭. বুখারি (২৮১১); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৮৫৮৬)।
৮. বুখারি (২৮৪৯); মুসলিম (৯৮৭, ১৮৭১)।
৯. মুসলিম (১৯২৩); আবু দাউদ (২৪৮৪)।
১০. আবু দাউদ (৩৪৬২); বাজ্জার (৫৮৮৭)।
📄 জিহাদের অর্থ ও প্রকারভেদ
জিহাদের অর্থ ও প্রকারভেদ: জিহাদ শব্দের শাব্দিক অর্থ শ্রম দেওয়া, চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যয় করা, সংগ্রাম করা। আল্লাহর পথে ব্যয়িত সব ধরনের সংগ্রাম ও কষ্ট-ক্লেশকে জিহাদ বলা হয়। সে হিসেবে জিহাদের অর্থ বেশ ব্যাপক এবং প্রকারভেদও অনেক। আল্লাহ ও বান্দার মাঝে যা-কিছু অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, সেসব লঙ্ঘন করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার নামই জিহাদ। সুতরাং নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের নাম জিহাদ, শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নাম জিহাদ, দ্বীনের জন্য সম্পদ ব্যয় করা জিহাদ, ইলমের মাধ্যমে ইসলামের দুশমনকে পরাজিত করা জিহাদ, দ্বীনের জন্য মুখে সংগ্রাম করা জিহাদ, লেখালিখি করা জিহাদ, কাফেরদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে যুদ্ধ করা জিহাদ। আর এ কারণে জিহাদের অর্থের ক্ষেত্রে সালাফের একেক রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। বস্তুত জিহাদ এই সবগুলো অর্থকেই ধারণ করে।¹
সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একেক জিহাদের গুরুত্ব ও মান একেক রকম। বরং ব্যক্তিভেদেও জিহাদের বিধান ও গুরুত্ব ভিন্ন ভিন্ন হবে। কখনও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ গুরুত্বপূর্ণ; বরং এটা অন্যান্য জিহাদের উপক্রমণিকা। কারও আত্মা যদি বিশুদ্ধ ও সুস্থ না থাকে, প্রবৃত্তি যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে সে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কীভাবে? তাই হালাল-হারাম মেনে চলা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে আপ্রাণ চেষ্টা করাও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।² এ কারণে ইবনে মাসউদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বোত্তম আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, সময়মতো নামাজ আদায় করা, মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ করা। তৃতীয় পর্যায়ে বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা।³ ইবনে মাসউদ নামাজে অবহেলা করতেন, কিংবা মাতা-পিতার অবাধ্য ছিলেন, তাই তাকে এমন বলেছেন—এ ধরনের ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট গলদ। বরং অন্যান্য আমলও যে গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝানো উদ্দেশ্য। যে ঠিক মতো নামাজ পড়ে না, মাতা-পিতার সঙ্গে সদাচরণ করে না, সে কীভাবে তরবারির জিহাদ করবে, কিংবা তার সে জিহাদের কী মূল্য? তা ছাড়া জিহাদের জন্য নামাজ আসেনি, বরং নামাজ প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ এসেছে। ফলে নামাজ লক্ষ্য, জিহাদ উপলক্ষ্য। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রাহি. লিখেছেন, জিহাদের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি প্রকার হচ্ছে মানুষের জাহির ও বাতিন সংশোধন করা। এটাই সকল নবির কাজ।⁴
কখনও আবার কেবল মুখ ও কলমের জিহাদই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকে বলেন, فَلَا تُطِعِ الْكَفِرِيْنَ وَ جَاهِدْهُمْ بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا. অর্থ: ‘আর আপনি কাফেরদের আনুগত্য করবেন না, বরং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর জিহাদ করুন।’ [ফুরকান: ৫২] এখানে জিহাদ বলতে দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে কাফেরদের পরাজিত করা উদ্দেশ্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলা।⁵
