📄 মোজার উপর মাসাহ্ আহলে সুন্নাতের নিদর্শন
এটি একটি ফিকহি মাসআলা, তথাপি আহলে সুন্নাতের আকিদার অধিকাংশ গ্রন্থেই মাসআলাটি আলোচিত হয়। কারণ, কিছু বিভ্রান্ত সম্প্রদায় এটাকে অস্বীকার করে; অথচ এটা মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাদের খণ্ডনের লক্ষ্যে এবং তাদের বিভ্রান্তি থেকে আহলে সুন্নাতকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে ইমামগণ আকিদার কিতাবে এটা নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। ফলে এটা ফিকহি মাসআলা হওয়া সত্ত্বেও আহলে সুন্নাত ও আহলে বিদআতের আকিদার পরিচয়নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। যারা এটাকে স্বীকার করবে, তারা আহলে সুন্নাত; যারা অস্বীকার করবে, তারা আহলে বিদআত।
যেসব সম্প্রদায় মোজার উপর মাসাহ অস্বীকার করে, তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খারেজি ও শিয়া-রাফেজি সম্প্রদায়।¹ তারা বলে, মোজার উপর মাসাহ করার সুযোগ নেই; শরিয়তে এমন কিছু আসেনি; বরং পায়ের উপর মাসাহ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় অস্বীকার করে তারা কয়েকটি বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়: এক. মোজার উপর মাসাহ-সংক্রান্ত একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস (যা মুতাওয়াতির তথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত) অস্বীকার করে। দুই. ওজুতে পা ধোয়াসংক্রান্ত আয়াতের অপব্যাখ্যা করে পা মাসাহ করার কথা বলে। তিন. যেসব সাহাবি মোজার উপর মাসাহ করেছেন, সেগুলোকে পা মাসাহের কথা বলে চালিয়ে দেয়। চার. সেসব সাহাবির হাদিস দিয়ে দলিল দেয়, যারা প্রথমে না জানার কারণে পা মাসাহের কথা বলেছেন। পরবর্তী সময়ে তারাও পা ধৌত করেন। পাঁচ, ওজুতে পা ধোয়ার বদলে মাসাহ করে। এভাবে তারা সুন্নাত ছেড়ে দিয়ে বিদআতে লিপ্ত হয়েছে।
আহলে সুন্নাতের সকল ধারার আলিমদের মতে, পা ধোয়া এবং মাসাহ করতে চাইলে মোজার উপর মাসাহ করা (সরাসরি পায়ের উপর নয়) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। হাসান বসরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি সত্তরজন সাহাবিকে পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকেই মোজার উপর মাসাহ করতেন। আবু বকর, উমর, উসমান, আলি, আহলে বদর, আহলে হুদাইবিয়াহ, অন্যান্য মুহাজির ও আনসার—সবাই মোজার উপর মাসাহ করতেন।'¹ ইমাম কারখি বলেন, 'যে ব্যক্তি মোজার উপর মাসাহ অস্বীকার করে, তার ব্যাপারে আমার কুফরের ভয় হয়।'²
তারা আরবি ব্যাকরণকে ঢাল বানিয়ে এবং সালাফের কিছু মানুষের বক্তব্য দিয়ে তাদের মতামতকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَ امْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ. অর্থ: 'হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হও, তখন স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত করো। মাথা মাসাহ করো, আর পদযুগল (ধৌত করো) গোড়ালি-সহ।' [মায়িদা: ৬] উক্ত আয়াতে পা ধোয়ার কথা মাথা মাসাহের পরে এসেছে। امْسَحُوا بِرُءُوْসِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ। কিন্তু পায়ের ক্ষেত্রে 'ধোয়া' শব্দটি উচ্চারণ করা হয়নি, প্রয়োজনও নেই। কারণ, সেটার 'আতফ' হবে