📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও শত্রুতা

📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও শত্রুতা


মহব্বত তথা ভালোবাসা প্রাকৃতিক বিষয়। আল্লাহ তায়ালা কেবল মানুষ নয়, পৃথিবীর সকল সৃষ্টির হৃদয়ে ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন। এই ভালোবাসা ও হৃদ্যতার উপরই পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে। যদি সৃষ্টির ভিতরে পারস্পারিক ভালোবাসা না থাকত, তবে সর্বত্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো, পৃথিবীতে সৃষ্টির বিকাশ ব্যাহত হতো। ভালোবাসা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন: প্রাকৃতিক ভালোবাসা। এগুলোতে মৌলিকভাবে পাপ-পুণ্য নেই। পণ্যের জায়গাতে ব্যবহার করলে পুণ্য, পাপের ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে পাপ। যেমন: সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা, বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন ও অন্য আত্মীয়দের পারস্পরিক ভালোবাসা। এগুলো আল্লাহর জন্য হলে তাতে পুণ্য আছে, কিন্তু অপাত্রে হলে তাতে পাপও রয়েছে। একইভাবে জাগতিক বিভিন্ন বিষয়, যেমন: খাবার, পোশাক, স্থান ও সময়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা; এগুলোও ভালো হলে তাতে পুণ্য রয়েছে, খারাপ হলে তাতে পাপ রয়েছে।
তবে এসব ভালোবাসা প্রাকৃতিক ও বৈষয়িক। মানুষের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির তাতে বেশ প্রভাব রয়েছে। ফলে এগুলো কখনও স্বার্থপূর্ণ, আবার কখনও নিঃস্বার্থ হয়ে থাকে। তাই এটা সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা নয়। বরং সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা হচ্ছে আল্লাহকে ভালোবাসা। যে সত্তা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্বে এনেছেন, আপনাকে সুন্দর রূপ ও দেহাবয়ব দিয়েছেন, হাজারও অনুগ্রহে আপনার জীবন সমৃদ্ধ করেছেন, প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি মুহূর্তে আপনি যার মুখাপেক্ষী, যিনি আপনাকে সুরক্ষিত রাখেন, আপনার সকল প্রয়োজন পূর্ণ করেন, তিনি আপনার ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। ফলে প্রত্যেক মুমিনের জন্য আল্লাহকে ভালোবাসা অপরিহার্য। এই ভালোবাসা জগতের সকল ভালোবাসার উর্ধ্বে। এই ভালোবাসার সামনে জগতের সবার ভালোবাসা, সকল ভালোবাসা ম্লান। কুরআনে আল্লাহর ভালোবাসাকে ঈমান ও কুফরের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّتَّখِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّوْنَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ অর্থ: 'আর এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনই ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।' [বাকারা: ১৬৫] মুমিনদের এই ভালোবাসার কারণে আল্লাহ তাদেরও ভালোবাসেন, মহব্বত করেন। পরকালে তিনি তাদের জান্নাত দান করবেন। দিদারের সৌভাগ্য ও সুযোগ দেবেন। বিপরীতে কাফেররা যেসব মূর্তি ও ব্যক্তিকে ভালোবাসে, যাদের পূজা করে, কিয়ামতের দিন সবাই তাদের অস্বীকার করবে। আল্লাহ বলেন, وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوْا بِعِبَادَتِهِمْ كَفِرِينَ. অর্থ: 'যখন মানুষকে হাশরে একত্র করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে।' [আহকাফ: ৬] অন্য আয়াতে বলেন, وَقَالَ إِنَّمَا اتَّخَذْتُمْ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَوْثَانًا مَّوَدَّةَ بَيْنِكُمْ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا ثُمَّ يَوْمَ الْقِيمَةِ يَكْفُرُ بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ وَ يَلْعَنُ بَعْضُكُمْ بَعْضًا وَمَأْوَنَكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ تُصِرِينَ. অর্থ: 'তিনি বললেন, পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা রক্ষার জন্য তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমাগুলোকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ। এর পর কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং পরস্পরকে লানত করবে। তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।' [আনকাবুত: ২৫]