কিন্তু যখন স্বাভাবিকভাবে জিহাদ শব্দটা ব্যবহার করা হবে, তখন এর দ্বারা তরবারির জিহাদই উদ্দেশ্য হবে। কারণ, সকল প্রকারের জিহাদের মাঝে তরবারির জিহাদ সর্বোত্তম। এতে অন্য সব ধরনের কুরবানি অন্তর্ভুক্ত; বরং জগতের সর্বাপেক্ষা প্রিয় জীবনটাই এখানে বাজি ধরা হয়। দুর্গম পাহাড়ে কিংবা বিজন মরুভূমিতে দুশমনের বিধ্বংসী ড্রোনের জন্য অপেক্ষমাণ মুজাহিদ, আর নিজ ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের পাশে গায়ে কম্বল জড়িয়ে কলম কিংবা কী-বোর্ড চাপা মুজাহিদ সমান হতে পারে না।
টিকাঃ
১. বাদায়েউস সানায়ে (৭/৯৭)।
২. ফাতহুল বারি (১১/৩৩৮); আহসানুল ফাতাওয়া (১/৫৫০)।
৩. বুখারি (২৭৮২)।
৪. আত-তাফহিমাত (২/১০৩)।
৫. আবু দাউদ (৪৩৩৫); তিরমিজি (২৩৪৬)।
📄 জিহাদের বিধান
জিহাদের বিধান: পূর্বে আমরা যেমনটা বলেছি, আল্লাহ তায়ালা জিহাদ তথা কিতালের বিধান দিয়েছেন প্রয়োজন-সাপেক্ষে। অর্থাৎ দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণে জিহাদ একটি হাতিয়ার, দ্বীন জিহাদের হাতিয়ার নয়। ইমাম আবু হানিফা রাহি. বলেন, জিহাদ মুসলমানদের উপর ওয়াজিব... যখন প্রয়োজন।¹ তাই জিহাদ মানুষের প্রাণ রক্ষার জন্য বৈধ করা হয়েছে, ধ্বংসের জন্য নয়। কারণ, হত্যা ও রক্তপাত মৌলিকভাবে আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। আল্লাহ বলেন, مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّهَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا. অর্থ: 'যে ব্যক্তি হত্যার বিনিময় (কিসাস) কিংবা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ব্যতীত একটি প্রাণকে হত্যা করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একটি প্রাণকে বাঁচাল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচাল। [মায়িদা: ৩২] তবে দ্বীন জীবনের চেয়ে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টি করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেনই তার দাসত্বের জন্য। ফলে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা মানবজীবনের প্রথম উদ্দেশ্য। দ্বীন ব্যতীত মানবজীবন অর্থহীন। ফলে এই দ্বীন প্রতিষ্ঠার সামনে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধে অপরাধী হবে। আর কিছু প্রাণের জন্য যেহেতু দ্বীন নষ্ট হতে পারে না, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে না, তাই বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থ বলি দেওয়া হবে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের হত্যা করা হবে। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, 'আমি মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসুল, আর নামাজ আদায় করে, জাকাত প্রদান করে। যখন তারা এগুলো করবে, তাদের রক্ত ও সম্পদ আমার থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। তবে ইসলামের কোনো হক থাকলে ভিন্ন কথা। আর তাদের অন্তরের হিসাব থাকবে আল্লাহর উপর।'²
