📘 আকীদাহ ত্বহাবিয়্যাহ সালাফ ও খালাফের ব্যাখ্যা 📄 সালাফ ও খালাফ

📄 সালাফ ও খালাফ


প্রশ্ন আসতে পারে, ইমাম আবু হানিফার মানহাজ যদি হয় জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা—যেমনটা জাসসাস বলেছেন—তা হলে ইমাম তাহাবি কীভাবে বললেন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না? উত্তর দুইভাবে দেওয়া যেতে পারে: এক. এখানে জুলুম বলতে ইমাম তাহাবি লঘু জুলুম উদ্দেশ্য নিয়েছেন। আর ইমাম আবু হানিফা যে জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলেছেন, সেটা প্রচণ্ড জুলুম। ফলে দুই কথায় কোনো সংঘাত নেই। দুই. সময়ের ব্যবধান। ইমাম আবু হানিফা যে শতাব্দে ছিলেন, সেটা ছিল দ্বন্দ্বমুখর এক শতাব্দ। উমাইয়া-আব্বাসীয়দের টানাপোড়েন একদিকে, অপরদিকে শিয়া-সুন্নি জটিলতা, অধিকন্তু নবি-পরিবারের সদস্যদের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, কিছু শাসক ও তাদের গভর্নরের সীমাহীন জুলুম গোটা পরিবেশকে অশান্ত করে রেখেছিল। ফলে মুসলিমগণ স্বভাবতই এই জুলুম থেকে মুক্তি চাইতেন সেটা কঠিন পথে হলেও। কিন্তু ফলাফল কী হয়েছে? বিদ্রোহ কি ভালো ফল বয়ে এনেছে?
আমরা দেখি, জালিমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে একাধিক হাদিস ও সতর্কবাণী থাকতেও তাদের কাছে বিদ্যমান দলিলের মাধ্যমে তারা বিদ্রোহ করেছেন। মূলত তারা জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে 'নাহি আনিল মুনকার' হিসেবে গণ্য করতেন। ফলে এটা তাদের ইজতিহাদ, যেটাকে অবৈধ বলার সুযোগ নেই। কিন্তু তা উম্মাহর জন্য এবং তাদের নিজেদের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে? আনেনি। আমরা দেখেছি, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর, হুসাইন ইবনে আলির মতো সাহাবাদের চরম বেদনাদায়কভাবে হত্যা করা হয়েছে। মদিনাবাসী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে সাহাবি ও তাবেয়ি-সহ সেখানে গণহত্যা চালানো হয়েছে। ইরাকে আবদুল মালিক ও হাজ্জাজের উপর বিদ্রোহকারী ইবনুল আশআস ও তাঁর সঙ্গে বিদ্যমান সবাই, খোরাসানে বিদ্রোহকারী ইবনুল মুহাল্লাব ও তার সঙ্গে বিদ্যমান সবাই করুণভাবে পরাজিত ও নিহত হয়েছেন। জায়দ ইবনে আলিকে মাঝপথে ছেড়ে গিয়েছে তাঁর সঙ্গীরা। উমাইয়াদের সরিয়ে আব্বাসীয়রা এসেছে, কিন্তু জুলুম বন্ধ হয়নি। মদিনা ও বসরাতে যারা খলিফা আবু জাফর মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তারা সবাই পরাজিত হন। এসব বিদ্রোহে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। ফলে তাদের মাধ্যমে—ইবনে তাইমিয়ার ভাষায়—দ্বীন ও দুনিয়ার কেউ উপকৃত হয়নি।¹
বরং ইমাম আবু হানিফা রাহি.-এর বক্তব্যে গভীর দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়, জাসসাসের কথা সঠিক নয়; কিংবা প্রথমদিকে ইমামের মাজহাব ছিল সেটা। পরবর্তী সময়ে ইমামও পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছিলেন। আবু মুতি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যেসব মানুষ সৎ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজের নিষেধ করে এবং সেটার জন্য জামাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তাদের কাজ কি সঠিক মনে করেন? ইমাম বললেন—না। কারণ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ওয়াজিব হলেও তারা যেটা করে তাতে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। তাতে রক্ত ঝরে; হারামকে হালাল বানানো হয়; মানুষের ধন-সম্পদ নষ্ট হয়। এ কারণে আল্লাহ বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, وَإِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا * إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ. অর্থ: 'যদি মুমিনদের দুটি দল পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর আক্রমণ করে, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দেবে এবং ইনসাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন।' [হুজুরাত: ৯] ফলে মুসলমানদের জামাতের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করবে, তাদের তরবারি দিয়ে শায়েস্তা করা হবে। শাসক যদি জালেমও হয়, নিজেরা ন্যায়ের উপর থাকবে, ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত দলের সঙ্গে থাকবে (বিদ্রোহীদের সঙ্গে থাকবে না)। কারণ, রাসুলুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাদের (শাসকদের) কেউ ইনসাফ করুক কিংবা জুলুম করুক, তোমাদের তাতে ক্ষতি নেই। তোমাদের পুণ্য তোমাদের জন্য, তাদের জুলুম তাদের কাঁধে।²