এই ভালোবাসা আপনাকে এবং আপনার অন্য সকল ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আপনি আল্লাহকে ভালোবাসলে আল্লাহ যা ভালোবাসেন আপনিও তা-ই ভালোবাসবেন, আল্লাহ যা ঘৃণা করেন আপনিও তা ঘৃণা করবেন, আল্লাহ যাকে ভালোবাসতে বলেন আপনি তাকে ভালোবাসবেন, আল্লাহ যার থেকে দূরে থাকতে বলেন আপনি তার থেকে দূরে থাকবেন, তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। এটাকে বলা হয় আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা রাখা। ফলে আপনার ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হবে মুমিনগণ, আর আপনার ঘৃণার পাত্র হবে কাফেররা। তাওহিদবাদীদের ইমাম ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এখানেও আমাদের আদর্শ। তিনি আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতার বিরল নজির স্থাপন করেছেন। আল্লাহ বলেন, قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِنَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَ بَدَا بَيْنَنَا وَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَ الْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَةً. অর্থ: 'তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের অস্বীকার করলাম। তোমাদের ও আমাদের মাঝে শুরু হলো চিরশত্রুতা, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।' [মুমতাহিনা: ৪]
মুমিনদের প্রতি কীভাবে ভালোবাসা রাখতে হয় আল্লাহ আমাদের সে দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, وَ الَّذِينَ جَاءُوْ مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُوْنَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوْبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوْا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ . অর্থ: 'আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এবং ভ্রাতাদের যারা আমাদের অগ্রে ঈমান এনেছে, ক্ষমা করুন। আর ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।' [হাশর: ১০] কাফেরদের ঘৃণার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْনَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে।' [মুমতাহিনা: ১] অন্য এক আয়াতে কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُوْনَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآখِرِ يُوَادُّوْنَ مَنْ حَاذَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيْرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوْبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحِ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ * أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْনَ. অর্থ: 'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদের আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা নিকটাত্মীয় হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।' [মুজাদালাহ: ২২]