মুখমণ্ডল ও হাতের উপর, মাথার উপর নয়। দু-একজন বাদে সকল সাহাবি ও তাবেয়ি-সহ সকল মুসলমান কুরআনের আয়াতটিকে এভাবে পড়েছেন এবং ওজুতে পা ধোয়া বুঝেছেন। সাহাবায়ে কেরাম ওজু, মোজার উপর মাসাহ ইত্যাদি বিষয় নিজেরা নিজেরা কুরআন-হাদিস পড়ে কিংবা আরবি ব্যাকরণের নিয়ম ধরে শেখেননি। কারও কাছ থেকে শুনে শেখেননি; বরং তারা আল্লাহর রাসুলকে বছরের পর বছর ওজু করতে দেখেছেন। তাকে মুখ, হাত ও পা ধুতে এবং মাথা মাসাহ করতে দেখেছেন। দেখে দেখে শিখেছেন। একাধিক সাহাবি থেকে হাদিসে এসেছে, 'আমি কি তোমাদের সেভাবে ওজু করে দেখাব না যেভাবে আমি রাসুলুল্লাহকে ওজু করতে দেখেছি?' কিংবা 'এটা রাসুলুল্লাহর ওজু।'
হ্যাঁ, ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন 'আমি কুরআনে দেখি দুটো অঙ্গ ধোয়া (মুখ ও হাত) এবং দুটো অঙ্গ মাসাহ (মাথা ও পা)-এর কথা।' কারণ, তিনি 'পা'কে মাথার উপর 'আতফ' করতেন। কিন্তু সেটা বাস্তবতা না জানার ফলে। যখন জানতে পারেন, তখন তিনি অন্যদের মতো পা ধোয়ার কথা বলেন। বরং সহিহ বুখারিতে খোদ তাঁর ওজুর কথা এসেছে। তিনি দুই পা ধুয়ে বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে এভাবে ওজু করতে দেখেছি।³ একইভাবে আনাস, রিফায়াহ প্রমুখ সাহাবি থেকেও পা মাসাহের কথা এসেছে। কিন্তু সেগুলোতে তখনকার, যখন তারা ধোয়ার কথা জানতেন না। পরবর্তীকালে তারা মত পরিবর্তন করে ধোয়ার কথা বলেন।⁴ আলি রাজি. এবং অন্যান্য সাহাবি থেকে পা মাসাহের যেসব বর্ণনা এসেছে, সেটা ধোয়ার বদলে, সরাসরি পা মাসাহ নয়। বরং মোজার উপর মাসাহ। যারা ওজুতে পা না ধুয়ে মাসাহ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পায়ের গোড়ালিকে জাহান্নাম থেকে সতর্ক করেছেন।⁶ ফলে ওজুতে পা না ধুয়ে মাসাহ করা সাহাবা ও মুসলমানদের ইজমার খিলাফ।⁷ কাসানি (৫৮৭ হি.) লিখেন, সকল সাহাবা ও ফকিহের কাছে মোজার উপর মাসাহ জায়েজ। ইবনে আব্বাস থেকে সামান্য ব্যতিক্রম বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এটা রাফেজিদের মাজহাবে পরিণত হয়েছে।⁸
শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার লিখেন, মুতাওয়াতির সূত্রে রাসুলুল্লাহর ওজুর বর্ণনা পাওয়া যায়। তাতে স্পষ্ট যে, তিনি তার দুই পা ধৌত করেছেন। একজন সাহাবি থেকেও এর বিপরীত বর্ণনা প্রমাণিত নয়। হ্যাঁ আলি, ইবনে আব্বাস, আনাস—এই তিনজন থেকে বিপরীত (পা মাসাহের) বর্ণনা এসেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা তাদের মত পরিবর্তন করে সকল সাহাবার মতো মত দিয়েছেন। আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা বলেন, রাসুলুল্লাহর সাহাবাগণ পা ধোয়ার ব্যাপারে একমত ছিলেন। ইমাম তহাবি ও ইবনে হাজাম রাহি. মনে করেন, প্রথমে মাসাহ বৈধ ছিল। পরবর্তীকালে সেটা মানসুখ (রহিত) হয়ে যায়।⁹ সুতরাং পা ধোয়া অপরিহার্য। মাসাহ করতে হলে সরাসরি পা মাসাহ নয়, বরং মোজার উপর মাসাহ করতে হবে।
টিকাঃ
১. আস-সুন্নাহ, মারওয়াজি (১০৩)।
২. গজনবি (১৩৩)।
৩. বুখারি (১৪০)।
৪. বিস্তারিত দেখুন: শরহুল মুহাজ্জাব, নববি (১/৪২১)।
৫. ইবনে মাজা (৪৬০); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৪১১)।
৬. বুখারি (৬০, ১৬৩); মুসলিম (২৪১)।
৭. শরহুল মুহাজ্জাব (১/৪১৭)।
৮. বাদায়েউস সানায়ে (১/৭)।
৯. ফাতহুল বারি (১/২৬৬)।