এভাবে একদিকে প্রথম সময়ের বিদ্রোহগুলো যখন ব্যর্থ হয়, এর ক্ষতি, অনিষ্ট এবং অপকারিতা সামনে আসে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণীর সার্থকতা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়, অপরদিকে আব্বাসীয় খেলাফত সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ইমামগণ জুলুম ইসুতে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করাকেই অগ্রাধিকারযোগ্য মনে করেন। এ কারণেই ইমাম তহাবি, বাজদাবি-সহ পরবর্তী সময়ে হানাফি-মাতুরিদি ধারার সকল আলিম বিদ্রোহ না করার পক্ষে। ইমাম মাতুরিদি তো জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে খারেজিদের সিফাত হিসেবে অভিহিত করেছেন।³ ইবনে আবদুল বার বলেন, বিষয়টি মতভেদপূর্ণ। তবে শাসক জালেম হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা চাই। কারণ, তাতে নিরাপত্তা ভীতিতে পরিণত হয়, মুসলমানের রক্তপাত ঘটে, পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। এর চেয়ে জুলুম ও অন্যায় সহ্য করাই উত্তম। অভিজ্ঞতাও বলে, দুটো অপছন্দের বিষয় সামনে থাকলে যেটা বেশি ক্ষতিকর সেটাকেই বর্জন করা উচিত। ইমাম নববি বলেন, ওটা প্রথম যুগে ছিল। পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাত জালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার ব্যাপারে একমত হয়।
মোট কথা, জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বৈধ কি না ব্যাপারটি প্রথম যুগে মতভেদপূর্ণ ছিল। অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ি জালিমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সঠিক মনে করতেন না। তবে অনেকে সরাসরি বিদ্রোহ করেছেন। হুসাইন, ইবনুজ জুবাইর-সহ নবি-পরিবারের সকলের কর্ম উক্ত দৃষ্টিতে দেখা হবে। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন দেখা গেল এগুলো ভালো কোনো ফলাফল বয়ে আনে না, তখন সালাফের সর্বসম্মত মত হলো জালেমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা। এভাবেই বুঝতে হবে ইমাম তহাবি-সহ অন্যদের মতামত। কারণ, সময়ের ফারাকটা অনেক। ফলে যদি রক্তপাত ও বড় ধরনের ফিতনা ছাড়া জালেমকে সরিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেটা করা উচিত। আর যদি রক্তপাত ছাড়া সম্ভব না হয়, তবে জমহুরের মতে থাকা উচিত। কারণ, তাতে প্রচুর রক্তপাত হয় এবং উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হয়। উপরন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকালেও জমহুরের মতকেই সর্বাধিক সঠিক, সবেচেয় যুক্তিযুক্ত এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণকর মনে হবে। হানাফি ও মাতুরিদি আলিম আবু হাফস গজনবি লিখেন, 'শাসক হওয়ার জন্য নিষ্পাপ হওয়া শর্ত নয়। ফলে জুলুম করলেই শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। কারণ, এর ফলে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, মুসলমানদের মাঝে অনিষ্ট ও হানাহানির সূচনা হয়। এটা বরং খারেজিদের মাজহাব।' ইবনে হাজার আসকালানি লিখেন, 'জালেমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা সালাফের একটি প্রাচীন মাজহাব। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন দেখা গেল এতে হিতে বিপরীত হয়, তখন সেটা বর্জন করার উপর সবাই একমত হয়েছেন। হাররা ও ইবনুল আশআস-সহ অন্যান্য বিদ্রোহের ঘটনায় চিন্তাশীলদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।'

টিকাঃ
১. মিনহাজুস সুন্নাহ, ইবনে তাইমিয়া (৪/৫২৮)। ২. আল ফিকহুল আবসাত (৪৪); বিস্তারিত দেখুন অধমকৃত ইমাম আবু হানিফার আকিদা গ্রন্থে। ৩. তাবিলাতু আহলিস সুন্নাহ, মাতুরিদি (১/১০৪)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px