এ ভালোবাসাটা স্রেফ ইহকালের নয়, বরং পরকালের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। পরকালে শুধু এই ভালোবাসাই কাজে আসবে। পার্থিব স্বার্থের জন্য পৃথিবীতে যারা একে অপরকে ভালোবেসেছে, সেখানে তারা শত্রু হয়ে যাবে। আর যারা ঈমানের ভিত্তিতে একে অপরকে ভালোবেসেছে, তাদের বন্ধন অটুট থাকবে, তারা একে অপরের উপকারে আসবে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফেরদের বন্ধুত্বের ব্যাপারে বলেন, الْآخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ. অর্থ: 'বন্ধুবর্গ সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে মুত্তাকিগণ নয়।' [জুখরুফ: ৬৭] অপরদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের ভালোবাসার সুফল সম্পর্কে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, তারা কোথায় যারা আমার জন্য একে অপরকে ভালোবাসে? তাদের আজ আমার ছায়ায় ছায়া দান করব যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই।'¹ আরেক হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর এমন কিছু বান্দা রয়েছে, যাদের জন্য কিয়ামতের দিন নুরের মিম্বার প্রস্তুত করা হবে, অথচ তারা নবি নন শহিদও নন; বরং নবি ও শহিদগণ তাদের দেখে ঈর্ষা করবেন।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'তারা কারা?' তিনি বললেন, 'যারা আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে।'² অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, 'সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার ছায়ায় ছায়া দেবেন যেদিন তার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না: এক. ন্যায়পরায়ণ শাসক। দুই. সেই যুবক যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। তিন. সেই লোক যার হৃদয় সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকত। চার. সেই দুজন মানুষ যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে, আল্লাহর জন্য তারা মিলিত হয়েছে, আল্লাহর জন্য বিচ্ছিন্ন হয়েছে। পাঁচ. সেই লোক যাকে সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত কোন নারী ডেকেছে, কিন্তু সে জবাবে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। ছয়. সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর জন্য এমনভাবে দান করেছে যে, তার বাম হাত জানতে পারেনি ডান হাত কী দান করেছে। সাত. সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে নির্জনে ডেকেছে আর যাতে তার চোখের অশ্রু ঝরেছে।'³ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তিনটি বিষয় যার মাঝে থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে: যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে, ফলে তার কাছে তাদের দুজনের চেয়ে আর কেউ প্রিয় হবে না। যে অন্যকে কেবল আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে। আর যাকে আল্লাহ কুফর থেকে রক্ষা করার পরে সেখানে ফিরে যাওয়াকে ততটা অপছন্দ করবে, যতটা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।'⁴

টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (১৮৮২১); তয়ালিসি (৭৮৩); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩১০৬০)।
২. নাসায়ী (৪১৮৮)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৩৪৩৪); তিরমিজি (২৩৯০); মুসনাদে আহমদ (২২৫০৬)।
৪. বুখারি (৬৬০, ১৪২৩); মুসলিম (১০৩১)।
৫. বুখারি (১৬, ২১); মুসলিম (৪৩)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 ‘আল্লাহ ভালো জানেন’ বলার অভ্যাস গড়ুন

📄 ‘আল্লাহ ভালো জানেন’ বলার অভ্যাস গড়ুন