উপরের আলোচনায় স্পষ্ট যে, জিহাদ আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ও এ দ্বীনের অনুসারীদের সুরক্ষার হাতিয়ার। এ কারণে জিহাদের বিধানকে উলামায়ে কেরাম মৌলিকভাবে ফরজে কিফায়াহ বলেন। অর্থাৎ উম্মাহর সবার জিহাদ করতে হবে না। বরং একদল করলে গোটা উম্মাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে।³ এটা তখনকার বিধান, যখন মুসলিম রাষ্ট্র ও মুসলিমরা শক্তিশালী থাকবে। এ অবস্থায় খলিফা প্রতি বছর একবার বা দুইবার মুজাহিদদের কিছু দল দুশমনের বিরুদ্ধে পাঠাবেন। তারা পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে আল্লাহর দ্বীনের পতাকা বুলন্দ করবেন। দুশমনদের অন্তরে ইসলামের সম্ভ্রম ও মুসলিমদের প্রভাব ছড়িয়ে দেবেন, তাদের আতঙ্কিত ও ভীত-সন্ত্রস্ত রাখবেন। মুসলমানরা তাদের দ্বীন কিংবা দায়িত্ব থেকে গাফিল নয় এটা বুঝিয়ে দেবেন। পরিভাষায় এটাকে জিহাদুত তলব/জিহাদুল ফাতহ/ইকদামি বা আক্রমণাত্মক জিহাদ বলা হয়।⁴ এ ধরনের জিহাদে হত্যা কিংবা যুদ্ধই মুখ্য নয়, বরং শত্রুকে তিনটি প্রস্তাব দেওয়া হবে: এক. ইসলামের দাওয়াত। দুই. ইসলাম অস্বীকার করলে জিজইয়ার মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার। তিন. প্রথম দুটো প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধ। ইবনে আব্বাস রাজি. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সম্প্রদায়কে ইসলামের দিকে ডাকার আগে যুদ্ধ করেননি।⁵ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এখানে মুখ্য হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন, যুদ্ধ নয়। তাই এমন সাধারণ অবস্থায় সকল মুসলিমের উপর এমন জিহাদ ফরজ নয়। বরং দু-একটা দল যদি আদায় করে, তবে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর যদি কেউ আদায় না করে, তবে সবাই গুনাহগার হবে।⁶
দুশমনরা যত ভয়ংকর ও আগ্রাসী হয়ে উঠবে, ধীরে ধীরে জিহাদের পরিসর তত বিস্তৃত হবে। অর্থাৎ পূর্ণ নিরাপত্তার সময় কেবল দু-একটি দলের পক্ষ থেকে জিহাদ করলেই হয়ে যাবে। কিন্তু যখন কোনো ভূখণ্ডের মুসলিম সীমানা আক্রান্ত হবে এবং সেখানের মুসলমানদের পক্ষে শত্রুর মোকাবিলা করা সম্ভব না হবে, তখন আশেপাশের মুসলমানদের উপর তাদের সহায়তা করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। কারণ, তখন একটি দলের মাধ্যমে উদ্দেশ্য পূর্ণ হচ্ছে না। ফলে অন্যদের উপরও ধীরে ধীরে ফরজ হতে থাকবে। এটাকে পরিভাষায় জিহাদুদ দিফা বা প্রতিরক্ষামূলক জিহাদ বলা হয়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত সীমানা এবং তার আশেপাশের লোকদের উপর জিহাদ ফরজে আইন (তথা সবার উপর ফরজ) হয়ে পড়বে। আর যারা তুলনামূলক দূরে থাকবে, তাদের উপর তখনও ফরজে কিফায়াহ হিসেবে বিবেচিত হবে। লড়াইয়ের পরিধি যত বৃদ্ধি পাবে, ফরজে কিফায়াহ থেকে ফরজে আইনের পরিধিও বিস্তৃত হবে। ফলে যদি পুরো উম্মাহ আক্রান্ত হয়, তবে গোটা উম্মাহর প্রত্যেকের উপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যাবে। আর কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে শত্রু আক্রমণ করলে সেখানের নারী-পুরুষ প্রত্যেকের উপর জিহাদ ফরজ হয়ে যায়। তখন ইমাম (শাসক) সবাইকে জিহাদের জন্য ডাক দেন। এটাকে বলা হয় ‘নাফিরে আম’। এটা জিহাদের চূড়ান্ত অবস্থা। এমন অবস্থায় শাসকের অনুমতি থাকা জরুরি নয়, বরং শাসক থাকাও জরুরি নয়। কেউ কারও অনুমতি নেওয়া জরুরি নয়; বরং যে যেভাবে পারবে শত্রুকে প্রতিহত করবে।⁷
টিকাঃ
১. শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি (১৮৭)।
২. বুখারি (২৫); মুসলিম (২২); দারাকুতনি (৮৯৮)।
৩. শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি (১৮৯); আল-মুগনি, ইবনে কুদামা (৯/১৯৬)।
৪. দেখুন: আল-হাবিল কাবির, মাওয়ারদি (১৪/১১২-১১৩)।
৫. মুসনাদে আহমদ (২০৮১); আল মুজামুল কাবির, তাবারানি (১১১৫৯)।
৬. বাদায়েউস সানায়ে (৭/৯৭)।
৭. তাফসিরে কুরতুবি (৩/৩৮); হিদায়া (২/৩৭৮); আহকামুল কুরআন, জাসসাস (৪/৩১২); তাতারখানিয়া (৭/৮-৯); ফাতহুল বারি (৬/৩৭); আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ইবনে তাইমিয়া (৫/৫৩৮); রদ্দুল মুহতার (৪/১২২-১২৪); ইলাউস সুনান (১২/১১)।
📄 জিহাদের জন্য কি শাসক শর্ত?
