📄 মুসলমানদের ঐক্যের আবশ্যকতা
ঐক্য এমন একটি বিষয় যা মুসলিম জাতির স্থিতি, বিকাশ ও সংহতি বজায় রাখে, মুসলমানদের জন্য দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ বয়ে আনে। ঐক্য যেমন মুসলমানদের ঈমান-আকিদাকে সুরক্ষিত রাখে, পার্থিব জগতেও মুসলমানদের শক্তিশালী করে, সমৃদ্ধ করে, মুসলিম উম্মাহকে মজবুত ও বিজয়ী করে। এ কারণে আকিদার কিতাবগুলোতে আহলে সুন্নাতের ঐক্যের উপর সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا.
অর্থ: 'তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ করো; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ করো, যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গেছ।' [আলে ইমরান: ১০৩] অনৈক্য মুসমানদের পার্থিবভাবে কীভাবে ক্ষতি করে এবং তাদের দুর্বল করে দেয় সে প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ.
অর্থ: 'আর তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য করো। পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। তাতে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে।' [আনফাল: ৪৬] আজকে মুসলিম জাতি গোটা পৃথিবীর তাবৎ জাতির সামনে বিড়ালের মতো হয়ে থাকার অন্যতম একটি কারণ হলো তাদের অভ্যন্তরীণ কোলাহল, হানাহানি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব। অথচ সবাই এক ধর্মের অনুসারী, এক তাওহিদের সাক্ষ্যদাতা, এক কুরআন-সুন্নাহর মানুষ। অনৈক্য কেবল দুনিয়া নয়, মুসলমানদের ঈমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এটাকে পার্থিব বিষয় কিংবা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন,
وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ মَصِيْرًا.
অর্থ: 'যে ব্যক্তি সরল পথ স্পষ্ট হওয়ার পরেও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুসলমানের অনুসৃত পথ ছেড়ে অন্য পথে চলে, আমি তাকে ওই দিকেই ফেরাব, যে দিকে সে গিয়েছে (অর্থাৎ বক্র করে দেবো)। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। সেটা কতই না নিকৃষ্টতর গন্তব্য!' [নিসা: ১১৫] অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, شَرَعَ لَكُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا وَصَّى بِهِ نُوْحًا وَ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيْمَ وَمُوْسَى وَعِيْسَى أَنْ أَقِيْمُوا الدِّيْنَ وَلَا تَتَفَرَّقُوْا فِيْهِ.
অর্থ: 'তিনি তোমাদের জন্য সেই দ্বীন নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নুহকে। আর যা আমি ওহি করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহিম, মুসা ও ঈসার প্রতি এ মর্মে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করো এবং তাতে মতভেদ করো না। [শুরা: ১৩] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতকে কখনোই গোমরাহির উপর ঐক্যবদ্ধ করবেন না।' এরপর দুই হাত উঁচু করে দেখিয়ে-বললেন, 'জামাতের উপর আল্লাহর হাত রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।'¹
টিকাঃ
১. তিরমিজি (২১৬৭); মুসতাদরাকে হাকেম (৭৯৩)।
📄 ঐক্য বিনষ্টের কৌশল
মুসলমানদের ঐক্য ধরে রাখার সর্বোত্তম উপায় হলো শাখাগত বিষয় নিয়ে মতভেদ পরিহার করা। উম্মাহর কোটি কোটি সদস্য সব বিষয়ে একমত থাকা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক নিয়মও এর সঙ্গে যায় না। স্বয়ং সাহাবাগণ বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ করেছেন। কিন্তু তারা জানতেন কোন বিষয়ে মতভেদ করা যাবে আর কোন বিষয়ে মতভেদ করা যাবে না, কতটুকু মতভেদ করা যাবে কতটুকু করা যাবে না। এ কারণে তাদের মাঝে মতবিরোধ থাকলেও বিচ্ছিন্নতা ও হানাহানি ছিল না। তারা উম্মাহর বৃহত্তর ইসুর সামনে নিজেদের ক্ষুদ্র মতভেদগুলোর প্রতি ভ্রুক্ষেপই করতেন না। কিন্তু আজকের মুসলিম উম্মাহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মতভেদের সামনে উম্মাহর বৃহত্তর সর্বসম্মত বিষয়গুলো খেয়ালই করে না। ঈমানের ক্ষেত্রে, কুফরের ক্ষেত্রে, ফরজ ও ওয়াজিবের ক্ষেত্রে—সব জায়গায় আহলে সুন্নাত একমত। বরং দ্বীনের প্রায় পঁচানব্বই ভাগের বেশি বিষয়ে আহলে সুন্নাতের সকল মুসলিম একমত। কিন্তু আফসোসের বিষয় এই, সর্বসম্মত পঁচানব্বই ভাগ বিষয়ের চেয়ে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো মতভেদপূর্ণ পাঁচ ভাগ, যেগুলোর বেশিরভাগই অগুরুত্বপূর্ণ। ফলে নফল, মুস্তাহাব, মাকরুহ ও মুবাহের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাদের মাঝে যুদ্ধ যুদ্ধ রব লেগে যায়। এসব বিষয় নিয়ে তারা একদল আরেক দলকে একটু ছাড় দিতে চায় না।