আজ মুসলিম উম্মাহ যেসব রোগে আক্রান্ত অথচ মুমিনদের যেগুলো থেকে অনেক দূরে থাকা উচিত ছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্ঞানগত অহংকার। আজ সবাই জানে, সবকিছু জানে। আমাদের প্রত্যেকে আজ একেকজন জ্ঞানের সাত-সমুদ্দুর। ফলে অনলাইনে অফলাইনে টেলিভিশনের পর্দায় ওয়াজের মঞ্চে মাদরাসায় মসজিদে রাস্তায় বা মাঠে আপনি যাকে যেকোনো জায়গায় যেকোনো প্রশ্ন করবেন, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেয়ে যাবেন। এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে যাদের প্রশ্ন করার পরে বলবে, 'আমি জানি না' অথবা 'আল্লাহ ভালো জানেন'। অথচ এটা ইসলামের দীক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষত আকিদার ক্ষেত্রে কথা বলায় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন জরুরি ছিল। অথচ আজ আকিদা নিয়ে যার যা ইচ্ছা বলে বেড়াচ্ছে।
ইসলাম আমাদের না জেনে অনুমানভিত্তিক ও আন্দাজের উপর ভর করে কোনোকিছু বলতে বারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে একাধিক আয়াতে বিষয়টির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَنَا وَ أَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْনَ. অর্থ: 'আপনি বলুন, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গুনাহ, অন্যায়-অত্যাচার। আর (হারাম করেছেন) আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি। আর (হারাম করেছেন) আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জানো না।' [আরাফ: ৩৩] অন্য আয়াতে বলেন, وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّমْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا. অর্থ: 'যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেটার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয় এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।' [ইসরা: ৩৬]।
আমরা যদি আল্লাহর রাসুলের সিরাত এবং সালাফের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিই, সেখানে এই দীক্ষার সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন দেখব। এমনকি আল্লাহর রাসুলকে অনেক সময় প্রশ্ন করা হলে তিনি ওহির অপেক্ষা করতেন। যতক্ষণ ওহি না আসত, তিনি জবাব দিতেন না, আন্দাজে কিছু বলতেন না। সুরা কাহাফে এসেছে, কাফেররা যখন আল্লাহর রাসুলকে জিজ্ঞাসা করল আসহাবে কাহাফ কত দিন তাদের গুহাতে অবস্থান করেছিল, তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে বলতে বলেন, قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ. অর্থ: 'আপনি বলুন, আল্লাহ ভালো জানেন তারা কতদিন তথায় অবস্থান করেছে। আকাশ ও জমিনের সকল অদৃশ্যের জ্ঞান তার কাছে।' [কাহাফ: ২৬] আবার যখন তাদের সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় আল্লাহ বলেন, قُلْ رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِمْ অর্থ: 'আপনি বলে দিন, তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আমার প্রতিপালক ভালো জানেন।' [কাহাফ: ২২] একইভাবে সাহাবায়ে কেরামকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে, তারা না জানলে সবসময় বলতেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন।' বরং অনেক সময় জানলেও বলতেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন।' এমন একটা ঘটনাও পাওয়া যায় না, যেখানে তারা আন্দাজে কোনো উত্তর দিয়েছেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর সর্বোত্তম শিক্ষক, আর তারা ছিলেন সর্বোত্তম শিক্ষার্থী।