জিহাদের জন্য কি শাসক শর্ত?: জিহাদ এলোপাতাড়ি হত্যা, রাহাজানি, খুন কিংবা বিশৃঙ্খলার নাম নয়; বরং এটা ইসলামি শরিয়াহর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাময় ইবাদত। ফলে এটা বাস্তবায়নের জন্য বেশকিছু শর্ত রয়েছে:
এক. নিয়ত ও উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ করা। অর্থাৎ জিহাদ একমাত্র আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দ্বীনের কালিমা বুলন্দ করার জন্য হতে হবে। পার্থিব কোনো স্বার্থে জিহাদ করলে সেটা আল্লাহর পথের জিহাদ হবে না। পরকালে এমন মুজাহিদের জন্য পুণ্য নেই, শাস্তি রয়েছে। কারণ, আল্লাহর পথে জিহাদ না হলে সেটা অনর্থক মারামারি ও রক্তপাতে পরিণত হবে। সেক্ষেত্রে মুসলিমের জিহাদ আর অমুসলিমের সন্ত্রাসবাদের মাঝে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
দুই. মুজাহিদদের মাঝে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য ব্যক্তিগত পর্যায়ের শর্তগুলো বিদ্যমান থাকা। যেমন বালেগ হওয়া, সুস্থ ও সমর্থ হওয়া, মাতা-পিতার অনুমতি থাকা ইত্যাদি।
তিন. ইমামের তত্ত্বাবধানে জিহাদ করা। ইমাম ছাড়া জিহাদ বৈধ নয়। কারণ, ইমাম ছাড়া জিহাদ বিশৃঙ্খলার পথ উন্মুক্ত করে, মুসলমানদের মাঝে ফিতনার দরজা খুলে দেয়। যার যখন ইচ্ছা, যার বিরুদ্ধে ইচ্ছা যুদ্ধের ডাক দেবে, তাদের লোকালয়ে গিয়ে তরবারি চালাবে; এ কারণে জিহাদের ডাক দেবেন খলিফা বা তার নির্ধারিত প্রতিনিধি। তারা জিহাদের আয়োজন করবেন, নেতৃত্ব দেবেন।
প্রশ্ন হলো, সকল জিহাদে কি ইমামের অনুমতি প্রয়োজন? অনেক আলিম জিহাদের ক্ষেত্রে ইমামের অনুমতির শর্ত নিয়ে অতিরঞ্জন করেন। ফলে তারা ইমাম ছাড়া কোনো প্রকারের জিহাদ কল্পনা করতে পারেন না।¹ এটা গলদ। আবার অনেকে ইমামের শর্তকে একেবারে মূল্যহীন মনে করেন। ফলে তাদের দৃষ্টিতে কোনো জিহাদেই কোনো ইমাম বা অনুমতি দরকার নেই; এটাও গলদ।
হক উভয় মতাদর্শের মাঝামাঝি। অর্থাৎ উপরে জিহাদের যেসব প্রকারভেদ উল্লেখ করা হয়েছে, সবগুলোর বিধান ও শর্ত অভিন্ন নয়। বরং প্রকারভেদ হিসেবে শর্ত ও বিধান ভিন্ন। মুহাক্কিক আলিমদের মতে, জিহাদুত তলব তথা আক্রমণাত্মক জিহাদে ইমামের অনুমতি থাকা প্রয়োজন। যদিও কুরআন-সুন্নাহে এ প্রকারের জিহাদের মাঝে সরাসরি ইমামের শর্তের উপস্থিতি পাওয়া যায় না, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশেদিনের ইতিহাস দেখলে সুস্পষ্ট যে, খলিফার পরামর্শ, প্রস্তুতি ও অনুমতি ছাড়া আক্রমণাত্মক জিহাদ হতো না। বরং খলিফাই ঠিক করতেন মুজাহিদদের