মসজিদ, মাদরাসা, সেমিনার—সর্বত্র কেবল এগুলো নিয়েই আলোচনা। তাদের দেখলে মনে হবে, এগুলোই ইসলামের মূল বাণী, এগুলোর জন্যই আল্লাহ কুরআন পাঠিয়েছেন। প্রায়শই বিভিন্ন ইসুকে কেন্দ্র করে তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত দেখবেন; দেখবেন কীভাবে একদল আরেক দলের মসজিদ-মাদরাসা ভেঙে দিচ্ছে, জান ও মালের ক্ষতি করছে, পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট করছে, নিজেরা মারামারি করে জাহিল ও ধর্মহীন লোকদের কাছে বিচারের জন্য যাচ্ছে। এর চেয়ে বড় লাঞ্ছনার কথা আর কী হতে পারে? মুস্তাহাব ও নফল নিয়ে নিজেদের এসব মারামারির ভিড়ে দ্বীন ও উম্মাহর পিঠ কখন দুশমনের জন্য উদোম হয়ে গেছে, সেটা খবর রাখারও সময় পায় না আজকের মুসলমানরা। সামান্য মতপার্থক্যের কারণে এক মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইকে ইহুদি-খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের চেয়েও বড় দুশমন মনে করে। আহলে সুন্নাতের একজন আরেকজনকে ততটুকু ছাড় দেয় না, যতটা ছাড় তারা খ্রিষ্টান মিশনারি, শিয়া, কাদিয়ানি, হিন্দু ও নাস্তিকদের দেয়।
তাই সুন্নাত ও জামাত দুটো রক্ষার জন্য ছাড় দিতে হবে। মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোর পরিবর্তে সর্বসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে। দ্বীন ও উম্মাহর অভিন্ন শত্রুদের প্রতি অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে। যেসব বিষয়ে কোনো অঞ্চলে উম্মাহ একটি সুন্নাতের উপর থাকে, জামাতের সুরক্ষার জন্য সেখানে নতুন একটি বিপরীত মত সৃষ্টি অনুচিত। যেমন: কোনো অঞ্চলে মুসলিম উম্মাহ বুকের নিচে হাত বাঁধে। ফিতনার আশঙ্কা থাকলে সেখানে বুকের উপরে হাত বাঁধা অনুচিত। কোনো স্থানের মুসলিমরা তারাবি বিশ রাকাত পড়ে। বিশৃঙ্খলার ভয় থাকলে সেখানে আট রাকাতের মতাদর্শ প্রচার করা অসঠিক। কারণ, তাতে উম্মাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, জামাত নষ্ট হবে; অথচ সুন্নাত ও জামাত দুটোই দরকার। বরং মুসলমানদের প্রচলিত একটি সুন্নাতকে অপর একটি সুন্নাতের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বীনের চেয়ে নিজেকে ফোকাসের উদ্দেশ্য ও লৌকিকতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তাই এ-জাতীয় কাজ বর্জনীয়। আমার উদ্দেশ্য যদি দ্বীনই হয়, তবে মুসলমানরা তো দ্বীনের উপর আছেনই, তা হলে কেন বিশৃঙ্খলা তৈরি করব? এমনকি যদি আমার আমলটি প্রচলিত আমলের চেয়ে উত্তম হয়, তবুও ফিতনার আশঙ্কা থাকলে আমি তাদের বিরোধিতা করব না। একটু উত্তম আমল প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মুসলমানদের মাঝে বিভেদের আগুন ছড়িয়ে দেওয়া, মুসলমানদের জামাত তথা ঐক্য ধ্বংস করে দেওয়া ইসলামের কাজ নয়। এমন উত্তমের চেয়ে অনুত্তমের উপর থাকা ঢের মঙ্গজজনক। হ্যাঁ, সংঘাতটা যদি উত্তম-অনুত্তমের পরিবর্তে ঈমান ও কুফরের, সুন্নাত ও বিদআতের হয়, তখন ঈমান ও সুন্নাহর শিবিরে থেকে কুফর ও বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা অপরিহার্য।
আল্লাহ অনৈক্যকে মুশরিকদের কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ. অর্থ: 'আর মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা তাদের ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং দলে-দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত।' [রুম: ৩১-৩২] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হিদায়াতপ্রাপ্তির পরে কোনো সম্প্রদায় ততক্ষণ পর্যন্ত গোমরাহ হয় না, যতক্ষণ না বিবাদ-বিতর্কে জড়ায়। এরপর তিনি কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন, مَا ضَرَبُوْهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُوْنَ অর্থ: 'তারা আপনার সামনে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে, তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে।'¹
টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩২৫৩); ইবনে মাজা (৪৮); মুসনাদে আহমদ (২২৫৯৪)।
📄 আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও শত্রুতা
মহব্বত তথা ভালোবাসা প্রাকৃতিক বিষয়। আল্লাহ তায়ালা কেবল মানুষ নয়, পৃথিবীর সকল সৃষ্টির হৃদয়ে ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন। এই ভালোবাসা ও হৃদ্যতার উপরই পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে। যদি সৃষ্টির ভিতরে পারস্পারিক ভালোবাসা না থাকত, তবে সর্বত্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হতো, পৃথিবীতে সৃষ্টির বিকাশ ব্যাহত হতো। ভালোবাসা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন: প্রাকৃতিক ভালোবাসা। এগুলোতে মৌলিকভাবে পাপ-পুণ্য নেই। পণ্যের জায়গাতে ব্যবহার করলে পুণ্য, পাপের ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে পাপ। যেমন: সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা, বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন ও অন্য আত্মীয়দের পারস্পরিক ভালোবাসা। এগুলো আল্লাহর জন্য হলে তাতে পুণ্য আছে, কিন্তু অপাত্রে হলে তাতে পাপও রয়েছে। একইভাবে জাগতিক বিভিন্ন বিষয়, যেমন: খাবার, পোশাক, স্থান ও সময়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা; এগুলোও ভালো হলে তাতে পুণ্য রয়েছে, খারাপ হলে তাতে পাপ রয়েছে।
তবে এসব ভালোবাসা প্রাকৃতিক ও বৈষয়িক। মানুষের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির তাতে বেশ প্রভাব রয়েছে। ফলে এগুলো কখনও স্বার্থপূর্ণ, আবার কখনও নিঃস্বার্থ হয়ে থাকে। তাই এটা সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা নয়। বরং সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসা হচ্ছে আল্লাহকে ভালোবাসা। যে সত্তা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্বে এনেছেন, আপনাকে সুন্দর রূপ ও দেহাবয়ব দিয়েছেন, হাজারও অনুগ্রহে আপনার জীবন সমৃদ্ধ করেছেন, প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি মুহূর্তে আপনি যার মুখাপেক্ষী, যিনি আপনাকে সুরক্ষিত রাখেন, আপনার সকল প্রয়োজন পূর্ণ করেন, তিনি আপনার ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। ফলে প্রত্যেক মুমিনের জন্য আল্লাহকে ভালোবাসা অপরিহার্য। এই ভালোবাসা জগতের সকল ভালোবাসার উর্ধ্বে। এই ভালোবাসার সামনে জগতের সবার ভালোবাসা, সকল ভালোবাসা ম্লান। কুরআনে আল্লাহর ভালোবাসাকে ঈমান ও কুফরের মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَّتَّখِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّوْنَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ অর্থ: 'আর এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনই ভালোবাসা পোষণ করে, যেমন ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।' [বাকারা: ১৬৫] মুমিনদের এই ভালোবাসার কারণে আল্লাহ তাদেরও ভালোবাসেন, মহব্বত করেন। পরকালে তিনি তাদের জান্নাত দান করবেন। দিদারের সৌভাগ্য ও সুযোগ দেবেন। বিপরীতে কাফেররা যেসব মূর্তি ও ব্যক্তিকে ভালোবাসে, যাদের পূজা করে, কিয়ামতের দিন সবাই তাদের অস্বীকার করবে। আল্লাহ বলেন, وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاءً وَكَانُوْا بِعِبَادَتِهِمْ كَفِرِينَ. অর্থ: 'যখন মানুষকে হাশরে একত্র করা হবে, তখন তারা তাদের শত্রু হবে এবং তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে।' [আহকাফ: ৬] অন্য আয়াতে বলেন, وَقَالَ إِنَّمَا اتَّخَذْتُمْ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَوْثَانًا مَّوَدَّةَ بَيْنِكُمْ فِي الْحَيُوةِ الدُّنْيَا ثُمَّ يَوْمَ الْقِيمَةِ يَكْفُرُ بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ وَ يَلْعَنُ بَعْضُكُمْ بَعْضًا وَمَأْوَنَكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ تُصِرِينَ. অর্থ: 'তিনি বললেন, পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা রক্ষার জন্য তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমাগুলোকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ। এর পর কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং পরস্পরকে লানত করবে। তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।' [আনকাবুত: ২৫]