পরবর্তী যুগেও এই সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য অব্যাহত ছিল। ইমাম মালেক থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি অনেক দূর থেকে তার কাছে এসে চল্লিশটি প্রশ্ন করল। ইমাম মালেক সেগুলোর ভিতর থেকে মাত্র কয়েকটির উত্তর দিলেন। আর বাকিগুলোর ক্ষেত্রে বললেন, 'আমি জানি না'। লোকটি বলল, আমি এতদূর থেকে এসেছি আর আপনি বলছেন 'আমি জানি না'? ফিরে গিয়ে আমার কওমকে কী জবাব দেবো? তিনি বললেন, 'বলবে, মালেক জানে না। মালেকের ছাত্র ইবনে ওয়াহাব বলেন, অধিকাংশ সময়ই তাকে বলতে শুনতাম 'আমি জানি না'। তাকে যতবার 'আমি জানি না' বলতে শুনেছি, ওগুলো লিখলে সব খাতাপত্র ভরে যেত। অর্থাৎ আমাদের সালাফ 'জানি না' শব্দ বলতে কোনোরকম কুণ্ঠিত হতেন না, লজ্জা পেতেন না। কারণ, তারা প্রকৃত অর্থেই জ্ঞানী ছিলেন। ফলে নিজেদের সীমাবদ্ধতা জানতেন। ইমাম মালেক বলতেন, 'জানি না' বলা হচ্ছে আলিমের ঢালস্বরূপ। যখন সে এটা খুইয়ে ফেলবে, তার মাথা খোয়াবে।²

টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩৩৭৩)।
২. আল-ইনতিকা, ইবন আবদুল বার (৩৭)।

📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 মোজার উপর মাসাহ্ আহলে সুন্নাতের নিদর্শন

📄 মোজার উপর মাসাহ্ আহলে সুন্নাতের নিদর্শন


এটি একটি ফিকহি মাসআলা, তথাপি আহলে সুন্নাতের আকিদার অধিকাংশ গ্রন্থেই মাসআলাটি আলোচিত হয়। কারণ, কিছু বিভ্রান্ত সম্প্রদায় এটাকে অস্বীকার করে; অথচ এটা মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাদের খণ্ডনের লক্ষ্যে এবং তাদের বিভ্রান্তি থেকে আহলে সুন্নাতকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে ইমামগণ আকিদার কিতাবে এটা নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। ফলে এটা ফিকহি মাসআলা হওয়া সত্ত্বেও আহলে সুন্নাত ও আহলে বিদআতের আকিদার পরিচয়নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। যারা এটাকে স্বীকার করবে, তারা আহলে সুন্নাত; যারা অস্বীকার করবে, তারা আহলে বিদআত।
যেসব সম্প্রদায় মোজার উপর মাসাহ অস্বীকার করে, তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে খারেজি ও শিয়া-রাফেজি সম্প্রদায়।¹ তারা বলে, মোজার উপর মাসাহ করার সুযোগ নেই; শরিয়তে এমন কিছু আসেনি; বরং পায়ের উপর মাসাহ করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় অস্বীকার করে তারা কয়েকটি বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয়: এক. মোজার উপর মাসাহ-সংক্রান্ত একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস (যা মুতাওয়াতির তথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত) অস্বীকার করে। দুই. ওজুতে পা ধোয়াসংক্রান্ত আয়াতের অপব্যাখ্যা করে পা মাসাহ করার কথা বলে। তিন. যেসব সাহাবি মোজার উপর মাসাহ করেছেন, সেগুলোকে পা মাসাহের কথা বলে চালিয়ে দেয়। চার. সেসব সাহাবির হাদিস দিয়ে দলিল দেয়, যারা প্রথমে না জানার কারণে পা মাসাহের কথা বলেছেন। পরবর্তী সময়ে তারাও পা ধৌত করেন। পাঁচ, ওজুতে পা ধোয়ার বদলে মাসাহ করে। এভাবে তারা সুন্নাত ছেড়ে দিয়ে বিদআতে লিপ্ত হয়েছে।
আহলে সুন্নাতের সকল ধারার আলিমদের মতে, পা ধোয়া এবং মাসাহ করতে চাইলে মোজার উপর মাসাহ করা (সরাসরি পায়ের উপর নয়) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। হাসান বসরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি সত্তরজন সাহাবিকে পেয়েছি, যাদের প্রত্যেকেই মোজার উপর মাসাহ করতেন। আবু বকর, উমর, উসমান, আলি, আহলে বদর, আহলে হুদাইবিয়াহ, অন্যান্য মুহাজির ও আনসার—সবাই মোজার উপর মাসাহ করতেন।'¹ ইমাম কারখি বলেন, 'যে ব্যক্তি মোজার উপর মাসাহ অস্বীকার করে, তার ব্যাপারে আমার কুফরের ভয় হয়।'²