কোথায় পাঠানো হবে, কখন পাঠানো হবে, কতজন পাঠানো হবে। দু-একজন সাহাবির ব্যতিক্রম কিছু ঘটনা থাকলেও রাসুলুল্লাহর গোটা জীবন, সকল সাহাবার সচরাচর আমল বাদ দিয়ে দু-একটা ঘটনা দলিলযোগ্য নয়। আর দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হলেও উত্তম কিংবা সাধারণ আমল বলা সম্ভব নয়। কারণ, এগুলো পরবর্তী সময়ে যে বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে না, সেটা বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ পাশের রাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কোনো মাসলাহাতের কারণে ইমাম ‘আহদ’ তথা কোনো একটা চুক্তি করেছেন; আর চুক্তির ক্ষেত্রে ইসলামের সরল ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে চুক্তি রক্ষা করতে হবে। সুতরাং তাদের উপর হুট করে চোরাগুপ্তা আক্রমণ করা যাবে না। এখন যদি এ ধরনের জিহাদে ইমামের অনুমতির শর্ত না রাখা হয়, যে-কেউ গিয়ে চুক্তিবদ্ধ পক্ষের উপর আক্রমণ করবে, যা মুসলমানদের পক্ষ থেকে গাদ্দারি হিসেবে বিবেচিত হবে। মোট কথা, এ প্রকারের জিহাদে ইমামের অনুমতি ও ইমামের পরামর্শের প্রয়োজন হবে।
ইবনে কুদামা রাহি. লিখেন, জিহাদ ইমাম এবং তার ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল।² জফর আহমদ উসমানি রাহি. ইলাউস সুনানে লিখেছেন, ‘জিহাদের জন্য ইমাম শর্ত। যদি মুসলমানদের ইমাম না থাকে, তবে ‘উজলাহ’ তথা নিঃসঙ্গতা অবলম্বন করবে। বিষয়টি... হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত। সুতরাং যদি মুসলমানদের ইমাম না থাকে, তবে জিহাদ নেই...।³ কেবল ইমাম নয়, সন্তানের জন্য মাতা-পিতার অনুমতি লাগবে। ইমাম মুহাম্মাদ রাহি. লিখেন, মাতা-পিতার অনুমতি ছাড়া জিহাদে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, মাতা-পিতার আনুগত্য ফরজে আইন।⁴ স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি লাগবে; দাসের জন্য মনিবের অনুমতি লাগবে। কারণ, এটা সবার জন্য ফরজ নয়। আর নফল কাজ করতে গেলে অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়।⁵
টিকাঃ
১. সালেহ ফাওজান (১৪৮)।
২. আল-মুগনি (৯/২০২)।
৩. ইলাউস সুনান (১২/৪)।
৪. শরহুস সিয়ারিল কাবির, সারাখসি (১৮৩)।
৫. কোনো কোনো আলিম মনে করেন, এই প্রকারের জিহাদেও অনুমতির দরকার নেই। তারা সাহাবি আবু বাসির, আবু জান্দাল রাজি.-এর ঘটনা দিয়ে দলিল দেন। কিন্তু আমাদের কাছে যেটা অগ্রাধিকারযোগ্য তা উপরে লেখা হয়েছে। এক-দুইজন সাহাবির আমল সকল সাহাবি ও গোটা উম্মাহর আমলের বিপরীতে দলিল হতে পারে না।