এই ভালোবাসা আপনাকে এবং আপনার অন্য সকল ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আপনি আল্লাহকে ভালোবাসলে আল্লাহ যা ভালোবাসেন আপনিও তা-ই ভালোবাসবেন, আল্লাহ যা ঘৃণা করেন আপনিও তা ঘৃণা করবেন, আল্লাহ যাকে ভালোবাসতে বলেন আপনি তাকে ভালোবাসবেন, আল্লাহ যার থেকে দূরে থাকতে বলেন আপনি তার থেকে দূরে থাকবেন, তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। এটাকে বলা হয় আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতা রাখা। ফলে আপনার ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হবে মুমিনগণ, আর আপনার ঘৃণার পাত্র হবে কাফেররা। তাওহিদবাদীদের ইমাম ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এখানেও আমাদের আদর্শ। তিনি আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য শত্রুতার বিরল নজির স্থাপন করেছেন। আল্লাহ বলেন, قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِنَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَ بَدَا بَيْنَنَا وَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَ الْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَةً. অর্থ: 'তোমাদের জন্য ইবরাহিম ও তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করো, তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের অস্বীকার করলাম। তোমাদের ও আমাদের মাঝে শুরু হলো চিরশত্রুতা, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।' [মুমতাহিনা: ৪]
মুমিনদের প্রতি কীভাবে ভালোবাসা রাখতে হয় আল্লাহ আমাদের সে দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, وَ الَّذِينَ جَاءُوْ مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُوْنَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوْبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوْا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِيمٌ . অর্থ: 'আর যারা তাদের পরে আগমন করেছে তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের এবং ভ্রাতাদের যারা আমাদের অগ্রে ঈমান এনেছে, ক্ষমা করুন। আর ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।' [হাশর: ১০] কাফেরদের ঘৃণার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُوْনَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوْا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ অর্থ: 'হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে।' [মুমতাহিনা: ১] অন্য এক আয়াতে কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষ মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُوْনَ بِاللَّهِ وَالْيَوْমِ الْآখِرِ يُوَادُّوْنَ مَنْ حَاذَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيْرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوْبِهِمُ الْإِيْمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحِ مِنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خُلِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ * أُولَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُوْনَ. অর্থ: 'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদের আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা নিকটাত্মীয় হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদের শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রেখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।' [মুজাদালাহ: ২২]