তারা আরবি ব্যাকরণকে ঢাল বানিয়ে এবং সালাফের কিছু মানুষের বক্তব্য দিয়ে তাদের মতামতকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَ امْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ. অর্থ: 'হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হও, তখন স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত করো। মাথা মাসাহ করো, আর পদযুগল (ধৌত করো) গোড়ালি-সহ।' [মায়িদা: ৬] উক্ত আয়াতে পা ধোয়ার কথা মাথা মাসাহের পরে এসেছে। امْسَحُوا بِرُءُوْসِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَيْنِ। কিন্তু পায়ের ক্ষেত্রে 'ধোয়া' শব্দটি উচ্চারণ করা হয়নি, প্রয়োজনও নেই। কারণ, সেটার 'আতফ' হবে মুখমণ্ডল ও হাতের উপর, মাথার উপর নয়। দু-একজন বাদে সকল সাহাবি ও তাবেয়ি-সহ সকল মুসলমান কুরআনের আয়াতটিকে এভাবে পড়েছেন এবং ওজুতে পা ধোয়া বুঝেছেন। সাহাবায়ে কেরাম ওজু, মোজার উপর মাসাহ ইত্যাদি বিষয় নিজেরা নিজেরা কুরআন-হাদিস পড়ে কিংবা আরবি ব্যাকরণের নিয়ম ধরে শেখেননি। কারও কাছ থেকে শুনে শেখেননি; বরং তারা আল্লাহর রাসুলকে বছরের পর বছর ওজু করতে দেখেছেন। তাকে মুখ, হাত ও পা ধুতে এবং মাথা মাসাহ করতে দেখেছেন। দেখে দেখে শিখেছেন। একাধিক সাহাবি থেকে হাদিসে এসেছে, 'আমি কি তোমাদের সেভাবে ওজু করে দেখাব না যেভাবে আমি রাসুলুল্লাহকে ওজু করতে দেখেছি?' কিংবা 'এটা রাসুলুল্লাহর ওজু।'
হ্যাঁ, ইবনে আব্বাস রাজি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন 'আমি কুরআনে দেখি দুটো অঙ্গ ধোয়া (মুখ ও হাত) এবং দুটো অঙ্গ মাসাহ (মাথা ও পা)-এর কথা।' কারণ, তিনি 'পা'কে মাথার উপর 'আতফ' করতেন। কিন্তু সেটা বাস্তবতা না জানার ফলে। যখন জানতে পারেন, তখন তিনি অন্যদের মতো পা ধোয়ার কথা বলেন। বরং সহিহ বুখারিতে খোদ তাঁর ওজুর কথা এসেছে। তিনি দুই পা ধুয়ে বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে এভাবে ওজু করতে দেখেছি।³ একইভাবে আনাস, রিফায়াহ প্রমুখ সাহাবি থেকেও পা মাসাহের কথা এসেছে। কিন্তু সেগুলোতে তখনকার, যখন তারা ধোয়ার কথা জানতেন না। পরবর্তীকালে তারা মত পরিবর্তন করে ধোয়ার কথা বলেন।⁴ আলি রাজি. এবং অন্যান্য সাহাবি থেকে পা মাসাহের যেসব বর্ণনা এসেছে, সেটা ধোয়ার বদলে, সরাসরি পা মাসাহ নয়। বরং মোজার উপর মাসাহ। যারা ওজুতে পা না ধুয়ে মাসাহ করে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পায়ের গোড়ালিকে জাহান্নাম থেকে সতর্ক করেছেন।⁶ ফলে ওজুতে পা না ধুয়ে মাসাহ করা সাহাবা ও মুসলমানদের ইজমার খিলাফ।⁷ কাসানি (৫৮৭ হি.) লিখেন, সকল সাহাবা ও ফকিহের কাছে মোজার উপর মাসাহ জায়েজ। ইবনে আব্বাস থেকে সামান্য ব্যতিক্রম বর্ণনা পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে এটা রাফেজিদের মাজহাবে পরিণত হয়েছে।⁸
শাইখুল ইসলাম ইবনে হাজার লিখেন, মুতাওয়াতির সূত্রে রাসুলুল্লাহর ওজুর বর্ণনা পাওয়া যায়। তাতে স্পষ্ট যে, তিনি তার দুই পা ধৌত করেছেন। একজন সাহাবি থেকেও এর বিপরীত বর্ণনা প্রমাণিত নয়। হ্যাঁ আলি, ইবনে আব্বাস, আনাস—এই তিনজন থেকে বিপরীত (পা মাসাহের) বর্ণনা এসেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা তাদের মত পরিবর্তন করে সকল সাহাবার মতো মত দিয়েছেন। আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা বলেন, রাসুলুল্লাহর সাহাবাগণ পা ধোয়ার ব্যাপারে একমত ছিলেন। ইমাম তহাবি ও ইবনে হাজাম রাহি. মনে করেন, প্রথমে মাসাহ বৈধ ছিল। পরবর্তীকালে সেটা মানসুখ (রহিত) হয়ে যায়।⁹ সুতরাং পা ধোয়া অপরিহার্য। মাসাহ করতে হলে সরাসরি পা মাসাহ নয়, বরং মোজার উপর মাসাহ করতে হবে।

টিকাঃ
১. আস-সুন্নাহ, মারওয়াজি (১০৩)।
২. গজনবি (১৩৩)।
৩. বুখারি (১৪০)।
৪. বিস্তারিত দেখুন: শরহুল মুহাজ্জাব, নববি (১/৪২১)।
৫. ইবনে মাজা (৪৬০); সুনানে কুবরা, বাইহাকি (১৪১১)।
৬. বুখারি (৬০, ১৬৩); মুসলিম (২৪১)।
৭. শরহুল মুহাজ্জাব (১/৪১৭)।
৮. বাদায়েউস সানায়ে (১/৭)।
৯. ফাতহুল বারি (১/২৬৬)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px