এ ভালোবাসাটা স্রেফ ইহকালের নয়, বরং পরকালের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। পরকালে শুধু এই ভালোবাসাই কাজে আসবে। পার্থিব স্বার্থের জন্য পৃথিবীতে যারা একে অপরকে ভালোবেসেছে, সেখানে তারা শত্রু হয়ে যাবে। আর যারা ঈমানের ভিত্তিতে একে অপরকে ভালোবেসেছে, তাদের বন্ধন অটুট থাকবে, তারা একে অপরের উপকারে আসবে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফেরদের বন্ধুত্বের ব্যাপারে বলেন, الْآخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ. অর্থ: 'বন্ধুবর্গ সেদিন একে অপরের শত্রু হবে, তবে মুত্তাকিগণ নয়।' [জুখরুফ: ৬৭] অপরদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিনদের ভালোবাসার সুফল সম্পর্কে বলেন, 'আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, তারা কোথায় যারা আমার জন্য একে অপরকে ভালোবাসে? তাদের আজ আমার ছায়ায় ছায়া দান করব যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই।'¹ আরেক হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'আল্লাহর এমন কিছু বান্দা রয়েছে, যাদের জন্য কিয়ামতের দিন নুরের মিম্বার প্রস্তুত করা হবে, অথচ তারা নবি নন শহিদও নন; বরং নবি ও শহিদগণ তাদের দেখে ঈর্ষা করবেন।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'তারা কারা?' তিনি বললেন, 'যারা আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে।'² অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, 'সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার ছায়ায় ছায়া দেবেন যেদিন তার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না: এক. ন্যায়পরায়ণ শাসক। দুই. সেই যুবক যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। তিন. সেই লোক যার হৃদয় সর্বদা মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকত। চার. সেই দুজন মানুষ যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে, আল্লাহর জন্য তারা মিলিত হয়েছে, আল্লাহর জন্য বিচ্ছিন্ন হয়েছে। পাঁচ. সেই লোক যাকে সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত কোন নারী ডেকেছে, কিন্তু সে জবাবে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। ছয়. সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর জন্য এমনভাবে দান করেছে যে, তার বাম হাত জানতে পারেনি ডান হাত কী দান করেছে। সাত. সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে নির্জনে ডেকেছে আর যাতে তার চোখের অশ্রু ঝরেছে।'³ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তিনটি বিষয় যার মাঝে থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করবে: যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে, ফলে তার কাছে তাদের দুজনের চেয়ে আর কেউ প্রিয় হবে না। যে অন্যকে কেবল আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে। আর যাকে আল্লাহ কুফর থেকে রক্ষা করার পরে সেখানে ফিরে যাওয়াকে ততটা অপছন্দ করবে, যতটা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।'⁴
টিকাঃ
১. মুসনাদে আহমদ (১৮৮২১); তয়ালিসি (৭৮৩); মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা (৩১০৬০)।
২. নাসায়ী (৪১৮৮)।
৩. আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি (৩৪৩৪); তিরমিজি (২৩৯০); মুসনাদে আহমদ (২২৫০৬)।
৪. বুখারি (৬৬০, ১৪২৩); মুসলিম (১০৩১)।
৫. বুখারি (১৬, ২১); মুসলিম (৪৩)।
📄 ‘আল্লাহ ভালো জানেন’ বলার অভ্যাস গড়ুন
আজ মুসলিম উম্মাহ যেসব রোগে আক্রান্ত অথচ মুমিনদের যেগুলো থেকে অনেক দূরে থাকা উচিত ছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্ঞানগত অহংকার। আজ সবাই জানে, সবকিছু জানে। আমাদের প্রত্যেকে আজ একেকজন জ্ঞানের সাত-সমুদ্দুর। ফলে অনলাইনে অফলাইনে টেলিভিশনের পর্দায় ওয়াজের মঞ্চে মাদরাসায় মসজিদে রাস্তায় বা মাঠে আপনি যাকে যেকোনো জায়গায় যেকোনো প্রশ্ন করবেন, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেয়ে যাবেন। এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে যাদের প্রশ্ন করার পরে বলবে, 'আমি জানি না' অথবা 'আল্লাহ ভালো জানেন'। অথচ এটা ইসলামের দীক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষত আকিদার ক্ষেত্রে কথা বলায় অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন জরুরি ছিল। অথচ আজ আকিদা নিয়ে যার যা ইচ্ছা বলে বেড়াচ্ছে।
ইসলাম আমাদের না জেনে অনুমানভিত্তিক ও আন্দাজের উপর ভর করে কোনোকিছু বলতে বারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে একাধিক আয়াতে বিষয়টির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَنَا وَ أَنْ تَقُوْلُوْا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُوْনَ. অর্থ: 'আপনি বলুন, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গুনাহ, অন্যায়-অত্যাচার। আর (হারাম করেছেন) আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে অংশীদার করা, তিনি যার কোনো সনদ অবতীর্ণ করেননি। আর (হারাম করেছেন) আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জানো না।' [আরাফ: ৩৩] অন্য আয়াতে বলেন, وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّমْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا. অর্থ: 'যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই সেটার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয় এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।' [ইসরা: ৩৬]।
আমরা যদি আল্লাহর রাসুলের সিরাত এবং সালাফের জীবনের দিকে দৃষ্টি দিই, সেখানে এই দীক্ষার সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন দেখব। এমনকি আল্লাহর রাসুলকে অনেক সময় প্রশ্ন করা হলে তিনি ওহির অপেক্ষা করতেন। যতক্ষণ ওহি না আসত, তিনি জবাব দিতেন না, আন্দাজে কিছু বলতেন না। সুরা কাহাফে এসেছে, কাফেররা যখন আল্লাহর রাসুলকে জিজ্ঞাসা করল আসহাবে কাহাফ কত দিন তাদের গুহাতে অবস্থান করেছিল, তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে বলতে বলেন, قُلِ اللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوا لَهُ غَيْبُ السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ. অর্থ: 'আপনি বলুন, আল্লাহ ভালো জানেন তারা কতদিন তথায় অবস্থান করেছে। আকাশ ও জমিনের সকল অদৃশ্যের জ্ঞান তার কাছে।' [কাহাফ: ২৬] আবার যখন তাদের সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় আল্লাহ বলেন, قُلْ رَّبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِمْ অর্থ: 'আপনি বলে দিন, তাদের সংখ্যা সম্পর্কে আমার প্রতিপালক ভালো জানেন।' [কাহাফ: ২২] একইভাবে সাহাবায়ে কেরামকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে, তারা না জানলে সবসময় বলতেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন।' বরং অনেক সময় জানলেও বলতেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন।' এমন একটা ঘটনাও পাওয়া যায় না, যেখানে তারা আন্দাজে কোনো উত্তর দিয়েছেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পৃথিবীর সর্বোত্তম শিক্ষক, আর তারা ছিলেন সর্বোত্তম শিক্ষার্থী।
পরবর্তী যুগেও এই সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য অব্যাহত ছিল। ইমাম মালেক থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি অনেক দূর থেকে তার কাছে এসে চল্লিশটি প্রশ্ন করল। ইমাম মালেক সেগুলোর ভিতর থেকে মাত্র কয়েকটির উত্তর দিলেন। আর বাকিগুলোর ক্ষেত্রে বললেন, 'আমি জানি না'। লোকটি বলল, আমি এতদূর থেকে এসেছি আর আপনি বলছেন 'আমি জানি না'? ফিরে গিয়ে আমার কওমকে কী জবাব দেবো? তিনি বললেন, 'বলবে, মালেক জানে না। মালেকের ছাত্র ইবনে ওয়াহাব বলেন, অধিকাংশ সময়ই তাকে বলতে শুনতাম 'আমি জানি না'। তাকে যতবার 'আমি জানি না' বলতে শুনেছি, ওগুলো লিখলে সব খাতাপত্র ভরে যেত। অর্থাৎ আমাদের সালাফ 'জানি না' শব্দ বলতে কোনোরকম কুণ্ঠিত হতেন না, লজ্জা পেতেন না। কারণ, তারা প্রকৃত অর্থেই জ্ঞানী ছিলেন। ফলে নিজেদের সীমাবদ্ধতা জানতেন। ইমাম মালেক বলতেন, 'জানি না' বলা হচ্ছে আলিমের ঢালস্বরূপ। যখন সে এটা খুইয়ে ফেলবে, তার মাথা খোয়াবে।²
টিকাঃ
১. তিরমিজি (৩৩৭৩)।
২. আল-ইনতিকা, ইবন আবদুল বার (৩৭)।